(Bengali Language)
যদি জিজ্ঞেস করি, বাঙালির প্রিয় কিশোর কে? এখনকার ছেলে-মেয়েরা কী বলবে জানি না, আমরা যারা পঞ্চাশপথগামী তারা দুটো নাম বলতে পারি, বলতে চাইও। একজন ‘পথের পাঁচালী’-র অপু, অন্যজন ‘ডাকঘর’-এর অমল। তারাই আমাদের প্রিয়।
অমল অবশ্য কিশোরবেলা অবধি যায়নি, বালকবেলাতেই তার দিন ফুরিয়েছিল। খোলা জানলা দিয়ে আসা তারার আলো মেখে সে যখন ঘুমিয়ে পড়েছিল ঘরে, সুধা এসে তখন জানিয়ে গিয়েছিল— সুধা তাকে ভোলেনি। আমরাও ভুলিনি— নারীরা, পুরুষেরা। আমাদের ছেলেবেলায় পড়া বিভূতিভূষণ আর রবীন্দ্রনাথ আমাদের মনে থেকে গেছে। অপু আর দুর্গা, অমল আর সুধা। অপু-দুর্গা ভাই-বোন। অমল-সুধা বন্ধু।
আরও পড়ুন: ফেসবুক আর বাংলা বানানের ধন্যযোগ
অমল আর অপু দুজনেই হাঁ-করা ছেলে। বড় বড় চোখ করে চারপাশ দেখত। তাদের সে-দেখায় প্রকৃতি লেগে থাকত ঘন হয়ে। অমলের অসুখ করেছিল। ছোট কবিরাজ তাকে ঘরের বাইরে যেতে নিষেধ করেছিলেন। অমল তাই জানলার কাছটিতে বসে থাকত। শব্দ দিয়ে, মন দিয়ে বুনে তুলত, না-দেখা দূর পৃথিবীর ছবি। সেই পৃথিবীতে তার পা পড়েনি। সেই পৃথিবীর ঝরনা-সাগর-পাহাড় সে একালের ট্যুরিস্টদের মতো আমুদে পর্যটনে দখল করতে চায়নি। শুধু মনের জানলা খুলে দিয়ে দু’চোখ ভরে দেখতে চেয়েছিল। সেই কাজে তার সহচর ছিল ফকিরবেশী ঠাকুরদা।
‘ঠাকুরদা। সে ভারি আশ্চর্য জায়গা। সে পাখিদের দেশ— সেখানে মানুষ নেই। তারা কথা কয় না, চলে না, তারা গান গায় আর ওড়ে।
অমল। বাঃ, কী চমৎকার! সমুদ্রের ধারে?

ঠাকুরদা। সমুদ্রের ধারে বৈকি।
অমল। সব নীল রঙের পাহাড় আছে?
ঠাকুরদা। নীল পাহাড়েই তো তাদের বাসা। সন্ধের সময় সেই পাহাড়ের উপর সূর্যাস্তের আলো এসে পড়ে আর ঝাঁকে ঝাঁকে সবুজ রঙের পাখি তাদের বাসায় ফিরে আসতে থাকে— সেই আকাশের রঙে পাখির রঙে পাহাড়ের রঙে সে এক কাণ্ড হয়ে ওঠে।
অমল। পাহাড়ে ঝরনা আছে?
