(Rabindranath Tagore)
“৯ সেপ্টেম্বর ১৮৯০
ভাই ছোট বৌ— আমরা ইফেল টাউয়ার বলে খুব একটা উঁচু লৌহস্তম্ভের উপর উঠে তোমাকে একটা চিঠি পাঠালুম। আজ ভোরে প্যারিসে এসেচি। লন্ডনে গিয়ে চিঠি লিখ্ব। আজ এই পর্যন্ত। ছেলেদের জন্য হামি”।
এই সাদামাটা চিঠিটি লিখেছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তাঁর স্ত্রী মৃণালিনী দেবীকে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর উনিশ বছরের দাম্পত্য জীবনে যে অল্পসংখ্যক চিঠি লিখেছিলেন, উপরোক্ত চিঠি তারই একটি নমুনা বলা যেতে পারে। (Rabindranath Tagore)
তেইশ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথের বিবাহ হয়েছিল দশ বছরেরও কম বয়সি ‘বাঙাল’ কন্যা ভবতারিণীর সঙ্গে। পরে রবীন্দ্রনাথই তাঁর নাম দেন মৃণালিনী। গ্রামের মেয়ে ভবতারিণীকে ঠাকুরবাড়ির উপযুক্ত করে তুলতে, তাঁকে ইংরেজি শেখাতে লোরেটো স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয়েছিল। রাখা হয়েছিল পাশ্চাত্য আদব কায়দায় অভ্যস্ত, সেকালের আধুনিকা— কবির জ্ঞানদা বৌঠানের তত্ত্বাবধানে। (Rabindranath Tagore)
আরও পড়ুুন: দিনের পর দিন: শতবর্ষে শংকর ঘোষ
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর বৌঠান কাদম্বরীর বয়সের তফাত মাত্র দুই বছরের। আট বছর বয়সি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বন্ধুতা হয়েছিল দশ বছর বয়সি কাদম্বরীর। বাল্যকাল থেকে তারুণ্যে পৌঁছানোর পুরো ঘটনাই ঘটেছিল একসঙ্গে অর্থাৎ তাঁদের বেড়ে ওঠা ও সম্পর্কের পরিণতিও ঘটে সেই সময়ে। মৃত্যুর সময়ে কাদম্বরীর বয়স ছিল পঁচিশ, রবীন্দ্রনাথ তখন তেইশ বছর বয়সের তরুণ। তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্কের কথা কে না জানে। সে সম্পর্কের ভিত ছিল বন্ধুত্ব, প্রেম, ভালবাসা ও নির্ভরতা। (Rabindranath Tagore)
কিশোর বয়স থেকে কবি লেখালেখি করতেন তাঁর বৌঠানের কাছে বসে। রবীন্দ্রনাথের বিবাহের চার মাস পরেই মৃত্যু হয় কাদম্বরীর। তার কিছুদিন পরে প্রকাশিত ‘শৈশবসংগীত’ কাব্যগ্রন্থটি তিনি উৎসর্গ করেছিলেন সদ্যপ্রয়াত বৌঠানকে। উৎসর্গপত্রে লিখেছিলেন, “এ কবিতাগুলিও তোমাকে দিলাম। বহুকাল হইল, তোমার কাছে বসিয়াই লিখিতাম, তোমাকেই শুনাইতাম। সেই সমস্ত স্নেহের স্মৃতি ইহাদের মধ্যে বিরাজ করিতেছে। তাই মনে হইতেছে, তুমি যেখানেই থাক না কেন, এ লেখাগুলি তোমার চোখে পড়িবেই।” (Rabindranath Tagore)

