(Chandi Lahiri)
কৃত্তিবাস ওঝার শান্তিপুর, আমাদের দুজনেরই দেশ। দুজনেরই মানে, চণ্ডী লাহিড়ী এবং আমি। এমনকী আমাদের জন্মদিনও একদিন আগে-পরে। তাঁর ১৫ মার্চ, আমার ১৬ মার্চ। জানি না, এসবের জন্যই চণ্ডীদার সঙ্গে আমাদের পরিবারের প্রাণের টান ছিল কি না! বৌদি আর ওঁদের কন্যা তুলিও ছিল আমাদের বড় আপনজন। সদাহাস্যময় চণ্ডীদার মধ্যে অহংকারের লেশমাত্র ছিল না। নিজের কার্টুনের মতোই গল্প বলার ধরন ছিল সহজ সরল ও সাবলীল। তাঁকে নিয়ে লিখতে বসে তেমনই নানা গল্প ভিড় করে আসছে মনে। (Chandi Lahiri)
পাইকপাড়ায় একদিন তাঁর সরকারি আবাসনে আড্ডার মেজাজে বসে আছি। হঠাৎ জানলার বাইরে, খোলা আকাশের দিকে উদাস দৃষ্টি রেখে বলতে শুরু করলেন, ১৯৭৬ সালের লক্ষ্মীপুজোর কথা। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর দিন, রাজ্যের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের বাড়ির বাগানে এক শ্বেতশুভ্র লক্ষ্মীপেঁচা দেখা গেল। চণ্ডীদা তখন এক সংবাদপত্রে কর্মরত। সম্পাদক তাঁকে ডেকে বললেন, ‘কালকের হেডলাইন করছি— বাংলার লক্ষ্মীলাভ। এটা মাথায় রেখে একটা ছবি এঁকে ফেলুন।’ (Chandi Lahiri)
মা যখন দূরদর্শনে কর্মরত, তখন থেকেই চণ্ডী লাহিড়ীর সঙ্গে আমাদের পারিবারিক পরিচয়। অবশ্য, তাঁর কার্টুনের সঙ্গে পরিচিত অগণিত বাঙালির মধ্যে আমিও একজন ছিলাম। ওঁর কাজের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় এম.সি.সরকার প্রকাশিত বই, ‘Chandi looks around’ থেকে। (Chandi Lahiri)
মনে আছে, ১৯৮৯ সালের সাধারণ নির্বাচন। শাসক দল কংগ্রেস ভাল ফল করতে পারল না। উত্তর ভারতে মুখ থুবড়ে পড়ল। কিন্তু, দক্ষিণ ভারতে দু-হাত ভরে ঝুলি পূর্ণ করে দিল মানুষ। তবুও কংগ্রেস নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি! ফল ঘোষণার পরদিন, আনন্দবাজার পত্রিকার চতুর্থ পৃষ্ঠায় ছাপা হল চণ্ডীদার আঁকা কার্টুন। রাজীব গান্ধী হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইছেন। নিচে ক্যাপশন— ‘আজি দখিন-দুয়ার খোলা!’ (Chandi Lahiri)

চণ্ডীদা কার্টুনকে বলতেন আর্ট অফ নেগেশন। উনি মনে করতেন, একটু যুদ্ধের পরিবেশ না থাকলে, লড়াই করার মনোভাব না থাকলে, মারামারি-কাটাকাটি না থাকলে কার্টুন ঠিক জমে না। ছয়ের দশকে ভারত-চিন যুদ্ধের পর, চু এন লাই এবং শ্রীলঙ্কার সিরিমাভো বন্দনয়কের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়। সেই বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে একটি বিশেষ কার্টুন! একটা বাগানে দুটো দোলনায় দুলছেন চু এন লাই এবং সিরিমাভো বন্দনয়কে, নিচে ক্যাপশন— ‘সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে’! (Chandi Lahiri)
কমিউনিস্ট নেতা ভূপেশ গুপ্ত সংসদে পণ্ডিত নেহেরুকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কলকাতার এক নামী দৈনিক কীভাবে এমন সস্তার কার্টুন ছাপে?’ নেহেরু বাংলা ভাল বুঝতেন। তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ‘ছবির ক্যাপশন যখন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের, তখন কার্টুন সস্তা বা অশ্লীল হতেই পারে না।’ হাস্যরসের মধ্যে দিয়ে ভারতের সংসদে সেদিন ওই বিতর্কের অবসান ঘটে। পরে পণ্ডিত নেহেরু আর চণ্ডীদার মধ্যে কথাও হয়েছিল এই নিয়ে। হায়! সেদিনের রাজনীতি আর এখনের রাজনীতির কত তফাৎ! (Chandi Lahiri)
