(Bengali Novel)
বাড়িতে ঢুকে প্রথমেই নিজের ঘরে না গিয়ে একতলার বাথরুমে স্নান সারে মোহনা। সারাদিন পরে থাকা জামা কাপড়, শাড়ি কোনওটাই সে দোতলা অবধি নিয়ে যায় না, না কেচে। এটা তার সেই ছোটবেলার অভ্যাস। স্কুল থেকে ফিরে কাঁধের ব্যাগ নামিয়ে আগেই স্নান ঘরে ঢুকতে বলত মা। গা ধুয়ে পরিষ্কার জামা পরে কিছু খেয়ে নিয়ে দৌড়ে খেলার মাঠ। ফিরে এসে আবার হাত-পা-গা ধুয়ে জামা পালটে তবে নিজের ঘরে ঢুকত।
মা এই সময় তুলসী মঞ্চে প্রদীপ জ্বালিয়ে ধূপ ধরাত। বিশেষ বিশেষ দিনে সে মায়ের বদলে এই দায়িত্ব পালন করত।
আরও পড়ুন: জলকে চল: পর্ব – (১) (২) (৩) (৪) (৫) (৬) (৭) (৮) (৯) (১০) (১১), (১২) (১৩), (১৪)
মা বলত, প্রদীপ জ্বালিয়ে পূর্বপুরুষদের দেখাচ্ছি— এই যে আমি এখানে।
মায়ের কথা শুনে অবাক লাগত তার। আকাশ এখান থেকে কত উঁচুতে। সেখান থেকে নিচের সব কিছু ছোট লাগে। পূর্বপুরুষরা কী করে বুঝতে পারে তাদের পরিবারের কেউ বাতি দেখাচ্ছে!
তবে বিষয়টা মন্দ লাগত না। মায়ের মুখে তুলসী গাছের দুঃখের কথা শুনে বরং তার মন খারাপ হত।
মা বলত—
তুলসীর আরেকটা নাম বৃন্দা, কৃষ্ণপ্রিয়া রাধিকার সহচরী ছিলেন তিনি। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ মতে, একদিন গোলকে তুলসীকে কৃষ্ণের সঙ্গে ক্রীড়ারত দেখে রাধিকা তুলসীকে অভিশাপ দেন, ‘তুমি মানবীরূপে জন্মগ্রহণ করবে।’ এতে কৃষ্ণ দুঃখিত হয়ে তুলসীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন— মানবীরূপে জন্মগ্রহণ করলেও তপস্যা দ্বারা আমার একাংশ প্রাপ্ত হবে। রাধিকার শাপে তুলসী পৃথিবীতে রাজা ধর্মধ্বজ ও মাধবীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। তুলসী এদিকে নারায়ণকে ভুলতে পারেননি। তিনি ব্রহ্মার কঠোর তপস্যা করতে শুরু করেন। ব্রহ্মা তখন স্থির থাকতে না পেরে তাঁকে বর দিতে সম্মত হন।
শিব শঙ্খচূড়ের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হন এবং নারায়ণ শঙ্খচূড়ের রূপ ধারণ করে শঙ্খচূড়ের স্ত্রীর সঙ্গে ছলনা করলেন। ছলনা করে নারায়ণ তার সতীত্ব নষ্ট করেছেন জেনে, তুলসী নারায়ণকে অভিশাপ দেন যে, তুমি পাষাণে পরিণত হও।
তখন তুলসী বললেন, তিনি নারায়ণকে স্বামীরূপে চান।
ব্রহ্মা বললেন, এখন তুমি কৃষ্ণের অংশ সুদামার স্ত্রী হও। পরে কৃষ্ণকে লাভ করবে। রাধিকার শাপে সুদামা দানবরূপে জন্মগ্রহণ করবে, তার নাম হবে শঙ্খচূড়। নারায়ণের শাপে তুলসী বৃক্ষরূপে জন্মগ্রহণ করবে। তুমি না জন্মগ্রহণ করলে, তার সকল পূজা ব্যর্থ হবে।
যথা সময়ে শঙ্খচূড়ের সঙ্গে তুলসীর বিয়ে হল। শঙ্খচূড়ের বর ছিল যে, তাঁর স্ত্রীর সতীত্ব যেদিন নষ্ট হবে, সেদিন তাঁর মৃত্যু হবে।

