(Color Change In History)
ক’দিন আগেই সারা দেশ জুড়ে পালিত হল ভারতবর্ষের এক অন্যতম ধর্মীয় উৎসব হোলি, আমাদের বাংলার দোল। রঙের খেলায় মাতল দেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ। কিন্তু এই অক্ষর কর্মীর কলম সে প্রতিবেদন লিখতে আসেনি। তার বিষয় এমন এক রং ও রং বদলের আখ্যান, যা চিরকালীন নিদেনপক্ষে দীর্ঘস্থায়ী এক ছাপ ফেলে গেছে সমাজ, রাজনীতি এবং জনমানসে। তবে শুরুতেই বলে নেওয়া দরকার, রাজনীতি, সাহিত্য, সংস্কৃতি অথবা বিনোদন, সর্বস্তরে অতি সম্প্রতি দেশজোড়া যে আয়ারাম-গয়ারাম, রং ও রং বদলের খেলা চলেছে, সে প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাব অতি সযত্নে।
কারণ এই নিত্য বদলের কিসসা এতই নোংরা ও সস্তা হাটুরে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে যে, তা নিয়ে কিছু লেখার কথা ভাবনাতেও আনছি না। স্থির করেছি সাম্প্রতিককাল থেকে অনেকটা পিছিয়ে গিয়ে শুরু করব এই প্রতিবেদন। অতঃপর ধীরে ধীরে এগোতে এগোতে এসে, সে প্রয়াসে দাঁড়ি টানব অতি সাম্প্রতিক সময়ের ঠিক আগে। আলোচনায় আনব এমন কিছু বিখ্যাত ব্যক্তিত্বকে, যাঁদের রং বদল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছাপ রেখে গেছে সামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিসরে। সদর্থক বা নঙর্থকভাবে। দেশের সীমা ছাড়িয়ে সেই রং বদল পৌঁছে গেছে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও। শুরুটা করা যাক পুরাকাল থেকে।
আরও পড়ুন: পোষ্য কোলকাতার সেকাল একাল
তালিকায় প্রথম নামটা দস্যু রত্নাকর। কুখ্যাত রক্তপিপাসু এক অপরাধী, অসংখ্য হত্যা, ও লুঠতরাজের সঙ্গে যার নাম প্রায় সমার্থক হয়ে গিয়েছিল সেই পুরাকালে। যার লুঠ করা অর্থে প্রতিপালিত হত তার পরিবার, অথচ তার কৃত অপরাধের দায়ভার নিতে অস্বীকার করেছিল পরিবারের সদস্যরা। এহেন কুখ্যাত তস্কর তীব্র আত্মগ্লানি আর অনুশোচনায় একদিন দস্যুবৃত্তি ত্যাগ করে ধ্যানে বসেছিলেন। এতটাই দীর্ঘ ছিল সেই ধ্যান যে, তাঁর সারা শরীরে বল্মীকের আস্তরণ, সহজ বাংলায় উইঢিবি গড়ে ওঠে। ধ্যানে সিদ্ধিলাভের পর দস্যু রত্নাকর হয়ে ওঠেন মহর্ষি বাল্মিকী (বল্মীক থেকে বাল্মিকী)। সারা পৃথিবীর অন্যতম সেরা মহাকাব্য সপ্তকাণ্ড রামায়ণের রচয়িতা মহাকবি। নীতি ও আদর্শগত প্রশ্নে মানসিকতার এই পরিবর্তন, বলা ভাল, রং বদল, মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তো বটেই!