বিবাহের সময়ে তরুণ রবীন্দ্রনাথ একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ সাহিত্যিক, আর তাঁর স্ত্রী, এক অতি সাধারণ গ্রাম্য বালিকা, যাঁকে গড়েপিটে তোলা মোটেই সহজ ছিল না। এ কথা অনস্বীকার্য যে, রবীন্দ্রনাথের অসামান্য প্রতিভা, খ্যাতি ও ব্যক্তিত্বের পাশে অজ পাড়াগাঁয়ের মেয়ে, যদিও গৃহকর্মে নিপুণা, কর্তব্য পালনে অনড়, মমতাময়ী মৃণালিনী ছিলেন তুলনামূলকভাবে এক অতি ‘সাধারণ মেয়ে’। উনিশ বছরের বিবাহিত জীবনে, মৃণালিনী জন্ম দিয়েছিলেন পাঁচটি সন্তানের। প্রথম সন্তানের জন্ম হয়, যখন তাঁর বয়স মাত্র বারো। (Rabindranath Tagore)
কাদম্বরীর মৃত্যুর পরে রবীন্দ্রনাথ আকৃষ্ট হলেন রূপে গুণে অতুলনীয়া, বিলেতফেরত ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরার প্রতি, যাঁর সঙ্গে তাঁর বয়সের পার্থক্য ১২ বছরের। অচিরে তিনি হয়ে উঠলেন কবির মানস-সঙ্গিনী। নববধূ মৃণালিনী শ্বশুরবাড়িতে এসে দেখলেন, ইতিমধ্যে তাঁর প্রায় সমবয়সী ইন্দিরাকে তাঁর স্বামী ‘প্রভাত সঙ্গীত’ কাব্যগ্রন্থ সস্নেহে উৎসর্গ করেছেন। (Rabindranath Tagore)
কবি দাম্পত্য জীবনে মৃণালিনীকে মাত্র ছত্রিশটি চিঠি লিখেছিলেন।
এমনকী ১৮৮৬ সালে প্রকাশিত ‘কড়ি ও কোমল’-এর পত্রকবিতাগুলির মধ্যে অনেকগুলি চিঠি কবি যে ‘ইন্দিরা প্রাণাধিকাসু’-কে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন, কে জানে সেসব চিঠির অস্তিত্ব মৃণালিনীর নজর এড়াতে পেরেছিল কি না! (Rabindranath Tagore)
কবি স্বল্পকালীন দাম্পত্য জীবনে মৃণালিনীকে মাত্র ছত্রিশটি চিঠি লিখেছিলেন। সাজাদপুর থেকে প্রথম চিঠিটি লিখেছিলেন ১৮৯০ সালে, জানুয়ারি মাসে। শিলাইদহ থেকে ‘ভাই ছুটি’-কে সর্বশেষ চিঠিটি লেখেন ১৯০২ সালে। সেই বছরই নভেম্বর মাসে প্রয়াত হন কবিপত্নী। প্রথম দুটি চিঠি ও চার এবং পাঁচ নম্বর চিঠিতে কবি মৃণালিনীকে সম্বোধন করেছেন ‘ছোট বউ’ বলে। তিন নম্বর চিঠিটি লিখেছেন ‘ছোট গিন্নি’-কে। বাকি চিঠিগুলির সবই ‘ভাই ছুটি’-কে উদ্দেশ্য করে লেখা। (Rabindranath Tagore)

কবির দাম্পত্য জীবন সম্বন্ধে সবটা না হলেও আংশিক ধারণা পাওয়া যায় এই চিঠিগুলি থেকে। কবি এখানে কখনও দায়িত্বশীল স্বামী, কখনও তিনি স্নেহময় পিতা, কখনও দেরিতে চিঠির উত্তর দেওয়ার কারণে স্ত্রীর প্রতি ক্ষুব্ধ। কিন্তু যে প্রেম, ভালবাসা কবির জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তার যেন বড় অভাব চিঠিগুলিতে। কবি এখানে নির্ভেজাল সাংসারিক, পরিবারের সুচিন্তক, স্ত্রীর প্রতি কর্তব্যপরায়ণ। (Rabindranath Tagore)
