(Children Story)
ফুলডুংরি পাহাড়ের কোলে ছোট একটি জঙ্গল ঘেরা গ্রাম। গ্রামের নাম ফুলকুসুমা। গ্রামটির পাশ দিয়ে এঁকেবেঁকে বয়ে গেছে একটি নদী। নদীটিকে গাঁয়ের লোকেরা বলে ফুলঝোরা। আর ফুলঝোরা নদীর চারপাশে ঘন সবুজ জঙ্গল। বসন্তে কুসুমের গাছে গাছে যখন কচি কচি রাঙা পাতা গজায়, তখন মনে হয় যেন গ্রামে কুসুম ফুলের মেলা বসেছে। তাই তো এমন নাম গ্রামের। পাহাড়, নদী ও জঙ্গল নিয়ে গ্রামের মানুষজন শান্তিতে বসবাস করে।
গ্রামের মাঝখানে মোটাসোটা এক বুড়ো কুসুম গাছ রয়েছে। বুড়ো কুসুমের তলায় ছোটনের বাড়ি। ছোটনের বাবা ফুলকুসুমার জঙ্গলের বনবাংলোতে কাজ করে। বাড়িতে আছে তার মা ও বুড়ি ঠাকুমা। গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে ক্লাস ওয়ানে পড়ে ছোটন। জঙ্গলের সুড়কিপথ ধরে মায়ের সঙ্গে সে স্কুল যায়।
একদিন স্কুল যাওয়ার সময় হঠাৎ তার চলার পথে একটি সাপ চলে এল। ছোটন প্রচণ্ড ভয় পেয়ে চিৎকার করে মাকে জড়িয়ে ধরল। ভয়ে দু’চোখ বন্ধ করে নিল। ঠক্ ঠক্ করে কাঁপতে শুরু করল। ছেলের এমন অবস্থা দেখে মা তাকে কোলে তুলে নেয়। সাপটা কিন্তু নিজস্ব ছন্দে পথ পেরিয়ে জঙ্গলে মিশে যায়। মা ছোটনকে বলল, ‘খোকা চোখ খোল, দেখ সাপটা কখন চলে গেছে।’
ছোটন সাহস করে চোখ খুলতে পারল না। এতটুকু ছোট্ট জীবনে আজ সে প্রথম সাপ নামক এমন এক ভয়ঙ্কর প্রাণীর মুখোমুখি হল। অগত্যা মা তাকে কোলে করেই স্কুলে পৌঁছে দেয়। তাকে বলে, ‘দেখ ছোটন স্কুলে এসে গেছি। এবার চোখ খোল। আর কোনও ভয় নেই বাবা।’ (Children Story)

ছোটন ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকায়। চারপাশে পিটপিট করে চেয়ে দেখে। তারপর মায়ের কোল থেকে নামে। কিন্তু নামলে কী হবে? কিছুতেই মায়ের আঁচল ছাড়ে না। ঘ্যানঘ্যান করতে থাকে, ‘মা তুমি আমায় ছেড়ে যেও না। থাকো…।’ (Children Story)
ছোটনের মা তাকে বুঝিয়ে বলে, ‘দেখ বাবা, আমি এখানে থাকলে ঘরের কাজ করবে কে? রান্না করবে কে? তোর ঠাকুমা খাবে কী?’
