(Book Fair Memories)
অতএব নেমে পড়লাম জলে। অথৈ জল। বইমেলার আদিগন্ত ভিড়ে নিজেকে পিঁপড়ের মতো লাগে। তবু মনে হয় এই ৪৯ বছরের লিগ্যাসিতে ১৫টা বছর আমার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ হয়তো পিঁপড়ের থেকে একটু উঁচু স্থানে বসায় আমাকে!
এখন ২০২৬, বছরটা ভোটের বছর বলেই কি আগুন লাগার ভয় খানিক বেশি পেলেন কর্তৃপক্ষ? গেটের মুখে পকেট খামচে, তাই বের করে নেওয়া হল সমস্ত ধোঁয়া! প্রথম কয়েকদিন। বন্ধ করে দেওয়া হল লিটল ম্যাগের বাথরুমের পিছনে আমাদের ডেরা। সিকিউরিটি বসল সেখানে পাহারায়। একটা ছোট গুমটি চায়ের দোকান, কতখানি ভয় ছুঁড়ে দিতে পারে প্রশাসনের দিকে! অথচ এ দোষে কেবল কবি সাহিত্যিক বা পাঠক দুষ্ট নন। নিজেদের ভগবান ভাবা পুলিশকর্মীরাও কাজের ফাঁকে চা-এর সঙ্গে ধোঁয়া উড়িয়েছেন এখানে।
মেলা শুরুর দিন সাতেক আগে যখন পত্রিকার নতুন সংখ্যা গুছিয়ে আনতে পারছি না, কাজের ফাঁকে রাত জাগছি এক-দুদিন, কবি নীলাঞ্জন দরিপা তখন ঠিক এই জায়গাটি নিয়েই গদ্য লিখছেন মাস্তুলের জন্য। গদ্যের নাম রাখছেন- ‘নো ম্যানস্ ল্যান্ড’, বিষয়, আমাদের এই আড্ডার ঠেক ও যৌথ বায়বীয় নেশা! শুধুই কি চা সিগারেট? বইমেলার প্রচারে কোনও ভূমিকা রাখেনি এই তল্লাট? যেখানে হাতে হাতে বিক্রি হত টেবিলে না বসা পত্রিকা, যেখানে কানে কানে ছড়িয়ে পড়ত ভাল বইয়ের খবর, লেনদেন হত বই, বিক্রিতে তার ভূমিকা অস্বীকার করি কীভাবে! (Book Fair Memories)
মেলার এই খোঁচ জমিটিতে একটি টিনের ঘরে সারাবছর থাকে এই পরিবার। মুখের গড়ন বলে মেদিনীপুরের দিকে বাড়ি হতে পারে তাঁদের। নিম্ন মধ্যবিত্তের ঘরে এই কদিনের কয়েক লক্ষ অতিথি, বছরের পর বছর যে সেবা পেয়ে এসেছে তাতে আন্তরিকতা না থাকলেও, নিজেদের পর্যটক মনে হয়নি কখনই। এই ঠেক থেকেই কত সংখ্যা নিয়ে আলোচনা করেছি সম্বিতদার সঙ্গে, এখানেই দীর্ঘ ঝামেলা মিটিয়ে নিয়েছি আমি আর দেবনাথ। তন্ময়ের শেষ না হওয়া সিগারেটের বাক্সের দিকে মুগ্ধ হয়ে হাত পেতেছি কতবার! মাথার উপর কলকাতা পুলিশের বেলুন দেখে আমাদের খুঁজে হাজির হয়েছে পাড়ার বন্ধুরা। তারা আঘাত পেয়েছে জায়গাটা এবছর আর নেই শুনে। সুদীপ্তদার সেই ডাক মনে পড়ে, ‘যাঁরা যাঁরা ‘বহুবচন’ কিনে নিয়েছেন, জায়গাটা ফাঁকা করে দিন!’… (Book Fair Memories)

পৃথ্বীর সঙ্গে এখানে দাঁড়িয়েই কথা হয়েছিল বইচুরি সংখ্যা নিয়ে। ও আইডিয়া দিয়েছিল, সংখ্যার নাম হবে ‘বই কেন ঝাড়ে…’। সে কাজ আর হয়ে ওঠেনি আমাদের… আমারই আলস্য। ভিড় মেলার মাঝে এই ৫০০ স্কোয়্যারফুট জায়গায় কোনও ডিসপ্লে ছিল না বইয়ের। তবু এই আড্ডায়, পিঠের ব্যাগে ব্যাগে যা বই ছিল, তা কোনও মেলার থেকে বোধহয় কোনও অংশে কম নয়… (Book Fair Memories)
বইমেলার এই নিষিদ্ধ পল্লিতে যেতেন নন স্মোকাররাও। মুহূর্তে মুহূর্তে কথার মাঝখান থেকে হাত তুলে ধোঁয়া তাড়াতেন। বিশাল এই মাঠ যদি এক সংসার বলে ভাবি, তবে ধোঁয়া বলে দেয় এ নিশ্চয় রান্নাঘর ছিল মেলার। মেলার নেশা, ব্যাগের বোতলে রেখে যাঁরা একটু বেশি কাছে ডাকতেন, তাঁরা এবছর বিতাড়িত। বাসস্ট্যান্ডের কোণে এক গাছতলায় কিছুটা জায়গা পেয়েছেন। গেটের বাইরে সেই আচার তাদের দূরত্ব বাড়িয়ে দিচ্ছে মেলার সঙ্গে। (Book Fair Memories)
