(Gouranga Da Old Kolkata)
সত্তর দশকের কথা, বাংলা চারিদিক থেকে উত্তাল। কলকাতার রাজপথে তখন তেপায়া টেম্পোর পাশাপাশি জোড়া বলদ গাড়ি টানে, হলুদ টাক্সি ও মিনিবাস তখনও বাঙালি দেখেনি, স্পন্ডেলাইসিস এবং এগ রোলের সঙ্গে বাঙালির পরিচয় হয়নি, সরকারি লোক বাড়িতে এসে পক্সের টিকা দিয়ে যেত। সকাল ন’টায় সাইরেন বাজতেই ঘড়িতে সময় মিলিয়ে নিয়মিত দম দিত। পাড়ায় মাতাল পরিচয় জানতে পারলে দিনের বেলায় তাঁর দিকে কৌতূহলী নজরে সবাই তাকাত। তখন মাতালরা একটা বিশেষ শ্রেণিভুক্ত প্রাণী হিসেবে মান্যতা পেত।
সে সময় ঢাকুরিয়া বাবুবাগান অঞ্চলে চার কামরার ফ্ল্যাট ছিল আমাদের যৌথ পরিবারের আস্তানা। শহুরে মানুষদের তখনও কত কী আজানা ছিল। ‘বিস্ময়’ ছিল মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী। ‘জেরক্স’ কী জিনিস, তখন সে সম্পর্কে আমাদের বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না। স্কুলে সাপ্তাহিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি হত সাইক্লোস্টাইল মেশিনে। স্কুল শিক্ষক মোম কাগজের ওপর দাঁতাল কলম দিয়ে লিখে দিলে, সেই কাগজটা, একটা মোটা কালির বেলনার ওপর সেঁটে দিয়ে, তার হাতল ধরে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সুন্দর হস্তাক্ষরের প্রশ্নপত্র সাইক্লোস্টাইল কপি করা হত। একই পদ্ধতিতে জরুরি স্কুল নোটিস আমাদের হাতে দেওয়া হত।
আরও পড়ুন: সাহিত্য ও সিনেমার ‘অন্তর দ্বন্দ্ব’ থেকেই জন্ম ‘ভারতীয় সমান্তরাল সিনেমা’র
পাড়ায় তখন হাতেগোনা কয়েকটা বাড়িতে ফ্রিজ, টিভি টেলিফোন। বাবুবাগান মাঠের পাশে হলুদবাড়ির দোতলায় ফ্রিজের পাশে একটা শাটার দেওয়া চারপায়া কাঠের টিভি ছিল। সে বাড়ির বারান্দায় বসে আমার প্রথম টিভিতে ক্রিকেট খেলা দেখা। ভাষ্যকার গলা কাঁপিয়ে বলছেন, হাইকোর্ট প্রান্ত থেকে সাড়ে ছ’ফুটের টনি গ্রেগ বল হাতে ছুটে আসছেন। আমরা দেখছি, তিনি ছুটছেন ঠিকই কিন্তু ছোটার মাঝে অদ্ভুতভাবে কোমর দুলিয়ে নিচ্ছেন। পাড়ার মাঠে কয়েকজন গ্রেগ সাহেবের নকল করে কোমর দুলিয়ে বল করার চেষ্টা করে কিছুতেই সফল হচ্ছে না। বল করার সময় গতি কমে যাচ্ছে ফলে বল ছুড়তে পারছে না।