পুরাকাল থেকে নথিবদ্ধ ইতিহাসের দিকে অগ্রসর হলে পাব বিন্দুসারপুত্র, মগধ সম্রাট অশোককে। চরম আগ্রাসী, সাম্রাজ্যবাদী রণোন্মত্ত এই শাসকের শাসনকালে সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ঘটেছিল অবিভক্ত পূর্ব পাকিস্তান থেকে সুদূর আফগানিস্তান পর্যন্ত। এহেন প্রবল বলদর্পী শাসককে সবচেয়ে বেশি প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়েছিল কলিঙ্গ (অধুনা উড়িষ্যা) দখল করতে গিয়ে। রক্তের স্রোতে সমগ্র কলিঙ্গ দেশ ভাসিয়ে, তবেই তা অধিকার করতে সমর্থ হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এই ভয়াবহ হিংসা ও রক্তপাত তাঁর মনোজগতে এক বিপুল পরিবর্তন এনে দিয়েছিল। ‘সঙ্ঘং শরণং গচ্ছামি’- মন্ত্রোচ্চারণে অবলোকিতেশ্বরের পাদপদ্মে শরণ নিয়েছিলেন সম্রাট অশোক। দয়া নদীর জলে অবগাহন করে পরিবর্তিত হয়েছিলেন চণ্ডাশোক থেকে ধর্মাশোকে। ধরিত্রীর এক বিপুলাংশ জুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন চিরন্তন প্রেম ও শান্তির বার্তা! পৈশাচিক থেকে মানবিক রং বদলের এ-ও এক জাজ্বল্যমান নিদর্শন বৈকি।
অতঃপর ইতিহাস চক্রকে আরও অনেকখানি ঘুরিয়ে সামনে এগিয়ে আসা যাক। সদর্থকের বদলে নেতিবাচক কিছু রং বদল প্রত্যক্ষ করা যায় এই সময়।

মহম্মদ বিন তুঘলক। দিল্লির ষোড়শতম সুলতান। জন্ম ১২৯০ সাল। তুঘলক বংশের উত্তরাধিকারী, অসামান্য প্রতিভাধর এই নৃপতি, পারসিক, উর্দু, তুর্কি, আরবি, হিন্দি ও সংস্কৃত ভাষায় পণ্ডিত, চিকিৎসা বিজ্ঞানেও ছিলেন প্রবল উৎসাহী। তাঁর আমলে এ দেশ পর্যটনে এসছিলেন ইবন বতুতার মতো সুবিখ্যাত ভূপর্যটক। দেশে নতুন মুদ্রার উদ্ভাবক এই মানুষটি কেন যে এক উন্মাদপ্রায় খেয়ালে সহসা তাঁর রাজধানী দিল্লি থেকে সুদূর দৌলতাবাদে (অধুনা মহারাষ্ট্র) উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, তার উত্তর, ইতিহাসের কাছে আজও এক ধাঁধা।
মিরজাফর। আপনারা কখনও কোনও সংখ্যালঘু মানুষের এহেন নাম শুনেছেন? সোজাসাপ্টা জবাব- না। তাঁদের কাছে, এমনকি সংখ্যাগুরু সম্প্রাদায়ের কাছেও এই বিশেষ নামটা বিশ্বাসঘাতকতার সমার্থক হয়ে গেছে বহুকাল। কারণ, বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার প্রতি চরম আনুগত্যের ভান বজায় রেখে, ঠিক শেষ মুহুর্তে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে নিজের এবং অবিভক্ত বাংলা তথা ভারতবর্ষের স্বাধীনতাকে বিক্রি করে দিয়েছিলেন এই ধূর্ত উজির।
তাঁর এই উদ্ভট খেয়াল, বলা ভাল, মানসিক পরিবর্তন এখানেই থেমে থাকেনি। তিনি সঙ্গে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন দিল্লির সিংহভাগ মানুষকেও। যার ফল হয়েছিল বিষময়। দিল্লি থেকে সুদূর দৌলতাবাদ, এই দীর্ঘ পরিযায়ে শুধু পথশ্রমের তীব্র ক্লান্তিতেই মারা গিয়েছিল অসংখ্য মানুষ। সুলতানের এহেন কাণ্ড ‘তুঘলকি কানুন’, ‘তুঘলকি সিদ্ধান্ত’ নামে, আজও রূপক বা উপমা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ইতিহাসের চোখে ‘উন্মাদ বাদশা’ হিসেবে তো কবেই চিরস্থায়ী হয়ে গেছে সুলতান মহম্মদ বিন তুঘলক- এই নামটি।

