(Kasauli)
সময় সকাল আটটা। কুয়াশার কম্বল সরিয়ে, জেগে উঠছে শিবালিক হিমালয়। কালকা-শিমলা পথের টয়ট্রেন আমাকে ‘ধরমপুর হিমাচল’ স্টেশনে নামিয়ে ‘টংলিং টংলিং’ শব্দে চলল সিমলার পথে। আর আমি স্টেশনের সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে একটা গাড়ি ধরলাম কসৌলির উদ্দেশে।

কসৌলি, হিমাচল প্রদেশের দক্ষিণে সোলান জেলার একটি ছোট্ট শান্ত শহর। চণ্ডীগড় থেকে গাড়িতে ঘণ্টা তিনেকের পথ। তবে, টয়ট্রেন চড়ার মজাই আলাদা, তাই কালকা হয়েই এলাম। পাহাড়ি পথে এঁকেবেঁকে চলে, গাড়ি এসে পৌঁছোল কসৌলির সরকারি নিবাস “হোটেল রস কমন্স”-এর সামনে। মালপত্র ঘরে রেখে বারান্দায় এলাম প্রাতরাশ সারতে। কসৌলির সেরা ‘ভিউ পয়েন্ট’ এই সরকারি হোটেলের বাগানটি। অন্যান্য হোটেলের অতিথিরাও পাহাড় দেখতে চলে আসেন এই বাগানে।

প্রাতরাশ সেরে হাঁটতে বেরোলাম। কসৌলি সম্পর্কে বলা যায়, এক সম্ভ্রান্ত ষাটোর্ধ্ব মেমসাহেব। তবু তিনি তাপসী নন। যৌবনের উচ্ছ্বল দিনও বহুবিগত। বয়সের সময়োচিত ছাপ তাঁকে ভারাক্রান্ত করেনি, বরং তিনি হয়েছেন স্নিগ্ধা।
একসময় বহু ব্রিটিশ অফিসারেরা বাংলো, গীর্জা, বাজার গড়ে শহরটাকে সাজিয়ে তুলেছিলেন। কিন্তু ব্রিটিশ সভ্যতার পথ দিয়েও বয়ে গেছে কাল। আর সময়ের স্রোতে কসৌলির রমরমাও “গন উইথ দ্য উইন্ড”। কিন্তু শহরটির আভিজাত্য আজও প্রমাণ করে তার সৌম্য কৌলীন্য। (Kasauli)

আমি প্রথমে এলাম কসৌলি তিব্বতী বাজারে। সাহেব আমলে গড়ে ওঠা এই বাজারে, আজও রয়েছে পুরোনো দিনের ছাপ। পাথরের বাঁধানো রাস্তার দু’ধারে দোকান, মূলত নানান রঙের শীতের কাপড়ের। সঙ্গে খাবারের দোকান, মনিহারীর পসরা, সবই আছে। মালিকানা বদলেছে, কিন্তু ‘এস্থেটিক্স’ নয়। বাজারটি কলেবরে বেড়েছে। তবে বর্ধিত অংশও কিন্তু পুরোনো ধাঁচে তৈরি, পাথুরে। ঠিক করলাম, দুপুরের খাওয়াটা এখানেই সেরে নেব। সেই মতো একটা দোকানে ঢুকে হিমাচলী কায়দায় রাঁধা দেশি মুরগি কষা, বেশ তৃপ্তি করেই খাওয়া গেল। (Kasauli)