এও এক অদ্ভুত গণতন্ত্র, কবি, লেখক, পাঠক প্রজা আর শাসক তাঁদের গোছানো প্রাসাদের বারান্দা থেকে ক্যামেরায় চোখ রাখছেন, পিলপিল করে ঢুকে আসছে লোক, তাঁদের পকেট টিপে বুঝে নেওয়া হচ্ছে সঙ্গে কোনও দাহ্য বস্তু আছে কি না! তাঁরা বই কিনবেন কি না তাই নিয়ে মাথাব্যথা নেই বারান্দার নিরো সাহেবদের! মেলা মিটে গেলে যে লোকসংখ্যা অথবা যে টাকার অঙ্ক জানানো হয়ে থাকে, তা কাদের থেকে জানা হয়? আমরা কেন পনেরো বছরেও কারোর প্রশ্নের সম্মুখীন হলাম না? অতএব হয় এই সংখ্যা একেবারেই ভুয়ো, অথবা এতে আমাদের অংশগ্রহণ নেই! (Book Fair Memories)
শিক্ষিত মানুষের নেশায় সেই সম্ভ্রম থাকে বলেই হয়তো অগ্রজ কবি আকণ্ঠ পান করে ন-নম্বর গেটের বাইরে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলতে পারে, ‘তোমার বাইকে চড়িয়ে একদিন খুব জোরে চালাবে?’
তাহলে নেশার চোটে টেবিলেই যে বন্ধু তার হাজার সাতেক টাকার বই ফেলে চলে গেল? তাদের কোনও যোগদান থাকল না এই মেলায়? গড়ে নম্বর পেয়ে আসায়, শিক্ষাব্যবস্থা অবশ্য আমাদের অভ্যস্ত করে তুলেছে এসব মিথ্যার সঙ্গে। কীই বা হবে, চুনোপুটিদের! বড়জোর তাদের সাঁতার আটকাতে পুকুর বুজিয়ে দেবে রাজা! হলও তো তাই! (Book Fair Memories)
মেলায় নেশা করার ব্যক্তিগতভাবে বিরোধী হলেও এর পরবর্তী ঘটনাগুলোর দিকে তাকিয়ে মজাও যে লাগে না তা নয়! শিক্ষিত মানুষের নেশায় সেই সম্ভ্রম থাকে বলেই হয়তো অগ্রজ কবি আকণ্ঠ পান করে ন-নম্বর গেটের বাইরে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলতে পারে, ‘তোমার বাইকে চড়িয়ে একদিন খুব জোরে চালাবে?’ আমি রাজি হওয়ায়, ঘাড়ে চুমু খেয়ে টলে পড়ে যায় সে! তাঁকে সামলায় দুই তরুণ কবি… এই যে আন্তরিকতা, একে ফেলে দিই কীভাবে! (Book Fair Memories)

সেবছর লিটল ম্যাগাজিনের লাগোয়া টয়লেটটি জীবিত ছিল। ফুড কোর্টের পর একটা লম্বা পর্দা লাগিয়ে আলাদা করা থাকত সেই বাথরুম। তার সামনেই লুকিয়ে মদ খেত লোকজন। হালকা হয়ে বেরিয়ে দেখতাম চেনা মুখ কেমন স্তব্ধ হয়ে আছে। হাঁ করে তাকিয়ে রয়েছে। কত সহজে সব ঝগড়া ভুলিয়ে দিয়ে গলায় টেনে নিচ্ছে অথবা অতিরিক্ত ঘামছে ঠান্ডার দিনে, আর যে কথা বলার নয়, সে কথাও বলে দিচ্ছে নির্দ্বিধায়! তারপর তাকে টানতে টানতে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাওয়া! রাস্তায় কখন সে এক প্রবীণ কবির পাত থেকে চিকেন পকোড়া তুলে নিয়েছে তা আমরাও জানি না! ফেরত যাওয়ার পর ক্ষমা চাইতে গিয়ে এক বিরাট হাসাহাসি! (Book Fair Memories)
