Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

একালের ইন্দ্রনাথ

সুমিত্রা দেবনাথ

মার্চ ১০, ২০২৬

Sundarban Night
Bookmark (0)
Please login to bookmark Close
(Sundarban)

হঠাৎ একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। বেশ কয়েক বছর আগের কথা। সেবামূলক সংগঠন ‘লায়ন্স ক্লাব অব রানাঘাট ওয়েস্ট’-এর উদ্যোগ ও আয়োজনে আমরা দশ-পনেরো জন গিয়েছি সুন্দরবনে একটা সার্ভিস প্রোগ্রাম করতে। সে’বার জেনে অবাক হয়েছিলাম সুন্দরবনের ‘উইডো গ্রাম’-এর কথা। মধু সংগ্রহে গিয়ে অনেক গ্রামবাসী চিরতরে বাঘের পেটে হারিয়ে যায়। স্বামীহারা সেইসব স্ত্রী একত্রে ‘উইডো গ্রামে’ বাস করে। তাদের ও তাদের ছেলেমেয়েদের লড়াই ও যন্ত্রণার কথা সে’দিন হতবাক করেছিল।

সেবামূলক কাজের পরদিন ইঞ্জিনচালিত বড় নৌকায় কয়েকটি জায়গা একটু ঘুরতে বেরিয়ে ছিলাম। যাত্রা শুরুর সময়ে জোয়ারের জলে নদী কানায় কানায় ভর্তি। ঝড়খালির ফরেস্ট বাংলোর প্রায় গা ছুঁয়ে বোটে চড়েছিলাম। ভরন্ত যৌবনা মাতলা নদী। চারদিকে শুধু জল আর জল। মূল নদী থেকে অনেক খাঁড়ি বের হয়েছে কিছু দূর পরপর। সেগুলোও জলে টইটুম্বুর। দুই পাড়ে বিস্তৃত বাদাবন। লবনাম্বু উদ্ভিদের শ্বাসমূল ও ঠেসমূলের অদ্ভুত সব গড়ন।


আরও পড়ুন: রঞ্জু ভ্যালি, এক মনভোলানো অচিনগাঁও – প্রথম পর্ব


জলে ভেসে ভেসে দিন গড়িয়ে একসময় বিকেল হল। সারাদিনের খাওয়াদাওয়ার আয়োজন ছিল বোটেই। ‘তাড়াতাড়ি চালাও’ হঠাৎ কার্তিকদার উদ্বিগ্ন কন্ঠস্বর। রোগা, কালো, লম্বা পিটানো গড়ন মানুষটার দিকে তাকালাম। উনিই ঝড়খালিতে আমাদের স্থানীয় যোগাযোগ ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যম ছিলেন। হাসিখুশি, অতিথিপরায়ণ।

কিন্তু সারাদিনে চুপচাপ থাকা মানুষটা পড়ন্ত বিকেলে হঠাৎ কেন এত ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলেন, বুঝতে পারলাম না। তখন বেলাশেষে দিগন্তসীমার বাইরে হারিয়ে যেতে বসেছে সূর্য। আকাশের ক্যানভাসে আবির রঙের লুটোপুটি। লাল রঙের মায়াবী ছটাকে নদীর জলেও রক্তিম তরঙ্গের দোলা। বোটের ডেকে বসে সেই আলোর জাদুতে মন মজিয়ে বসে আছে সবাই।

Sundarban Night
স্বামীহারা সেইসব স্ত্রী একত্রে ‘উইডো গ্রামে’ বাস করে, তাদের ও তাদের ছেলেমেয়েদের লড়াই ও যন্ত্রণার কথা সে’দিন হতবাক করেছিল

‘যা…গেল…গেল…সব শুকিয়ে গেল…!’