একবার এক চিঠিতে কবি লিখছেন, “বড় হোক্ ছোট হোক্ ভাল হোক্ মন্দ হোক্ একটা করে চিঠি রোজ লেখ না কেন? ডাকের সময় চিঠি না পেলে ভারি খালি ঠেকে”।
স্ত্রীর সম্বন্ধে সেভাবে কোনও অভিযোগ না করলেও, কিছু চিঠির ভাষায় যে দর্শন কবি স্ত্রীকে বোঝাতে চেয়েছেন, তার থেকে বুঝতে অসুবিধে হয় না যে, তাঁদের সম্পর্কের মধ্যে একটা ফাঁক ছিল।
চিঠি পড়ে মনে হতেই পারে, রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘ছুটি’-র চিঠি না পেয়ে উতলা। কিন্তু তার পরেই যখন কবি লেখেন— রথী তার বাবার কাছে আসবে কি না, সে কথা চিঠিতে জানতে তিনি বিশেষভাবে উৎসুক ছিলেন, তখন বোঝা যায় স্ত্রীর চিঠি পাওয়ার জন্য অস্থির হওয়ার আসল কারণ। অর্থাৎ এখানে চিঠি নিয়ে অনুযোগের কারণ পুত্রের আসবার সংবাদ না পাওয়া।(Rabindranath Tagore)

অন্য দিকে সংসারের খুঁটিনাটি ব্যাপার নিয়ে তাঁর অনুসন্ধান প্রমাণ করে, সংসার নিয়ে তাঁর আগ্রহ কিছু কম নয়। যেমন কলকাতা থেকে লেখা এক চিঠিতে প্রকাশ পায়, মধুপুরে হাওয়া বদল করতে যাওয়া স্ত্রীর কাছ থেকে ওখানকার হাল-হকিকত জানতে চাওয়ার ঔৎসুক্য -“তোমাদের বাগান এখন কীরকম? কিছু ফসল পাচ্চ? কড়াইশুঁটি কতদিনে ধরবে? ইদারায় ফটিক রোজ ফট্কিরি দিচ্চে ত? জল সাফ হচ্চে?” ইত্যাদি ইত্যাদি। (Rabindranath Tagore)
স্ত্রীর সম্বন্ধে সেভাবে কোনও অভিযোগ না করলেও, কিছু চিঠির ভাষায় যে দর্শন কবি স্ত্রীকে বোঝাতে চেয়েছেন, তার থেকে বুঝতে অসুবিধে হয় না যে, তাঁদের সম্পর্কের মধ্যে একটা ফাঁক ছিল। তিনি যে দু’জনের মধ্যে সম্পর্কের উন্নতি একেবারে চাননি, তাও নয়। (Rabindranath Tagore)
তাঁর এবং তাঁর ছুটির মধ্যে যে একটা মানসিক দূরত্ব আছে, তা এই চিঠির মধ্যে কবি অতি স্পষ্ট অথচ মৃদুভাষায় প্রকাশ করেছেন।
১৯০০ সালে কলকাতা থেকে লেখা এক চিঠিতে কবি লিখছেন, “…তোমাতে আমাতে সকল কাজ ও সকল ভাবেই যদি যোগ থাকত, খুব ভাল হত— কিন্তু সে কারও ইচ্ছায়ত্ত নয়…”। আবার তিনি সেই চিঠিতেই লিখছেন, “…আমার ইচ্ছা ও অনুরাগের সঙ্গে তোমার সমস্ত প্রকৃতিকে মেলাবার ক্ষমতা তোমার নিজের হাতে নেই…”।
তাঁর এবং তাঁর ছুটির মধ্যে যে একটা মানসিক দূরত্ব আছে, তা এই চিঠির মধ্যে কবি অতি স্পষ্ট অথচ মৃদুভাষায় প্রকাশ করেছেন।
কখনও আবার কবি তাঁর চিঠিতে ‘ছুটি’-কে সংসারে সঠিকভাবে চলার সুপরামর্শ দেন— “তুমি অনর্থক মনকে পীড়িত কোরো না। শান্ত স্থির সন্তুষ্ট চিত্তে সমস্ত ঘটনা বরণ করে নেবার চেষ্টা কর”।
