(Rajshekhar Basu)
নিয়মানুবর্তিতা ও সুশৃঙ্খল অভ্যাসের জন্য রাজশেখর বসু, সমগ্র বাঙালি সমাজের কাছেই এক দৃষ্টান্ত। শুধু সাহিত্য ও বিজ্ঞানমেধায় নয়, সাধারণ বাঙালির থেকে তাঁকে পৃথক করা যায় তাঁর কাজের প্রতি নিষ্ঠা দিয়ে। ১৮৮০ সালের ১৬ মার্চ (মতান্তরে ১৮ মার্চ) বর্ধমান জেলার বামুনপাড়ায় রাজশেখর বসুর জন্ম। পৈতৃক বাড়ি ছিল নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরের কাছে উলা বীরনগরে। বাবা চন্দ্রশেখর বসু ও মা লক্ষ্মীমণি দেবী।
রাজশেখর বসুরা ছিলেন, নয় ভাই বোন। ইন্দুমতী, কুমুদবতী, শশিশেখর, ঊষাবতী, লীলাবতী, রাজশেখর, হিরণ্যবতী, কৃষ্ণশেখর, গিরীন্দ্রশেখর। রাজশেখরের শৈশব কেটেছে দ্বারভাঙ্গায়, বাবার কাজের জায়গায়। কলকাতায় ফেরার পর সৃষ্টির প্রসার ঘটে। ১৮৯৯ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানে অনার্স। ১৯০৩ সালে বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কসে রসায়নবিদ হিসেবে যোগদান। এক বছরের মধ্যেই হয়ে ওঠেন সেখানকার ম্যানেজার ও পরে সেক্রেটারি। প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা ও উদ্ভাবন সমান তালে এগিয়ে নিয়ে যান তিনিই।
আরও পড়ুন: চিরকালীন জাদুসম্রাট
রাজশেখর বসুকে বাংলা সাহিত্যের জগতে কোনও একটি অভিধায় প্রকাশ করা দুরূহ। তিনি অনুবাদক, অভিধান রচয়িতা, বিজ্ঞানী, ব্যবসা পরিচালক, দক্ষ প্রশাসক, পরিভাষা বিশারদ। তাঁর মতো বহুমুখী প্রতিভার মূল্যায়ন বঙ্গসমাজে আজও অসম্পূর্ণ থেকে গিয়েছে।

১৯০৬ সালে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ প্রতিষ্ঠানে সক্রিয়ভাবে যোগ দেন তিনি। ১৯২২ সালে ‘ইণ্ডিয়ান সাইকো- অ্যানালিটিক্যাল সোসাইটি’র সঙ্গেও যুক্ত হন। যুক্ত ছিলেন ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ’-এর সঙ্গেও।
আদ্যোপান্ত স্বদেশি ভাবনার এই মানুষটি ছিলেন স্বভাবগম্ভীর। ১৯২২ সালে ‘পরশুরাম’ ছদ্মনামে সাহিত্য জগতে পদার্পণ। ১৯২৪ সালে তাঁর ‘শ্রীশ্রীসিদ্ধেশ্বরী লিমিটেড’, ‘চিকিৎসা সংকট’, ‘মহাবিদ্যা’, ‘লম্বকর্ণ’ ও ‘ভুশণ্ডীর মাঠে’ গল্পগুলি নিয়ে প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘গড্ডলিকা’ প্রকাশিত হয়। প্রকাশক ছিলেন ১৪ নম্বর পার্শীবাগানের শ্রীব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। বইতে ছবি এঁকেছিলেন শ্রী যতীন্দ্রকুমার সেন। সাহিত্যে মহামূল্য অবদানের পরেও রাজশেখর বসুর সবিনয় স্বীকারোক্তি ছিল, ‘আমি সাহিত্যিক নই। সাহিত্যিক হতে গেলে কিছু বিদেশি এবং অনেক কিছু দেশি সাহিত্য পড়তে হয়। আমি প্রায় কিছুই পড়িনি। কাজেই আমাকে লেখক বলতে পারেন, সাহিত্যিক কিছুতেই নয়।’