নারায়ণ বললেন, শূল দ্বারা শিব যু্দ্ধে রত হলে আমি এর স্ত্রীর সতীত্ব নষ্ট করব। শিব শঙ্খচূড়ের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হন এবং নারায়ণ শঙ্খচূড়ের রূপ ধারণ করে শঙ্খচূড়ের স্ত্রীর সঙ্গে ছলনা করলেন। ছলনা করে নারায়ণ তার সতীত্ব নষ্ট করেছেন জেনে, তুলসী নারায়ণকে অভিশাপ দেন যে, তুমি পাষাণে পরিণত হও।
তুলসীকে সান্ত্বনা দিয়ে নারায়ণ বললেন, তোমার দেহ থেকে গণ্ডকী নদী উৎপন্ন হবে। আর তোমার কেশ থেকে উৎপন্ন হবে তুলসীবৃক্ষ। তুমি লক্ষ্মীর ন্যায় আমার প্রিয়া হবে।
তখন তুলসী নারায়ণের গৃহে স্থান চাইলে নারায়ণ বললেন, আমার গৃহে লক্ষ্মী রয়েছে, তোমার স্থান গৃহে নয়, গৃহাঙ্গনে হবে। সেই থেকে নারায়ণ শিলারূপে অবস্থিত। আর তার বুকে সবসময় তুলসী থাকেন।
তখন তুলসী নারায়ণের গৃহে স্থান চাইলে নারায়ণ বললেন, আমার গৃহে লক্ষ্মী রয়েছে, তোমার স্থান গৃহে নয়, গৃহাঙ্গনে হবে। সেই থেকে নারায়ণ শিলারূপে অবস্থিত। আর তার বুকে সবসময় তুলসী থাকেন।
মায়ের কথা শুনে মোহনার মন খারাপ হয়ে যেত তুলসীর জন্য। আহা রে! কত কষ্ট পেয়েছেন!
মা বলত, শুধু কি তুলসী? আমাদের সব পুরাণ, মহাকাব্যেই মেয়েদের নিচু করে দেখা হয়েছে। প্রতিটি দেবতার লোভের শিকার মেয়েরা, যারা জানতও না ছদ্মবেশে দেবতারা এসে তাঁদের স্পর্শ করছে। অথচ যত অভিশাপ সব মেয়েদের দিত। অহল্যা, তারা, মন্দোদরী, কুন্তী, দ্রৌপদী— সবার সঙ্গেই প্রতারণা করা হয়েছে।
– কিন্তু মা এরা তো সতী।
– না করে উপায় কী? অন্যায় তো করেছে দেবতারাই। এখন তাদের যদি সতী না বলা হয়, তবে অন্যদের কাছে দেবতা বলে কীভাবে পুজো পাবে? তাই এই মিথ্যা সান্ত্বনা পুরস্কার।
– সবাই যদি খারাপ হয়, তুমি তাহলে কেন ঠাকুরে বিশ্বাস করো?
সম্মান কতটা অর্জন করেছে, মোহনা বুঝতে পারে না আজও। কিন্তু এ বাড়িতে এসেও তুলসী তলায় প্রদীপ জ্বালাতে ভোলে না। তার কোন পূর্বপুরুষ এই দীপের শিখা দেখে তাকে চিনতে পারছে, সেটাও সে জানে না। শুধু ভাল লাগাটা রয়ে গেছে।
– বিশ্বাস মানুষের মনের জোর বাড়ায়। তাই করি। তবে আমি জীবন্ত ঈশ্বরকে পুজো করি। রামকৃষ্ণ, রামমোহন, বিদ্যাসাগর…। মেয়ে জন্ম কী অত সোজা! তাদের কথা দেড়শো বছর আগে কে শুনত! গুটিকয় মহাপুরুষ জন্মেছিল বলে মেয়েরা মানুষের মর্যাদা পেল। তাও কী আজও মেয়েদের দুর্দশা ঘুচেছে? সেই জন্য তোকে বলি ভাল করে পড়াশোনা শিখে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। নইলে কোনও সম্মান পাবি না।
সম্মান কতটা অর্জন করেছে, মোহনা বুঝতে পারে না আজও। কিন্তু এ বাড়িতে এসেও তুলসী তলায় প্রদীপ জ্বালাতে ভোলে না। তার কোন পূর্বপুরুষ এই দীপের শিখা দেখে তাকে চিনতে পারছে, সেটাও সে জানে না। শুধু ভাল লাগাটা রয়ে গেছে।
প্রদীপ আর ধূপ ধরিয়ে উপরে উঠে এল সে। রাই তাকে দেখতে পেয়েই জড়িয়ে ধরল। মেয়েটা বয়সেই কেবল বড় হয়েছে, এখনও সেই ছোটবেলার মতোই সে বাড়ি ফেরা মাত্র ‘মা আদর’ বলে জড়িয়ে ধরে।

– কী হল?
