(Lunar Mission)
মনের কোণে একটা চাপা কষ্ট, মাঝে মাঝে তাই বিনা কারণেই বিরক্ত হয়ে পড়তাম। আবার কখনও কখনও, ওড়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা বাসি গ্যাস বেলুনের মতো মেঝের কাছে ঝুলে থাকতাম। তবু, এই অবস্থার যে কোনও সুরাহা নেই, সেই সত্যটা মেনে নিতে বেশ কয়েক বছর লেগে গেল। অবশেষে মানতেই হল, অনেক দেরি হয়ে গেছে, আর কোনও উপায় নেই। চাঁদে যাওয়া আমার আর হবে না!
যখন ওরা সবে চাঁদমামার চৌহদ্দিতে ঘুরপাক খেতে আরম্ভ করেছে, তখনও আমি ইস্কুলের গণ্ডি পেরোইনি। সে বয়সে যা শুনতাম, তাই বিশ্বাস করতাম। অবশ্য আজকাল তা আর করি না। এই হল অভিজ্ঞতা বাড়বার খেসারত। তখন বিশ্বাস করতাম, অদূর ভবিষ্যতে একদিন যে কেউ ক্যাপসুলে চড়ে চাঁদের চারপাশে ক’বার ঘুরে, ‘হু, হা, ওহ্ বাবাঃ…’ করে, ওখানে না থেকে, এই পৃথিবীর পুরনো ঠিকানায় ফিরে আসবে। চিড়িয়াখানা যাওয়ার মতো।
আরও পড়ুন: অংবংচং: বাঙালি কি ভাষার কল্পনা হারাচ্ছে?
স্বপ্ন দেখতাম, একদিন কাগজের পাতায়, ল্যাম্পপোস্টের গায়ে কুণ্ডু স্পেশালের বিজ্ঞাপন থাকবে, ‘এবার পুজোয় চন্দ্রযাত্রা’। কিন্তু এখন বুঝে গেছি, ওটা নিছক স্বপ্ন ছিল! আর পাঁচটা স্বপ্নের মতো ওটাও একদিন মিলিয়ে যাওয়ার জন্য জন্মেছিল।

আসলে, যে কোনও অসাধারণ ঘটনাই আমাদের স্তম্ভিত করে দেয়, তাই না? এমনকী যে কোনও অসাধারণ ঘটনার সম্ভাবনাতেই আমরা উত্তেজিত হয়ে পড়ি। এই উত্তেজনাই জীবনের রসদ যোগায়। কিন্তু এমন কোনও নিয়ম তো নেই যে, অসাধারণ বলেই সম্ভাবনাটি ঘটনা হয়ে দাঁড়াবে। বরং, কোন সম্ভাবনা শেষ পর্যন্ত ধোপে টিকবে, আর কোনটি ভেসে যাবে, সে কথা হলফ করে বলার কোনও উপায় নেই। একেবারে জ্যোতিষ! পরিষ্কার করে, প্রাঞ্জল ভাষায় অনেকগুলো ভবিষ্যৎবাণী করার পর, কোনটা যে লাগবে আর কোনটা লাগবে না, সে ভার ছেড়ে দিতে হবে ভবিতব্যের হাতে।
অসাধারণ সম্ভাবনাকে সত্যি করে তুলতে তাই নিজের কেরামতির উপরই নির্ভর করা দরকার। দুনিয়া যেমন চলছে চলুক, নিজের রোমাঞ্চ নিজেই তৈরি করে নিতে হবে। সেটা শুনে যতটা কঠিন মনে হয়, ততটা যে নয়, আমি তা অনেকবার দেখেছি।
মফঃস্বল একটা ছায়ার মতো। এর একটা আবছা অবয়ব আছে, কিন্তু কোনও স্পষ্ট সীমারেখা নেই। এ হল প্রদীপের তলার আলো আঁধারি, গোধূলি গোছের লগ্ন। না এদিক, না ওদিক।
