(Boimela Theke Fire)
বইমেলা নিয়ে কথা উঠলেই যাঁদের কথা মাথায় আসে, তাঁদের এক নায়ক সদ্য চলে গেলেন! ‘শংকর’। বাড়ি থেকে জিটি রোড যাওয়ার পথে বাঁদিকে একটি পুরোনো বাড়ি পড়ে। লম্বা এক উঠোনের মাঝে একটি সাইকাস গাছ। দেখলে মনে হয়, অনেকদিন কোনও অতিথি আসেনি এবাড়িতে। প্রয়োজনীয় কাজটুকুর বাইরে কেউ পা রাখেনি এই উঠোনে, আর তাই একটি বিশেষ পথ ছাড়া গোটাটাই শ্যাওলা। ছেলেবেলায় শোনা গল্পের বাড়ির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন হয় বলেই হয়তো পুরোনো বাড়ির প্রতি এক অদ্ভুত টান থাকে শৈশবে। বাড়িটি দেখিয়ে বাবা বরাবর বলে এসেছেন, এই দেখ এটা শংকরের শ্বশুরবাড়ি। লেখক মণিশংকর মুখোপাধ্যায়! বাংলা সাহিত্যের সম্ভবত শেষ নায়ক!
জনপ্রিয়তার কারণে যে মানুষটি অব্দি পৌঁছে কখনও সইয়ের খাতা হাতে ধরাতে পারিনি! মনে পড়ে বাবার হাত ধরে যখন ময়দান মেলায় যেতাম, যখন কুশল কাকুদের পত্রিকা নিয়ে মাঠের মাঝেই কোথাও কাগজ পেতে বসে যেতাম, অনিয়মিত আস্তানা থেকে আমাদের তাড়িয়ে দিতে আসত পুলিশ! তারপর লোটাকম্বল গুছিয়ে আবার কোনও এক আস্তানায়! আমাদের মতোই কাগজ পেতে জটলা করত আরও অনেকে, কেউ পরিবার নিয়ে সেরে নিত লাঞ্চ, কেউ বা গিটার হাতে বন্ধুদের সঙ্গে গানবাজনা করে বিক্রি করত আঁকা! সেই এবড়োখেবড়ো মাঠের মেলায় বার দশেক পা মচকাতো আমাদের। আর সেই দুঃখ ভোলাতে বড়রা নিয়ে যেতেন হরলিক্সের স্টলে। সেখানে পাওয়া যেত রেডিমেড হরলিক্স! এই অপ্রত্যাশিত এনার্জি জড়ো করেই ছুটতাম সইয়ের খাতা নিয়ে, কোথায়, কোন স্টলের সামনে ভিড়, বয়স্ক কোনও লেখক বসে সই দিচ্ছেন সেখানে…
আরও পড়ুন: মেলার সাক্ষী চাতাল…
ছেলেবেলা থেকে যা যা কিছু আগলে রেখেছি তাতে স্মৃতির সম্ভার ছাড়া বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছি সইয়ের খাতাটুকুই। বইমেলার নায়কদের সই! তাঁরা নাম জিজ্ঞাসা করতেন, তারপর কিছু একটা এমন লিখে দিতেন, যা একমাত্র আমার কাছেই রয়ে যেত সারাজীবন! লেখকের এই দশ বারো শব্দের ব্যক্তিগত মালিকানা আরও অনেকটা গর্বিত করত আমাদের! (Boimela Theke Fire)

মেলা পালিয়ে বেড়ালো! সেই সঙ্গেই বদলে বদলে গেল নায়কদের মুখ! চলে গেলেন অনেকেই, যাঁরা রয়েও গেলেন তাঁরাও এই মুহূর্তে অনেকেই আর মেলায় আসার মতো নেই! দূর থেকে সমীহ রাখলাম তাঁদের প্রতি। এরপর পত্রিকা হল নিজেদের। গোটা মেলাটাকে এক অন্য চোখে দেখতে শুরু করলাম! সেখানে শুধু পাঠক আর পাঠক! কোণের দিকে একটা ছোট্ট জায়গা বরাদ্দ হল আমাদের জন্য! লিটল ম্যাগাজিন প্যাভেলিয়ান। (Boimela Theke Fire)
বাবার হাত ছেড়ে একা যাওয়া শুরু করলাম, সে এক অন্য মেলা! এখানে কাউকে চিনি না আমি! এখানে মায়ের বাড়িয়ে দেওয়া জলের বোতল নেই! বাবার চিনিয়ে দেওয়া লেখক নেই! কিন্নর জ্যেঠু-জেঠিমার হৈ হৈ নেই! দিদি, টুলকি দিদির বইয়ের ব্যাগ নেই! থাকার মধ্যে আছি আমি, আর আসমুদ্র পাঠক! এই খোলা মাঠে এবার নিজের পরিচিতি নিজের বানানোর সময়! (Boimela Theke Fire)
পত্রিকার নেশায় যখন জেলা মেলা বা ছোট ছোট লিটল ম্যাগাজিন মেলায় ছুটে বেড়াচ্ছি নানান জায়গায়, কখনও ডানকুনি, কখনও কোন্নগর, শ্রীরামপুর বা সিঙ্গুর, এই ভদ্রলোককে দেখে অবাক হয়ে যেতাম! কোনও মেলা বাদ পড়ে না তাঁর!