নিজেকে সম্পূর্ণভাবে মেলে ধরার যে আন্তরিক প্রয়াস ও আবেগ ইন্দিরাকে লেখা চিঠিতে প্রকাশ পায়, তার অত্যন্ত অভাব ছুটিকে লেখা চিঠিগুলিতে। ইন্দিরাকে লেখা চিঠির সংখ্যা আট বছরে দুশো সাতান্ন। রবীন্দ্রনাথকে লেখা ইন্দিরার চিঠির সংখ্যাও প্রায় সমান। ছিন্নপত্রাবলীতে প্রকাশিত ইন্দিরাকে লেখা চিঠির সময়কাল বেলার জন্মের এক বছর পর থেকে শমীর জন্মের এক বছর পর পর্যন্ত। এই সব কিছু নিয়েই কেটেছে মৃণালিনীর উনিশ বছরের বিবাহিত জীবন। (Rabindranath Tagore)

মৃণালিনীকে লেখা প্রথম চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ কৌতুকভরে দাম্পত্যকলহের উল্লেখ করেছেন। লিখেছেন, “ভাই ছোট বউ, যেমনি গাল দিয়েছি অম্নি চিঠির উত্তর এসে উপস্থিত। কাকুতিমিনতি করলেই অম্নি নিজমূর্তি ধারণ করেন, আর দুটি গালমন্দ দিলেই একেবারে জল”। যাঁকে কবি এমনভাবে এবং এমন ভাষায় চিঠি লিখেছেন, তিনি ততদিনে তাঁর দুই সন্তানের জননী। (Rabindranath Tagore)
আশ্চর্যের ব্যাপার, মৃণালিনীর অতি যত্নে রাখা কবির চিঠিগুলির মধ্যে কিন্তু গালমন্দ দেওয়া চিঠিগুলি নেই। তবে কি মৃণালিনী কবির চিঠি বেছে বেছে রেখেছিলেন? বিবাহিত জীবনের সবটা জুড়ে কিন্তু কবি এই চিঠিগুলি লেখেননি। তারিখ অনুযায়ী বারো বছরে তিনি লিখেছেন মাত্র ছত্রিশটি চিঠি। (Rabindranath Tagore)
এদিকে, ১৮৮৭ থেকে ১৮৯৫ সাল পর্যন্ত, আট বছরে, তিনি ইন্দিরা দেবীকে ২৫৭টি চিঠি লিখেছিলেন
এদিকে, ১৮৮৭ থেকে ১৮৯৫ সাল পর্যন্ত, আট বছরে, তিনি ইন্দিরা দেবীকে ২৫৭টি চিঠি লিখেছিলেন, হিসেব করলে দেখা যায়, গড়ে এগারো দিন অন্তর একটি করে চিঠি লেখা হয়েছিল। প্রথম ১৫১টি চিঠির মধ্যে, ইন্দিরা দেবীকে লেখা ১৪৩টি এবং বন্ধু শ্রীশচন্দ্র মজুমদারকে লেখা ৮টি চিঠি। ১৩১৯ বঙ্গাব্দে এই চিঠিগুলি নিয়ে ‘ছিন্নপত্র’-এর প্রথম প্রকাশ। রবীন্দ্রনাথ নিজে এই চিঠিগুলির সম্পাদনা করেন। (Rabindranath Tagore)
১৮৯৫ সালে ১১ মার্চ শিলাইদহ থেকে এক চিঠিতে তিনি ইন্দিরাকে লেখেন, “আমাকে একবার তোর চিঠিগুলো দিস— আমি কেবল ওর থেকে আমার সৌন্দর্য সম্ভোগগুলো একটা খাতায় টুকে নেব— কেননা, যদি দীর্ঘদিন বাঁচি তাহলে এক সময়ে নিশ্চয় বুড়ো হয়ে যাব— তখন এই সমস্ত দিনগুলো স্মরণের এবং সান্ত্বনার সামগ্রী হয়ে থাকবে…”। পরে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষে আরও ১০৬-টি পত্র যুক্ত করে ‘ছিন্নপত্রাবলী’ হিসেবে প্রকাশিত হয়। (Rabindranath Tagore)
সমস্ত আকাশ যেন, হৃদয়পুঞ্জের মতো আমাকে বেষ্টন করে ধরেছে। আশ্চর্য এই যে, পরশু দিন আমার এখানে যখন জনসমাগম হবে, তখন এরা যেন আর থাকবে না— মানুষ এলে যে প্রকৃতির মধ্যে আর প্রকৃতির স্থান থাকে না
