(Salil Chowdhury)
বিশ শতকের গোড়ায় বাংলা গানের গড়নে বড়সড় বদল এনেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ধ্রুপদের গঠনে স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী আর আভোগের আগমন অনন্য এক রূপ এনে দিয়েছিল। কিন্তু রবীন্দ্র-অধ্যায় তো শেষ হল এক সময়। তারপর? অনেকটা যেন এই প্রশ্নেরই জবাব হয়ে এলেন সলিল চৌধুরী। বাংলার অন্যতম সেরা গীতিকার, সুরকার। বাংলা গানের জগতে নতুন ঢেউ তুললেন এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পী। (Salil Chowdhury)
সলিল চৌধুরী শ্রোতাদের পরিচয় করালেন নতুন ধরনের দীর্ঘ গানের সঙ্গে। যার লয় বদলায়, ছন্দ বদলায়, এমনকী সপ্তকও বদলে বদলে যায়। ‘গাঁয়ের বধূ’, ‘রানার’ থেকে ‘পাল্কীর গান’, গণসঙ্গীত— ‘বাংলাগানের স্বর্ণযুগ’ শুরু হল এই মায়েস্ত্রোর হাত ধরে। বাঙালি তথা ভারতীয় সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে সলিল চৌধুরী এক গুরুত্বপূর্ণ ‘অ্যালবাম’ বললেও কম বলা হয়। তাবৎ বাঙালির মতোই সেই তালিকায় শৈশব থেকেই ছিলাম আমিও। (Salil Chowdhury)
মায়ের কাছে ঘুমপাড়ানি গান শোনার মধ্যে দিয়ে প্রথম পরিচয় সলিল চৌধুরীর কম্পোজিশনের সঙ্গে। ঘুমপাড়ানির তালিকায় একটি গান নিয়মিত থাকত– ‘ঝিলিক ঝিলিক ঝিনুক খুঁজে পেলাম/ তোমায় তা দিলাম’। এই লিরিক্সের গভীরে কী আছে, তা বোঝার মতো বুদ্ধিশুদ্ধি তখনও হয়নি। তবে ‘তা দিলাম…’- এর সুর শৈশব দখল করেছিল দীর্ঘকাল। (Salil Chowdhury)

বেশ বুঝতে পারতাম, এই গানের সুরকার যে-ই হোন না কেন, তিনি রবীন্দ্র-নজরুলের অনুসারী নন। তাঁর সুরের আলাদা ‘ব্যক্তিত্ব’, একটা রক্তমাংসের মানুষের মতো যেন বলে উঠছে— ‘আমি আছি, আমি থাকব, আমি অনন্য’। পরে গানটি রেকর্ডে শোনার সময়, পাথরে পাথরে ঠিকরে চলা পাহাড়ি নদীর মতোই সুরটি আবার ফিরে এল আমার কাছে। গায়িকাদের মধ্যে বরাবরই সন্ধ্যা-গীতা-উৎপলা-আল্পনাদের কণ্ঠ বেশি প্রিয়। তাই হয়তো কোথাও একটু অপূর্ণতা রয়ে গেল। (Salil Chowdhury)
একটু বড় হওয়ার পরে, আবার নতুন করে পেলাম সলিল চৌধুরীকে। তখন স্কুল থেকে ফিরেই রোজ Sony Cassette Recorder চালিয়ে দিতাম। সে এক অদ্ভুত মায়াবী জগত। ওই আশ্চর্য যন্ত্রটির কিছু বোতাম টিপে দিলেই বেরিয়ে আসত ‘ঠাকুমার ঝুলি’, ‘হিংসুটে দৈত্য’, ‘এক এক্কে এক’-এর মতো অলৌকিক সব জিনিস। আর থাকত ১, ২, ৩ ছাপ মারা তিনটি ক্যাসেট, যাতে শুধু সলিলের গান। গায়ক-গায়িকার মেলা তাতে, কে নেই সেখানে! সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় থেকে বাণী ঘোষাল, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় থেকে বিশ্বজিৎ। (Salil Chowdhury)
গানটির প্রথম অংশ শুনলে স্পষ্ট বোঝা যায়, Beethoven-এর Fifth Symphony সলিলকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। Symphonyটির প্রথম phrase আর গানটির শুরু প্রায় এক বললেই চলে।