আসল রহস্য পরে জেনেছিলাম, দিনের বেলায় টিভি এন্টেনাতে কাক বসলে ছবি নেচে উঠত আমরা সেটাকেই টনি গ্রেগের নিজস্ব স্টাইল ভেবে বসেছিলাম। সে যুগে সরলতাই ছিল মানুষের সব থেকে বড় সম্পদ। বোকা হলে কখনই নিজেকে অপরাধী মনে হত না। যেবার শ্যাম থাপা মোহনবাগানের হয়ে বাইসাইকেল কিকে গোল করেছিল, ওই আমার হলুদ বাড়িতে শেষ টিভি দেখা। শ্যাম থাপা গোল দেওয়ামাত্র সামনের সারিতে বসে থাকা বুকুদা উত্তেজিত হয়ে নিজেও মাটিতে শুয়ে একটা বাইসাইকেল কিক ছুড়ে দিল। সপাটা তাঁর পা গিয়ে লাগল চারপায়া টিভির এক পায়ে। মুহূর্তের মধ্যে মাথায় ফুলদানি ও বাঁধানো ফ্যামিলি ফোটোগ্রাফ সমেত টিভি লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।

বাড়ির বয়স্ক মাসিমা ঘুম নষ্ট করে অনেকক্ষণ আমাদের বাঁদরামো সহ্য করেছেন, এবার তিনি চিৎকার করে পাড়া মাতালেন। সব দোষ গৃহকর্তার। কেন তিনি আদিখ্যেতা করে পাড়ার ছেলেদের বাড়িতে ঢুকতে দিয়েছেন, এই অভিযোগ তুলে গৃহিণীর উদ্দাম আম্ফালন। সব কিছু দেখে বাড়ির ছেলেমেয়ে বেতের সোফায় বসে হাত-পা ছুড়ে কান্না জুড়ে দিল। গৃহকর্তার আফশোস তিনি দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে সদ্য টিভির লাইসেন্স রিনিউ করেছেন। এ প্রসঙ্গে বলে রাখা প্রয়োজন যে, সে সময় রেডিও এবং টেলিভিশন এর জন্য লাইসেন্স লাগত এবং সেটা বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়ে পোস্ট অফিসে গিয়ে রিনিউ করাতে হত। ট্রানজিস্টার আসার পর সে নিয়ম তুলে দেওয়া হয়। এদিকে আমি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিলাম না, মেঝের কাচ কুড়িয়ে তাঁদের সাহায্য করব, না কাকিমার পা ধরে বুকুদার হয়ে ক্ষমা চাইব।
বিপদ বুঝে বুকুদা নিমেষের মধ্যে অঞ্চল থেকে হাওয়া, পাড়ার ত্রিসীমানায় কেউ তাঁর টিকি খুঁজে পেল না। পাবে কী করে! ঘটনার স্থল থেকে এক দৌড়ে তিনি ট্রেন চেপে কাঁকিনাড়াতে মামার বাড়ি পালিয়েছেন।
মাসখানেকের মধ্যেই তাঁর শোওয়ার ঘরের দরজার পাশে একটা লম্বা টুলের উপর কুরুসের কাজ করা সাদা ঢাকনা তলায় চাপা দেওয়া থাকত কালো টেলিফোন, আর তার পাশে গাবদা টেলিফোন ডাইরেক্ট্রি। এসটিডি বলে কোনও শব্দ অভিধানে স্থান পেয়েছিল কি না জানা নেই।
গ্যাসে রান্নার চলন তখন সীমিত, পাড়ায় জ্বালানির যোগান বলতে লালার কেরোসিনের দোকান আর মনুয়ার কয়লার দোকান। এই মনুয়ার দোকান ছিল আমাদের বাড়ির বাঁ-পাশে প্রশান্তদার বাড়ির তলায়। প্রশান্তদার ভাই সোনাদা কলকাতা ইউনিভার্সিটিতে সদ্য চাকরি পেয়ে প্রেমে পড়ছে দিল্লিবাসী দিদির ননদের। চিঠির যোগাযোগে আর তাঁদের মন মানে না বলে সোনাদা টেলিফোনের আবেদন করে ফেলল। মাসখানেকের মধ্যেই তাঁর শোওয়ার ঘরের দরজার পাশে একটা লম্বা টুলের উপর কুরুসের কাজ করা সাদা ঢাকনা তলায় চাপা দেওয়া থাকত কালো টেলিফোন, আর তার পাশে গাবদা টেলিফোন ডাইরেক্ট্রি। এসটিডি বলে কোনও শব্দ অভিধানে স্থান পেয়েছিল কি না জানা নেই।