এই চিঠিগুলিতে স্ত্রীর প্রসঙ্গ সামান্যই উত্থাপন করেছেন কবি। ১৮৯৫-তে শিলাইদহ থেকে ইন্দিরাকে লেখা চিঠিতে শরতের আকাশের বর্ণনা দিতে গিয়ে কবি লিখছেন, “সমস্ত আকাশ যেন, হৃদয়পুঞ্জের মতো আমাকে বেষ্টন করে ধরেছে। আশ্চর্য এই যে, পরশু দিন আমার এখানে যখন জনসমাগম হবে, তখন এরা যেন আর থাকবে না— মানুষ এলে যে প্রকৃতির মধ্যে আর প্রকৃতির স্থান থাকে না”। (Rabindranath Tagore)
পুজোর সময় সেবার মৃণালিনী আসছিলেন তাঁর স্বামীর কাছে, সন্তানদের নিয়ে। সঙ্গে হয়তো বা ছিলেন আত্মীয় পরিজন এবং দাসদাসী। কবির চিঠিতে উল্লিখিত ‘জনসমাগম’-এর নেত্রী আর কেউ না, তাঁরই স্ত্রী মৃণালিনী।
জাহাজ থেকে স্ত্রীকে লেখা এক চিঠিতে কবি লিখছেন, “আমাদের জাহাজটা ডানদিকে গ্রিস্ আর বাঁ দিকে একটা দ্বীপের মাঝখান দিয়ে চলেছে… তোমাকেও একদিন আসতে হবে তা জান? তা মনে করে তোমার খুসি হয় না? যা কখনো স্বপ্নেও মনে করনি সেই সমস্ত দেখতে পাবে”। (Rabindranath Tagore)
ইতিহাসের সূত্র ধরে আমরা এটাও জানি, স্বামীর সঙ্গে তাঁর বিদেশ ভ্রমণের স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে গিয়েছে।
বিদেশ থেকে স্বামীর এই চিঠি পেয়ে না জানি মৃণালিনী কত খুশি হয়েছিলেন! হয়তো স্বামীর সঙ্গে বিদেশ ভ্রমণের স্বপ্নও দেখেছিলেন। যদিও এই চিঠি যখন মৃণালিনীর হাতে পৌঁছায়, তখন তিনি দুই সন্তানের জননী এবং ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা। ইতিহাসের সূত্র ধরে আমরা এটাও জানি, স্বামীর সঙ্গে তাঁর বিদেশ ভ্রমণের স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে গিয়েছে। (Rabindranath Tagore)
মৃণালিনীর মাঝে মাঝে যে মন খারাপ হত— কবির তা অজানা ছিল না। এই মন খারাপের কারণ সম্বন্ধে কবি কী মনে করতেন, তা জানা না গেলেও, কবির একটি চিঠি কিন্তু অন্য কথা বলে। “অনেক রাত্রে জেগে উঠে জ্যোৎস্নায় বসে থাকি— হিম কিছুমাত্র নেই। কাল বসে বসে মনে পড়ছিল এই ছাদের উপর তোমার অনেক মর্মান্তিক দুঃখের সন্ধ্যা ও রাত্রি কেটেছে— আমারও অনেক বেদনার স্মৃতি ছাদের সঙ্গে জড়িত হয়ে আছে। যদি অনেক রাত্রে এই ছাদের জ্যোৎস্নায় তুমি বস্তে তাহলে বোধ হয় আবার তোমার মন বাষ্পাচ্ছন্ন হয়ে আস্ত।…” ইত্যাদি ইত্যাদি। (Rabindranath Tagore)

