(Human Future)
‘আপনি তো মা। সন্তানের জন্য ভয় হয় না?’
প্রশ্নটা করা হল ড্যানিয়েলা অ্যামোদেইকে। সম্প্রতি তাঁর সংস্থা অ্যান্থ্রোপিক ‘ক্লড কোওয়ার্ক’ নামের এক এআই মডেল বাজারে এনেছে। আর মডেলটি পদার্পণ করতে না করতেই জোর ধাক্কা খেয়েছে গুগল, মেটা, মাইক্রোসফটের মতো আন্তর্জাতিক বিজনেস জায়ান্টদের স্টক। ভারতের আইটি বাজার থেকে একদিনে মুছে গিয়েছে ২ লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগ। ‘আহত’দের তালিকায় ইনফোসিস, টিসিএস, উইপ্রো, এইচসিএলের মতো সংস্থা। ২০২০ সালে নাকি শেষ এমন বিপর্যয় দেখা গিয়েছিল।
অবশ্য বিপর্যয় ঘটার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কোডিং সংক্রান্ত যেসব কাজ করতে মানুষের অনেকটা সময় লাগে, ক্লড কোওয়ার্ক তা নিমেষে করে দিচ্ছে। সময়ের পাশাপাশি খরচও বাঁচিয়ে দিচ্ছে। ফলত, যে সংস্থাগুলি ওইসব কাজের জন্য গুচ্ছ কর্মী রেখেছে, তাদের ব্যবসা মার খেতে পারে— এমনটাই আশঙ্কা হয়েছিল বিনিয়োগকারীদের। সেই আশঙ্কা ফুটে উঠেছে শেয়ার বাজারের ধসে।
আরও পড়ুন: অলকা, Big Brother Is Watching You
সাংবাদিকের প্রশ্ন শুনে অবশ্য ড্যানিয়েলা উত্তর দেন নিরুত্তাপ কণ্ঠে। মনে করিয়ে দেন আগের প্রজন্মের বাবা-মায়েদের কথা। যাঁরা কম্পিউটার, ইন্টারনেটের আবিষ্কার দেখেছেন। মোবাইল, টিভি যাঁদের চোখের সামনে ধীরে ধীরে ঘরের সদস্য হয়ে উঠেছে। তাঁরাও একই ভয়ে ছিলেন। সন্তানের ক্ষতি হবে না তো?
ক্ষতি যে হয়নি তা নয়। কম্পিউটার আসার পর অনেকেই বাতিল হয়ে গিয়েছেন উইন্ডোজের পুরোনো ভার্শনের মতো। তাঁদের খুঁজে নিতে হয়েছে বিকল্প কর্মক্ষেত্র। আবার এও সত্যি, সেদিনের কম্পিউটার, ইন্টারনেটই আজ তৈরি করেছে বিকল্প কাজের সুযোগ। এই দুটি ছাড়া এখন প্রায় কোনও কাজ হয় না। মোবাইল, টিভিও সুযোগ করে দিয়েছে কন্টেন্ট ক্রিয়েশন ও বিনোদনসহ নানা কাজের।

অ্যান্থ্রোপিকের মালকিনের যুক্তি, ‘এআই যদি ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য সুস্বাস্থ্য, সুশিক্ষার ব্যবস্থা করে, তাহলে বাবা-মা হয়ে কি আমরা সেটা চাইব না?’ একই সঙ্গে তাঁর স্বীকারোক্তি, ‘এআই-এর নেতিবাচক দিক রয়েছে। সেগুলো যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলাও এআই সংস্থাগুলিরই দায়িত্ব।’
সত্যি বলতে, এআই আরও উন্নত হলে কতটা দ্রুত বাজার দখল করবে, কেউ জানে না। ঠিক যেমন কেউ জানে না, সাধারণ মানুষ তথা নিচুতলার কর্মীদের চাকরি থাকবে না যাবে; কোন কোন সেক্টর সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়বে। জানেন না, তাবড় তাবড় স্টক কাঁপানো ড্যানিয়েলাও। তবে, বাজার অর্থনীতিতে যে বড়সড় প্রভাব পড়বে, সে বিষয়ে সবাই নিশ্চিত।
লাফবরো বিশ্ববিদ্যালয়ও নভেম্বরে তৈরি করেছে প্রায় একই ধরনের ‘ট্রান্সনিউরোন’, যা নির্দিষ্ট কিছু ভাবনাচিন্তা করতে সক্ষম।
ড্যানিয়েলা অ্যামোদেইয়ের প্রশ্ন আমাদের ঠেলে দেয় আরেক অবশ্যসম্ভাবী প্রশ্নের দিকে। তা হল, এআই কি মানুষের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে? হলেও কতটাই বা?
