(Ong Bong Chong 4)
শব্দ তো ব্যবহারে বাঁচে। ব্যবহার না করলে শব্দরা মরে যায় না, হারিয়ে যায়। বাঙালি জীবন থেকেও অনেক শব্দ হারিয়ে গেছে। যা আগে বেশ চলত, এখন আর চলে না। অনেকদিন শুনি না। অবশ্য এ-কথার একদিক থেকে কোনও অর্থ নেই। হয়তো আমার কান যতদূর অবধি যায় ততদূর অবধি শুনতে পাই না। তার বাইরে আছে, দিব্য বহাল তবিয়তে বেঁচে আছে এবং চালুও আছে, হারিয়ে যায়নি।
শব্দ নিরালম্ব নয়। তার সঙ্গে বস্তুর আর জীবন যাত্রার যোগ গভীর। আমার মায়ের রান্না ঘরেই যে কত শব্দ এল আর গেল। এক সময় বাঙালির ঘরে ঘরে জনতা স্টোভ কেনা হয়েছিল। বাঙালি মানে মধ্যবিত্ত বাঙালির কথা বলছি। তার আগে বিকেলের চা করা ছিল খুবই ঝক্কি। স্টোভ ছিল, কিন্তু সেই পাম্প দেওয়া স্টোভ জ্বালানো ও ব্যবহার করা কঠিন। বিকেলের রান্না হত, তোলা উনুনে। উনুন ধরানো কঠিন কাজ। জনতা স্টোভ আসার পরে দেখা গেল তা জ্বালানো নেভানো সোজা। নামটিও বেশ, জনতা। কানে লেগে যায়। এই আগুন ও রন্ধন যন্ত্রটি সকলের, এই বোধ তৈরি হয়। ফলে বেশ মনে পড়ে মা বিকেলবেলায় বাবাকে জনতা স্টোভ জ্বেলে চা করে দিত।
আমাদের বাড়িতেই শুধু নয়, আরও কয়েকটি বাড়িতে চায়ের নতুন নাম হল ‘জনতার জল’। দামি সুগন্ধী দুধেল চা খাওয়ার অর্থনৈতিক সামর্থ মধ্যবিত্ত বাঙালির ছিল না। তারা চা খেতেন তবে সেই চায়ের গুণমান তেমন নয়। তাই ‘জনতার জল’ এই নামটা বেশ মানিয়ে গিয়েছিল। তবে জনতা যুগ বেশিদিন চলেনি। বাড়িতে গ্যাসের সংযোগ আসতে শুরু করে এর কিছুদিন পরে। ফলে জনতার দাপট একটু কমল, ব্যবহারও। তারপর একসময় জনতা স্টোভ বাক্স বন্দি হয়ে ঘরের এক দিকে পড়ে রইল। জনতার জল শব্দটাও বেমালুম হারিয়ে গেল।

আজকাল মাঝে মাঝে ভাবি, জনতার জল শব্দটা তো পুরনো অর্থে নতুন করে ফিরবে না। অনেকে আবার জনতার গরম জল এই শব্দবন্ধটিও ব্যবহার করতেন। চা তো গরমই হয়। যাই হোক, জনতার গরম জলের বদলে জনতার জল শব্দটিকে মাঝে মাঝে আজকাল ফিরিয়ে আনতে ইচ্ছে করে। কাকে বলা যায় জনতার জল। জন আবেগের নাম কি জনতার জল দেওয়া চলে? বিষ্ণু দে’র কবিতায় ছিল জনসমুদ্রে নেমেছে জোয়ার। জনতাকে জলের সঙ্গেই তিনি তুলনা করেছেন। ‘জনসমুদ্র’ তো চালু শব্দ। ‘জনজোয়ার’ শব্দটিও বেশ চলে। খেয়াল করলে দেখা যাবে, এ-সবই সমাস বদ্ধ পদ। জন পূর্ব পদ, জোয়ার আর সমুদ্র পর পদ। জলের সমুদ্র বা জলের জোয়ার নয়। জল শব্দটিকে জন দিয়ে প্রতিস্থাপিত করা হয়েছে।
জলে যেমন ঢেউ ওঠে, জনগণের মধ্যেও তেমন ঢেউ উঠছে। একসময় খেলার মাঠে এমন ঢেউ ইচ্ছে করে তোলা হত। একদিকের গ্যালারির দর্শকেরা একসঙ্গে উঠলেন, বসলেন। তাঁরা বসতে না বসতেই আরেক দিকের দর্শকেরা উঠলেন। এইভাবে গ্যালারিতে একটা ওয়েভ তৈরি হত। বাঙালিরা ক্রমে আর জনজোয়ার, জনসমুদ্র এই সব বলছে না। তাদের কাছে মেক্সিকান ওয়েভ (Mexican Wave) শব্দটা ক্রমশই গত শতকের আটের দশকে টিভি-র দৌলতে দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়ে উঠল। জনতার ওয়েভ উঠেছে জনতার ওয়েভ উঠেছে একথা লোকজন বলতে শুরু করল।