পাখিগুলো আমাকে নিতান্ত তুচ্ছ একটা মানুষ বলে যদি একঘরে করে না রাখত তা হলে ঐ ঝরনার ধারে তাদের হাজার হাজার বাসার একপাশে বাসা বেঁধে সমুদ্রের ঢেউ দেখে দেখে সমস্ত দিনটা কাটিয়ে দিতুম।
ঠাকুরদা। বিলক্ষণ! ঝরনা না থাকলে কি চলে! একেবারে হীরে গালিয়ে ঢেলে দিচ্ছে। আর, তার কী নৃত্য! নুড়িগুলোকে ঠুং-ঠাং ঠুং-ঠাং করে বাজাতে বাজাতে কেবই কল্ কল্ ঝর্ ঝর্ করতে করতে ঝরনাটি সমুদ্রের মধ্যে গিয়ে ঝাঁপ দিয়ে পড়ছে। কোনো কবিরাজের বাবার সাধ্য নেই তাকে একদণ্ড কোথাও আটকে রাখে। পাখিগুলো আমাকে নিতান্ত তুচ্ছ একটা মানুষ বলে যদি একঘরে করে না রাখত তা হলে ঐ ঝরনার ধারে তাদের হাজার হাজার বাসার একপাশে বাসা বেঁধে সমুদ্রের ঢেউ দেখে দেখে সমস্ত দিনটা কাটিয়ে দিতুম।’

দু’জনের কথায় বোনা ক্রৌঞ্চদ্বীপের ছবিতে রঙের পরে রঙ লাগত। একই ক্যানভাসে পাখি-পাহাড়-ঝরনা-সমুদ্দুর। ঠিক যেন পটে আঁকা ছবি। একে অন্যের সঙ্গে মিলে-মিশে গেছে। বিলিতি ছবির থেকে যে পারস্পেকটিভ, বাস্তবের ত্রিমাত্রিকতা ও একের থেকে অন্যের বস্তুগত দূরত্বের যাথার্থ্য প্রকাশের কলাকৌশলের বিদ্যে আমরা শিখেছিলাম, অমলের মনের আঁকা ছবিতে তা ছিল না। আসলে এক ভৌগোলিকতা থেকে অন্য ভৌগোলিকতায় তার ছিল অবাধ ভেসে যাওয়া। সেই ভাসমানতা সে বজায় রাখতে পেরেছিল ভাষার কল্পনায়। ঠিক যেমন পেরেছিল পথের পাঁচালীর অপু। (Bengali Language)
অপুর খেলনা ছিল না বিশেষ। সে জানত তার মায়ের করা পায়েসের স্বাদের বস্তুগত দারিদ্র্য। তবু সে মহাভারতের কর্ণের কাছে পৌঁছে যেতে পারত নিজের কল্পনার ভাষায়। সামান্য উপকরণ নিয়ে এক কল্পনার যাত্রায় সামিল হত। হাতের খেলনা হিসেবে সামান্য কিছু নিয়ে কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধে ঢুকে পড়ত। সেই যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলায় সে অভিনয় করত কর্ণের পক্ষে। (Bengali Language)
কিশোর অপুর মতো অমল অবশ্য যুদ্ধের ময়দানে ঢুকতে চায়নি। সে চলে যেত দইওয়ালার গ্রামে।
কিশোর অপুর মতো অমল অবশ্য যুদ্ধের ময়দানে ঢুকতে চায়নি। সে চলে যেত দইওয়ালার গ্রামে। দইওয়ালা শুনে অবাক হয়ে যেত। দই বিক্রি করতে যে এত সুখ হতে পারে, এই কথায় বোনা গ্রামের কথা শোনার আগে সে ভাবতেই পারেনি। এই যে শব্দের কল্পনায় বাস্তবের না-পাওয়াকে অতিক্রম করে যাওয়ার শক্তি, একে চিত্ররূপ দিয়েছিলেন সত্যজিৎ। (Bengali Language)
‘পথের পাঁচালী’-র পরে ‘অপরাজিত’ আর ‘অপুর সংসার’। কলকাতা শহরে এসে যুবক অপু বাস্তবে না-পাওয়ার সত্যিকে চিনতে শিখল। অপর্ণার সঙ্গে সংসার করার আগে ও অপর্ণার সঙ্গে সামান্য কিছুদিন সংসার করার মধ্যে, অপু তার না-পাওয়াকে অন্যরকম এক পাওয়া দিয়ে ঢেকে রেখেছিল। অপু শহরে একা, বাড়িওয়ালা এসে ভাড়ার জন্য তাগাদা দেয়। আত্মগ্লানি হয় তার। সেই ভাড়া-বাড়ির ছাদে যখন বৃষ্টি নামল, তখন সেই ধারাজলে স্নান করার মুহূর্তে অপু স্পর্শ পেল প্রকৃতির। (Bengali Language)

মুহূর্তের জন্য যা তাকে না-পাওয়ার জগৎ থেকে আশ্চর্য এক পাওয়ার জগতে নিয়ে গিয়েছিল। সত্যজিৎ বড় যত্ন করে সেই দৃশ্য নির্মাণ করেছিলেন। (Bengali Language)