মাতাল বন্ধু নিয়ে তখন আমরা হঠাৎ হয়ে ওঠা অভিভাবক! তাদেরকে ফুটপাথে বসিয়ে ট্যাক্সি ডাকছি। ডানলপ পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারলে বাকিটা অটোয় ম্যানেজ হয়ে যাবে! চার পাঁচটা ট্যাক্সির পর একজন রাজি হন ৩০০ টাকায়, গাড়ি সাইড করতে করতে মাতাল বন্ধুটি তাঁকে গিয়ে বলে ‘যাবে না কেন? ৪০০ টাকা তো দেব! তোমাকে যেতেই হবে!’ অগত্যা ৩০০তে রাজি করানো ট্যাক্সি বেঁকে বসে ৪০০র দিকে। আমরাও উঠে বসি নিরুপায়। পাছে জানলা দিয়ে হাত বাড়ায়, তাকে বসানো হয় মাঝখানে। এই প্রবল ফিরে আসার মাঝে বইমেলা হারিয়ে যায়। সিঁথির মোড়ে এসে হঠাৎ সে ডানদিকে নিতে বলে ট্যাক্সিকে। তারপর লরির জ্যামের মধ্যে জানলা দিয়ে বুক অব্দি বেরিয়ে শুরু করে বমি! ডানলপে নেমে ৪০০টাকা দেওয়ার পর ট্যাক্সিওলা আমাকে দিয়ে তাঁর ট্যাক্সির দরজা ধোওয়ায়! বাধ্য ছেলের মতো মুছতে থাকি বন্ধুর অপরাধের নমুনা! কোনও প্রমাণ থাকবে না। (Book Fair Memories)
এবছর মেলার ডিউটিতে পরিচিত দমকলকর্মী নেই! যিনি আমার সঙ্গে রাইফেল শুটিং করেছেন দীর্ঘ এক দশক! প্রতিবছর যিনি টেবিল খুঁজে দেখা করে গেছেন আমাদের সঙ্গে। একটা হাসিমুখ ছাড়া কিছুই দিতে পারিনি তাকে।
এরপর আরেকপ্রস্থ উদ্গীরণ ঘটায় সে বাসস্ট্যান্ডের পিছনে গিয়ে। তাকে রুমাল দিই, জলের বোতল দিই, তারপর বিদায় জানিয়ে ফিরে আসি উত্তরপাড়া। আমাকে অবাক করে প্রায় বছর দু’য়েক পর সেই রুমালটি কেচে ফেরত দিতে চায় বন্ধুটি! হেসে উঠি, সে হাসি গিয়ে ঠেকে আমাদের ‘নো ম্যানস ল্যান্ডের’ মাথায় থাকা পুলিশের বেলুনে… (Book Fair Memories)

এবছর মেলার ডিউটিতে পরিচিত দমকলকর্মী নেই! যিনি আমার সঙ্গে রাইফেল শুটিং করেছেন দীর্ঘ এক দশক! প্রতিবছর যিনি টেবিল খুঁজে দেখা করে গেছেন আমাদের সঙ্গে। একটা হাসিমুখ ছাড়া কিছুই দিতে পারিনি তাকে। ইউনিফর্ম দেখলেই সে ভেবে তাকিয়েছি ওদিকে, তারপর মুখের আদল না মেলায় ফিরিয়ে নিয়েছি নিজেকে। ঠিক যেভাবে মেলার ভিড়ে মৃত অনেককেই খুঁজে পাই অন্য কারুর আদলে। তারপর ভুল ভাঙে সামনে গিয়ে দাঁড়ালে। অরিত্র বা নীলাব্জদার মতো দেখতে লোকগুলো বেড়া পেরিয়ে ঢুকে পড়ে ওই ঘিরে রাখা সরকারি জায়গাটায়, যেখানে আমাদের, দুঃখের ভয়ে ঢুকতে দিচ্ছে না প্রশাসন! (Book Fair Memories)
এখন ২০২৬, জীবনে দায়িত্ব বেড়েছে, কাজে এবং প্রকাশনাতেও। আর তাই সব কথা হয়তো সহজেই লিখে দিতে পারব না এই লেখায়। কাজের চাপে সেই বন্ধু এবছর একদিনের বেশি আসতে পারেনি মেলায়। নেশাগ্রস্ত মুখগুলোও আস্তে আস্তে পালটে যাচ্ছে। এখন সেই স্তব্ধ মুখে ঘামে ভেজা দৃষ্টিরা আমাদের চেয়ে বয়সে কিছু কম। তারা মেলার ওই বিশেষ অংশুটুকু আমাদের চেয়ে খানিক কম পেয়েছে। দুর্বলতাও হয়তো কিছুটা কমই। এভাবেই মুছে যায় স্মৃতি, যেকোনও শূন্যস্থানে এসে বসার দায়িত্ব নেয় অন্য কেউ।
বইমেলা থেকে ফিরে সেসব হিসাব নিয়ে বসি, যা এখনও মেলাতে পারলাম কই! (Book Fair Memories)
চিত্র ঋণ- অরিত্র দত্ত
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
আকাশ লিখতে ভালোবাসে, ভালোবাসে গাছপালা আর বাইক রাইড! একসময় খেলাধুলার সঙ্গে কাটিয়েছে এক দশকেরও বেশি সময়। গত বেশ কয়েক বছর ধরে বাংলা পোর্টালে কর্মরত। যদিও মন থেকে ব্যবসার প্রতি এক অদ্ভুত টান আছে তার!