কবির চিঠি থেকেই উপলব্ধ হয়, দেরিতে হলেও মৃণালিনী তাঁর চিঠির উত্তর দিতেন। রবীন্দ্রনাথকে লেখা তাঁর স্ত্রীর চিঠিগুলির একটিও কেন পাওয়া গেল না, এই প্রশ্ন থেকেই যায়। আর বিলম্বে চিঠির উত্তর দেওয়ার জন্য রবীন্দ্রনাথের অভিযোগও কিন্তু ধোপে টেকে না। বিশেষ করে যখন বড় মেয়ে বেলা এক চিঠিতে তার মায়ের কাজের এমন এমন ফিরিস্তি দিচ্ছেন, যাতে স্পষ্ট বোঝা যায়, এক একদিন কবিপত্নীর চিঠি লেখার সময়টুকু বের করা মুশকিল হয়ে ওঠে। (Rabindranath Tagore)
বেলা বাবাকে লিখছেন, “সত্যদাদা আজ কাশী যাচ্ছেন, সেই জন্য নরু বৌঠানদের জন্য মিষ্টি তৈরি হচ্ছে। মা-ও সেই সঙ্গে তোমাদের আর নাটোরের মহারাজকে কিছু খাবার নিজের হাতে করে পাঠাচ্ছেন। তাই আজ বড় ব্যস্ত আছেন বলে তোমাকে লিখতে পারলেন না, আমাকে বললেন লিখতে”। (Rabindranath Tagore)
কে জানে মৃণালিনীর মৃত্যুর পরে কবির মনে কোনও আফসোস হয়েছিল কি না, এরকম একটি প্রেমহীন শেষ চিঠি ছুটিকে লেখার জন্য।
১৯০২ সালে রবীন্দ্রনাথ যে চিঠিটি মৃণালিনীকে লিখেছিলেন, সেটি ছুটিকে লেখা শেষ চিঠি হবে তা ওঁর জানা ছিল না— এটা যেমন সত্য, তেমনই সত্য এই চিঠির ভাষ্য। এই চিঠির সিংহভাগ জুড়ে কবি লিখেছেন, ভবিষ্যৎ জীবনে পুত্র রথীকে প্রতিষ্ঠিত করতে তাঁর কী করণীয় এবং পিতা হিসেবে তাঁর নিজের কর্তব্যের কথা। (Rabindranath Tagore)
একটি শব্দও কবি খরচ করেননি তাঁর ছুটির জন্য। কে জানে মৃণালিনীর মৃত্যুর পরে কবির মনে কোনও আফসোস হয়েছিল কি না, এরকম একটি প্রেমহীন শেষ চিঠি ছুটিকে লেখার জন্য। (Rabindranath Tagore)
সেই চিঠিতে কবি লিখছেন, “রথীকে আমি উচ্চতর জীবনের জন্য প্রস্তুত করতে চাই— সুতরাং নিয়ম, সংযম এবং কৃচ্ছসাধন করতেই হবে— যতই দৃঢ়তার সঙ্গে লেশমাত্র লঙ্ঘন না করে, সে নিজের ব্রত সাধন করবে ততই সে মানুষের মতো মানুষ হয়ে উঠবে”। আপাতদৃষ্টিতে স্ত্রীকে লেখা এই চিঠিতে নজরে পড়ে এক স্নেহময় কর্তব্যপরায়ণ পিতাকে, কিন্তু তার অতিরিক্ত কিছু নয়। (Rabindranath Tagore)
রথীন্দ্রনাথ তাঁর মা সম্পর্কে লিখেছিলেন, মৃণালিনী কোনওদিন ইস্কুলে লেখাপড়া শেখেননি। এ প্রসঙ্গে ‘বলুদা’ অর্থাৎ বলেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা উল্লেখযোগ্য, যিনি অল্প বয়স থেকেই ছিলেন অত্যন্ত সাহিত্যপ্রেমী।
রথীন্দ্রনাথ তাঁর মা সম্পর্কে লিখেছিলেন, মৃণালিনী কোনওদিন ইস্কুলে লেখাপড়া শেখেননি। এ প্রসঙ্গে ‘বলুদা’ অর্থাৎ বলেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা উল্লেখযোগ্য, যিনি অল্প বয়স থেকেই ছিলেন অত্যন্ত সাহিত্যপ্রেমী। বলেন্দ্রনাথ ছিলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্র এবং রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্র। তিনি বাংলা, ইংরেজি ও সংস্কৃতে যখন যে বই পড়তেন, তাঁর থেকে কম বয়সি খুড়িমা অর্থাৎ মৃণালিনীকে তা না পড়ালে তাঁর চলত না। বলুর কাছে শুনে শুনে তাঁরও এই তিন ভাষায় যথেষ্ট জ্ঞান জন্মেছিল। (Rabindranath Tagore)