এছাড়া ছিল অন্তরা চৌধুরীর গাওয়া ছোটদের গানের ক্যাসেট। সলিল-যজ্ঞের শতবর্ষে ছোটদের গানগুলির কথা না বললে, তাঁর মূল্যায়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ‘ও সোনা ব্যাঙ, ও কোলা ব্যাঙ’ না শুনলে অনেকেরই ছোটবেলা খুব একঘেয়ে হত, এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। এখানেও সলিল চৌধুরী তাঁর নিজস্বতায় অনন্য। ছোটদের গানের কথা আর সুরের মজার ফাঁকে ফাঁকেই ঝলকে ওঠে তাঁর শানিত ব্যঙ্গ। (Salil Chowdhury)
কৈশোর পার হলে সকলেরই, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত বাঙালিদের ‘পাকামি’তে পায়। বিভিন্ন ব্যাপারে তৈরি হয় ‘critical’ দৃষ্টিভঙ্গি। স্বাভাবিকভাবেই, তখন মনে হল, যে সলিল বা রবীন্দ্রনাথ সাধারণত আলোচিত হন, তাঁদের পাশ কাটিয়ে ‘অন্য সলিল’ অথবা ‘অন্য রবীন্দ্রনাথ’কে খুঁজে বের করা প্রয়োজন। (Salil Chowdhury)

সম্ভবত, স্কুলের উঁচু ক্লাসে বা সদ্য কলেজে ঢোকার পরে একটি সিডির সন্ধান পেলাম, তাতে লেখা ‘অন্য সলিল’। ক্যাসেটের দাবি অনুসারে, তাতে ‘না যেয়ো না’ বা ‘রানার’ ছিল না। ছিল ‘এবার আমি আমার থেকে আমাকে বাদ দিয়ে’, যার গায়ক শচীন গুপ্তকে আমরা ভুলে গেছি। আর ছিল তাজ্জব করে দেওয়া সব গণসঙ্গীত। যেমন একটি গান ‘ঢেউ উঠছে কারা টুটছে’। গানটির প্রথম অংশ শুনলে স্পষ্ট বোঝা যায়, Beethoven-এর Fifth Symphony সলিলকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। Symphonyটির প্রথম phrase আর গানটির শুরু প্রায় এক বললেই চলে। ওই ক্যাসেটেই ছিল মাধুরী চট্টোপাধ্যায়ের গাওয়া একটি গান ‘ওই যে সবুজ বনবীথিকায়’। গানের interlude-এ ঝর্ণাধারার মতো অনায়াসে বইছে Beethoven-এর Sixth Symphony। যাকে Pastoral Symphony বলা হয়, তার একটি phrase। পড়তে কিছুটা যান্ত্রিক লাগলে দুঃখিত, সলিলকে বুঝতে গেলে এগুলি বলতেই হয়। তেমনই, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে গীত ‘যদি নাম ধরে তারে ডাকি’, Mozart-এর 40th Symphony দ্বারা গভীরভাবে অনুপ্রাণিত। যার ছত্রে ছত্রে রয়েছে আমাদের মার্গসঙ্গীতের চলন। ‘ভারতীয় কানে’ (যদি এরকম কোনওকিছুর অস্তিত্ব থাকে) তাই একেবারেই তা বেমানান লাগে না। (Salil Chowdhury)
সলিল চৌধুরীর অন্তঃসলিলা সুরগুলির উৎস সন্ধানের পাশাপাশি দরকার সবিতা চৌধুরীকেও স্মরণ করা। গায়িকার গানগুলি মন দিয়ে শুনলে বোঝা যায়, সুর নিয়ে কী ধরনের experiment করেছিলেন বিখ্যাত এই বাঙালি সুরকার। যেমন অবশ্যই উল্লেখ্য ‘যা রে যা আমার আশার ফুল ভেসে যা’। ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত প্রিয় এই গান সম্প্রতি নতুনভাবে পুনরাবিষ্কার করে চমকে উঠতে হল। (Salil Chowdhury)