কার্তিকদার আতঙ্কিত চিৎকারে সবাই অবাক হয়ে তাকাল। কার্তিকদার অঙ্গুলি সংকেত জলের দিকে। দেখি তপ্ত তৃষিত মরুভূমির মতো ভাঁটার টান নদীতে। কে যেন নদী ও খাঁড়ির জল চোঁ চোঁ করে শুষে নিচ্ছে। কয়েক মুহূর্তে জল চারপাশ থেকে উধাও। সদ্য যৌবন হারানো নদী তখন বার্ধক্যে জড়জড়! চারিদিকে শুধু কালো কাদার রাজ্য। তার মধ্যে বড়সড় শরীর নিয়ে আমাদের জলবাহন আটকে।

অনেকের কন্ঠে আতঙ্ক, ‘এখন উপায়? বাংলোয় ফিরব কি করে?’

‘কিচ্ছুটি করার নেই গো, বাবু। আইজগা বোটির মধ্যিই নাত্তিরটা কাডাইতে হবে। ভয় কিবল একডাই। উই জঙ্গুলির মধ্যি দি হঠাৎ আসা লাল হলুদ ডোরাকাডা তিনারে।’

মাঝির চোখ পাকিয়ে বলা এই কথার পরে সবার মুখে কুলুপ। পরদিন ভোরবেলা পর্যন্ত নিজেদের পরিণাম চিন্তায় ভীত। রাত বারোটার পরে জোয়ার আসবে।

মাঝির চোখ পাকিয়ে বলা এই কথার পরে সবার মুখে কুলুপ। পরদিন ভোরবেলা পর্যন্ত নিজেদের পরিণাম চিন্তায় ভীত। রাত বারোটার পরে জোয়ার আসবে।

ধীরে ধীরে একসময়ে অন্ধকারের চাদরে ঢাকা পড়ে চারপাশ। দ্বিতীয়ার চাঁদের ক্ষীণ আলোয় নদীবক্ষ ও দূরের আবছায়া বাদাবন আরও রহস্যময়। জোনাকির ঝিকিমিকি আলো কার আগমনের সংকেত এনে, আবার দূরে চলে যাচ্ছে। থমথমে পরিবেশ। মরা নদীখাত ছুঁয়ে কেবল নোনা হাওয়া বইছে শন্ শন্ করে।

Sundarban Night
যাত্রা শুরুর সময়ে জোয়ারের জলে নদী কানায় কানায় ভর্তি

‘আর ডেকির উপর থাইকবেন না। নীচে লেমে আসুন…’ মাঝির নির্দেশে সবাই বোটের নিচের তলে। ঠিক যেন বোটের পেটের ভিতরে ঢুকে আত্মরক্ষার চেষ্টা। তার মধ্যে ভয় দূর করে মনটা অন্যদিকে ঘোরাতে ভাই সুব্রত মজার গল্প বলা শুরু করল। কেউ খুশি, কেউ ক্ষুব্ধ। এক একজনের এক একরকম প্রকাশ। গোপালদা তো বিপদের মধ্যে হাসিঠাট্টায় রেগেমেগে দু’কথা শুনিয়েই দিল। একটু একটু করে নরমে গরমে পরিবেশটা বাধ্য হয়ে মানিয়ে নিতে চেষ্টা করছে সবাই। তখন রাত দশটা। হঠাৎ…

‘ঝপাঝপ…ঝলাৎ…ঝলাৎ…’

শব্দ ভেসে এল দূর থেকে। সবার কৌতূহলি কান সেদিকে। বোটের ভিতরে শুধু আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ। অন্ধকারে মুখগুলো পড়া যাচ্ছে না। নিশ্চিত সবাই বাঘমামার আগমন সম্ভাবনায় ভীত-সন্ত্রস্ত। মানবসেবা করতে এসে যে, নিজেদেরই বাঘের সেবায় প্রাণ দিতে হবে, তা কে আর ভেবেছিল। ‘আহা! জীবসেবায় আত্ম বলিদান। মন্দ নয় মোটেই!’ মজা করে আমি কথাটা বলতে গিয়েও অর্ধেকটা বলে গোপালদার কটমট করে তাকানো দেখে চুপ করে গেলাম।

মাঝি কোনও কথা না বলে, ফস্ করে দেশলাই ধরিয়ে লন্ঠনটা জ্বালালো। মুখে একটা ধরানো বিড়িও গুঁজে নিল। আলোর রেখায় তাঁর লড়াকু মুখের শিরা-উপশিরা আরও ফুলে উঠেছে বলে যেন মনে হল।