– তুমি আজকাল বড্ড বার ফটকা হয়ে যাচ্ছ মা। বাড়ি ফিরতে তোমার ইচ্ছেই করে না।
মেয়ের মুখে এই ভাষা শুনে একটু অবাক হল মোহনা। এ ভাষা তুই কোথা থেকে শিখলি?
– ওই যে কী একটা সিরিয়াল চলছিল, আম্মা দেখে, সেখানে ছেলের বউকে শাশুড়ি মা বলছিল।
ওই যে সিরিয়াল চালিয়ে রেখে ফেসবুক। আম্মাকে কিছু বোলো না। আম্মা টিভিটা চালিয়ে রাখে ঠিকই, কিন্তু কিছুই দেখে না। বলে, একটা কিছু চললে মনে হয় বাড়িটায় লোক আছে, তাই চালিয়ে রাখা।
– এইসব জঘন্য সিরিয়াল দেখে আম্মা? আর তুইও? আমি তো ভাবতেই পারছি না মায়ের সঙ্গে এই ভাষায় কেউ কথা বলতে পারে!
– সরি মা। রাগ করো না। আমি তো মজা করলাম।
– আম্মা কী করছে?
ওই যে সিরিয়াল চালিয়ে রেখে ফেসবুক। আম্মাকে কিছু বোলো না। আম্মা টিভিটা চালিয়ে রাখে ঠিকই, কিন্তু কিছুই দেখে না। বলে, একটা কিছু চললে মনে হয় বাড়িটায় লোক আছে, তাই চালিয়ে রাখা।
– কেন? তুই কথা বলিস না সারাদিন?
– আমি যতটুকু সময় পাই বলি তো! তুমিই বা কতক্ষণ বলো?
– আমি তাহলে সারাদিন বাড়িতে বসে থাকি। কাজকর্মগুলো তুই কর।
কী জানাব? আমার কলেজে ভরতির সময় তুমি কি জানতে আমি কোথায় কোথায় ফর্ম ফিল আপ করেছি? কাম অন। এখন হঠাৎ করে আমাকে নিয়ে এত ভাবতে বসো না। বি কুল।
– আমি কেন তোমার কাজ সামলাব? তুমি কি আমার কাজ করে দেবে যখন আমি ব্যবসা করব?
– তুই আবার কীসের ব্যবসা করবি?
– করব। তবে এখনই নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না। আগে হায়ার স্টাডি কীসে করি দেখি।
– দেখি মানে? যা নিয়ে পড়ছিস তার ওপরেই করবি।
– তার কোনও মানে নেই মা। আমি হয়তো ম্যানেজমেন্ট নিয়েও পড়তে পারি। ভেবে রেখেছি, দেখেও রেখেছি। কতগুলো জায়গায় ফর্ম ফিল-আপও করে দিয়েছি। দেখি শেষ অবধি কোথায় পড়ি বা পাই।
– আমাকে তো জানাসনি?