অনেকে বলছেন, মানুষের মতো করে ভাবতে পারা এআইয়ের কম্ম নয়। শরীর, মন, আবেগ ও বুদ্ধি মিলিয়ে মানুষের নির্মাণ। ফলে এআই যতই উন্নত হোক, মানুষের বিকল্প হয়ে ওঠা মুশকিল। আবার অনেকের মতে, এআই ভবিষ্যতে ভয়ঙ্কর ঝড় তুলবে। প্রথমে বর্তমান পরিস্থিতি দিয়ে মেপে নেওয়া যাক, কোন তরফে পাল্লা ভারী।
তোমার মন নেই AI?
বেশ কিছু সাম্প্রতিক গবেষণার কথা তুলে ধরা যাক। গত অক্টোবরে ইউএসসি ভিটারবি স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিং-এর গবেষকরা তৈরি করেছেন আর্টিফিশিয়াল নিউরোন। হিউম্যান ব্রেনের কিছু কাজ এই নিউরোন হুবহু নকল করতে পারে। লাফবরো বিশ্ববিদ্যালয়ও নভেম্বরে তৈরি করেছে প্রায় একই ধরনের ‘ট্রান্সনিউরোন’, যা নির্দিষ্ট কিছু ভাবনাচিন্তা করতে সক্ষম।

নিউরোন তো ব্রেনের অংশ। তাই দিয়ে কি মন আর আবেগ তৈরি করা সম্ভব? মনোবিজ্ঞানসহ অন্যান্য তাত্ত্বিক বিষয় মনের নানা সংজ্ঞা দিয়ে থাকে। তবে নিউরোসায়েন্স বলছে, মন হল মস্তিষ্কের শারীরবৃত্তীয় নানা কার্যকলাপের ফল; সেখানে বিভিন্ন নিউরোহরমোন ও নিউরোট্রান্সমিটারেরও ভূমিকা রয়েছে।
জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটি আর কর্টিক্যাল ল্যাব যৌথভাবে সিলিকন চিপের মধ্যে ‘চাষ’ করছে হিউম্যান ব্রেন সেল। অরগানয়েড ইনটেলিজেন্স অর্থাৎ প্রাণসহ বুদ্ধিমত্তা তৈরি করাই তাঁদের লক্ষ্য।
অর্থাৎ, ল্যাবে নিউরোন, নিউরোহরমোন আর নিউরোট্রান্সমিটার বানিয়ে ফেলতে পারলে প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ কাজ হয়ে যায়। বাকি কাজ, এদের ভিতর নানা জটিল সংযোগ বা কানেকশন তৈরি করা। মানুষের ব্রেনে এই সবকটি জিনিস বিশেষভাবে একে অপরের হাত ধরে রয়েছে। তাই দুঃখ হলে কান্না আসে, আনন্দ হলে বা মজা পেলে হাসি, বিপদে পড়লে হাত-পা কাঁপানো দুশ্চিন্তা। সেভাবেই এদের জুড়তে হবে কৃত্রিম ব্রেনের ভিতরে। (Human Future)
কাজটা আপাতভাবে কঠিন মনে হলেও বিজ্ঞানীরা মোটেই থেমে নেই। ব্রেনের ১৩০০টি ‘সাব-রিজিয়ন’ শনাক্ত করে ফেলেছে অ্যালেন ইনস্টিটিউট অব ব্রেন সায়েন্স। কীভাবে মস্তিষ্কের এক কোটি কোশ নিজেদের মধ্যে ‘কথা’ বলে, সেই ‘ম্যাপিং’ করতে সাহায্য করবে সাব-রিজিয়নগুলো। জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটি আর কর্টিক্যাল ল্যাব যৌথভাবে সিলিকন চিপের মধ্যে ‘চাষ’ করছে হিউম্যান ব্রেন সেল। অরগানয়েড ইনটেলিজেন্স অর্থাৎ প্রাণসহ বুদ্ধিমত্তা তৈরি করাই তাঁদের লক্ষ্য। (Human Future)

সাধারণ এআই-কে শেখানো কাজের বাইরে কিছু করতে বললে, থম মেরে যায়। এমআইটি-র গবেষকরা তাই মনের আদলেই তৈরি করছেন লিকুইড নিউরাল নেটওয়ার্ক (LNN)। মন তো আদতে লিকুইড বা তরলের মতোই। যে ‘পাত্রে’ রাখা হচ্ছে সেই পাত্রের আকার বুঝে ‘প্রতিক্রিয়া’ জানায়। LNN ঠিক তা-ই। সম্প্রতি খুব ছোট একটি LNN মডেল বানিয়ে, তা দিয়ে জঙ্গলের ভিতর ড্রোন ওড়াতে সফল হয়েছেন গবেষকরা। মডেলটি নিজেই গাছপালা, পাহাড় দেখেশুনে, কোথাও ধাক্কা না খেয়ে ড্রোন উড়িয়েছে! আলাদা করে শিখিয়ে দিতে হয়নি। (Human Future)
আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অনেক কঠিন কাজ করে দিলেও, এখনও তার মানুষের সাহায্য লাগে। কারণ ভুলগুলো শুধরে নিতে হয়। কিন্তু, ভুল তো শিশুদেরই হয়, বড়রা শুধরে দেয়। প্রাপ্তবয়স্ক হলে তো সন্তান তার বাবা-মায়ের মতোই সব কাজ করতে পারে, তাই না? (Human Future)
AGI-কে আপাতত কল্পবিজ্ঞান বা Science Fiction হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে বহু গবেষক সাই-ফাই(Sci-fi)-কে সত্যি করতে উঠে পড়ে লেগেছেন। ঠিক যেভাবে জুল ভার্ন, আইজ্যাক আসিমভের গল্প ধীরে ধীরে সত্যি হয়ে উঠেছে।
পৃথিবীর নানা প্রান্তে গবেষণা যে গতিতে (গাণিতিক পরিভাষায় যাকে খানিকটা Exponential growth বলা যেতে পারে) এগোচ্ছে, তাতে আগামী ৫-১০ বছরে মানুষের এআই-সন্তান বেশ ‘বড়’ হয়ে উঠবে।
তাছাড়া, ধীরে ধীরে গুরুত্ব বাড়ছে আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইনটেলিজেন্স বা AGI-এর। AGI-কে আপাতত কল্পবিজ্ঞান বা Science Fiction হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে বহু গবেষক সাই-ফাই(Sci-fi)-কে সত্যি করতে উঠে পড়ে লেগেছেন। ঠিক যেভাবে জুল ভার্ন, আইজ্যাক আসিমভের গল্প ধীরে ধীরে সত্যি হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে এআই মানুষের বিকল্প হয়ে উঠবে না— এমন দাবি বেশ কষ্টকল্পনা।

AI আসার পর?
এখানেই আদতে কাহিনির শুরু। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মানুষের বিকল্প হয়ে উঠলে ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে অর্থনীতিতে। বদলটা ভালও হতে পারে, আবার খারাপও। ভাল বদলটা প্রথমে বলা যাক।
বিভিন্ন জিনিসপত্র ও পরিষেবার দাম কমবে। ফলে, মানুষের সংসার খরচও কমতে পারে। সবরকম পরিষেবাই আগের তুলনায় দ্রুত পাওয়া যাবে। কাজের নিরিখ কী সুবিধা হবে? সৃজনশীল দক্ষতা বেশি গুরুত্ব পাবে। অর্থাৎ যে নতুন বা আলাদা কিছু ভাবতে পারে, তৈরি করতে পারে; তার গুরুত্ব বাড়বে।
এআই জলজ্যান্ত মানুষ বা ‘প্রায়’মানব হয়ে উঠলে পরিস্থিতি হতে পারে বেশ ভয়াবহ। কারণ বিকল্প কর্মক্ষেত্র অনেকটাই কমে যেতে পারে। নিচুতলার কর্মীরা বেশি সমস্যায় পড়বে।
ড্যানিয়েলা যেমন বলছিলেন, মানুষের সফট স্কিলগুলোই এখন আরও বেশি জরুরি হয়ে উঠবে কর্মক্ষেত্রে। হিউম্যানিটির বিষয় যেমন বাংলা, ইংরেজি, সমাজবিদ্যা ইত্যাদি নিয়ে পড়াশোনার গুরুত্ব নাকি বাড়বে। আশ্চর্য মনে হলেও এটা সত্যি, ‘ক্লড কোওয়ার্ক’-এর আবিষ্কর্তা নিজেও সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেছেন কলেজে। এছাড়া, আধ্যাত্মিক ও বিনোদন ক্ষেত্র আরও বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ এনে দেবে। কিন্তু, প্রশ্ন অন্যত্র। যে পরিমাণে ছাঁটাই হওয়ার আশঙ্কা, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কি কর্মসংস্থান হবে? (Human Future)