তখন আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পাড়ায় প্রতিবেশীদের একমাত্র ভরসা ছিল সোনাদাদের টেলিফোন। ট্রাঙ্ককলে ডাক এলে আশেপাশের বাড়ি থেকে লোকজন ছুটে এসে অপেক্ষা করত। হলুদ বাড়ির পর আমি সোনাদার বাড়িতেই দিনের পর দিন শতরঞ্জিতে বসে চিত্রহার, চিত্রমালা, বুনিয়াদ, ইয়ে জো হ্যায় জিন্দেগি দেখেছি।

তখন লোকাল ট্রেনে বগির সংখ্যা অনেক কম ছিল। ফলে প্ল্যাটফর্মের আয়তন ছিল আজকের তুলনায় দৈর্ঘ্যে প্রায় অর্ধেক। ঢাকুরিয়া আপ প্ল্যাটফর্মের বাম ধারে ছিল কুশারীর পানের দোকান। দোকান ঘেঁষে ছোট্ট পাঁচিলে পা ঝুলিয়ে বসে চলত আমাদের আড্ডা। পাঁচিলের মাঝামাঝি জায়গা দিয়ে কয়েক ধাপ সিঁড়ি নেমে সোজা রাস্তা চলে গেছে বিনোদিনী স্কুলের দিকে। সিঁড়ি ঘেঁষে বাম ধারে ছিল হরি’দার চায়ের দোকান। আর তার ঠিক পাশেই একটা রেডিও মেরামতের দোকান। সেই দোকান মালিকের নামটা এখন কিছুতেই মনে পরছে না। যাই হোক, রেডিওর দোকানে ভিড় দেখে আমরা অনুমান করতে পারতাম ক্রিকেট টেস্ট খেলা বা মহালয়ার দূরত্ব। রেডিও দোকানের নানান অভিযোগ পাঁচিলে বসে কানে আসত।
অধিকাংশের বক্তব্য ‘তোমার দোকানে রেডিও স্পষ্ট বাজে, কিন্তু বাড়ি নিয়ে গেলেই ক্যুই ক্যুই করে।’ এই নিয়ে দু’পক্ষের তর্কের লড়াই লেগেই থাকত। কিছুদিন পরে আবিষ্কার হল, এই সমস্যার প্রধান দোকানের গায়ে লেগে থাকা একটা টিনের দরজা। সেটাই নাকি রেডিও টিউনিং বদলে দিচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হল টিনের দরজার মালিক চা’য়ালা হরি, অদূর ভবিষ্যতে তাঁর দরজা বদলের কোনও পরিকল্পনাই নেই। সেই শুনে বদলে গেল রেডিও দোকানির চা সাপ্লায়ার। হরির বদলে প্ল্যাটফর্ম শেষের নিতাই হল নতুন চা সাপ্লায়ার। রেডিওয়ালা হরির ওপর রেগে গেলেই বলত ‘আজ তোর দুধ কেটে ছানা হবে দেখিস’। তখন প্যাকেট দুধের যুগ শুরু হয়নি। ফলে গুঁড়ো দুধ দিয়ে চা করলে কাস্টমার পালাবে। হরিদা আমাদের কাছে পালটা অভিযোগ জানাত ‘তোমরা লেখাপড়া করছ। তোমারাই বলো সাপ দিয়ে কেউ পেটে লাঠি মারে?’