যাঁরা বড় শহরে মানুষ হয়েছেন, তাঁরা ওই কথাটা পুরোপুরি নাও বুঝতে পারেন, কিন্তু আমি বুঝি। আমার প্রথম জীবন কেটেছে শহরতলিতে, যার আদুরে নাম মফঃস্বল। মফঃস্বল একটা ছায়ার মতো। এর একটা আবছা অবয়ব আছে, কিন্তু কোনও স্পষ্ট সীমারেখা নেই। এ হল প্রদীপের তলার আলো আঁধারি, গোধূলি গোছের লগ্ন। না এদিক, না ওদিক। শহুরে আর গ্রামীণ সংস্কৃতির মিলন হওয়ার জন্য এর চেয়ে ভাল ভৌগলিক অবস্থান আর কিছু হতে পারে না। (Lunar Mission)
কিন্তু বাস্তবে, এরা সমুদ্র সৈকতের জল আর বালির মতো পাশাপাশি থেকে যায়। তাই ব্যবধানটা বেশি চোখে পড়ে! তৈরি হয় এক বিচিত্র সমাজতত্ত্ব। এতে আমি খুবই অভিজ্ঞ, কেন না মফঃস্বলের ছেলেদের আমি ভাল করে চিনি। ছোটবেলা থেকে তারাই আমার বন্ধু। শুধু জানি তাই নয়, বুঝি যে তারা কীসে খুশি, কী তারা বুঝে উঠতে পারে না, আর কীসে তারা অবাক হয়! যেমন, একবার কলকাতা বেড়াতে গেলে সে ঘটনা তারা মাসের পর মাস, বছরের পর বছর মনে রাখে। শুধু মনে রাখে তাই নয়, ওদের মনের গভীরের মনোরম আবহাওয়াতে ঐ অভিজ্ঞতাকে জোয়ারের জলের মতো ফুলতে দেয়। পরের কয়েক বছর ধরে তারা ওই ঘটনাটাকে ওস্তাদি তারানা গাওয়ার মতো শির ফুলিয়ে হাত-পা নেড়ে বলে চলে। (Lunar Mission)

এই যেমন আমার ছোটবেলার বন্ধু হাঁদু। সে তার খ্যাতির শৃঙ্গে উঠেছিল একবার ত্রিফলা জয় করে। একদিন হাঁদুর কাকা ওকে খিদিরপুর চিড়িয়াখানায় নিয়ে গিয়েছিল, হাওড়া থেকে ট্রামে চড়ে। সেদিন এক ঢিলে দু-দুটো বাজ পাখি, চিড়িয়াখানা আর ট্রাম! মফঃস্বল দুনিয়ার কাছে দু’টোর মধ্যেই হালকা বিলিতি গন্ধ। তার উপর আবার চিড়িয়াখানায় বসে, সেই বারেই, একটা খয়েরি রঙের হাতলের ওপর গোল আইসক্রিমের বল খেয়েছিল হাঁদু। (Lunar Mission)
ওই হাতলটা এত ভাল ছিল যে, সেটিও খেয়ে ফেলেছিল! অন্য ছেলেরা যদিও হাতল খাওয়াটা ভাল চোখে দেখেনি, কিন্তু সেসব প্রসঙ্গ অগ্রাহ্য করে, হাঁদু তখন থেকেই হাওয়ার উপর দিয়ে হাঁটতে শুরু করে।
হাঁদু বলেছিল, ট্রামচালকরা সব সময়ই খুব বিমর্ষ। কোম্পানিতে যাদের শাস্তি হয়, তাদেরই ওই কাজে লাগায়। দিন নেই রাত নেই, ওরা শুধু একটা সামনের খাঁচায় দাঁড়িয়ে লোক যাওয়া-আসা দেখে