খারাপ প্রভাব শুরু এখান থেকেই। এআই জলজ্যান্ত মানুষ বা ‘প্রায়’মানব হয়ে উঠলে পরিস্থিতি হতে পারে বেশ ভয়াবহ। কারণ বিকল্প কর্মক্ষেত্র অনেকটাই কমে যেতে পারে। নিচুতলার কর্মীরা বেশি সমস্যায় পড়বে। ভারতের মতো শ্রমবহুল দেশ কীভাবে সেই পরিস্থিতি সামাল দেবে? (Human Future)

আন্দ্রে গোর্জ ও অন্য কয়েকজন তাত্ত্বিক তুলে ধরছেন ‘পোস্ট-ওয়ার্ক সোসাইটি’-র কথা। অর্থাৎ সমাজে আর কেউ কাজ করবে না। সব কাজ বা অন্তত ৮০-৯০ শতাংশ কাজ যন্ত্র করবে। কাজ না করলে মানুষ আয় করবে কীভাবে? খাবেই বা কী? তাত্ত্বিকদের যুক্তি, সরকার তার রাজস্ব থেকে সবাইকে একটা নির্দিষ্ট অর্থ দেবে। অর্থনীতির পরিভাষায় যা, ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম (UBI)। (Human Future)
বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের মহিলারা ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ পান, বয়স্করা বার্ধক্য ভাতা পান; কদিন পর থেকে শুরু হবে ‘যুবসাথী’। ইউবিআই অনেকটা তেমন কাঠামো। অঙ্কটা হয়তো ১৫০০ টাকার মতো কম হবে না, তবে ১৫ লক্ষ আশা করাও ভুল! (Human Future)
এআই কতটা ব্যবহার হবে আর কতটা নয়, তা সমস্ত দেশকেই একসঙ্গে ঠিক করতে হবে। অর্থাৎ রাষ্ট্রসংঘকে নামতে হবে মাঠে। কিন্তু রাষ্ট্রসংঘ মানেও গেরো।
সাধারণত উৎপাদন আর আর্থিক ক্ষমতা যাঁদের হাতে, তাঁরাই অর্থনীতির বড় অংশের নিয়ন্ত্রক। ধরা যাক, পৃথিবীর ৮০-৯০ শতাংশ মানুষ এআইয়ের জন্য কাজ হারিয়েছেন। বাকিরা হয় অভিজাত শ্রেণি, নয় সরকারপক্ষ, অথবা গবেষণা, বিনোদন বা আধ্যাত্মিক কাজের সঙ্গে যুক্ত। তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যাক, মন্দার বাজারেও তাদের কাজ থাকবে। (Human Future)
এই ৯০ শতাংশ মানুষের পেট চালানোর টাকা সরকার জোগাড় করবে ওই ১০ শতাংশের উপর কর বসিয়ে। গোটা পৃথিবীর জনসংখ্যা পাল্লা দিয়ে বাড়ছে, অর্থাৎ বিপুল পরিমাণ কর। সেই কর তাঁরা দিতে সম্মত হবেন? বরং, সরকারকে তুষ্ট রাখতে পারলে এই কর ফাঁকি দেওয়া বেশ সহজ। যা অনেকেই করে থাকেন। ভবিষ্যতে আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা। ফলে UBI দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হবে, এমনটা বলা যায় না। (Human Future)

এই পরিস্থিতি হয়তো কিছুটা ঠেকাতে পারে আন্তর্জাতিক স্তরে এআই সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন। এআই কতটা ব্যবহার হবে আর কতটা নয়, তা সমস্ত দেশকেই একসঙ্গে ঠিক করতে হবে। অর্থাৎ রাষ্ট্রসংঘকে নামতে হবে মাঠে। কিন্তু রাষ্ট্রসংঘ মানেও গেরো। কোনও দেশ চাইলেই জলবায়ু চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়। কোনও সরকার আবার রাষ্ট্রসংঘকে লবডঙ্কা দেখিয়ে নিজের দেশে একুশে আইন চালায়। কোনও কোনও দেশ আবার ঢালাও সন্ত্রাস করে, সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে বিশেষ সম্মেলনে মৈত্রীর ভাষণ দেয়। ফলে, আন্তর্জাতিক আইন বহু দেশই অমান্য করতে পারে। তবুও মন্দের ভাল এই যে, আইন প্রাথমিক সুরক্ষা দেয়। (Human Future)