– কী জানাব? আমার কলেজে ভরতির সময় তুমি কি জানতে আমি কোথায় কোথায় ফর্ম ফিল আপ করেছি? কাম অন। এখন হঠাৎ করে আমাকে নিয়ে এত ভাবতে বসো না। বি কুল।
না না, বলল, কিন্তু খেয়ে নিয়েছে। বলল, তোর মা আবার রাগ করবে না খেলে। বলে হেসে উঠল রাই।
– বুঝলাম। বলে কথা ঘোরাল মোহনা। বাবু আইসক্রিম দিয়েছে?
– হ্যাঁ। কাটলেটও খেলাম। আম্মাকেও ডেভিল দিলাম। আম্মা বলছিল, বাইরের জিনিস না খাওয়াই ভাল।
– খায়নি?
– না না, বলল, কিন্তু খেয়ে নিয়েছে। বলল, তোর মা আবার রাগ করবে না খেলে। বলে হেসে উঠল রাই।
– চল আম্মার ঘরে গিয়ে একটু গল্প করে আসি।

– তুমি যাও মা। আমি প্রোজেক্টের কাজ করছি।
– কী বিষয়?
– রবীন্দ্র ভাবনায় নারী।
– বই পেয়েছিস?
– আম্মা অনেক রেফারেন্স দিয়েছে।
এই শুরু হল গেম নিয়ে বলা! আমি না পড়লে পরীক্ষাটা কে দেবে মা? তুমি তো একটা প্রোজেক্টও করে দাও না। সব আমাকে একাই করতে হয়।
– বাহ! পরীক্ষার ডেট দিল?
– এখনও দেয়নি। তবে এই সপ্তাহে দিয়ে দেবে শিওর।
– পড়াশোনা করছিস? নাকি সারাদিন গেম চলছে?
– এই শুরু হল গেম নিয়ে বলা! আমি না পড়লে পরীক্ষাটা কে দেবে মা? তুমি তো একটা প্রোজেক্টও করে দাও না। সব আমাকে একাই করতে হয়।
– এত বড় মেয়েকে আবার আমি কী করে দেব? তাছাড়া তোর সাবজেক্ট আর আমার সাবজেক্ট এক নয়।
– তাহলে আমারটা যখন আমাকেই করতে হয়, তুমি এত জেরা কেন করো? যাও তার থেকে বরং আম্মার সঙ্গে গল্প করো।
– তুই ঘরে থেকে থেকে বড্ড অসহিষ্ণু হয়ে যাচ্ছিস। একটুতেই রেগে যাস।
– আমি তো ঘরে বসে বিরক্ত হচ্ছি। যদি বেরোবার উপায় থাকত বেরোতাম। কিন্তু তুমিও তো দিদার সঙ্গে মিসবিহেভ করো।
– আমি! এ কথা তোকে দিদা বলেছে?
সে মেয়ের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। পিছন থেকে হাত বাড়িয়ে মাথাটা ঘুরিয়ে কপালে একটা চুমু খেল। সোনা মা! বলে স্নেহলতার ঘরের দিকে পা বাড়াল।
– দিদা কেন বলবে? আমার তো কান আছে, শুনতে পাই। আচ্ছা, আমি পড়তে গেলাম, বলে রাই পড়ার টেবিলে ফিরে গেল।
মোহনা সেদিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল। সত্যি সে আজকাল মাকে একটুতেই সমালোচনা করে। কিন্তু মা তো তার মতো এতক্ষণ বাইরে থাকত না। রাইয়ের পড়াশোনা সে অর্থে সে কোনওদিনই দেখেনি। মেয়েটা নিজে নিজেই পড়ে। অথচ তার ক্লাস টেন অবধি মা-ই সব দেখিয়ে দিত। তবু কেন মাঝে-মাঝে মায়ের প্রতি তার এত রাগ হয়, সে নিজেও বুঝে উঠতে পারে না।
সে মেয়ের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। পিছন থেকে হাত বাড়িয়ে মাথাটা ঘুরিয়ে কপালে একটা চুমু খেল। সোনা মা! বলে স্নেহলতার ঘরের দিকে পা বাড়াল।
স্নেহলতার ঘরে টিভি নিজের মতোই চলছে। তার হাতে মোবাইল ধরা। সেখানে কেউ একজন গীতা পাঠ করছেন।
মোহনাকে দেখে তিনি মোবাইল পাশে রেখে দিয়ে হাসল।
মোহনা টিভির সুইচ আর মোবাইলের সাউন্ড অফ করে তার বিছানায় উঠে বসল।
মোহনা হাসল। সারাদিন কী করলে? – করার আর কী আছে? বই পড়তে পড়তে চোখ লেগে গেছিল। তোমার আজ মিটিং কেমন হল?