Sundarban Night
‘কিচ্ছুটি করার নেই গো, বাবু। আইজগা বোটির মধ্যিই নাত্তিরটা কাডাইতে হবে। ভয় কিবল একডাই। উই জঙ্গুলির মধ্যি দি হঠাৎ আসা লাল হলুদ ডোরাকাডা তিনারে।’

‘বসে থাকুন বাবুরা…না ডাইকলে ওপরডায় আইসবেন নাকো। মুই সমুদ্দিটার ভাব বুঝি আসি…।’ অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে ধীরে পায়ে উপরে উঠে গেল সে। লবণ জলের জীবনে হিংস্র প্রাণী ও শত অভাবের সঙ্গে লড়াই করে ওরা এমন সাহসী ও নির্বিকার।

কয়েক পল নিস্তব্ধতা। তারপর ‘ক্যাঁ ক্যাঁ’ শব্দ করে একটা প্যাঁচা অজানা আতঙ্কের মাত্রা বাড়িয়ে দূরে কোথায় ছুটে গেল। ডেকের উপরে নানা শব্দ উঠছে বারবার। কিছুই বোঝা যাচ্ছে না নিচের তলায় বসে থেকে। অধৈর্য ও আশঙ্কার পারদ ক্রমশ বাড়ছে।

কানকে তো বিশ্বাস হচ্ছে না মোটেই। এই অন্ধকারে কখন আমাদের না বলে চলে গিয়েছিলেন। আবার, দেবদূতের মতো আলোর নিশানা নিয়ে হাজির হলেন। সবাই বুকে বল পেয়ে একছুটে ডেকের উপর।

এমন সময়ে কার্তিকদার কন্ঠস্বর‌। ‘আর এখানে রাত কাটাতে হবে না। সব ব্যবস্থা হয়ে গিয়েছে। চলে আসুন সবাই।’

কানকে তো বিশ্বাস হচ্ছে না মোটেই। এই অন্ধকারে কখন আমাদের না বলে চলে গিয়েছিলেন। আবার, দেবদূতের মতো আলোর নিশানা নিয়ে হাজির হলেন। সবাই বুকে বল পেয়ে একছুটে ডেকের উপর।

Sundarban Night
ডেকের উপরে নানা শব্দ উঠছে বারবার

দেখি, হাটুডোবা কাদায় একটা ছোট্ট নৌকা নিয়ে হাজির কার্তিকদা। মুখে বিশ্বজয়ের হাসি। লন্ঠনের আলোয় তাঁর কালো ক্ষয়াটে মুখের সাদা দাঁতগুলো চকচক করছে। একটা ছোট্ট কাপড় কোমরে ততোধিক ছোটো করে জড়ানো। আদুর গা। হাতে বড় একটা বাঁশ। উঁচু বোট থেকে নৌকায় নামার জন্য আরও দুটো বাঁশ পেতে দিয়েছেন। বিস্ময়ের ঘোর কাটছে না। এই আঁধার রাতে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে কীভাবে করলেন এসব।

সেই উঁচু অংশের দিকে তাকিয়ে ভাবছি, অত উঁচু থেকে নৌকাটা নামালো কি করে? প্রশ্নটা করতেই কার্তিকদার দাদা একগাল হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘বাঁশে বান্ধি দুজনে টানি নামায়ছি। এক্কেবারে শেষডায় কাত্তিক আছাড় খালো। কোমরে এট্টু লাইগছে…।’ এসব শুনে সে’রাতে বিস্ময়ের ঘোর কাটেনি।