এরপর থেকে আমাদের বন্ধুদের আড্ডায় কোনও কথাই বেশিক্ষণ চলত না, যদি না সে আলোচনায় হঠাৎ একটা ট্রাম এসে পড়ত। কোনও কারণে ট্রামটা না ঢুকতে পারলে নিদেনপক্ষে ময়দান, ভিক্টোরিয়া, হাওড়া ব্রিজ, নিয়ন বাতি, বা আর কিছু না হোক একখানা দোতলা বাস নির্ঘাৎ ঢুকে পড়ত। তাই, মফঃস্বলের নোঙরটা যাদের জীবনে খুব শক্ত, ট্রাম তাদের মনে এক বহির্জাগতিক আকার নিয়েছিল। (Lunar Mission)
ট্রামের একটা অলৌকিক দিক ছিল তাদের কাছে। সে অনেক কিছু করতে পারত, এমনকী উড়তেও হয়তো পারত! ওর গায়ে অনেকগুলো জানলা, সবগুলো বন্ধ করা যায়। কিন্তু একটাও দরজা নেই, যেটা বন্ধ করা যায়! হাঁদু বলেছিল, ট্রামচালকরা সব সময়ই খুব বিমর্ষ। কোম্পানিতে যাদের শাস্তি হয়, তাদেরই ওই কাজে লাগায়। দিন নেই রাত নেই, ওরা শুধু একটা সামনের খাঁচায় দাঁড়িয়ে লোক যাওয়া-আসা দেখে, আর ট্রামটা নিজেই নিজেকে চালিয়ে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। মানুষের কোনও দরকার নেই! (Lunar Mission)
আরও পড়ুন: পশ্চিম এশিয়ার ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে- মিশন বুয়েনস এয়ার্স
ট্রামের চলন যেমন মসৃণ, দুলুনিও তেমনই ঘুমপাড়ানি। চিড়িয়াখানা থেকে ফেরার পথে হাঁদু একটা বসার জায়গা পেয়ে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিল। সেটা ওর মোটেই ভাল লাগেনি। ওর ইচ্ছা ছিল, রকেট গতির ওই ট্রামে হাতল না ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আসে। ট্রাম নিজে তো অসাধারণ চালক, তাই ওর চলা, থামা কিছুতেই কোনও হাঁচকানি নেই। রাজকীয় চাল! এমনকী ওর কোনও হর্নও নেই, শুধু একটা ঘণ্টা। সেটাও এত আস্তে বাজে যে, কোনও মন্দির বা গির্জায় বাজলে কোনও ভগবানেরই পছন্দ হত না। ট্রামের ইঞ্জিন বলে যদি কিছু থাকেও, সেটা কোনও আওয়াজ করে না। তেল মোবিলের ধোঁয়া গন্ধ কিচ্ছু ছড়ায় না! খুব সভ্য জাত। ও সবই নিজে নিজে করতে পারে, যেখানে চায় সেখানে যেতে পারে। হাঁদুর কথা শুনে আমরা বুঝে গিয়েছিলাম, ট্রামই হল মানবসভ্যতার তুঙ্গ। (Lunar Mission)