এআই বা এজিআই আদতে সমস্যা নয়। সমস্যা হল তার নিয়ন্ত্রণ কাদের হাতে, সেটা নিয়ে। সরকার ও শিল্পপতিই যদি শেষ কথা বলে, তাহলে মুশকিল। গণতন্ত্রে জনগণ সরকারকে কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তারপরেও জনতাকে ‘ছেলে ভুলিয়ে’ চুপ রাখা সরকারের পক্ষে খুব কঠিন কাজ? ইতিহাস ও বর্তমান কিন্তু তেমনটা বলে না। (Human Future)
বিজ্ঞানীরা সৃষ্টির আনন্দে নানা জিনিস আবিষ্কার করে চলেন। যেমন অ্যাটম বোম করেছিলেন বা বিভিন্ন যুদ্ধাস্ত্র, রাসায়নিক বোমা করে চলেছেন।
প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানকে ঠেকানো কঠিন। ঠেকানো উচিত কি না, সেটাও গভীর আলোচনার প্রশ্ন। বিজ্ঞানীরা সৃষ্টির আনন্দে নানা জিনিস আবিষ্কার করে চলেন। যেমন অ্যাটম বোম করেছিলেন বা বিভিন্ন যুদ্ধাস্ত্র, রাসায়নিক বোমা করে চলেছেন। সব গবেষণাতেই বিপুল পরিমাণে কর্পোরেট ও সরকারি বিনিয়োগ থাকে। অর্থাৎ বিজ্ঞানীরাও এক অর্থে শ্রমিক। কারণ, কর্পোরেট পরিভাষায় রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (R&D) সরকার ও শিল্পপতি শ্রেণির হাতে। (Human Future)
সাধারণ মানুষের ভ্রান্তি যেখানে
সরকার ও শিল্পপতিদের নিন্দা করা এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। ক্যাপিটালিজমকে প্রায়ই ‘উস্কানি’ দিয়ে থাকে কনজিউমারিজম। অর্থাৎ আনন্দে-ফুর্তিতে থাকতে যত ইচ্ছে, যা ইচ্ছে জিনিস কেনার নেশা। অপ্রয়োজনীয় জিনিসই সেই তালিকায় বেশি থাকে। বর্তমানে এই প্রবণতা প্রায় সকলের। (Human Future)
আরও পড়ুন: সোশ্যাল মিডিয়ায় দোকানপাট
যে জিনিস মানুষ গ্রহণই করবে না, সেই জিনিসের বাজার তৈরি হওয়া মুশকিল। কিন্তু যেটি গ্রহণ করছে, তার বাজার তৈরি হবেই। মানুষকে দিয়ে কোনও জিনিস গ্রহণ করানোর সহজ পথ, জিনিসটি সস্তা করে দেওয়া। ‘স্পেশাল ডিসকাউন্ট’, ‘লিমিটেড অফার’, ‘বাই ওয়ান গেট টু’-র মতো যত মত তত পথ-এ। পকেটের রেস্ত কম বলে, সস্তার নেশায় মানুষ আজও ভোলে। কিন্তু সেই নেশার ফাঁক গলে ঢুকে পড়ে কনজিউমারিজম। (Human Future)
একটা সহজ উদাহরণ দেওয়া যাক? ১০ বছর আগে ভারতে একটি বিশেষ সংস্থা ফ্রি ডেটার সুযোগ নিয়ে এসেছিল। কাতারে কাতারে মানুষ আকৃষ্ট হলেন। তাঁদের অনেকেই আগে খুব অল্প টাকার রিচার্জ করতেন, বেশিরভাগ সময় অন্যের ওয়াইফাই দিয়ে কাজ চালাতেন, মিনিট গুণে কথা বলতেন। কয়েকদিন পর সংস্থাটি পরিষেবার জন্য অল্প কিছু মূল্য ধার্য করল। মানুষ দিতে রাজি হল। কিন্তু, ১-২ জিবি ফ্রি ডেটা কি সত্যিই তখন সবার দরকার ছিল না আজও আছে? দিনের শেষে সবারই ডেটা ফুরিয়ে যেত না যায়? ‘অতিরিক্ত নাও, দামও দাও’-এর অভ্যাসই নেশা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, যা কাটানো বেশ কঠিন। (Human Future)