তখনও অবাক হওয়ার বাকি ছিল। একে একে সবাই ছোট ডিঙিটায় চড়ে তো বসলাম। কিন্তু নৌকা চলবে কী করে? চারদিকে তো থইথই কাদা। মাঝি নৌকার পিছন থেকে ঠেলতে লাগল। কার্তিকদা প্রায় হাটুডোবা কাদার মধ্যে সেটিকে টেনে নিয়ে চললেন। এতজনের ভারে তাঁর লম্বা শরীরটা কাশফুলের মতো বেঁকে যাচ্ছে। তবু তিনি হাল ছাড়ার পাত্র নন। অন্তত ত্রিশ পা এভাবে চলে নৌকটাকে খাঁড়ির অল্প জলে নিয়ে ফেললেন। সেই জল-কাদা, বাঘ ও সাপের বিপদের মধ্যে তিনি একাকী নৌকার গুণ টেনে চললেন। তাঁকে দেখে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের সাহসী ইন্দ্রনাথের কথা মনে পড়ল। ভিনদেশি মানুষদের প্রাণে বাঁচাতে নিজের জানটা তাঁর কাছে নেহাৎ তুচ্ছ বিষয়।

কার্তিকদার আতঙ্কিত চিৎকারে সবাই অবাক হয়ে তাকাল। কার্তিকদার অঙ্গুলি সংকেত জলের দিকে। দেখি তপ্ত তৃষিত মরুভূমির মতো ভাঁটার টান নদীতে

বহুবার পথে এরকম জীবন পথিকের দেখা মিলেছে। চলার পথে আমরা যখন কোনও বিপদে পড়ি; অথবা জীবনে ভয়ানক ঝড় আসে, পথ খুঁজে পাই না, কষ্ট পাই; একটা আলোর ঠিকানার জন্য মাথা কুটে মরি, ঠিক তখনই আলোর নিশানা নিয়ে হাজির হন কোনও জীবনদেবতা। তাঁদের কথায়-কাজে বিশেষ কোনও বার্তা থাকে। সেই আলোকবর্তিকা আমাদের অন্ধকার পথে নতুন করে আলো দেখায়। সেদিন কার্তিকদাও আমাদের কাছে সেই আলোর নিশানা নিয়ে হাজির হয়েছিলেন।

‘দিন দিদি। কলটা আমি চেপে দিচ্ছি। এক হাতে হবে না। আপনি দু’হাতে ঘষুন। এ তো পলিমাটি। খুব আঁঠা…।’ কার্তিকদার কথায় নিজের ভাবনা থেকে সরে আসলাম। দেখলাম, একমুখ হাসি নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছেন কলের পাড়ে, সকলকে সাহায্য করতে। ছেঁড়া মশারির কয়েকটা টুকরো অতিথিদের হাতে তুলে দিয়েছেন। মশারির নেট ছাড়া সেই কাদা ঘষে তোলা কষ্টকর। আসলে খাঁড়ির শেষে বাংলো অনেকটা উঁচু পাড়ের ওপারে। জল থাকলে পাহাড় সমান এই পাড়গুলোকে বোঝা যায় না। অন্য সময় এগুলো প্রাচীরের মতো মাথা তুলে দাঁড়ায়। সেই পথটা জুতো খুলে কাদার মধ্যেই হেঁটে উঠতে হয়েছিল।

Sundarban Night
লবণ জলের জীবনে হিংস্র প্রাণী

সেই উঁচু অংশের দিকে তাকিয়ে ভাবছি, অত উঁচু থেকে নৌকাটা নামালো কি করে? প্রশ্নটা করতেই কার্তিকদার দাদা একগাল হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘বাঁশে বান্ধি দুজনে টানি নামায়ছি। এক্কেবারে শেষডায় কাত্তিক আছাড় খালো। কোমরে এট্টু লাইগছে…।’ এসব শুনে সে’রাতে বিস্ময়ের ঘোর কাটেনি।

কিন্তু রাতের হাত ছেড়ে একই নিয়মে নোনাজলের দেশে ভোর হয়েছিল। সেদিন দু-তিন জন ছাড়া সবাই ঘুম থেকে দেরি করে উঠেছিল আলসেমিতে। কয়েক ঘণ্টা পরেই তো ফিরতে হবে সেই শহুরে ব্যস্ততা ও কোলাহলের পৃথিবীতে। তার আগে শান্তি ও নির্জনতার জল হাওয়ায় যতটুকু চুপচাপ থাকা যায়।