সে অনেক দশক হয়ে গেল। এতদিনে হাঁদুর ট্রামের উপর আরও অনেক প্রলেপ পড়েছে আমার মনে। অভিজ্ঞতার ঝুলিতে এখন নানা গাড়ি, বিলাসবহুল বাস, দ্রুতগামী ট্রেন, স্টিমার ইত্যাদি ঠাসা। তার মধ্যে জলজাহাজ, উড়োজাহাজও ভর্তি। তবু, হাঁদুর ট্রামের ওই রোমাঞ্চকে কেউই এখনও সিংহাসনচ্যুত করতে পারেনি। ওটা ঘিরে যে একটা আলোকচ্ছটা তৈরি হয়েছিল, তা একটুও ম্লান হয়নি। সেই কারণেই আমি এত উৎগ্রীব ছিলাম, একদিন রকেট চড়ে চাঁদে যাব। আশা ছিল, চন্দ্রযাত্রা হয়তো ট্রামযাত্রাকে টপকালেও টপকাতে পারে! কিন্তু, তা আর কিছুতেই হওয়ার নয়। (Lunar Mission)
সানফ্রাসিসকোতেও একটা ট্রাম চলে, তার ডাকনাম কেবল্ কার। দেড়শো বছর আগে, হুবহু একই জমানায় জন্ম হয়েছিল হাঁদুর ট্রাম আর এই কেবল্ কারের। এটা খটাখট শব্দে, ঢিমেতালে চলতে চলতে ঘনঘন দাঁড়িয়ে পড়ে। এর পাদানিতে দাঁড়ানোয় কোনওরকম বাধা নেই।
দুনিয়ার নানা জায়গায় কর্মজীবন কাটিয়ে এখন আমি বাসা বেঁধেছি এক অন্য শহরতলিতে— ওকল্যান্ডে। ছোট্ট উপসাগরের ওপারেই সানফ্রাসিসকো শহর। একটা পাঁচ মাইল লম্বা ব্রিজ, টানেল, পাতাল রেল আর কয়েকটা ফেরি দিয়ে আমাদের যোগাযোগ। ছোটবেলার মতোই অনেকটা। (Lunar Mission)
সানফ্রাসিসকোতেও একটা ট্রাম চলে, তার ডাকনাম কেবল্ কার। দেড়শো বছর আগে, হুবহু একই জমানায় জন্ম হয়েছিল হাঁদুর ট্রাম আর এই কেবল্ কারের। এটা খটাখট শব্দে, ঢিমেতালে চলতে চলতে ঘনঘন দাঁড়িয়ে পড়ে। এর পাদানিতে দাঁড়ানোয় কোনওরকম বাধা নেই। (Lunar Mission)

এ হল শখের পর্যটকদের স্বপ্নযান, তাই স্থানীয় ব্যবসায়ীদের প্রেমিকা। যাত্রীরা এতে চড়ে শুধু চড়বার জন্য, কোথাও যাওয়ার জন্য নয়। এটা চড়ে কেউ যদি কোথাও গিয়ে পৌঁছে যায়, সেটা উপরি পাওনা। তক্ষুনি ওইটা চড়েই তারা ফিরবার জন্যে উৎগ্রীব হয়ে ওঠে। ফলে, সাকুল্যে তাদের কোথাওই যাওয়া হয় না। সুতরাং, এমন একটা অভাবনীয় যানে চড়তে শহরে যাওয়ার জন্য উৎসুক হয়ে থাকাটা আমার পক্ষে অত্যন্ত স্বাভাবিক। কিন্তু, সে ইচ্ছা আমার একেবারেই হয়নি। কারণ আমি জানতাম ওই কেবল্ কার, হাঁদুর ট্রামের সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে একটা পিদিমও জ্বালাতে পারবে না। (Lunar Mission)
তবুও, একদিন মফঃস্বল থেকে বেরিয়ে পড়লাম বড় শহর দেখতে। ছবিতে দেখা কিছু দ্রষ্টব্য স্থানে যাওয়ার কথা ভেবেছিলাম, কিন্তু ওই কেবল্ কারের ভাবনা এড়িয়ে গিয়েছি। একদিন পাতাল রেলে চড়ে সানফ্রাসিসকো বে’র তলা দিয়ে পৌঁছলাম প্রথম স্টেশন এমবার্কেডেরোতে, শহরের কেন্দ্রে।