ছোটন মায়ের ওসব ভারী ভারী কথা বুঝতে চায় না। সে মায়ের আঁচল মুঠো করে চেপে ধরে থাকে। আর চারিদিকে আতঙ্কের দৃষ্টিতে চেয়ে চেয়ে দেখে। মা বুঝতে পেরে বলে, ‘এখানে তো পরিষ্কার জায়গা, দেখ। সাপ এখানে আসবে না।’
তাকে একপ্রকার টেনে বাড়ি নিয়ে যায়। কিন্তু বাড়ি গিয়েও তার মন থেকে আতঙ্ক কাটে না। চুপচাপ ঠাকুমার গা ঘেঁষে বসে থাকে। আর এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে। যে ছেলে সারাক্ষণ লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে খেলা করে বেড়াত, সে কেমন চুপচাপ হয়ে যায়।
ছোটন কিছুতেই ভরসা পায় না। মা ফেরার জন্য পা বাড়ালেই সে চিৎকার করে কেঁদে ফেলে। তার কান্না শুনে অফিসঘর থেকে দিদিমণি বেরিয়ে আসেন। ছোটনের মায়ের মুখে সমস্ত ঘটনা শোনেন। তারপর ছোটনকে কাছে টেনে হেসে বলেন, ‘দেখো আমি তো আছি। এখানে তোমার বন্ধুরাও আছে। সাপ এখানে আসার সাহস করবে না বুঝলে।’ (Children Story)
তাতেও ছোটন ভরসা পায় না। মায়ের আঁচল চেপে ধরে থাকে। শেষমেষ তার মা বিরক্ত হয়ে বলে, ‘চল তবে বাড়ি চল।’
তাকে একপ্রকার টেনে বাড়ি নিয়ে যায়। কিন্তু বাড়ি গিয়েও তার মন থেকে আতঙ্ক কাটে না। চুপচাপ ঠাকুমার গা ঘেঁষে বসে থাকে। আর এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে। যে ছেলে সারাক্ষণ লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে খেলা করে বেড়াত, সে কেমন চুপচাপ হয়ে যায়। (Children Story)

সেদিন সন্ধ্যেবেলা ছোটনের বাবা কাজ থেকে ফিরে সমস্ত ঘটনাটা শুনে হো হো করে হেসে ফেলল। ছোটনকে কোলের কাছে টেনে নিয়ে বলল, ‘আমার ছেলে হয়ে তুই সাপে ভয় পাস কী রে! এ আমাদের পাহাড়, জঙ্গল, নদীর দেশ। এখানে কত রকমের সাপখোপ দেখবি। তাদের সঙ্গে লড়াই করে বাঁচতে হবে। ভয় পেলে চলবে কেন!’ (Children Story)
এসব কথা ছোটন কিছুই বোঝে না। চুপ করে শোনে শুধু। তার চোখে সেই হিলহিলে বস্তুটা ভাসতে থাকে কেবল।
এইভাবে তিন চার দিন কেটে যায়। ছোটনকে স্কুলে পাঠাতে পারে না। সে কিছুতেই যাবে না ওই পথে। মা চিৎকার করে বলে, ‘তোকে আর স্কুল যেতে হবে না। যা খুশি তাই কর।’
পরদিন সকালবেলা ছোটনের বাবা কাজে চলে যায়। ছোটন স্কুলে যাবে না বলে বায়না ধরে। সেই জঙ্গলের পথেই, যেন সে-ই কালো সাপটা তার জন্য অপেক্ষা করছে। মা তাকে জোর করে নিয়ে যেতে চাইলে সে কান্নাকাটি জুড়ে দেয়। ছোটনের মা বিরক্তি প্রকাশ করে, ‘এ তো মহা মুশকিল হল দেখছি! এই ছেলেকে নিয়ে এখন কী যে করি।’ (Children Story)
এইভাবে তিন চার দিন কেটে যায়। ছোটনকে স্কুলে পাঠাতে পারে না। সে কিছুতেই যাবে না ওই পথে। মা চিৎকার করে বলে, ‘তোকে আর স্কুল যেতে হবে না। যা খুশি তাই কর।’

মা যে রাগ করেছে, তা ছোটন বেশ বুঝতে পারে। কিন্তু ছোট মানুষটার মন থেকে আতঙ্ক কিছুতেই যেতে চায় না। ভাল ছেলের মতো সন্ধ্যে হতে না হতেই বই নিয়ে বসে পড়ে। বসে বসে অঙ্কের খাতাতে কী সব আঁকিবুকি কাটছিল সে। সেদিন তার বাবা কাজ থেকে ফিরে তার সামনে হাজির হল। (Children Story)
বাবার হাতে ঝুলন্ত একখানা হিলহিলে বস্তু। যেমনটা সে দেখেছিল জঙ্গলের পথে, ঠিক তেমনটা। দেখে ছোটনের চোখ মুখ একেবারে শুকিয়ে গেল। কথা বলতে পারল না। ছোটনের বাবা ল্যাজটা ধরে নাড়তে থাকে। ছোটন ঠায় সেদিকে তাকিয়ে থাকে। তার বাবা সাপটা হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে একদম ছেলের গায়ের কাছে চলে আসে। ছেলেকে জিজ্ঞেস করেন, ‘এ-ই তো আমি ধরে আছি। দেখ, ভয় লাগছে?’ (Children Story)
ছোটন একটু সাহস সঞ্চয় করে ধীরে ধীরে বস্তুটাকে হাতে নেয়। সেই সেদিনকার মতো, একদম একই রকম দেখতে। তবে প্রাণহীন একটা বস্তু। এইবার ছোটন খিল খিল করে হেসে ওঠে, ‘এ তো খেলনা। খেলনা সাপ।’
সে চুপ করে থাকে। আবার জিজ্ঞেস করেন, ‘কী রে ভয় লাগছে? আমি তো হাতে ধরে আছি। তুই নিবি?’