– চা খেলে? মালতি দিয়েছে?
– দিচ্ছে মা। তোমাকেও দিতে বললাম।
– ভালই করেছ বলে। মনটা চা চা করছিল।
মোহনা হাসল। সারাদিন কী করলে?

– করার আর কী আছে? বই পড়তে পড়তে চোখ লেগে গেছিল। তোমার আজ মিটিং কেমন হল?
– হয়েছে মোটামুটি। এখন দেখা যাক।
– আচ্ছা বউমা, আমাদের পুরোনো বইয়ের লিস্টে একটা বই ছিল, প্রথম মহিলা লেখিকার গোয়েন্দা কাহিনি। দেখো তো বইটার কোনও কপি পাও কি না! একটা চরিত্র ছিল তাতে, মানে যে গোয়েন্দার সহকারী ছিল, তার নামটা কিছুতেই মনে করতে পারছি না।
ওদের বাড়ির মেয়েদের সঙ্গে তাঁর বেশ যোগাযোগও ছিল। আমাকে যা দেখছ, সব তাঁর হাতে তৈরি। আমি মূর্খ মেয়েমানুষ ছিলাম। কিন্তু তিনি আমাকে সবসময় বলতেন, ‘নিজেকে ছোট ভাববে না। নিজের মধ্যে হীন মনোভাব থাকলে লোকেও তাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে।’
– বেশ দেখব। তোমার বই পড়তে খুব ভাল লাগে, তাই না?
– হ্যাঁ। এ বাড়িতে তো তেমন কাজ ছিল না। বিয়ের পর শাশুড়ি মা রান্নাঘর সামলাতেন। আমি টুকটাক সাহায্য করতাম। তাছাড়া তখন অনেকগুলো দাস-দাসীও ছিল সাহায্যের জন্য। মা বলতেন, বউমা সুযোগ যখন পাচ্ছ পড়ে নাও, যত পড়বে তত সমাজকে চিনতে পারবে। আসলে তিনি নিজেও ছিলেন বই পাগল। আমার শ্বশুরমশাইও সব বইয়ের পাণ্ডুলিপি আগে তাঁকেই পড়তে দিতেন। তিনি স্কুলে পড়াশোনা শিখেছিলেন। কলেজে যেতে পারেননি। আমাদের বাপের বাড়িতে মা জ্যাঠাইমারা সব জড়িয়ে শাড়ি পরত। আমি এ বাড়ি এসে দেখি তিনি শাড়ি পরছেন কুঁচি দিয়ে, তিনি এ ব্যাপারে ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের অনুসরণ করতেন।
ওদের বাড়ির মেয়েদের সঙ্গে তাঁর বেশ যোগাযোগও ছিল। আমাকে যা দেখছ, সব তাঁর হাতে তৈরি। আমি মূর্খ মেয়েমানুষ ছিলাম। কিন্তু তিনি আমাকে সবসময় বলতেন, ‘নিজেকে ছোট ভাববে না। নিজের মধ্যে হীন মনোভাব থাকলে লোকেও তাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে।’
– আমার মাঝে মাঝে মনে হয় তোমার শাশুড়ি মায়ের সঙ্গে যদি আমার দেখা হত, খুব ভাল হত।
-সে হত। তবে তিনি তো খোকার যখন সাত বছর তখনই চলে গেলেন। তার তিন বছরের মধ্যেই শ্বশুরমশাইও। সেইসব দিনগুলো খুব খারাপ গেছে। তোমার শ্বশুরমশাইয়ের বয়স বেশি ছিল না তখন। প্রকাশনার কিছুই বুঝতেন না। ব্যবসায়িক বুদ্ধিও কিচ্ছু ছিল না। তবু যে কী করে এতদিন ধরে রেখেছিলেন কে জানে!