অস্বস্তিকে মাছি মারার মতো চাপড় দিয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম, এই বিদেশ বিভুঁইয়ে হাঁদুর ট্রামকে কিছুতেই হারতে দেওয়া যাবে না। হাঁটতে শুরু করলাম অন্যদিকে।
জলের ধারে, সুন্দর আবহাওয়া। নগরের ব্যস্ততা আর বেড়াতে আসা মানুষের উচ্ছ্বাস মিলে জায়গাটা সত্যি মনোরম। এদিক ওদিক দেখতে দেখতে হঠাৎ চোখে পড়ে গেল, আরে ওই তো! লাল, কালো আর সোনালি রঙের এক কামরার কেবল্ কার! বিগত যুগের ইন্দ্রজাল! খেলনা গাড়ি ধীর পায়ে চড়াই উৎরাই পেরিয়ে চলেছে নিজের তালে। ভেতরে কোনও লোক নেই। সবাই বাইরের পাদানিতে দাঁড়িয়ে, হাত নাড়ছে, গান করছে, চেঁচাচ্ছে! একহাতে হাতল ধরা, সেলফি হাতে মোবাইল। দার্জিলিঙের পাহাড়ি ট্রেনের শহুরে বোন। (Lunar Mission)
কিন্তু নাহ্, হাঁদুর ট্রামের সঙ্গে পেরে উঠবে না। সে প্রশ্ন উঠতেই দেওয়া উচিত নয়। নিজেকে বুঝিয়ে ফেললাম, ‘দূর দূর, ওই খটখটে এক্কার মতো ছ্যাকরা গাড়ি কেউ চড়ে নাকি? আমার অত বাজে সময় নেই, চোখের দেখাই যথেষ্ট।’ মনে হল কে যেন কানে কানে বলে উঠল, ‘তোমার তো ওই একটা জিনিসই আছে, অফুরন্ত সময়!’ অস্বস্তিকে মাছি মারার মতো চাপড় দিয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম, এই বিদেশ বিভুঁইয়ে হাঁদুর ট্রামকে কিছুতেই হারতে দেওয়া যাবে না। হাঁটতে শুরু করলাম অন্যদিকে। (Lunar Mission)
আরও পড়ুন: বাঙালির ডান ও যুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক চেতনা
জমজমাট জায়গা। দেশি বিদেশি সকলেই খুব হাসিখুশি। কে কাজে যাচ্ছে আর কে বেড়াতে, বোঝার উপায় নেই। সামনাসামনি হলেই একগাল হাসি আর কখনও কখনও তারই সঙ্গে একটা ‘হাই’। এক জায়গায় দু’মিনিট একসঙ্গে দাঁড়ালেই, সকলে কিছু না কিছু কথা আরম্ভ করে দেয়। চেনা অচেনার ফারাক নেই, তাই বাধাও নেই। (Lunar Mission)
হঠাৎ দেখি আমাদের পাড়ার রনাল্ড ফুটপাথের কাফেতে কম্পিউটার খুলে বসে আছে। আমাকে দেখতেই প্রশ্ন, ‘কী ব্যাপার? কোথায় যাচ্ছ?’ বসে পড়লাম ওর সঙ্গে। একথা সেকথার পর, গাইডের দায়িত্বটা নিজের হাতে তুলে নিয়ে প্রস্তাব দিল, একটু এদিক ওদিক ঘুরে ফিশারম্যানস্ ওয়ারফে গিয়ে লাঞ্চ খাওয়ার। বললাম, ‘তথাস্তু! কিন্তু ওই কেবল্ কারে চড়ে নয়।’ (Lunar Mission)