ছেঁড়া ধুলোমাখা প্যান্ট পরনে। মুখে প্রাণ জুড়ানো হাসি। ‘নেই নেই’-এর মধ্যে সামান্য পেয়ে খুশি থাকতে এরা ছোটবেলা থেকেই শিখে ফেলে। হাত তুলে ডাকতেই ছুটে এল। মুঠিভরা লজেন্স পেয়ে, হেসে কলকল করতে করতে, দে ছুট্ বাড়ির পথে।

কেবল আমরা তিনজন ভোরের লাজুক রোদ্দুর গায়ে মেখে পায়ে পায়ে এগিয়েছিলাম নদীর কাছটায়। বাতাসে শীতের আমেজ। সুন্দরী, গরান, গেঁওয়ার গা ছুঁয়ে নদীতে তখন ছোট ছোট ঢেউয়ের দোলা। পাড়ে বাঁধা নৌকাগুলো সেই দোলায় ভেসে যেতে চাইছে সুদূরের টানে। শুকনো ডাঙায় আটকে একটা ভাঙা নৌকা। তাতে বসে হাতে লাঠি নিয়ে গ্রামের চারটে ছোট ছেলে নৌকা চালানোর ভান করে খেলছে। তাদের খালি গা। ছেঁড়া ধুলোমাখা প্যান্ট পরনে। মুখে প্রাণ জুড়ানো হাসি। ‘নেই নেই’-এর মধ্যে সামান্য পেয়ে খুশি থাকতে এরা ছোটবেলা থেকেই শিখে ফেলে। হাত তুলে ডাকতেই ছুটে এল। মুঠিভরা লজেন্স পেয়ে, হেসে কলকল করতে করতে, দে ছুট্ বাড়ির পথে।

হঠাৎ চেনা কন্ঠস্বর কানে আসতেই নদীর বাঁকটায় এগিয়ে গেলাম। দেখি খাঁড়িতে সবে পৌঁছানো এক বোটের মাঝির সঙ্গে কী নিয়ে দরদাম করছেন কার্তিকদা। আমাদের দেখে থেমে গেলেন। কাছেই দোকান থেকে চা খাওয়ালেন। গল্প করতে করতে সঙ্গে নিয়ে আশপাশটা ঘোরালেন। তারপর আমরা বাংলোমুখো। ফেরার গোছগাছ শুরু। কেটে গেল বেশ কিছুটা সময়।

Sundarban Night
লবনাম্বু উদ্ভিদের শ্বাসমূল ও ঠেসমূলের অদ্ভুত সব গড়ন

তখন দুপুর ১২টা বাজে। ঝড়খালির বারান্দায় সবাই একসঙ্গে খেতে বসেছি। কাগজের থালায় মোটা চালের ভাতের উপর পাতলা মুসুরির ডাল। একপাশে মাখা আলুসেদ্ধ। খুব বেশি আশা ছিল না। গরম ডাল ভাত পেটপুরে খাচ্ছি। হঠাৎ কার্তিকদা একটা গামলা থেকে প্রত্যেকের পাতে একটা করে ইলিশ মাছের টুকরো ও ঝোল দিতে লাগলেন। খাবে কী, সবাই তো অবাক হয়ে কার্তিকদাকে দেখছে। বাড়িতে যার রোজ মাছ জোটে না, নিজের সামান্য রোজগার, বাবুদের কাছে গ্রামের মান রাখতে তিনি ইলিশ মাছ পাতে দিয়েছেন। এতটুকু হিসেব করেননি। নিজের গ্রামের সম্মান তাঁর কাছে অনেক বড় বিষয়। মনে পড়ে গেল, সেই কাকভোরে উনি অতিথিদের জন্য ইলিশ মাছের ব্যবস্থা করতে গিয়েছিলেন। এখানেই শেষ নয়, সুন্দরবনের খাঁটি মধুও সঙ্গে দিয়েছিলেন।

Sundarban Night
‘নেই নেই’-এর মধ্যে সামান্য পেয়ে খুশি থাকতে এরা ছোটবেলা থেকেই শিখে ফেলে