দুটো কোলা ব্যাঙ জানালা থেকে লাফ দিয়ে অফিসের টেবিলের উপর এসে তাঁকে প্রশ্ন করছে— ‘হাউ ডু ইউ ডু?’ ছবিটি পছন্দ হয়ে গেল সম্পাদক ধীরেন দাশগুপ্তর।
সংবাদপত্রে তাঁর প্রথম কার্টুন প্রকাশিত হয় হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকায়, ১৯৫৬ সালে। বিষয় ছিল বর্ষার সন্ধে। চণ্ডী লাহিড়ী বসে আছেন নিজের অফিসে, বাইরে ঝমঝম বৃষ্টি। দুটো কোলা ব্যাঙ জানালা থেকে লাফ দিয়ে অফিসের টেবিলের উপর এসে তাঁকে প্রশ্ন করছে— ‘হাউ ডু ইউ ডু?’ ছবিটি পছন্দ হয়ে গেল সম্পাদক ধীরেন দাশগুপ্তর। পরদিন থেকেই ওই ধরনের সাতটি কার্টুন রোজ ছাপা হত কাগজে। (Chandi Lahiri)
আমার কন্যার অন্নপ্রাশন থেকে শুরু করে প্রতিটি জন্মদিনে, একটা করে ছবি আর বই উপহার দিতেন চণ্ডীদা। ছবির নিচে লিখে দিতেন— ‘তিয়াইকে একজন দাদু’। নিজস্ব শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, কন্যার কর্কট রোগ, কিছুই তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। মনে প্রবল উৎসাহ নিয়ে কাজ করে যেতেন। (Chandi Lahiri)

রবিশঙ্কর চলে গেলেন। ওঁর স্বরণে তপন সিংহ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে নন্দনে সাতদিনব্যাপী উৎসবের আয়োজন করা হল। অন্যান্য অতিথিদের সঙ্গে, তিনিও আমন্ত্রিত ছিলেন। হাতে করে নিয়ে এলেন বিশ্ববন্দিত সেতারবাদকের একটি রঙিন কার্টুন। কী অসাধারণ, অভাবনীয় প্রাপ্তি! (Chandi Lahiri)
সেই সময় যে সংবাদপত্রে কর্মরত ছিলাম, তার মুখ্য সম্পাদককে প্রস্তাব দিয়েছিলাম চণ্ডীদার কার্টুন মাঝে-মধ্যে প্রকাশ করার জন্য। কিন্তু, দুঃখের বিষয়, মুখ্য সম্পাদক তথা কর্ণধার মানুষটি ছিলেন মোটা দাগের ব্যক্তি। প্রস্তাব গৃহীত হল না। (Chandi Lahiri)
চলচ্চিত্র জগতের অনেকের সঙ্গেই সুসম্পর্ক ছিল তাঁর। তপন সিংহ সবসময় চাইতেন, চণ্ডীদা কলকাতায় বসে অ্যানিমেশনের কাজ আরও ভালভাবে করুন।
তবে, আমি এবং আমার সহকর্মী-বন্ধু হাল ছাড়িনি। ঠিক হল, সংস্কৃতির জন্য ধার্য পৃষ্ঠায় চণ্ডীদার কার্টুন প্রকাশ করা হবে। প্রতি সপ্তাহে চণ্ডীদার কাছে ড্রয়িং খাতা দিয়ে আসতাম। উনি খাতার পাতা রঙে-রেখায় ভরে ফোন করলে, এক ফাঁকে গিয়ে নিয়ে আসতাম। (Chandi Lahiri)
চলচ্চিত্র জগতের অনেকের সঙ্গেই সুসম্পর্ক ছিল তাঁর। তপন সিংহ সবসময় চাইতেন, চণ্ডীদা কলকাতায় বসে অ্যানিমেশনের কাজ আরও ভালভাবে করুন। চিত্রনির্মাতা অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের ‘মৌচাক’, ‘পাকা দেখা’ ছবির জন্য কাজ করেছিলেন চণ্ডী লাহিড়ী। (Chandi Lahiri)

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে চণ্ডীদার কোনওদিন প্রত্যক্ষ পরিচয় হয়নি। তারপরেও তুমুল জনপ্রিয় হল মজার কার্টুনে ভরা ‘সুনন্দর জার্নাল’। সেই গল্পও শুনিয়েছিলেন একদিন। (Chandi Lahiri)
বিয়ের পরে হানিমুন করতে আন্দামানে গিয়েছিলেন চণ্ডীদা। সেখান থেকে ফেরার পথে জাহাজে রেডিওতে খবর পেলেন, সাহিত্যিক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় আর নেই! কাঁদতে কাঁদতে কলকাতায় ফিরেছিলেন সেবার। (Chandi Lahiri)