একটা বিদখুটে সাদা গাড়ি ঠিক আমাদের পাশে এসে দাঁড়াল। গাড়িটার চালে বেঢপ আকারের যাঁতার মতো একটা যন্তর, লাট্টুর মতো বাঁইবাঁই করে ঘুরে চলেছে। আরও গোটা তিনেক ছোট ছোট লাট্টু দু’পাশে আর পেছনে লাগানো, তারাও পরিত্রাহি ঘুরছে, ভিতরে কোন জনমনিষ্যি নেই।
‘চলো একটা ট্যাক্সি ধরে এগিয়ে পড়ি’, বলেই মোবাইলে টরে টক্কা আরম্ভ করে দিল রনাল্ড। ফুটপাথের ধারে দাঁড়িয়ে আমি আবার ডুব দিলাম সানফ্রাসিসকো মনোরম দৃশ্যাবলীর মধ্যে।
‘এসে গেছে, উঠে পড়ো।’ দেখি একটা বিদখুটে সাদা গাড়ি ঠিক আমাদের পাশে এসে দাঁড়াল। গাড়িটার চালে বেঢপ আকারের যাঁতার মতো একটা যন্তর, লাট্টুর মতো বাঁইবাঁই করে ঘুরে চলেছে। আরও গোটা তিনেক ছোট ছোট লাট্টু দু’পাশে আর পেছনে লাগানো, তারাও পরিত্রাহি ঘুরছে, ভিতরে কোন জনমনিষ্যি নেই। (Lunar Mission)

পিছনের দরজা খুলে রনাল্ড বসে পড়ল। আমায় সামনের সিটটার দিকে আঙুল দেখিয়ে দিল। উঠে বসে সিট বেল্টটা লাগাতেই গাড়িটা নড়েচড়ে গড়াতে আরম্ভ করে দিল।
‘আরে গেল গেল গেল, দেখো দেখো, ব্রেকটা বোধহয় লাগায়নি, এক্ষুনি কেলেঙ্কারি হবে!’ কেমন এক নির্বিকার ঔদাসীন্যে ট্যাক্সিটা পাশের রাস্তায় চলন্ত গাড়ির সারিতে ঢুকে পড়ল। নালার জল নদীতে পড়ে একাকার। ততক্ষণে শরীরের প্রতিটা পেশি লোহার চেয়েও শক্ত হয়ে গেছে। মাথা ঘুরছে না বুদ্ধিটা জমে গেছে, তা ঠাওর হল না। (Lunar Mission)
পাশে তাকালেই আমার বুকের ভিতরটা শুকিয়ে যাচ্ছে, চালক নেই! গদিটা ফাঁকা। স্টিয়ারিংয়ের চাকাটা নিজের মনে এদিক ওদিক ঘুরে চলেছে, যেন কেউ লাইসেন্সের পরীক্ষা দিচ্ছে!
দু’হাতে সামনের ড্যাশবোর্ডটা কামড়ে ধরে পাদানিতে পা-দুটো আপ্রাণ ঠেকনা দিয়ে রাখলাম। সামনে তাকিয়ে দেখি গাড়ি ঠিকই চলছে, আস্তে হচ্ছে, জোরে হচ্ছে, লালে থামছে, সবুজে চলছে। ঘোরবার আলো মানে ইনডিকেটর জ্বালিয়ে তবে ডাইনে-বাঁয়ে ঘুরছে! (Lunar Mission)
কিন্তু, পাশে তাকালেই আমার বুকের ভিতরটা শুকিয়ে যাচ্ছে, চালক নেই! গদিটা ফাঁকা। স্টিয়ারিংয়ের চাকাটা নিজের মনে এদিক ওদিক ঘুরে চলেছে, যেন কেউ লাইসেন্সের পরীক্ষা দিচ্ছে!