কিন্তু এবার যে বিজ্ঞপ্তি সাঁটা রয়েছে তাতে লেখা ‘এই দোকান সত্তর বিক্রি হবে। যোগাযোগ ‘হরির চায়ের দোকান’, নিচে তীরচিহ্ন দিয়ে পাশে হরির চায়ের দোকান দেখানো রয়েছে। যাতায়াতের পথে মানুষজন হরির কাছে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই হরি রেগে আগুন।
জামাইষষ্ঠীতে রেডিওয়ালা কয়েকদিনের জন্য সপরিবারে শ্বশুর বাড়ি গিয়েছে। দোকান বন্ধ রাখলে কাস্টমারদের সুবিধার্থে এধরনের বিজ্ঞপ্তি সেঁটে দেওয়ার রীতি রয়েছে। কিন্তু এবার যে বিজ্ঞপ্তি সাঁটা রয়েছে তাতে লেখা ‘এই দোকান সত্তর বিক্রি হবে। যোগাযোগ ‘হরির চায়ের দোকান’, নিচে তীরচিহ্ন দিয়ে পাশে হরির চায়ের দোকান দেখানো রয়েছে। যাতায়াতের পথে মানুষজন হরির কাছে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই হরি রেগে আগুন। হরিকে ফাঁসিয়ে জামাইষষ্ঠী খেয়ে ওঁর নাকি কোনও খাবারই হজম হবে না।
আমরা তাঁকে শান্ত করে বুঝিয়ে বললাম, তুমি যখন কিছুই জানো না, তাহলে ওই কাগজটা ছিঁড়ে ফেললেই হয়। মুহূর্তে সমস্যার সমাধান হয়ে গেল।

কিন্তু বিষয়টা আরও ভয়ংকর রূপ নিল জামাইষষ্ঠী খেয়ে দোকান খোলার পরে। যখন জনে জনে দোকান কিনতে রেডিও দোকানে হাজির হচ্ছে। এবার বলি এই ঘটনাটা আমরাই ঘটিয়েছিলাম। আসল সমস্যা হরির টিনের দরজায় ছিল না, ছিল ওঁর কাউন্টারের নিচে আমাদের একজনের লুকিয়ে রাখা করগেট টিনে। যাইহোক আষাঢ়ের শুরুতেই নিতাই বদলে গেল। রেডিওর দোকান থেকে মাঝে মধ্যেই ভেসে আসত হরি দু’টোকে তিনটে করে পাঠা।
রেডিওর উল্টোদিকে প্ল্যাটফর্ম ঘেঁষে ছিল কল্লোলের চশমার দোকান ‘এলিট অপটিক্যাল’। সেই চশমার দোকান ধরে কয়েক পা এগোলে পিচ রাস্তার হাতখানেক নিচ থেকে মুখ বের করে থাকত ছোট্ট একটা চপের দোকান। ওপর তলায় ছিল চিঁড়েমুড়ির দোকান। বিকেল হলেই দেহাতি বউ ছাপা শাড়িতে মুখ ঢেকে গামলায় বেসন গুলে, আলু চটকে থালায় তক্তি সাজিয়ে রাখত। বিহারি মরদ হাঁটুর ওপর ধুতি গুটিয়ে পিঁড়িতে বসে চপ ভাজত। চপের দোকানের পাশে তিন ধাপ সিঁড়ি উঠলেই আজকে আমার গল্পের নায়ক গৌরাঙ্গ’দার দোকান।
নিচের তাকে জলরঙের বাক্স, জ্যামিতি বাক্স, প্যাস্টেল রংবাক্স, দেশ-বিদেশের মানচিত্র, বিপ্লবী মনীষীদের ছবি, বিদেশি খুচরো পয়সা, জানা অজানা দেশের পোস্টাল স্ট্যাম্প, বেতাল থেকে বৈষ্ণোদেবীর রঙিন স্টিকার। অন্যদিকে স্তূপীকৃত টেস্ট পেপার আর ছাত্রবন্ধু।