পেটে ছুরি মারতে পারে এমন ‘মানুষকে’ কতটা জড়িয়ে ধরা যায়, তা সাধারণ মানুষকেই ঠিক করতে হবে। শেষ মুহূর্তে নয়, যথেষ্ট আগে থেকে।
সাধারণ শ্রেণির মানুষের সংখ্যা বরাবরই বেশি। এতটাই বেশি যে, সেই সময় টেলিকম বাজারে বড়সড় প্রভাব পড়ল। বহু ছোট সংস্থা ব্যবসা গুটিয়ে ফেলল। ব্যবসা বাঁচাতে বড় সংস্থাগুলি একই প্ল্যান নিয়ে এল। অল্প সংখ্যক মানুষ এই সস্তা ডেটার বিরোধী ছিল। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতি তাদেরও বাধ্য করল মাসভিত্তিক প্যাকেজ রিচার্জ করাতে। (Human Future)
আজ সেই প্ল্যানগুলি অনেকটাই দামি। বিকল্প পরিষেবা যারা দিতে পারত, তাদের কাছে আর ফিরে যাওয়ার পথ নেই। বাজার থেকে তাদের হঠিয়ে দিয়েছে সাধারণ মানুষেরই অতিরিক্ত ও সস্তায় পাওয়ার নেশা। এআই জিনিস সস্তা করার নামে এভাবেই মরণ-আলিঙ্গন করতে পারে। পেটে ছুরি মারতে পারে এমন ‘মানুষকে’ কতটা জড়িয়ে ধরা যায়, তা সাধারণ মানুষকেই ঠিক করতে হবে। শেষ মুহূর্তে নয়, যথেষ্ট আগে থেকে। (Human Future)
সাধারণ মানুষের স্বার্থ ভাবতে হলে তারও আগে অবশ্য দরকার লড়াইয়ের অভিমুখটি বুঝে নেওয়া। লড়াইটি আদৌ এআইয়ের বিরুদ্ধে মানুষের, না মানুষের বিরুদ্ধেই মানুষের?
ভবিষ্যতে এআইয়ের অসীম ক্ষমতা হতেও পারে, না-ও হতে পারে। কিন্তু অর্থনীতির ভারসাম্য ধরে রাখতে এআইয়ের ব্যবহার সীমিত করা দরকার। অথবা দরকার অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধীরে ধীরে এআই-নির্ভর হয়ে ওঠা। সাধারণ মানুষের স্বার্থ ভাবতে হলে তারও আগে অবশ্য দরকার লড়াইয়ের অভিমুখটি বুঝে নেওয়া। লড়াইটি আদৌ এআইয়ের বিরুদ্ধে মানুষের, না মানুষের বিরুদ্ধেই মানুষের? প্রকৃত প্রতিপক্ষ চেনাটাও কিন্তু জরুরি। (Human Future)
তথ্যসূত্র: Anthropic co-founder Daniela Amodei’s Interview, reuters.com, viterbischool.usc.edu, lboro.ac.uk, publichealth.jhu.edu, news.mit.edu, ibm.com, basicincome.stanford.edu, dictionary.cambridge.org, bbc.com/future, alleninstitute.org, autonomy.work, postneoliberalism.org
ডিজিটাল ও মুদ্রিত মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
বইয়ের প্রতি অগাধ ভালবাসা। প্রিয় ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও প্রিয় বিষয় বাংলার আঞ্চলিক সংস্কৃতি। সাধারণ নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষদের জীবনধারা হয়ে উঠেছে আগ্রহের কেন্দ্র। হিন্দুস্থান টাইমস বাংলা ও এবিপি আনন্দে জীবনযাপন ও স্বাস্থ্য বিভাগের সাংবাদিক ছিলেন। পড়াশোনা অর্থনীতি নিয়ে।