তবুও ছোটনের সাহস হয় না। বাবা তার খাতার উপরে বস্তুটাকে রাখে। ছোটন দেখে সেটা নড়েও না চড়েও না। বাবাকে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘মরে গেছে বাবা?’
‘হাতে নিয়ে দেখ, তবে তো বুঝবি।’

ছোটন একটু সাহস সঞ্চয় করে ধীরে ধীরে বস্তুটাকে হাতে নেয়। সেই সেদিনকার মতো, একদম একই রকম দেখতে। তবে প্রাণহীন একটা বস্তু। এইবার ছোটন খিল খিল করে হেসে ওঠে, ‘এ তো খেলনা। খেলনা সাপ।’ (Children Story)
বাবাও হেসে বলেন, ‘হ্যাঁ খেলনাই তো! সেই সেদিনকার মতো। কিচ্ছু করে না ওরা। তুই শুধু শুধু ভয় পাচ্ছিস।’
খেলনা সাপের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়ে যায়। পরদিন থেকে ছোটন স্কুলেও যেতে শুরু করে। মা তাকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আসে। বন্ধু সিধুকে সে বলল, ‘জানিস আমার বাবা একটা খেলনা সাপ কিনে দিয়েছে। সুন্দর। তোকে একদিন দেখাব বটে।’ (Children Story)
স্কুল ছুটির পর সে বন্ধুদের সঙ্গে বাড়ি ফেরে। ফিরে বাবার দেওয়া খেলনা সাপটা নিয়ে খেলা করে।
সে বারান্দায় বসে সাদা খাতায় আঁকিবুকি কাটছিল। ছোটনের ঠাকুমা গেছে পাশের গাঁয়ে মনসা পুজোতে। ছোটনের বাবা তো কোন সকালে কাজে চলে গেছে।
ইতিমধ্যে মাস ছয় কেটে গেছে। বর্ষা বাদলের কাল এসেছে। ফুলকুসুমা গ্রামের খাল বিল জলে ভরে গেছে। জঙ্গলের চলতি পথ জলকাদা আর জংলা গাছে ভরে উঠেছে। ও-ই পথে হেঁটে ছোটন স্কুলে যেতে পারে না। বড় রাস্তা ধরে অনেকটা পথ হেঁটে স্কুলে যেতে হয়। যখন টানা অনেকদিন ধরে বৃষ্টি চলে তখন ফুলঝোরা নদী কেমন ফুঁসতে থাকে। তার জল উপচে গ্রামে ঢুকে পড়ে। (Children Story)
বর্ষার সময়টা তাই গ্রামবাসীরা কেমন ভয়ে ভয়ে থাকে। জঙ্গলের পশুপাখিরাও তাদের বাসা হারিয়ে ঘরছাড়া হয়ে যায়। এই সময় ছোটনের রোজ স্কুলে যাওয়া হয় না। আর অনেকটা পথ হেঁটে বড় রাস্তা ধরে যেতে হয় বলে, মা তাকে একা ছাড়তেও ভরসা পায় না। (Children Story)

যাইহোক, এরকম এক বৃষ্টির দিনে ছোটন স্কুলে যেতে পারেনি। ছোটনের মা ব্যস্ত কাঠগাদায় রান্নার কাঠ সংগ্রহ করতে। যাতে বর্ষার দিনে অন্তত দু’মুঠো ফুটিয়ে খাওয়া যায়। সে বারান্দায় বসে সাদা খাতায় আঁকিবুকি কাটছিল। ছোটনের ঠাকুমা গেছে পাশের গাঁয়ে মনসা পুজোতে। ছোটনের বাবা তো কোন সকালে কাজে চলে গেছে। (Children Story)
আঁকা শেষ হলে সে ঘরের মধ্যে যায় তার রং পেন্সিলগুলো আনার জন্য। ঘরে ঢুকে দেখে, মেঝেতে একটা সাপ। কিন্তু এই সাপটা তার খেলনা সাপের থেকে অন্যরকম দেখতে। অবাক হয়ে সাপটার দিকে তাকিয়ে থাকে। সে ভাবে, তাহলে বাবা কি তার জন্য নতুন খেলনা এনেছে! কই তাকে তো কিছু বলেনি। (Children Story)
পুরো ঘটনাটা ঘটে যায় কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। ছোটন বড় বড় চোখ করে সাপের টুকরো দু’টোর দিকে তাকিয়ে থাকে।