এই যে, যা নেই, যা পাইনি তাকে শব্দ দিয়ে, কল্পনা দিয়ে ঢেকে দেওয়া, এর মধ্যে দীনতা নেই, শ্রী আছে। রবীন্দ্রনাথ বাঙালিকে একরকম করে তা শিখিয়েছিলেন। শান্তিনিকেতনের জীবনধারায় বস্তুর প্রাচুর্য ছিল না, অভাব ছিল, তবে সেই না-পাওয়াকে কল্পনা আর শ্রী দিয়ে সাজিয়ে তোলার সহজ জীবন অর্জন করেছিলেন তাঁরা। এও অপু-অমলের জীবনবোধেরই বাস্তব ভাষ্য। (Bengali Language)
শান্তিনিকেতনের জীবনধারায় বস্তুর প্রাচুর্য ছিল না, অভাব ছিল, তবে সেই না-পাওয়াকে কল্পনা আর শ্রী দিয়ে সাজিয়ে তোলার সহজ জীবন অর্জন করেছিলেন তাঁরা।
বুদ্ধদেব বসু তাঁর ‘সব পেয়েছির দেশে’ বইতে লিখেছিলেন সেই সব কথা। উলটে রাখা প্যাকিং বাক্স যে কী সুন্দর বসার জায়গা হতে পারে! দুর্মূল্য নয়, কেবল কল্পনার সাহচর্যে জীবনকে ভরিয়ে তোলা। এই যে চাওয়া-পাওয়ার গল্পে কল্পনার কারুকার্য, তা কি ইদানিং হারিয়ে যাচ্ছে? আমরা তো এই জীবনবোধকে একটু যত্ন করে লালন করতে পারতাম। বাঙালিদের মধ্যে যাঁরা লক্ষ্মীর সাধনা করতেন, তাঁরাও সেই সাধনা বর্বর সম্পদ-সাধনায় পর্যবসিত করতে চাননি। (Bengali Language)

রাজশেখর বসু বেঙ্গল কেমিক্যালসের জন্য যে বিজ্ঞাপন তৈরির কল্পনা করতেন, তা লক্ষ্মীর সাধনায় সরস্বতীর স্পর্শ হয়ে উঠেছিল। এই যে ভাষার কল্পনা, জীবনে অল্পকে, সহজকে আদর করে ঠাঁই দিয়ে শ্রীময় জীবনের স্বাদ উপভোগ, এটা তো অপরকে শেখানো যেতে পারত! (Bengali Language)
বাঙালির ভাষার মধ্যে কেবল প্রয়োজন মেটানোর উপকরণই ছিল না, অপ্রাপ্তিকে ভরে দেওয়ার মতো সম্পদও ছিল।
বাঙালির ভাষার মধ্যে কেবল প্রয়োজন মেটানোর উপকরণই ছিল না, অপ্রাপ্তিকে ভরে দেওয়ার মতো সম্পদও ছিল। এ কেবল বাংলা ভাষার বৈশিষ্ট্য, তা কিন্তু নয়। অন্য ভাষা-সংস্কৃতির মানুষেরাও এই কাজটি করেন, করতেন। এ তো মানুষের ভাষারই ধর্ম। এই ধর্ম যদি ভাষা থেকে হরণ করে নিয়ে, তাকে কেবল সংযোগ আর তথ্যের উপকরণ করে তোলা হয়, তাহলে মানুষেরাও ভাষার মধ্যে কেবল বস্তুকে খুঁজবে। ভাষা তো মানুষের মনকে অবস্তুর আনন্দে নিয়ে যেতে পারে; যেমন পারে সুর, রঙ আর রেখা, তা-ই যদি ভুলে যাই! যেন ভুলে না যাই। (Bengali Language)
অপু আর অমল। বাঙালির দুই চরিত্র। তাদের ভুলে গেলে আমরা যে শ্রী আর শান্তি হারিয়ে ফেলব।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
বিশ্বজিৎ রায়ের জন্ম ১৯৭৮-এ, কলকাতায়। রামকৃষ্ণ মিশন পুরুলিয়ায় স্কুলজীবন কাটিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত পড়াশুনো। উভয় পর্যায়েই প্রথম শ্রেণীতে প্রথম। বর্তমানে বিশ্বভারতীর বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেন। এবং বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক হিসেবে বাংলা সাহিত্যজগতে সুপরিচিত। রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্গসংস্কৃতি বিষয়ে তাঁর প্রকাশিত প্রবন্ধ সংকলনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘রবীন্দ্রনাথ ও বিবেকানন্দ: স্বদেশে সমকালে’, ‘সচলতার গান’, ‘সব প্রবন্ধ রাজনৈতিক’। এর বাইরে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর মুক্তগদ্যের বই ‘ঘটিপুরুষ’, ‘অন্দরবেলা’ ও ‘ইস্কুলগাথা’ এবং পদ্যের বই ‘বিচ্ছেদ প্রস্তাব’ ও ‘গেরস্থালির পদ্য’। ‘ঘটিপুরুষ’ গ্রন্থের জন্য পেয়েছেন নীলাঞ্জনা সেন স্মৃতি পুরস্কার।