ঠাকুরবাড়ির কোনও মেয়ের সঙ্গেই বিয়ের পরে কিশোরী মৃণালিনীর অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু তিন-চার বছরের বড় ‘বলু’র সঙ্গে মৃণালিনীর গড়ে উঠেছিল এক স্নেহ, প্রীতির সম্পর্ক। বয়সে ছোট মৃণালিনীকে বলেন্দ্রনাথ ডাকতেন ‘কাকিমা’ বলে। আর মৃণালিনী তাঁর এই ভাসুরপুত্রকে ‘বলু’ বলে ডাকতেন। (Rabindranath Tagore)
এই রকম পরিস্থিতিতে মৃণালিনী ও বলেন্দ্রনাথের মধ্যে গড়ে উঠেছিল এক অসাধারণ বন্ধুত্ব। এই কারণেই বলেন্দ্রনাথের অকাল এবং প্রায় আকস্মিক মৃত্যুতে শোকগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন মৃণালিনী।
স্বামী বেশিরভাগ সময়েই শহরের বাইরে। জোড়াসাঁকোর বাড়িতে থাকলেও ঘরের দরজা বন্ধ করে কবি ব্যস্ত থাকতেন লেখাপড়ার কাজ নিয়ে। এই রকম পরিস্থিতিতে মৃণালিনী ও বলেন্দ্রনাথের মধ্যে গড়ে উঠেছিল এক অসাধারণ বন্ধুত্ব। এই কারণেই বলেন্দ্রনাথের অকাল এবং প্রায় আকস্মিক মৃত্যুতে শোকগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন মৃণালিনী। (Rabindranath Tagore)

এমনই দুর্ভাগ্য, সেই সময় শিলাইদহে থাকায় প্রিয় ‘বলু’র সঙ্গে মৃণালিনীর শেষ দেখাটি পর্যন্ত হয়নি। বলেন্দ্রনাথের সমস্ত পারলৌকিক ক্রিয়া শেষ করে অনেক পরে রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহ ফিরে যান। বলেন্দ্রনাথের মৃত্যুর ধাক্কা সেভাবে কাটিয়ে উঠতে পারেননি মৃণালিনী। এই ঘটনার কিছু দিন পরে শিলাইদহ থেকে তিনি চলে আসেন কলকাতায় ও তার কিছুকাল পরে শান্তিনিকেতনে। (Rabindranath Tagore)
মন ভেঙে যাওয়া সত্ত্বেও মৃণালিনী শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণ করেন। শুধু তাই নয়, আশ্রমের আর্থিক অনটনের সময়ে তাঁর গায়ের সমস্ত গয়না কবির হাতে তুলে দিয়েছিলেন। পাশাপাশি আশ্রমের সমস্ত ছাত্রছাত্রীদের সেবায় সম্পূর্ণ আত্মনিয়োগ করেছিলেন। অত্যাধিক পরিশ্রমের কারণে তাঁর সাধারণ স্বাস্থ্যের সাংঘাতিক অবনতি ঘটে। ভাঙা মন ও ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়ে অচিরেই শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন তিনি। (Rabindranath Tagore)