১৯৫৮ সালে, ‘আনন্দীবাঈ ইত্যাদি গল্প’–র জন্য রাজশেখর বসু ‘অকাদেমি পুরস্কার’ পান। ১৯৫৫ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’-এ সম্মানিত করে ‘কৃষ্ণকলি ইত্যাদি গল্প’-র জন্য। ভারত সরকার ‘পদ্মভূষণ’ সম্মানে সম্মানিত করে ১৯৫৬ সালে। তৎকালীন সময়েই তাঁর গুণগ্রাহীর সংখ্যা ছিল বেশ দীর্ঘ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৩৩৯ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত ‘দুই বোন’ গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছিলেন রাজশেখর বসুকে।
সাহিত্য ও বিজ্ঞানে দক্ষতার পাশাপাশি নানা ছোটখাটো বিষয়ে তাঁর মুন্সিয়ানা ছিল নজরকাড়া। নিজের বকুলবাগানের বাড়ির নীল নকশা, আসবাবপত্রের নকশা নিজেই করেছিলেন। বাজার করতে ভীষণ পছন্দ করতেন। বাংলা লাইনো টাইপের উদ্ভাবক সুরেশচন্দ্র মজুমদারের অন্যতম সহযোগী ছিলেন রাজশেখর বসু।
কর্মমুখর এই মানুষটির বাইরের জীবন যতটা উজ্জ্বল, ব্যক্তিগত জীবন ছিল ততটাই কষ্টের। ১৯৩৪ সালের ১৫ এপ্রিল একই দিনে তাঁর কন্যা প্রতিমা ও জামাতা অমরনাথের মৃত্যু হয়। দুরারোগ্য ক্ষয়রোগে আক্রান্ত ছিলেন অমরনাথ। বসু পরিবার জামাতার প্রাণ বিয়োগ সম্পর্কে প্রায় আগাম নিশ্চিত ছিলেন। কিন্তু প্রথমে রাজশেখর কন্যা প্রতিমা শারীরিক অসুস্থতায় হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে প্রয়াত হন। সেই ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পরেই রাজশেখরের জামাতা অমরনাথও একই পথ অনুসরণ করেন। একই বাড়িতে একই দিনে হঠাৎ এমন দুই প্রয়াণে বাকরুদ্ধ হয়ে যান সকলে। মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করলেও, এই ঘটনা রাজশেখর বসুকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছিল ‘সতী’ কবিতাটি। ১৯৪২ সালে তাঁর পত্নী মৃণালিনী দেবীর প্রয়াণেও একইরকম আঘাত পান তিনি।

সাহিত্য ও বিজ্ঞানে দক্ষতার পাশাপাশি নানা ছোটখাটো বিষয়ে তাঁর মুন্সিয়ানা ছিল নজরকাড়া। নিজের বকুলবাগানের বাড়ির নীল নকশা, আসবাবপত্রের নকশা নিজেই করেছিলেন। বাজার করতে ভীষণ পছন্দ করতেন। বাংলা লাইনো টাইপের উদ্ভাবক সুরেশচন্দ্র মজুমদারের অন্যতম সহযোগী ছিলেন রাজশেখর বসু। এক্ষেত্রে যুক্তাক্ষরের জট ছাড়িয়ে সহজ হরফ তৈরি করেছিলেন তিনি।
রাজশেখর বসুর পাণ্ডুলিপিও চমৎকার শিল্পসৃষ্টির নিদর্শন। পাণ্ডুলিপিগুলির মাত্রা, বিন্যাস, পরিচ্ছন্নতা, পরিমিতিবোধ ছিল শিল্পগুণে সমৃদ্ধ। পূর্ণাঙ্গ পাণ্ডুলিপিতে কাটাকুটি বা হিজিবিজি কোনও জটিলতা কোথাও নজরে আসবে না। প্রতিটি পৃষ্ঠায় চারিদিকের মার্জিন মাপ সূক্ষ্মভাবে একই রাখতেন। লেখার একটি অনুচ্ছেদ শেষ হলে, অপর অনুচ্ছেদ যেখানে শুরু হত, সেখানকার মাপও থাকত একদম আগের মতোই। নিজের লেখার খাতা, ছোট নোটবই, পকেট ডায়েরি নিজেই তৈরি করে নিতেন নিপুণভাবে। কাগজ কাটা, সেলাই, মলাট সব ক্ষেত্রেই সৌন্দর্যবোধ বজায় থাকত।