ক্রমশ যত আপন হয়ে উঠলাম, বুঝতে শুরু করলাম নায়ক নন, মেলাটা চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন পার্শ্বচরিত্ররা! তাঁদের মধ্যে লেখক, প্রকাশক, প্রেস ছাড়াও রয়েছেন আরও অনেকে! মেলায় ঘুরতে ঘুরতে যাঁদের সঙ্গে প্রতিটা মোড়ে দেখা হয়ে যায় আচমকা, যাঁরা ধীরে ধীরে মুখ চিনে গেছেন বলে আমাদের কাছে বেচতে আসেন না ফেরি করা বই, খুব খুঁটিয়ে দেখি তাঁদেরও! মুখে কতকালের মেলার ধুলো লেগে! একটা সময়ের পর মানুষ বুঝতে শিখে যান কে তাঁর ক্রেতা, অথবা কে নয়! তবু মানুষ ফেরি করে, বই হাতে নিয়ে, কেউ সোজা হয়ে, কেউ ঝুঁকে পড়া শরীর নিয়ে ত্রিশ-চল্লিশ বছর ধরে ফেরি করে বই! (Boimela Theke Fire)

মেলার পার্শ্বচরিত্র বললেই যাঁর মুখ ভেসে ওঠে আগে, তিনি অলোক দত্ত। যবে থেকে মনে করতে পারি বইমেলা, এই লোকটাকে না দেখে বাড়ি ফিরিনি কোনওবার! ‘তিন টাকায় কিনবেন, পাঁচ মিনিট পড়বেন, এক ঘণ্টা হাসবেন’… এমন সব নানান ডায়লগ বলে মেলাজুড়ে বই ফেরি করেন তিনি। আজ নয়, বোধহয় আমার জন্মের অনেক আগে থেকেই! (Boimela Theke Fire)
পত্রিকার নেশায় যখন জেলা মেলা বা ছোট ছোট লিটল ম্যাগাজিন মেলায় ছুটে বেড়াচ্ছি নানান জায়গায়, কখনও ডানকুনি, কখনও কোন্নগর, শ্রীরামপুর বা সিঙ্গুর, এই ভদ্রলোককে দেখে অবাক হয়ে যেতাম! কোনও মেলা বাদ পড়ে না তাঁর! সর্বত্র যান, ঘুরেই বিক্রি করেন বইপত্র, পত্রিকা! বাবার চেয়ে বয়সে সামান্য বড়ই হবেন তিনি। অথচ কোনও ক্লান্তি নেই, নিজের নাটকে নিজের ভূমিকায়! দু’একবার কিনেছি তাঁর বই, কিন্তু পড়ে দেখা হয়নি। (Boimela Theke Fire)
আরও পড়ুন: মামার সামাজিক ভূমিকা
২০১৬ বা ১৭ সালে উত্তরপাড়া ‘গণ উদ্যোগ’-এর চেষ্টায় একটি লিটল ম্যাগাজিন মেলা শুরু হয়েছিল। তার দ্বিতীয় বর্ষের মেলাটি হয়েছিল হিন্দমোটরে দেশবন্ধু পার্কে। মফঃস্বলের সংস্কৃতিচর্চায় লিটল ম্যাগাজিনের ভূমিকা বলতে, মেলা হলে কিছু চা, চপ, সিগারেট বেশি বিক্রি হয়, এটুকুই! তবে মঞ্চে নাচ গান না হলে আর মেলা করে লাভ কী! কিন্তু কেবলই নাচ গান কেন? লিটল ম্যাগাজিন করতে গিয়ে যাঁরা মঞ্চ পেলেন না, তাঁদেরই বা একেবারে ফেলে দেওয়া যায় নাকি! অতএব কবিতাপাঠের আয়োজন হল। খুব একটা ছোট না সে তালিকা! মেধার বিচারে নয়, বরং স্বতঃস্ফূর্তভাবে যাঁরা নাম দিলেন, তাঁরা সকলেই উঠলেন মঞ্চে একে একে। কোনও এক ফাঁকে দেখলাম, নিজের ভূমিকা ছেড়ে রেখে মঞ্চে উঠলেন অলোকবাবু। তারপর কোনও খাতা, কোনও বই ছাড়াই, গড়গড় করে পড়লেন নিজের একটি লেখা, সেই দীর্ঘ্য পদ্যের মূল চরিত্র মেয়েটির নাম ‘বীথি’! সে লেখা আজও কানে বাজে আমার! (Boimela Theke Fire)
দুর্গাশঙ্কর রায়… মেলার শেষ দিনে প্যাভেলিয়ন ঘুরে নিজের পাঞ্জাবিতে মতামত লেখান, সবাইকে দিয়ে! যে যার ইচ্ছামতো তাতে লিখে দেন যা খুশি! তারপর বইমেলার স্মৃতি হয়ে থেকে যায় সে পাঞ্জাবি।