বয়সের ভারে গৌরাঙ্গদা চার পাল্লার দোকানের দু’পাল্লা বন্ধ রেখে কাজ চালাতেন। বন্ধ পাল্লার ছিটকিনি ভিতর থেকে সর্বক্ষণের জন্য শক্ত করে লাগানো থাকত। দোকানের সামনে সকাল বিকেল নানান বয়সের ভিড় লেগেই থাকত। গৌরাঙ্গদার মাথা ছুঁয়ে সারি সারি দড়ি টাঙানো ছিল, সেখানে ঝুলত স্বপন কুমার, চাঁদমামা, শুকতারা, সন্দেশ, কিশোরভারতী, আনন্দমেলা। আর একপাশে খাড়া করা থাকত দেব সাহিত্য কুটিরের নতুন নতুন সংকলন। নিচের তাকে জলরঙের বাক্স, জ্যামিতি বাক্স, প্যাস্টেল রংবাক্স, দেশ-বিদেশের মানচিত্র, বিপ্লবী মনীষীদের ছবি, বিদেশি খুচরো পয়সা, জানা অজানা দেশের পোস্টাল স্ট্যাম্প, বেতাল থেকে বৈষ্ণোদেবীর রঙিন স্টিকার। অন্যদিকে স্তূপীকৃত টেস্ট পেপার আর ছাত্রবন্ধু। বঙ্গলিপি, তাম্রলিপির আড়ালে লুঙ্গি পরে পৈতে কাঁধে সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে ভাঙা কাঠের চেয়ারে বসতেন গৌরাঙ্গদা।
গৌরাঙ্গদার শরীরের কোথাও ছিটেফোঁটা মেদ ছিল না। ফর্সা গায়ের রং। কালো মোটা ফ্রেমের চশমার ফাঁক দিয়ে তাঁর সরল দৃষ্টি আর পাতলা ঠোঁটে সর্বক্ষণের হাসির মধ্যে আমরা খুঁজে পেতাম এক অন্য ধরনের বন্ধুত্বের হাতছানি। যে কারণে দিনের পর দিন আমাদের টিফিনের জমানো পয়সা আমরা অবলীলায় গৌরাঙ্গদার হাতে তুলে দিয়েছি। কোনওদিন তার জন্য আমাদের মনে কোনও অনুতাপ ছিল না। কারণ বিনিময়ে আমরা পেয়েছি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে বই পড়ার সুযোগ। বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে দোকানে দাঁড়িয়েই স্বপন কুমার পড়ে ফেলতাম। বই কিনতে লাগত এক টাকা চার আনা, দাঁড়িয়ে পড়লে দিতে হত মাত্র চারআনা। ঘণ্টাখানেকেই শেষ করে দিতাম রতনের রোমহর্ষক কাহিনি।

স্বপন কুমারের প্রতি আমার ঠাকুরদাদার আগাগোড়া এলার্জি ছিল, কিন্তু কেন ছিল তা জানি না। অন্য বন্ধুদের মতো আমাকেও বাড়িতে পড়ার বইয়ের আড়ালে লুকিয়ে স্বপন কুমার পড়তে হত। একবার ক্লাস ফাইভের পরীক্ষার আগে চাদরের তলায় লুকিয়ে ‘চঞ্চলের আতঙ্ক’ পড়ছিলাম, মা’র কাছে ধরা পরে সে রাতে আমার উপোস। রাতে আমাকে খেতে দেওয়া হল না, সঙ্গে মা নিজেও খেলেন না। লাভের লাভ হল, পরের দিন বাবা অফিস থেকে হাফ ছুটি নিয়ে এসে আমাকে নিয়ে গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশনের লাইব্রেরিতে ভর্তি করে দিলেন। সেখানকার অভিজ্ঞতার কথা অন্য কোনও সময় হবে।