ছোটন হাত বাড়িয়ে মেঝে থেকে সাপটাকে তুলতে যায়। সাপটা ফোঁস করে ওঠে। সাপটাকে তখন সে ছোঁ মেরে আবার তুলতে যায়। সাপটা ছোটনের কচি হাতটাকে দড়ির মতো পেঁচিয়ে ধরে। সে মুহূর্তে হাত থেকে সাপটাকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করে। কিন্তু সে কিছুতেই ছাড়ে না। আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। তখন ছাড়ানোর জন্য সে সাপটাকে প্রাণপণ এক কামড় দেয়। সাপটা ছোটনের তীব্র কামড়ে দু’টুকরো হয়ে হাত ছেড়ে মেঝেতে পড়ে যায়। (Children Story)
পুরো ঘটনাটা ঘটে যায় কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। ছোটন বড় বড় চোখ করে সাপের টুকরো দু’টোর দিকে তাকিয়ে থাকে। ঠিক সেই সময় ছোটনের মা মাথায় কাঠের বোঝা নিয়ে বাড়ি ফেরে। ছোটন মায়ের শব্দ পেয়ে চিৎকার করে ওঠে, ‘মা শিগগির এসো। একটা নতুন সাপ…!’ বলেই সে জ্ঞান হারায়। (Children Story)
ছোটনের মা তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে দেখে, অজ্ঞান ছেলের পাশে ভয়ংকর বিষাক্ত এক গোখরো দু’টুকরো হয়ে পড়ে আছে। রক্তারক্তি কাণ্ড দেখে তো ছোটনের মায়ের চক্ষু চড়কগাছ! তৎক্ষণাৎ প্রতিবেশীদের ডাকাডাকি করে তাকে নিয়ে হাসপাতালে দৌড়ায়। ডাক্তাররা একরত্তি ছেলের কাণ্ড শুনে অবাক! ছেলের কী সাহস রে বাবা! সত্যি অবাক কাণ্ড! (Children Story)
ছোটেনের বাবাও ছেলের বিপদের কথা শুনে হাসপাতালে হাজির। তবে ডাক্তাররা তৎক্ষণাৎ ছোটনকে প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়ায় কয়েক ঘণ্টা পরেই জ্ঞান ফেরে ছোটনের। সে ধীরে ধীরে উঠে বসে। নিজের হাতটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে বাবাকে জিজ্ঞেস করে, ‘সেই নতুন খেলনা সাপটা কোথায় গেল বাবা? আমার হাতটা তো ছাড়তেই চাইছিল না!’ (Children Story)
ছেলের কথা শুনে তার বাবা হেসে বলে, ‘এই না হলে আমার ছেলে! তোর সাহস দেখে সাপ বাবাজী লেজ গুটিয়ে ভয়ে পালিয়েছে।’
ছেলের কথা শুনে তার বাবা হেসে বলে, ‘এই না হলে আমার ছেলে! তোর সাহস দেখে সাপ বাবাজী লেজ গুটিয়ে ভয়ে পালিয়েছে।’ ছেলে ও বাবার এমন কথা শুনে সবাই হো হো করে হেসে ওঠে। (Children Story)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
অলংকরণ- আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়
প্রথম লেখা কিশোর ছোটগল্প প্রকাশিত 'আনন্দবাজার পত্রিকা'র স্কুলের পাতায় এবং প্রথম কিশোর উপন্যাস 'আলোর ফুলকি'র পাতায়। এছাড়াও, সানন্দা, বর্তমান, নবকল্লোল,কথাসাহিত্য, সুখী গৃহকোণ, শুকতারা, চির সবুজ লেখা, দৈনিক স্টেটসম্যান, অন্তরীপ, কৃত্তিবাস, সুখবর, যুগশঙ্খ, গৃহশোভা, আজকাল সফর এবং অসংখ্য লিটিল ম্যাগাজিন ও সংকলনে গল্প, অণুগল্প এবং ভ্রমণ কাহিনি প্রকাশিত হয়েছে এবং নিয়মিত লেখালেখি করেন। 'ছোটগল্প প্রসার আকাদেমি' থেকে পেয়েছেন ছোট গল্পের জন্য 'বিমল ঘোষ স্মৃতি সাহিত্য সম্মান' ও 'বিশেষ সাহিত্য সম্মান '।