১৯৮৬-র ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ কেবল কলকাতার বাঙালি দেখেনি, কলকাতার বাইরের বাঙালিও দেখতে পেয়েছিল। কারণ স্থানীয় টিভি স্টেশনের দৌলতে পশ্চিমবঙ্গে টিভির সাম্রাজ্য বিস্তার লাভ করেছিল। তখন জনতা উঠে গেছে বাক্সে। রান্নার গ্যাস ঢুকেছে বাড়িতে। গ্যাসের সিলিন্ডার ব্ল্যাকে বিক্রি হচ্ছে এ বেশ চালু ঘটনা। রবিবার দূরদর্শনে প্রিয়া তেন্ডুলকরের ‘রজনী’ বলে একটা শো হত। তাতে তিনি বিভিন্ন সরকারি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব। রান্নার গ্যাস বেলাইনেও বেশি টাকা দিয়ে পাওয়া নিয়েও একটা এপিসোড তাতে ছিল।
এখন আমাদের যা অবস্থা আমরা কেউ আর কোনও রাজনৈতিক আদর্শে উদ্বেল হয়ে উঠব না। জনতা বিশ্বাস হারিয়েছে। তার নানা কারণ আছে। নতুন করে জন সমুদ্রে স্বতঃস্ফূর্ত জোয়ার ওঠা প্রায় অসম্ভব।
এই সময় জনতার ওয়েভ শব্দটা চালু হয় ও ক্রমে নিভেও যায়। যখন জনতার ওয়েভ উঠছে চালু হল তখন কিন্তু কেউ খেয়াল করেননি সলিল চৌধুরীর গানে ঢেউ উঠছে-র চমৎকার ব্যবহার আছে। যাই হোক, সবাই যে সব কিছু খেয়াল করবেন, তা নয়। ১৯৪৬-এর গান ‘ঢেউ উঠছে কারা টুটছে’। সে সব তো বাঙালির অতীত। কলকাতায় মনুমেন্টের তলায় হাজার হাজার বাঙালি এই গানে গলা মিলিয়েছে সে-সব আর কে মনে রাখে!
এই সব ভাবতে ভাবতে আমার ‘জনতার জল’ শব্দটি নতুন করে ফিরিয়ে আনতে ইচ্ছে করছে। জনতার গরম জল অর্থাৎ চা অর্থে নয়, ভিন্নার্থে। এখন আমাদের যা অবস্থা আমরা কেউ আর কোনও রাজনৈতিক আদর্শে উদ্বেল হয়ে উঠব না। জনতা বিশ্বাস হারিয়েছে। তার নানা কারণ আছে। নতুন করে জন সমুদ্রে স্বতঃস্ফূর্ত জোয়ার ওঠা প্রায় অসম্ভব। তাছাড়া মানুষ আর কাউকে বিশ্বাস করে না। তারা জানে সেও ধান্দা করে, অন্যরাও তাই। কেউ কম কেউ বেশি, এই যা পার্থক্য। তাই সংস্কৃতি রাজনীতি সব ক্ষেত্রেই যেটুকু ভিড় চোখে পড়ে, তা হিসেবি ভিড়। ‘দেখা যাক, কী হয়’ রকমের ভিড়।

কিম্বা কিছু একটা প্রয়োজনে বা ধান্দায় ভিড়। এই যে জনতার মাপা ভিড়, স্বতঃস্ফূর্ত নয় খানিকটা অভ্যেসের, দেখনদারির তার তো একটা নাম চাই। এমনকী পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্বের রাজনীতিও তেমন সাম্প্রদায়িক জনজোয়ার তুলতে পারবে বলে মনে হয় না। তুলতে যে পারবে না, সে অবশ্য ভালই। তাই জনতার এই স্তিমিত আবেগের সামান্য তিরতিরে চোখে পড়ার মতো জমায়েতের একটা নাম দেওয়া যাক। তাকে জনসমুদ্র বলা যাবে না, জনজোয়ারও নয়, জনতার ওয়েভ উঠেছে বলতেও আটকাবে। তাই বলা ভাল এ হল জনতার জল। গরম নয়, টগবগে নয়। নিতান্তই জনতার জল।
ওই যে বলেছি শব্দরা মরে যায় না, হারিয়ে যায়। থাকে। আবার হয়তো ফিরেও আসে। আমি আর কে? কেউ না, কমন ম্যান। তবু ইচ্ছে তো হয়। ইচ্ছে হল নতুন অর্থে ‘জনতার জল’-কে ফিরিয়ে আনতে। জনসমুদ্রে জোয়ার নামেনি, জনতার জল মাঝে মাঝে জমে।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
বিশ্বজিৎ রায়ের জন্ম ১৯৭৮-এ, কলকাতায়। রামকৃষ্ণ মিশন পুরুলিয়ায় স্কুলজীবন কাটিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত পড়াশুনো। উভয় পর্যায়েই প্রথম শ্রেণীতে প্রথম। বর্তমানে বিশ্বভারতীর বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেন। এবং বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক হিসেবে বাংলা সাহিত্যজগতে সুপরিচিত। রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্গসংস্কৃতি বিষয়ে তাঁর প্রকাশিত প্রবন্ধ সংকলনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘রবীন্দ্রনাথ ও বিবেকানন্দ: স্বদেশে সমকালে’, ‘সচলতার গান’, ‘সব প্রবন্ধ রাজনৈতিক’। এর বাইরে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর মুক্তগদ্যের বই ‘ঘটিপুরুষ’, ‘অন্দরবেলা’ ও ‘ইস্কুলগাথা’ এবং পদ্যের বই ‘বিচ্ছেদ প্রস্তাব’ ও ‘গেরস্থালির পদ্য’। ‘ঘটিপুরুষ’ গ্রন্থের জন্য পেয়েছেন নীলাঞ্জনা সেন স্মৃতি পুরস্কার।