এমন এক প্রতিভা মঞ্চে পেলে কি হয়ে উঠতে পারত না নায়ক? নাকি হেলাতেই তিনি হারিয়েছেন নিজের জায়গা? নিজেকে পার্শ্বচরিত্র হিসাবে দেখার সুখ নিজেই বেছে নিয়েছেন তিনি? জানি না! এভাবে কারোর ভালবাসায় দেগে দেওয়া যায় না অভিযোগ! (Boimela Theke Fire)

মাঝের কিছুটা সময় স্কিপ করে আসি এবার। এবার অর্থাৎ ২০২৬-এর বইমেলায় আলাপ হল তাঁর সঙ্গে, তিনিও এক অদ্ভুত চরিত্র। জানি না এতদিন কীভাবে চোখের আড়ালে রয়ে গেলেন তিনি! দুর্গাশঙ্কর রায়… মেলার শেষ দিনে প্যাভেলিয়ন ঘুরে নিজের পাঞ্জাবিতে মতামত লেখান, সবাইকে দিয়ে! যে যার ইচ্ছামতো তাতে লিখে দেন যা খুশি! তারপর বইমেলার স্মৃতি হয়ে থেকে যায় সে পাঞ্জাবি। পরের বছর আবার নতুন একটি পাঞ্জাবিতে তিনি শুরু করেন এই রিচুয়াল! (Boimela Theke Fire)
পাশে এসে দাঁড়ালেন লাঠি হাতে, রোগা চেহারা, হাতে ৬-৭টি মার্কার পেন, নানান রঙের কালির। বললেন ‘ভাই, কিছু একটু লিখে দাও, দেখো কোথায় জায়গা আছে!’ দ্বিধাগ্রস্ত আমি ওঁর পিঠ ভর্তি বাংলা ভাষার মাঝে খুঁজে নিই নিজের সামান্য ঠাঁই, তারপর হয়ে গেছে জানাতেই বলেন, ‘নাম, তারিখ সব লিখেছ? লিখে দাও! তোমরা নতুন প্রজন্ম এত সঙ্কোচ করলে হবে?’ দ্বিতীয়বারে লিখে দিই সেসব। তারপর খানিক নিজের স্বার্থেই আড্ডায় বাঁধি তাঁকে। চেয়ে নিই ফোন নম্বর, কে কী লিখেছিলেন সেই গল্প শোনাতে থাকেন তিনি… মুখস্থ বলতে থাকেন এক একজনের লেখা! ২রা ফেব্রুয়ারি রাস্তায় পড়ে গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। প্রায় জোর করেই সেখান থেকে ছুটি নিয়ে, মেলায় হাজির হন ৩ তারিখ। ভদ্রলোক গল্পের ছলেই জানান এই বিষয়টি তিনি গত চল্লিশ বছর ধরে করে আসছেন। (Boimela Theke Fire)

অগুণতি পার্শ্বচরিত্রের মধ্যে লেখা হল না যাঁদের নিয়ে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম যে ভদ্রমহিলার নাম মনে করতে পারছি না, তাঁকে দূর থেকে দেখে আসছি অনেক বছর ধরে। মৃত ছেলের ইচ্ছা পূরণ করতে চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁর পত্রিকা। আর এই পত্রিকা আর মেলার দৌলতে, আরও কত পুত্রের মা হয়ে উঠছেন তিনি! তাঁদের দিকে স্পটলাইট নেই। তাঁদের হাতে রঙচঙে ভ্যান নেই, ঘণ্টা বাজানো স্তাবক নেই। নেই মিডিয়াও। এঁরা মন দিয়ে লিখলে অনেকের ছুটি হয়ে যেতে পারত এই বাজার থেকে। বাজার কাঁপানো দাদাদের কেদারা টলে গেলেও তো যেতেই পারত। তাতে মন্দ হত না কিছুই, বরং অন্য এক লবির উত্থান দেখতাম আমরা। বইমেলা এক রঙিন উৎসব, যেখানে সাদা বা কালোর বাইরেও উড়ে বেড়ায় ছাই রঙা অনেক মানুষ, যাঁদের মুখোশ খুলে গেলে নায়কের আসন কেঁপে উঠতে পারে প্রচণ্ড জোরে। (Boimela Theke Fire)
চিত্র ঋণ- অরিত্র দত্ত
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
আকাশ লিখতে ভালোবাসে, ভালোবাসে গাছপালা আর বাইক রাইড! একসময় খেলাধুলার সঙ্গে কাটিয়েছে এক দশকেরও বেশি সময়। গত বেশ কয়েক বছর ধরে বাংলা পোর্টালে কর্মরত। যদিও মন থেকে ব্যবসার প্রতি এক অদ্ভুত টান আছে তার!