চণ্ডীদার কন্যা তুলি যখন কর্কট রোগে আক্রান্ত হয়, সেইসময় তাঁরা খুব ঠান্ডা মাথায় ব্যাপারটাকে মেনে নিয়েছিলেন। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে হাল না ছেড়ে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করিয়েছিলেন।
মজা করে বলেছিলেন, ‘লোকে হানিমুন করে হাসতে হাসতে ফেরে, কিন্তু আমি ফিরেছিলাম কাঁদতে কাঁদতে। আনন্দবাজারের অফিসে সাগরময় ঘোষ আমাকে একদিন ডেকে পাঠিয়েছিলেন। মনে দুঃখ নিয়ে মুখ কালো করে গেলাম, উনি বলেছিলেন, “জানি তোমার এখন কিছুই ভাল লাগছে না, কিন্তু কিছু তো করবার নেই”। (Chandi Lahiri)
‘আমি মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলাম যে কলকাতায় ফিরে এসে একদিন নারায়ণবাবুর সঙ্গে পরামর্শ করে ‘সুনন্দর জার্নাল’-র জন্য কাজগুলো করব। কিন্তু সেটা আর সম্ভব হল না। উনিও আমার সঙ্গে প্রাথমিক আলাপ করতে চাননি, কারণ উনি ভাবতেন আমি বোধহয় লেখকের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে কাজগুলো করব। সুনন্দর জার্নাল যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা হয়তো দেখে থাকবেন, নারায়ণবাবু যা লিখতেন আমি তার বিপরীতে একটা তত্ত্ব খাড়া করতাম!’ (Chandi Lahiri)

ছবির পাশাপাশি পথের একাধিক সারমেয়কে চণ্ডীদা আর বৌদি সযত্নে লালন করতেন। চণ্ডীদার কন্যা তুলি যখন কর্কট রোগে আক্রান্ত হয়, সেইসময় তাঁরা খুব ঠান্ডা মাথায় ব্যাপারটাকে মেনে নিয়েছিলেন। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে হাল না ছেড়ে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করিয়েছিলেন। তুলিও ভাল ছবি আঁকত। তুলির ছবি নিয়ে একবার একটা একক প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। (Chandi Lahiri)
তুলির প্রদর্শনী দেখার জন্য চণ্ডীদা তাঁর কন্যাসমা, সেই আমলের এক নবীনা লেখিকাকে অনুরোধ করেন। কিন্তু, তিনি বেশ অপমানজনক আচরণ করেন। চণ্ডীদার বয়সটাকেও সম্মান জানাবার প্রয়োজন মনে করেননি। অবশ্য চণ্ডীদা, মহিলার এহেন ব্যবহারে কিছুই মনে করেননি। কারণ, তিনি নিজেকে কখনও সেলিব্রেটিদের অন্তর্গত মনে করতেন না। অত্যন্ত সাধারণভাবে জীবনযাপন করে গিয়েছেন। (Chandi Lahiri)
২০১৮ সালের ১৮ জানুয়ারি, চণ্ডীদা চলে গেলেন। এর কয়েক বছরের মধ্যেই তুলিও বাবাকে অনুসরণ করল। তার বছখানেক পরে পাইকপাড়ার ওই আবাসনের বাসিন্দা, আমার এক স্নেহভাজন খবর দিল, বৌদিও পাড়ি দিয়েছেন অজানা অলোকময় লোকে। শুনে দুঃখ পাইনি, বরং খুশিই হয়েছিলাম যে, ওঁদের কেউই কাউকে ছেড়ে, বেশিদিন থাকল না। (Chandi Lahiri)
চিত্রঋণ- লেখক
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
অরিজিৎ মৈত্র পেশায় সাংবাদিক। তপন সিংহ ফাউন্ডেশনের সম্পাদক অরিজিৎ পুরনো কলকাতা নিয়ে চর্চা করতে ভালবাসেন। নিয়মিত লেখালিখি করেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। প্রকাশিত বই: অনুভবে তপন সিনহা, ছায়ালোকের নীরব পথিক বিমল রায়, চিরপথের সঙ্গী - সত্য সাই বাবা, বন্দনা, কাছে রবে ইত্যাদি।