খাওয়া শেষে গেলাম কসৌলি তিব্বতী বাজারের সামনে সেন্ট মেরি গীর্জায়। ১৮৫৩ সালে নির্মিত এই গীর্জাটি আয়তনে হিমাচল প্রদেশের সবথেকে বড় খ্রীষ্ট-ধর্মস্থান। মাটিরঙা স্থাপত্যের সঙ্গে লাগোয়া সমাধিক্ষেত্র। মনে হল, নিজেদের হাতে গড়া এই গীর্জার বাগানই তাঁদের শেষ মাটি। (Kasauli)
ব্রহ্ম মুহূর্ত, সামনে হিমালয়ের উদাত্ত প্রকৃতির রূপ, অপূর্ব ভৈরবী সুর আর সামনে ধৌলাধার ও গ্রেট হিমালয়ান রেঞ্জের উপর উষসী আলো- গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।
আলাপ হল গীর্জার ফাদারের সঙ্গে। আমাকে আপ্যায়ন করে ভিতরে নিয়ে গেলেন। অন্দরসজ্জাতেই ছিল আসল চমক- অনন্য গ্লাস পেন্টিং। সেই কাচের রঙের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করেছে রবি-কিরণ। গীর্জার ভিতর সৃষ্টি হয়েছে এক অবিমিশ্র রঙের সমাহার। আর সেই রঙের মধ্য দিয়ে দু’বাহু প্রসারিত যিশুমূর্তিকে মনে হচ্ছে মহাকাল।‘বিশ্বরূপ দর্শন’ অন্তে গীর্জা থেকে বেরিয়ে চলতে শুরু করলাম পাহাড়ি পথে। সামনে ধ্যানচাঁদের মূর্তি। হকি-র জাদুকরের এত জীবন্ত মূর্তি আর কোথাও আছে কিনা, আমার জানা নেই। মূর্তিটি পার হয়ে কিছুদূর এগিয়ে অফিসার্স ক্লাব। জন্মলগ্নে ছিল গোরা অফিসারদের। বর্তমানে দেশীয় আর্মি অফিসাররাই এ ক্লাবের সভ্য হন। এই ক্লাবের অদূরে বাস, সাহিত্যিক খুশবন্ত সিং-এর।

কসৌলির কয়েকটি নয়নাভিরাম ‘নেচার ট্রেল’ বা প্রকৃতির মধ্য দিয়ে হাঁটা পথ আছে। তার মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় ‘গিলবার্ট ট্রেল’। অফিসার্স ক্লাব থেকে মূল রাস্তা ধরে কিছুদূর এগোনোর পর একটি রাস্তা চলে যায় সবুজ বনানীর পাশ ধরে। সেই পথে এগিয়েই দেখি বহু নাম না জানা ফুল ও অচেনা পাখির রং গোটা পথটিকে রঙিন করে রেখেছে। (Kasauli)
আরও কিছুদূর এগিয়ে সানসেট পয়েন্ট। সেখানে কিছু পর্যটকদের ভিড় দেখে আর দাঁড়ালাম না। বরং মূল রাস্তা ধরে আরও কিছুদূর এগিয়ে পৌঁছোলাম মাঙ্কি পয়েন্ট। (Kasauli)

মাঙ্কি পয়েন্ট আবার মতান্তরে ‘মন কী পয়েন্ট’ নামেও পরিচিত। এমন সুরম্য ও নিভৃত স্থানেই তো মন দেওয়া নেওয়া হয়। একদম ধারে এসে লক্ষ্য করলাম, আমি একটি পাহাড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে। সামনে ছোট ছোট পাহাড় আরও আগে বিস্তৃত উপত্যকা। দূরে চণ্ডীগড় শহর। আর সমস্ত আকাশ জুড়ে অস্তগামী সূর্যের রঙের মেলা। গোটা পৃথিবীটাকেই মনে হচ্ছে মায়াপুরী। মনে মনে বললাম, “এই হল ক্লাইম্যাক্স। কসৌলির সব থেকে সুন্দর জায়গা মাঙ্কি পয়েন্ট।”সাহিত্যিক অনিতা দেশাইয়ের উপন্যাস “ফায়ার অন দ্য মাউন্টেন”-এর চূড়ান্ত মুহূর্তও এই মাঙ্কি পয়েন্টে। অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। সন্ধ্যাতারার আলোয় পথ দেখে ফিরে এলাম হোটেলে। (Kasauli)
সন্ধ্যেবেলায় বসেছিলাম কসৌলি তিব্বতী বাজারের “হ্যাংআউট ক্যাফে”তে। প্রথম দর্শনেই মন কেড়ে নিয়েছিল ক্যাফেটি।ভিতরে বসে মনে হল যেন এক টুকরো ইউরোপ। আলো, গ্রাফিতি, চেয়ার টেবিলের ধরন, আবহ সঙ্গীত সবেতেই পাশ্চাত্যের ছোঁয়া।
পরদিন ভোর বেলায় উঠে হোটেলের বাগানে বসলাম চা নিয়ে। সামনে উন্মুক্ত প্রকৃতি। সবে অন্ধকারের চাদর সরছে হিমালয়ের থেকে। হঠাৎ কানে এল সুর। স্থানীয় এক ভদ্রলোক বাগানের এক চেয়ারে বসে আলাপ ধরেছেন রাগ ভৈরবীতে। বন্দিশটি পরিচিত- শ্রীকৃষ্ণ রতনজনকরের “ভবানী দয়ানী মধুবাক্যবাণী”। ব্রহ্ম মুহূর্ত, সামনে হিমালয়ের উদাত্ত প্রকৃতির রূপ, অপূর্ব ভৈরবী সুর আর সামনে ধৌলাধার ও গ্রেট হিমালয়ান রেঞ্জের উপর উষসী আলো- গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।
আরও পড়ুন: রঞ্জু ভ্যালি, এক মনভোলানো অচিনগাঁও – প্রথম পর্ব
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জলখাবার খেয়ে হাঁটতে বেরোলাম। আজ ঢালু পথে পাহাড়ের গা বেয়ে নামা। পথের দু-ধারে বাংলো। ব্রিটিশ ছাপ প্রবল। এইগুলিই ছিল ব্রিটিশ আমলের ‘অফিসার্স বাংলো’। ক্ষমতা হস্তান্তরের পর এখন পাঞ্জাবীদের দখলে। একটি বাংলোর নামফলকে দেখি লেখা আছে “জটায়ু”। বিষয়টি “কাল্টিভেট” করার জন্য বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর বাড়ির মালিকের সঙ্গে দেখা হল। আসলে তিনি শ্যেন বিহঙ্গের ভক্ত। তাই এই নামকরণ। (Kasauli)