কেরলের ধীবরদের নিয়ে থাকাজি শিবশঙ্কর পিল্লাইয়ের লেখা বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত মালয়ালি চলচ্চিত্র ‘চেম্মীনে’-ও সুর দিয়েছিলেন সলিল। সিনেমার এক অংশে মান্না দে-র গাওয়া ‘মানসা মাইনে ভারু’ গানটির interlude-এ সুর হিসেবে ‘যা রে যা আমার আশার’ গানটির সুর ব্যবহার করেছিলেন সলিল চৌধুরী! শুধু বাংলা নয়, মুম্বই থেকে দক্ষিণ ভারত, সর্বত্র ছিল তাঁর অনায়াস বিচরণ। (Salil Chowdhury)
তিনি আমাদের সাহস দেন, নতুন নতুন চ্যালেঞ্জকে যেচে ডেকে নিতে, আত্মবিশ্বাস দেন নিজের মতো করে সেইসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার পথ খুঁজে নিতে। সঙ্গীতে, সমাজে, ব্যক্তিজীবনে, এমনকী রাজনৈতিক জীবনেও।
পরিশেষে, YouTube-এ উপলব্ধ সলিল চৌধুরীর একটি দুর্লভ বক্তৃতা নিয়ে না বললেই নয়। ‘Grammar of Orchestration in Indian Music’ শীর্ষক এক ভিডিয়োর শেষাংশে এক অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দেন সুরকার। ওই ‘সুরের খেলা’ই গানের জগতে তাঁর আসন চিনিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। (Salil Chowdhury)

বাখ-এর এক বিখ্যাত কম্পোজিশনের বিশেষ অংশ সলিল চৌধুরী বেছে নিয়েছিলেন খানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য। ভিডিয়োতে দেখা যাচ্ছে, প্রথমে তিনি অন্তরা চৌধুরীকে পিয়ানোতে সেই অংশটি বাজাতে বললেন। এরপরই ঘটল সেই আশ্চর্য কাণ্ড। দেবজ্যোতি মিশ্রের বেহালায় বাখ-এর কম্পোজিশনের সেই অংশের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বেজে উঠল সলিল-সৃষ্ট কম্পোজিশন! না বলে দিলে, কারও পক্ষে বোঝা সম্ভব নয় ওটি এক বঙ্গসন্তানের কীর্তি, পাশ্চাত্য মার্গসঙ্গীতের কোনও তথাকথিত ক্লাসিক নয়! বাখ-এর কম্পোজিশনের অংশটি যদি ‘সমস্যা’ হয়, ‘চ্যালেঞ্জ’ হয়, সলিল চৌধুরীর অংশটি হল সেটির ‘সমাধান’ বা ‘জবাব’। এটাই সলিল চৌধুরীর আসল ‘সুর’। তিনি আমাদের সাহস দেন, নতুন নতুন চ্যালেঞ্জকে যেচে ডেকে নিতে, আত্মবিশ্বাস দেন নিজের মতো করে সেইসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার পথ খুঁজে নিতে। সঙ্গীতে, সমাজে, ব্যক্তিজীবনে, এমনকী রাজনৈতিক জীবনেও। এই বিশেষত্বের কারণেই সম্ভবত বাংলা গানের জগতে সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে তিনি পৃথকভাবে স্মরণীয়। (Salil Chowdhury)
মুদ্রণ ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
স্বপ্নসোপান দত্ত এখন রসায়নে পি এইচ ডি'র জন্য গবেষণারত। কিন্তু বিজ্ঞান ছাড়াও বিভিন্ন বিষয়ে প্রখর আগ্রহ, তার একদিকে পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সঙ্গীত,স্বর্ণযুগের বাংলা গান ও সংস্কৃতি আর ফিল্ম, বিশেষ করে সত্যজিতের সৃষ্ট ছবি, আবার অন্যদিকে য়ুরোপের ইতিহাস ও তার বিভিন্ন দেশের রন্ধনশৈলী, আর এই দুইয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু। এইসব নিয়ে একাধিক লেখা বেরিয়েছে 'সমতট', 'জনবিজ্ঞানের ইস্তাহার', 'সাম্পান' ইত্যাদি পত্রিকায়।