বাবা দোলের আবির, পিচকারি, কালীপূজার ক্যাপ ভর্তি পিস্তল গৌরাঙ্গদার দোকান থেকে কিনে এনে আমাদের আবদার মেটাতেন। পিস্তল ছাড়াও আমরা ক্যাপ ফাটাতাম অন্য কায়দাতে। একটা লম্বা স্ক্রুর মধ্যে দুটো ওয়াশার দিয়ে। ওয়াশারের মাঝখানে ক্যাপ রেখে উপর থেকে নাট টাইট করে রাস্তায় ছুড়ে দিলেই আওয়াজ করে ফেটে উঠত। আচমকা লোক চমকানোর ক্ষেত্রে এটা ছিল এক মোক্ষম যন্ত্র। সমস্যা ছিল একটাই, বেশিরভাগ সময় নাট বল্টু গড়িয়ে পরত রাস্তার ধারের নর্দমায়।
কোনওদিন রুটি আলু ভাজা, আবার কোনওদিন লেবু টিপে ভেজা চিড়ে চিনি দিয়ে মেখে খেতেন। মাঝে মধ্যে সামনের চপওয়ালি দেহাতি কায়দায় ছোলার ছাতু মেখে সঙ্গে চাটনি পেঁয়াজ লঙ্কা দিয়ে সুন্দর করে কড়ির থালা সাজিয়ে দিত। গৌরাঙ্গদার খাওয়ার সময় আমরা কয়েকজন আড়াল করে দাঁড়াতাম।
রাস্তায় ক্রিকেট খেলার সময় নর্দমায় বল পড়লে বল ভেসে উঠত। আমরা বাঁ হাতে বল তুলে জোরে কয়েকটা ড্রপ মেরে জল ঝরিয়ে নিয়ে আবার খেলা শুরু করতাম। কিন্তু এই নাট বল্টুর কল নর্দমায় পরে জলের নিচে আবর্জনায় হারিয়ে যেত। আমাদের এই সমস্যার কথা শুনে মুশকিল আসান করে দিলেন গৌরাঙ্গদা। স্ক্রুর মাথায় হাতখানেক মাঞ্জা সুতো পেঁচিয়ে দিলেন। এবার নাট বল্টু আবর্জনায় ডুবে গেলেও সুতোর টানে আবার সেটা উঠে আসত।
বেলা বাড়লে গৌরাঙ্গদা টেবিল ছুঁয়ে যেত এক চিলতে রোদ। এই মাহেন্দ্রক্ষণ ছিল গৌরাঙ্গদার খাওয়ার সময়। টিফিন বাক্স খুলে খেতে বসতেন। কোনওদিন রুটি আলু ভাজা, আবার কোনওদিন লেবু টিপে ভেজা চিড়ে চিনি দিয়ে মেখে খেতেন। মাঝে মধ্যে সামনের চপওয়ালি দেহাতি কায়দায় ছোলার ছাতু মেখে সঙ্গে চাটনি পেঁয়াজ লঙ্কা দিয়ে সুন্দর করে কড়ির থালা সাজিয়ে দিত। গৌরাঙ্গদার খাওয়ার সময় আমরা কয়েকজন আড়াল করে দাঁড়াতাম। সে সময় কাস্টমারের তাড়া থাকলে আমরাই জিনিসপত্র এগিয়ে দিয়ে পয়সা গুণে গৌরাঙ্গদার সামনে টেবিলের ওপর রেখে দিতাম।
আরও পড়ুন: বাঙালির ডান ও যুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক চেতনা
ওই সময় ওখানে আমাদের উপস্থিত থাকার আসল রহস্য হল গৌরাঙ্গদা খেতে খেতে আমাদের নানা ধরনের গল্প বলতেন। তাঁর দোকানে কোন বইয়ে কী গল্প লুকিয়ে আছে, কোনটা আমাদের ভাল লাগবে, বা কোনটা পড়া উচিত ইত্যাদি ইত্যাদি। সেটার থেকেও বড় আকর্ষণ ছিল পাড়ার গুপ্ত রহস্য। একদিন চোখ গোল গোল করে আমাদের ইশারায় মুখোমুখি স্যাকরার দোকান দেখিয়ে বললেন, স্যাকরার সোনার গুড়ো ধুলো হয়ে হাওয়ায় উড়ে সামনের নালায় পড়ে, রাতের অন্ধকারে ওই নালার জল ছেঁকে একজন নাকি বিরাট টাকার মালিক হয়েছে। গৌরাঙ্গদার কথা দোকানের মালিকের কানে পৌঁছতেই তিনি মশারি কেটে দোকানের দরজায় আর গারদের গায়ে লাগিয়ে দিলেন। তারপর থেকে দিনের শেষে মশারি ঝাড়লেই তাঁর ঘরের মেঝে চকচক করে ওঠে।