‘দিদি, ভাল আছেন তো? সুব্রতদা ভাল আছে? মনে পড়ে সেই ঝড়খালির দুটো দিন। আপনাদের পায়ের ধুলো পড়েছিল আমাদের শত অভাবের পোড়া দেশে…’ এবারে দুর্গাপুজোর পরে হঠাৎ একদিন কার্তিকদার ফোন পেয়ে আবার নতুন করে সাহসী ইন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা হল অতীত স্মৃতির পাতা উল্টে।

মনের চোখে ভেসে ওঠে সুন্দরবনের একালের লড়াকু ইন্দ্রনাথের কাহিনি। মাতলা নদীর জলে জোয়ার ভাঁটা খেলা করে। ঝড় এসে ম্যানগ্রোভে আঘাত করে। বারে বারে ভাঙে ঘর।

‘দিদি, আসবেন নাকি এই শীতে? কতদিন দেখা হয় না…’ কার্তিকদা কথা বলে চলে। তাঁর কথায় গ্রাম্য ভাষার এতটুকু টান নেই। গ্রামের ছেলে পড়াশোনা করে শুদ্ধ বাংলায় কথা বলে। কিন্তু লেখাপড়া শিখে গ্রাম ছেড়ে যায়নি।

Sundarban Night
বাতাসে শীতের আমেজ। সুন্দরী, গরান, গেঁওয়ার গা ছুঁয়ে নদীতে তখন ছোট ছোট ঢেউয়ের দোলা

আমি শুনি। অন্যমনস্ক হয়ে কিছু উত্তরও দিই। আর মনের চোখে ভেসে ওঠে সুন্দরবনের একালের লড়াকু ইন্দ্রনাথের কাহিনি। মাতলা নদীর জলে জোয়ার ভাঁটা খেলা করে। ঝড় এসে ম্যানগ্রোভে আঘাত করে। বারে বারে ভাঙে ঘর।নোনাজলের দেশের ইন্দ্রনাথেরা নতুন করে মাটিতে বাঁধ দেয়। ঘরে ছাউনি তোলে। অনেক অভাব তাদের। তবুও তারা সুন্দরবনে সুন্দরের সন্ধান জারি রাখে।

তখনও ফোনের ওপারে গলার স্বরে আবেগের বন্যা, ‘এবার আসলে আপনাদের বৌমা কাঁকড়ার ঝোল রান্না করবে বলেছে…।’ কথা শেষ হয় না। শব্দের ভেলায় আমি ভাসতে থাকি অতীত স্মৃতি ও বর্তমান ভালোবাসার সাগরে।

চিত্রঋণ: উইকিমিডিয়া কমনস, ব্রিটানিকা

মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Sumitra Debnath Author

পেশায় শিক্ষিকা। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে পর্বত পদযাত্রী, পর্বতারোহী ও ভ্রামণিক এবং এই বিষয়ক লেখিকা।

Picture of সুমিত্রা দেবনাথ

সুমিত্রা দেবনাথ

পেশায় শিক্ষিকা। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে পর্বত পদযাত্রী, পর্বতারোহী ও ভ্রামণিক এবং এই বিষয়ক লেখিকা।
Picture of সুমিত্রা দেবনাথ

সুমিত্রা দেবনাথ

পেশায় শিক্ষিকা। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে পর্বত পদযাত্রী, পর্বতারোহী ও ভ্রামণিক এবং এই বিষয়ক লেখিকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Subscribe To Newsletter

কথাসাহিত্য

জীবনানন্দ দাশ

সংস্কৃতি

আহার

অমৃতা ভট্টাচার্য
শ্রুতি গঙ্গোপাধ্যায়
অমৃতা ভট্টাচার্য

বিহার

সুমিত্রা দেবনাথ
কাকলি মজুমদার
মধুছন্দা মিত্র ঘোষ

কলমকারী

ফোটো স্টোরি

নির্মাল্য চ্যাটার্জি
দেবার্চন চ্যাটার্জি

উপন্যাস

বিতস্তা ঘোষাল
বিতস্তা ঘোষাল
[adning id="384325"]
[adning id="384325"]

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.
  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.
  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.
  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).
  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

 

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com