স্নেহলতার ঘর থেকে বেরিয়ে মোহনা ছাদে গেল। এই সময়টা তার ছাদে গিয়ে দাঁড়াতে বেশ লাগে। কত তারা, গ্রহ, উপগ্রহ, মনে হয় এই তো কাছেই। অথচ কয়েকশো কোটি যোজন দূরে। সে সেদিকে তাকিয়ে গুন গুন করে গেয়ে উঠল— ‘মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকাল-মাঝে, আমি মানব একাকী ভ্রমি বিস্ময়ে, ভ্রমি বিস্ময়ে…’
– তোমার মনে হয়নি হাল ধরতে?
– কী যে বলো! আমি কি অত বুদ্ধি রাখি? আর আমার শাশুড়িমায়ের মতো আমি অত চটপটে, বুদ্ধিমতীও ছিলাম না। তবে তুমি কিন্তু একেবারে আমার শাশুড়ি মায়ের উপযুক্ত নাত-বউ। তিনি বেঁচে থাকলে খুব খুশি হতেন।
মোহনা হেসে উঠে দাঁড়িয়ে বলল— মালতি সেই যে চা দিয়ে গেল, তারপর কী রাঁধল কে জানে! দেখি একবার।
– হ্যাঁ, যাও মা।
স্নেহলতার ঘর থেকে বেরিয়ে মোহনা ছাদে গেল। এই সময়টা তার ছাদে গিয়ে দাঁড়াতে বেশ লাগে। কত তারা, গ্রহ, উপগ্রহ, মনে হয় এই তো কাছেই। অথচ কয়েকশো কোটি যোজন দূরে। সে সেদিকে তাকিয়ে গুন গুন করে গেয়ে উঠল— ‘মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকাল-মাঝে, আমি মানব একাকী ভ্রমি বিস্ময়ে, ভ্রমি বিস্ময়ে…’
(ক্রমশ)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
বিতস্তা ঘোষাল ঔপন্যাসিক, গল্পকার, কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। আধুনিক ইতিহাসে এম এ, লাইব্রেরি সায়েন্সে বিলিস। কলেজে সাময়িক অধ্যাপনা। প্রকাশনা সংস্থা ভাষা সংসদের কর্ণধার। ও অনুবাদ সাহিত্যের একমাত্র পত্রিকা ‘অনুবাদ পত্রিকা’-র সম্পাদক।
'বাংলা আকাডেমি', 'সারস্বত সম্মান', 'বিবেকানন্দ যুব সম্মান', ‘একান্তর কথাসাহিত্যিক পুরস্কার', 'কেতকী' কবি সম্মান, ‘চলন্তিকা’, 'দুই বাংলা সেরা কবি সম্মান', 'বিজয়া সর্বজয়া', 'মদন মোহন তর্কালঙ্কার সম্মান', 'বই বন্ধু সেরা লেখক ২০২৪' সহ একাধিক পুরস্কার ও সম্মান প্রাপ্ত।
বিতস্তার প্রকাশিত বই ৩৪টি। তাঁর কবিতা ও গল্প হিন্দি, ওড়িয়া, অসমিয়া ও ইংরেজি,ইতালি, গ্রীক ও স্প্যানিশে অনুবাদ হয়েছে। সম্প্রতি ওড়িয়া ভাষায় প্রকাশিত তার গল্প সংকলন রূপকথার রাজকন্যারা।
দেশ বিদেশে কবিতা ও গল্প পড়ার ডাক পেয়েছেন একাধিকবার।বাংলা সবকটি জনপ্রিয় পত্রিকা ও সংবাদপত্রে তার লেখা নিয়মিত প্রকাশিত।
নিজের কাজের গণ্ডীর বাইরে অফিস ও পরিবারেই স্বচ্ছন্দ বিতস্তা কাজের ফাঁকে অবসর সময় কাটান নানান সামাজিক কাজে।
ভালোবাসা ছাড়া বাকি সব কাজ গুরুত্বপূর্ণহীন। তার নিজের কথায় ভালোবাসা ছাড়া কেউ কি বাঁচে?