আরও কিছুদূর যাওয়ার পর দেখি মোহন মিকিনের ব্রিউয়ারি। বিখ্যাত রাম ‘ওল্ড মঙ্ক’-এ ব্যবহৃত স্পিরিট প্রস্তুত হয় এই কারখানাতেই। ফেরার পথে একটি সাঁই মন্দিরের পূজারীর সঙ্গে আলাপ হল। দুপুরে ভোগও খাওয়ালেন তিনি।
সন্ধ্যেবেলায় বসেছিলাম কসৌলি তিব্বতী বাজারের “হ্যাংআউট ক্যাফে”তে। প্রথম দর্শনেই মন কেড়ে নিয়েছিল ক্যাফেটি।
আরও পড়ুন: রঞ্জু ভ্যালি, এক মনভোলানো অচিনগাঁও – দ্বিতীয় পর্ব
ভিতরে বসে মনে হল যেন এক টুকরো ইউরোপ। আলো, গ্রাফিতি, চেয়ার টেবিলের ধরন, আবহ সঙ্গীত সবেতেই পাশ্চাত্যের ছোঁয়া। কফি সহযোগে সুন্দর কিছু সময় যাপন করে রাতে হোটেলে ফিরে এলাম। কসৌলিতে সেটিই ছিল শেষ রজনী। মন-কাড়া কসৌলির পথ দিয়ে যখন হোটেলের দিকে চলছি, একটি হিমাচলি বাচ্চা পথে নিজের খেয়ালে একটি পাহাড়ি লোকগান গাইছে, আর দূরে পাহাড়ের উপর রুপোলি সুধা ঢালছে পূর্ণিমার চাঁদ। (Kasauli)
কীভাবে যাবেন: দিল্লী, চণ্ডীগড়, কালকা থেকে সিমলাগামী যে কোনও বাসে ধরমপুর হিমাচল স্টেশনের পাশে নামতে পারেন। অথবা কালকা-সিমলা টয়ট্রেনে চেপে ধরমপুর হিমাচল স্টেশন। তারপর স্থানীয় গাড়ি। (Kasauli)
কোথায় থাকবেন: হিমাচল ট্যুরিজমের (এইচ পি টি ডি সি) হোটেল রস কমন্স। এছাড়াও কিছু প্রাইভেট হোটেল আছে।
ছবি সৌজন্য: লেখক
পেশায় তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, নেশা বই-বেড়ানো-ছবি-ক্রিকেট। তবে আড্ডার অছিলায় বাকি সব কাজ শিকেয় তুলে রাখাই পছন্দ। প্রবল গেঁজুড়ে। ভালো লিকার চা সঙ্গে থাকলে আর কথা নেই। মাঝেমধ্যেই কীবোর্ড থেকে অবাধ্য আঙুল সফটওয়্যার আর্কিটেকচার অথবা এক্সেল শিট থেকে Alt + Tab মেরে চলে যায় লেখার পাতায়।