নিজের লেখার জন্য একাধিক রঙের কালি ব্যবহার করতেন। পেনসিলে লেখার চলও তিনি বজায় রেখেছিলেন। যেকোনও পাণ্ডুলিপি শুরুর তারিখ লিখতেন কালো কালিতে, আর শেষের তারিখ সবুজ কালিতে। যেকোনও কাজ শুরু আর শেষ করার ক্ষেত্রে তারিখ লিখে রাখার অনন্য নজির ছিল তাঁর। মাসের তারিখ, মাসের সংখ্যা ও বছরের শেষ দুই সংখ্যা একসঙ্গে একই শব্দবন্ধের মধ্যে লিখে রাখতেন। বলা বাহুল্য, এতে তাঁর নিজস্বতার ছাপ থাকত, বাংলা সাহিত্য জগতে যা বিরল।
পুরানো দৈনিক সংবাদপত্র ছাড়া আর কোন কাগজই বিক্রি করতেন না। সব কিছুই জমিয়ে রেখে দিতেন একটি ঘরে। প্রতিটি কাজে অসীম নৈপুণ্য ও উৎসাহ তাঁর নিহিত শিল্পীসত্তাকেই বারবার প্রতিফলিত করে।
বহু লেখকের ঘরেই বইপত্র ও কাগজের তাড়া থাকে অগোছালো অবস্থায়। কিন্তু রাজশেখর ছিলেন এর বিপরীত। পুরানো দৈনিক সংবাদপত্র ছাড়া আর কোন কাগজই বিক্রি করতেন না। সব কিছুই জমিয়ে রেখে দিতেন একটি ঘরে।
১৯৬০ সালের ২৭ শে এপ্রিল। অন্যান্য দিনের মতোই দিনটি শুরু হয়েছিল তাঁর কঠোর নিয়মানুবর্তিতায়। কিন্তু দুপুরবেলা বিশ্রাম নিতে নিতেই দ্বিতীয়বার স্ট্রোক হল তাঁর। তৎকালীন স্বনামধন্য ডাক্তার পি কে রায়চৌধুরী ছিলেন তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক। তিনি এলেন, চিকিৎসা করলেন। কিন্তু সাধ্যমতো চেষ্টা করেও আর ফেরানো গেল না তাঁকে। পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে অন্য লোকে পাড়ি দিলেন বাঙালির পরশুরাম।
রাজশেখর বসুর একাধিক লেখা অনূদিত হয়েছে ভিন্ন ভাষায়, নাট্যরূপ পেয়েছে, এমনকী সিনেমাও হয়েছে। নির্মল হাস্যরসের পাশাপাশি তীব্র শ্লেষ ফিরে ফিরে এসেছে তাঁর লেখায়। নিজস্ব প্রতিভার ছাপ থেকে গিয়েছে তাঁর সব কাজেই। প্রতিটি কাজে অসীম নৈপুণ্য ও উৎসাহ তাঁর নিহিত শিল্পীসত্তাকেই বারবার প্রতিফলিত করে। জীবন ও সৃষ্টির মধ্য দিয়ে গড়পড়তা বাঙালির কাছে আজও এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে রয়ে গিয়েছেন তিনি।
তথ্যঋণ:
১) সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান, সম্পাদক অঞ্জলি বসু, সংশোধিত পঞ্চম সংস্করণ, প্রথম খণ্ড, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, ২০১৬।
২) হিতোপদেশের গল্প পাণ্ডুলিপি, রাজশেখর বসু, দি কালার্স অফ আর্ট, কলকাতা, ২০১৫।
৩) বইখানির নাম “গড্ডালিকা প্রবাহ”, পরিমল রায়, কাজী অনির্বাণ, দীপংকর বসু নিবেদিত, আই এম এইচ, নতুন দিল্লী, ২০১৯।
৪) সাম্পান, অষ্টম বর্ষ, প্রথম ও দ্বিতীয় সংখ্যা, পলব সরকার সম্পাদক, হাওড়া, ২০১৮।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
One Response
খুব মনে ধরলো লেখাটা