আবার একদিন ফিসফিস করে আমাদের জানাল, হরিণঘাটার দুধের ডিপোর উল্টোদিকের বাড়ির ছোরাটাকে গতকাল রাতে পুলিশ নাকি তুলে নিয়ে গিয়েছে। পাড়ায় পুলিশ নকশাল ধরতে এসে ওর বাড়ির ছাদে উঠে দেখতে পায় ফুলের টবে গাঁজার চাষ করেছে। ব্যস, সেই দেখে পুলিশ বাপ বেটা, দু’জনকেই তুলে নিয়ে গিয়ে গারদে পুরে দিয়েছে। এরকম অবাক করা পাড়ার গোপন খবর জানা যেত গৌরাঙ্গদার কাছ থেকে।
গৌরাঙ্গদার দোকানের বন্ধ পাল্লার পিছনের সারি দিয়ে ঝুলতো পেটকাটি, মুখপোড়া, ময়ূরপঙ্খী, মোমবাতি, বগগা, চাঁদিয়াল। জন্মদিন বা বিয়েতে তখন বই উপহার দেওয়ার রীতি ছিল। তাই দোকানের পিছনের দেয়ালে কাঠের তক্তার উপরে সাজানো থাকত শরৎচন্দ্র, বিমল মিত্র, শঙ্কর, তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ, ঘরে বাইরে, গীতাঞ্জলি, স্বরলিপি এমনকি হলুদ সেলোফেন মলাটে ঢেকে রাখা থাকত দাম্পত্যজীবনের জটিল প্রশ্ন উত্তর।
দুপুরে ঘণ্টাখানেকের জন্য দোকান বন্ধ রেখে বিকেল হতে না হতেই ম্যাজিক দড়ি, জলভরা বৈজয়ন্তী মালা আর কাঁধের ঝোলায় ভর্তি বই নিয়ে হাজির হতেন গৌরাঙ্গদা। সে এক অবাক করা জল পিচকিরি। বেলুনে জল ভরলেই হেমা মালিনী হেসে উঠতেন আবার কোনওটায় বৈজয়ন্তীমালা, মালা সিনহা, রেখা। যদিও বাড়িতে ঠাকুরদাদার প্রবল আপত্তি ছিল এই বেলুন খেলার উপর। তার নজর এড়িয়ে আমি কিছুই করতে পারতাম না। অন্যরা বেলুনে জল ভরে খেলত, আমি তখন ছিলাম নীরব দর্শক।
গৌরাঙ্গদার দোকানের বন্ধ পাল্লার পিছনের সারি দিয়ে ঝুলতো পেটকাটি, মুখপোড়া, ময়ূরপঙ্খী, মোমবাতি, বগগা, চাঁদিয়াল। জন্মদিন বা বিয়েতে তখন বই উপহার দেওয়ার রীতি ছিল। তাই দোকানের পিছনের দেয়ালে কাঠের তক্তার উপরে সাজানো থাকত শরৎচন্দ্র, বিমল মিত্র, শঙ্কর, তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ, ঘরে বাইরে, গীতাঞ্জলি, স্বরলিপি এমনকি হলুদ সেলোফেন মলাটে ঢেকে রাখা থাকত দাম্পত্যজীবনের জটিল প্রশ্ন উত্তর।
— গৌরাঙ্গদা কোথাও পেলাম না
— জানতাম পাবি না, বল কী চাই?
— ঢাকুরিয়ার ম্যাপ
আরও পড়ুুন: চৌরিচৌরা: ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের দিশা বদলের মুহূর্ত
— ওটা তোর **** ছাপাচ্ছে
আবার কেউ এসে বলল,
— গৌরাঙ্গদা টেস্ট পেপারের মানে বই হবে?
— গৌরাঙ্গদা ছাত্র বন্ধুর মানে বই হবে?
— গৌরাঙ্গদা এক পয়সার খুচরো হবে?