মিরজাফর। আপনারা কখনও কোনও সংখ্যালঘু মানুষের এহেন নাম শুনেছেন? সোজাসাপ্টা জবাব- না। তাঁদের কাছে, এমনকি সংখ্যাগুরু সম্প্রাদায়ের কাছেও এই বিশেষ নামটা বিশ্বাসঘাতকতার সমার্থক হয়ে গেছে বহুকাল। কারণ, বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার প্রতি চরম আনুগত্যের ভান বজায় রেখে, ঠিক শেষ মুহুর্তে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে নিজের এবং অবিভক্ত বাংলা তথা ভারতবর্ষের স্বাধীনতাকে বিক্রি করে দিয়েছিলেন এই ধূর্ত উজির। গিরগিটির চেয়েও দ্রুত ঘটে গেছিল তাঁর এই রঙ বদল। কিন্তু সাধারণ মানুষ তার এই ঘৃণ্য কর্মকে মনে রেখেছে অদ্যাবধি। নিজের জেলায় তাঁর বংশধরদের মুখ লুকিয়ে চলতে হয় আজও। সমাজের কাছে আজও বলতে গেলে, প্রায় একঘরে তাঁরা।
একটা প্রশ্ন উঠে আসে ঠিক এইখানেই। মিরজাফর কি একাই এই রং বদলানো বহুরূপীর তালিকাভুক্ত ছিলেন? সে তালিকায় রাজা নবকৃষ্ণ দেব, জগৎ শেঠ, উমিচাঁদের মতো বানিয়া, শ্রেষ্ঠীদের নাম কি ছিল না? যে ঘৃণা নিয়ে আমরা ‘মিরজাফর’ নাম থুড়ি শব্দটা উচ্চারণ করি, সেই একই ঘৃণাভরে কি উচ্চারিত হন জগৎ শেঠ অথবা উমিচাঁদ? ভারতবর্ষে স্বাধীনতার শেষ কেল্লা দখল করে লর্ড ক্লাইভ এসেছিলেন শোভাবাজার রাজবাড়ির দুর্গা প্রতিমা দর্শনে। একশো তোপধ্বনির মাধ্যমে তাঁকে স্বাগত জানিয়েছিলেন স্বয়ং রাজা নবকৃষ্ণ। অথচ বাংলা তথা ভারতবর্ষের স্বাধীনতা বিক্রয়কারীর বাড়ির দুর্গোৎসব তো আমরা দিব্য সেজেগুজে দেখতে যাই ফি বছর। পরোক্ষে এ আচরণও কি একধরনের দ্বিচারিতা বা অনৈতিক রং বদলকে সমর্থন নয়?

শেষে পরপর তিনটি রং বদলের কথা বলব, তা ইতিবাচক না নেতিবাচক, সেটা পাঠক নিজস্ব মত অনুযায়ী নির্ণয় করে নেবেন। তালিকায় প্রথম নাম নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি, কলকাতার মেয়র, সব মিলিয়ে মহাত্মা গান্ধীর অহিংসার নীতিতে সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাসী, জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দলে অত্যন্ত উচ্চস্তরের এক নেতা। আর এহেন একজনই কেন পরবর্তীতে, কীভাবে বিশ্বাসী হয়ে পড়লেন সশস্ত্র বিপ্লবের নীতি ও আদর্শে? গড়ে তুললেন আজাদ হিন্দ ফৌজের মতো সংগঠিত, শৃঙ্খলাবদ্ধ এক সেনাদল। ঝাঁপিয়ে পড়লেন সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসকের বিরুদ্ধে এক সর্বাত্মক, সশস্ত্র যুদ্ধে। তাঁর সেই পরিবর্তন অথবা সম্পূর্ণ রং বদলের আখ্যান ইতিহাস তার পাতায় ধরে রেখেছে।
তালিকায় থাকা আরও দুটি নাম চারু মজুমদার এবং বিমান বসু। এর মধ্যে প্রথমজন উত্তরবঙ্গের এক সম্পন্ন পরিবারের সন্তান, বাবা বীরেশ্বর মজুমদার জেলা কংগ্রেসের সভাপতি। দ্বিতীয়জন গান্ধীজির আদর্শে বিশ্বাসী, চরকা কাটা কংগ্রেসি পরিবারের সন্তান।
প্রশ্ন, তাঁর এই পরিবর্তন কি সত্যিই ঘটেছিল? নাকি তাঁর মানসিক সমর্থন বরাবরই সশস্ত্র বিপ্লবের পক্ষে ছিল? আর এই পথে কংগ্রেসকে তিনি সুরক্ষা কবচ হিসাবেই ব্যবহার করেছিলেন শুধুমাত্র? ভিতরে ভিতরে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সেই মহা দ্রোহের, যা তাঁকে এলগিন রোডের প্রাসাদোপম ওই বাড়িটা থেকে টেনে নিয়ে যাবে এক রক্তস্নাত রণাঙ্গনের দিকে?

বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের মতো সশস্ত্র বিপ্লব বিশ্বাসী একটি দলের অন্যতম অনুপ্রেরণাদাতা; ভগত সিং, বিনয়, বাদল, দীনেশদের কার্যকলাপকে নিঃশর্ত সমর্থন; এতবিধ সব কার্যকলাপ তো অহিংস আর ‘শান্তির ললিত বাণী’-তে কর্ণপাত না করে সেই মহাদ্রোহের পথে ছুটে যাওয়াকেই ইঙ্গিত করে এসেছে বরাবর। এই প্রতিবেদকের পর্যবেক্ষণ অন্তত সে কথাই বলছে। পাঠক এই ‘পরিবর্তন’ তথা মনের রং বদলকে কোন চোখে দেখবেন, আগেই বলেছি, তা সম্পূর্ণ তাঁর বিবেচনাধীন।
তালিকায় থাকা আরও দুটি নাম চারু মজুমদার এবং বিমান বসু। এর মধ্যে প্রথমজন উত্তরবঙ্গের এক সম্পন্ন পরিবারের সন্তান, বাবা বীরেশ্বর মজুমদার জেলা কংগ্রেসের সভাপতি। দ্বিতীয়জন গান্ধীজির আদর্শে বিশ্বাসী, চরকা কাটা কংগ্রেসি পরিবারের সন্তান। কিন্তু ইতিহাস তাদের টেনে নিয়ে গেল সম্পূর্ণ বিপরীত এক পথে। সমাজতন্ত্র। বিপ্লবের পথে বর্তমান শ্রেণিব্যবস্থার মূলোচ্ছেদ। সেখানেও মতাদর্শগত পার্থক্য এল। একজনকে গ্রাস করে নিল বিপ্লবের আগুন, অপরজন পা বাড়ালেন সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবন রয়ে গেল সমাজতন্ত্রে প্রকৃত বিশ্বাসী একজন মানুষের মতোই; ন্যূনতম বিলাসিতাবর্জিত, আড়ম্বরবিহীন। জাতীয়তাবাদী পারিবারিক পশ্চাৎপট থেকে উঠে আসা দুই ব্যক্তিত্বের সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী হয়ে পড়া, এহেন পরিবর্তন থুড়ি ‘রং বদল’-কে পাঠক কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখবেন, তাও দিনের শেষে নাহয় তাঁদের উপরই ছেড়ে দিলাম।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
জন্ম ও বেড়ে ওঠা উত্তর কলকাতার পুরোনো পাড়ায়। বহু অকাজের কাজী কিন্তু কলম ধরতে পারেন এটা নিজেরই জানা ছিল না বহুদিন। ফলে লেখালেখি শুরু করার আগেই ছাপ্পান্নটি বসন্ত পেরিয়ে গেছে। ১৪২১ সালে জীবনে প্রথম লেখা উপন্যাস 'দ্রোহজ' প্রকাশিত হয় শারদীয় 'দেশ' পত্রিকায় এবং পাঠকমহলে বিপুল সাড়া ফেলে। পরবর্তীতে আরও দুটি উপন্যাস 'জলভৈরব' (১৪২২) এবং 'বৃশ্চিককাল' (১৪২৩) প্রকাশিত হয়েছে যথাক্রমে পুজোসংখ্যা আনন্দবাজার এবং পত্রিকায়। এছাড়া বেশ কিছু প্রবন্ধ এবং দু চারটি ছোটগল্প লিখেছেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকা আর লিটিল ম্যাগাজিনে। তার আংশিক একটি সংকলন বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে 'ব্যবসা যখন নারীপাচার' শিরোনামে। ২০১৭ সালে পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি পুরস্কার।