স্ত্রীকে কবি কতটা গভীরভাবে ভালবাসতে পেরেছিলেন, তার পরিমাপ বিতর্কিত। তবে স্ত্রীর অকালমৃত্যুতে তিনি যে গভীরভাবে শোকগ্রস্ত হয়েছিলেন, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
চিকিৎসার জন্য মৃণালিনীকে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়। শেষ দিনগুলিতে কবি তাঁর সেবায় কোনও ত্রুটি রাখেননি। স্বল্প রোগভোগের পরে বাংলা সাল ১৩০৯-এর ৭ই অগ্রহায়ণ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কবিপত্নী।
অগ্রহায়ণ মাসে প্রকাশিত স্বসম্পাদিত বঙ্গদর্শন পত্রিকার ‘শেষ কথা’ কবিতায় কবি লিখলেন, “তোমার সংসার মাঝে, হায়, তোমাহীন/ এখনো আসিবে কত সুদিন-দুর্দিন-/ তখন এ শূন্য ঘরে চিরাভ্যাস টানে/তোমারে খুঁজিতে এসে চাব কার পানে”।
কবির এই যে বেদনা, ঘরের অন্তরালে নিঃশব্দচারিণী মৃণালিনীকে হারিয়ে ফেলার এই যে অনুভূতি, তার মধ্যেও কিন্তু কোনও অতিশয়োক্তি নেই। স্ত্রীকে কবি কতটা গভীরভাবে ভালবাসতে পেরেছিলেন, তার পরিমাপ বিতর্কিত।
কবির এই যে বেদনা, ঘরের অন্তরালে নিঃশব্দচারিণী মৃণালিনীকে হারিয়ে ফেলার এই যে অনুভূতি, তার মধ্যেও কিন্তু কোনও অতিশয়োক্তি নেই। স্ত্রীকে কবি কতটা গভীরভাবে ভালবাসতে পেরেছিলেন, তার পরিমাপ বিতর্কিত। তবে স্ত্রীর অকালমৃত্যুতে তিনি যে গভীরভাবে শোকগ্রস্ত হয়েছিলেন, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। (Rabindranath Tagore)
হয়তো রবীন্দ্রনাথ তাঁর স্ত্রীকে কোনওদিনই সঠিকভাবে ‘আবিষ্কার’ করতে পারেননি। মৃণালিনী চিরদিনই রয়ে গিয়েছেন ‘সাধারণ মেয়ে’ রূপে, সংসারের গৃহিণী, কল্যাণময়ী গৃহবধূ হিসেবে। আক্ষরিক অর্থে সংসারের যূপকাষ্ঠে নিজেকে প্রায় বলি দিয়েছিলেন মৃণালিনী। স্বামীর বৃহত্তর কাজেও অন্তরালে থেকে মস্ত সহায়ক হয়ে উঠেছেন। সবটাই করেছেন নিঃস্বার্থভাবে, ফলের আশা না রেখে। এখানেই মৃণালিনীর মহত্ব, যাঁর স্মৃতি আজও সমুজ্জ্বল ইতিহাসের পাতায়। (Rabindranath Tagore)
তথ্যসূত্র: ‘ভাই ছুটি স্ত্রীকে লেখা রবীন্দ্রনাথের চিঠি’ – সম্পাদনা: অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য, ছিন্নপত্রের রবীন্দ্রনাথ – হীরেন চট্টোপাধ্যায়
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
পেশা শুরু হয়েছিল সাংবাদিকতা দিয়ে। পরে নামী ইস্কুলের বাচ্চাদের দিদিমণি। কিন্তু লেখা চলল। তার সঙ্গে রাঁধা আর গাড়ি চালানো, এ দুটোই আমার ভালবাসা। প্রথম ভালবাসার ফসল তিনটি বই। নানা রাজ্যের অন্নব্যঞ্জন, মছলিশ আর ভোজনবিলাসে কলকাতা।