এই সব প্রশ্নের একটাই উত্তর ভেসে আসত
— ওটা তোর **** ছাপাচ্ছে
সে যুগে না ছিল মোবাইল ফোন, না ছিল গৌরাঙ্গদার নিজস্ব গাড়ি। কাঁধে একটা ক্যাম্বিস কাপড়ের ঝোলা ঝুলিয়ে, বুক পকেটে ট্রেনের মান্থলি, দুই রংয়ের দুটো পেন, সঙ্গে কাস্টোমারের চাহিদার তালিকা নিয়ে দুপুর রোদে কলকাতা দাপিয়ে বেড়াতেন।
একদিন স্টেশন রোডের এক টেলারিং শপের মালিক রঙিন চক কিনতে এসে গৌরাঙ্গদাকে গায়ে পড়ে নানা উপদেশ দিতে শুরু করলেন, সঙ্গে আমাদের দিকে আঙুল দেখিয়ে জানালেন, তাঁর ব্যবসায় উদ্ভট চাহিদার আবিস্কারক নাকি আমরা। তিনি ভীষণভাবে সাবধান করে দিলেন, যাতে কোনওভাবেই তিনি আমাদের প্রশ্রয় না দেন। লোকটা যতক্ষণ ছিল, গৌরাঙ্গদা একটা কথাও বলেননি। চলে যাওয়ার পর আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন ‘নিজের মেয়ের বিয়েতে যে ফাস্ট ব্যাচে বসে খায়, সে এসেছে আমাকে জ্ঞান দিতে।’
বিনোদিনী, রামচন্দ্র, পূর্ণচন্দ্র, ফ্লাওয়ারস কর্নার, শিশুশিক্ষা ভবন, ওই অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল যত স্কুল, এইসব স্কুলের অধিকাংশ পাঠ্যবই দায়িত্ব সহকারে জোগান দিতেন গৌরাঙ্গদা। তাকে বই কিনতে কলেজস্ট্রিট যেতে হত, সঙ্গে খেলনা কিনতে ক্যানিং স্ট্রিট আবার লাট্টু লাটাই ঘুড়ির জন্য কলাবাগান কখনও বা খিদিরপুর। গৌরাঙ্গদা একা হাতে সব দিক হাসি মুখে কী করে সামলাতেন, সেটা আজও আমার কাছে বিস্ময়। সে যুগে না ছিল মোবাইল ফোন, না ছিল গৌরাঙ্গদার নিজস্ব গাড়ি। কাঁধে একটা ক্যাম্বিস কাপড়ের ঝোলা ঝুলিয়ে, বুক পকেটে ট্রেনের মান্থলি, দুই রংয়ের দুটো পেন, সঙ্গে কাস্টোমারের চাহিদার তালিকা নিয়ে দুপুর রোদে কলকাতা দাপিয়ে বেড়াতেন। গৌরাঙ্গদার পদবি আজও আমার অজানা। কিন্তু শ্রীগৌরাঙ্গ স্টোর্স আমার জীবনের প্রথম দেখা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, যার জোগানদার, কর্মচারী, হিসাবরক্ষক এবং মালিক ছিলেন একা গৌরাঙ্গদা।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
প্রেমেন্দু বিকাশ চাকী বাংলা সিনেমা জগতে একজন দক্ষ চিত্রগ্রাহক হিসেবে বহু কালজয়ী এবং সমাদৃত ছবিতে কাজ করেছেন। তাঁর সিনেমাটোগ্রাফি, ছবির নান্দনিকতাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁর বহু ছবিই সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। ভূষিত হয়েছে বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে। পরবর্তীকালে, তিনি চলচ্চিত্র পরিচালনায় পদার্পণ করেন। পরিচালক হিসেবে মূলত পারিবারিক গল্প এবং মিষ্টি সম্পর্কের রসায়ন পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে ভালোবাসেন।
পরিচালনার পাশাপাশি চলচ্চিত্র জগতের সাংগঠনিক ক্ষেত্রেও তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বর্ণময় কর্মজীবনে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে ইস্টার্ন ইন্ডিয়া সিনেমাটোগ্রাফার্স অ্যাসোসিয়েশনের (EICA) সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব (KIFF)-এর টেকনিক্যাল কমিটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন সুদীর্ঘ সময়।
চলচ্চিত্রের কারিগরি বিষয়ে তাঁর ব্যবহারিক অভিজ্ঞতার আলোকে সরকারি এবং বেসরকারি বিভিন্ন চলচ্চিত্র শিক্ষাকেন্দ্রে একজন অতিথি অধ্যাপক (Guest Lecturer) হিসেবে আগামী প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের সমৃদ্ধ করে চলেছেন তিনি।