আরও পড়ুন: কল্পবিজ্ঞান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
চোখ বন্ধ করে ইষ্টনাম জপ করব ভাবলাম, হল না। চোখ বুজতেই পরিষ্কার এক ট্যাক্সিচালক ভেসে উঠল। আশায় ভর করে, আবার পাশের আসনের দিকে তাকালাম, সে উধাও! আবার চোখ বন্ধ করলাম, এবার আরও জোরে। ওই তো, ওই তো চালক সাহেব। অনেকক্ষণ বাদে নিঃশ্বাস নিলাম। ঘাড় ঘুরিয়ে পাশের আসনের দিকে উঁকি মারলাম, নাহ্ সে উধাও! (Lunar Mission)

স্টিয়ারিংটা বাচ্চাদের মতো কানামাছি-ভোঁভোঁ নেচে চলেছে। এয়ার কন্ডিশনার দিয়ে মৃদুমন্দ হাওয়া বইছে, রেডিওতে সিম্ফনি আর ট্যাক্সিটা রাজপথ ধরে উড়ে চলেছে, নিজের খেয়ালে। এমন শান্ত পরিবেশ পাওয়া দুষ্কর। কিন্তু এসব বিভীষিকা আমার জন্য নয়! চোখ বন্ধ করলেই বাস্তব জমে যাচ্ছে, সামনে চালক আবির্ভূত হচ্ছে। চোখ খুলে পাশে তাকালেই আরেক কোয়ান্টাম বাস্তব, সেখানে কেউ নেই, ছিলই না! গীতায় কি তাহলে একেই মায়া বলা হয়েছিল? (Lunar Mission)
কতক্ষণ যে এই যন্ত্রণা চলেছিল মনে নেই, শুধু মনে আছে যখন গাড়ির গতি এসে দাঁড়াল শূন্যে, কামানের গোলার মতো ছিটকে বেরিয়ে গেলাম একশো মাইল গতিতে। আহ, কী আরাম, বাতাসে যে এত অম্লজান (অক্সিজেন) থাকে, মনেই ছিল না।
ততক্ষণে আমার তূরীয় অবস্থা। কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে, বাম-ডান, উঁচু-নিচু সব একাকার। আমি শুধু থামতে চাই, তক্ষুনি। গলা ছেড়ে গান করতে ইচ্ছে করছে, ‘আমায় দে মা পাগল করে!’ তাও হল না, গলাটা মনে হল হাড়ের মতো খটখটে। (Lunar Mission)
কতক্ষণ যে এই যন্ত্রণা চলেছিল মনে নেই, শুধু মনে আছে যখন গাড়ির গতি এসে দাঁড়াল শূন্যে, কামানের গোলার মতো ছিটকে বেরিয়ে গেলাম একশো মাইল গতিতে। আহ, কী আরাম, বাতাসে যে এত অম্লজান (অক্সিজেন) থাকে, মনেই ছিল না। (Lunar Mission)
এখন? এখন, বেশ কয়েকদিন হয়ে গেছে। আমার একটা স্বীকারোক্তিও আছে। ইতিমধ্যে, আমি কয়েকবার স্বপ্নে ঐ গাড়িতে চড়ে এসেছি! প্রায়ই চোখ বন্ধ করে, মনে মনে আমি ঐ ট্যাক্সি চেপে ঘুরি। বড় শহরে গেলে দু’চোখ ভরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে দেখি, মোড়ের মাথায় কেবল্ কারকে সাইড দিতে গিয়ে চালকবিহীন ট্যাক্সি নিজে নিজে দাঁড়িয়ে গেল। এখন আমি বুঝে গেছি, ওই ওয়েমো ট্যাক্সির যত কাছে সেদিন পৌঁছেছিলাম, হাঁদুর ট্রাম বা ব্লু-অরিজিনের চন্দ্রযানের অত কাছে কোনও দিনই যেতে পারব না। তাতে আমার কোনও দুঃখও নেই।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
সাত পুরুষের ভিটে কলকাতার শহরতলি বালিতে। বর্তমানে অবসর জীবন কাটাচ্ছেন সান্ ফ্রান্সিসকোর শহরতলি ওকল্যান্ডে। আইআইটি ও বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা। পোর্ট ট্রাস্টে কিছু বছর কাজ করে আমেরিকা পাড়ি। পরে জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি ও এমআইটি-তে পড়াশোনা। কর্মজীবনের সিংহভাগজুড়ে ছিলেন বিমানবন্দর বিশেষজ্ঞ। সেই সুবাদে ঘুরে ফেলেছেন পৃথিবীর নানা স্থান। দেশি বিদেশি সাহিত্যকলা নিয়ে অনেকটা সময় কেটে যায়। কিছু পত্র পত্রিকায় লেখালেখির সুযোগও জুটে গিয়েছে সময়ে অসময়ে।
