Tags Posts tagged with "বাংলা উপন্যাস"

বাংলা উপন্যাস

হয় আমি নয়তো ও, চলে যেতে হবে অন্য স্কোয়াডে। মাঝেমধ্যে দেখা হবে সময় সুযোগ মতো। এই যুদ্ধপরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন দুজনের একসঙ্গে থাকাটা অনেক অসুবিধে সৃষ্টি করে। ডেকে আনতে পারে এমন অনেক বিপদকে যা পুরো স্কোয়াড এমনকি পার্টিকেও সমস্যায় ফেলতে পারে। আগের বহু অভিজ্ঞতা থেকে এটা শিখেছিলাম আমরা। আমিও ভালোভাবে জানতাম নিয়মটা। তবুও জুনা চলে যাবে – কথাটা ভাবলেই মোচড় দিয়ে উঠতো বুকের মধ্যে। সে এক দমফাটা কষ্ট। কাউকে বলতে পারতাম না। এমনকি জুনাকেও না। আর জুনা। অদ্ভুতরকম পাল্টে গেছিলো আমাকে পাওয়ার পর থেকে। পার্টির প্রতিটা অর্ডার আর নিয়মকানুন মেনে চলছিল অক্ষরে অক্ষরে। দেখে অবাক বনে গেছিল দলের সবাই। এমনকি বহুযুদ্ধের পোড়খাওয়া লীডার রামারাজু পর্যন্ত। “হাউ স্ট্রেঞ্জ কমরেড অবিনাশ! হোয়াট আ ট্রান্সফর্মেশন! ফ্রম আ ওয়াইল্ড টাইগ্রেস টু প্রফেশনাল অ্যান্ড ডিসিপ্লিনড গেরিলা ওয়ারিয়ার হোল ক্রেডিট গোজ টু ইউ।” শুনে লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতাম আমি।

রাতে থাকার জন্য একটু আলাদা জায়গা ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল আমাদের। অন্য সময় যতই নিয়ম মেনে চলুক না কেন ওই রাতের বেলায় ভয়ঙ্কর রকম বাধনছাড়া আর বন্য হয়ে উঠতো জুনা। সবচেয়ে ক্ষেপে যেতো একটা ব্যাপারে। মিটিং বা অন্য কাজ সেরে এসে হয়তো ডিবরিবাতির আলোয় বই পড়ছি, দুমদুমিয়ে এসে দাঁড়াতো সামনে – “বহোত হ গিয়া পড়হাই লিখাই। আব তু সির্ফ হামকো পড় অওর মেরা বাত শুন। সির্ফ মেরা ।” বলেই বইটা একটানে হাত থেকে কেড়ে নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিতো। এক ফুঁয়ে নিভে যেতো টিমটিম জ্বলতে থাকা ডিবরিবাতি।

এদিকে ঝড়ের মতো বয়ে যাচ্ছিল সময়। শেষ শীতের মিঠে ঠাণ্ডা কেটে গিয়ে বোশেখজ্যৈষ্ঠর তীব্র গরম। কাঠফাটা, ঝাঁ ঝাঁ ঝলসানো তাপে পুড়ে যাচ্ছে জঙ্গলবুঝতে পারছিলাম ছ’মাসের মেয়াদও পুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে খুব তাড়াতাড়ি। লম্বা গরমের প কড়কড়ানো বাজের শব্দে একদিন বর্ষা নামলো জঙ্গল জুড়ে। বৃষ্টিতে বৃষ্টিতে ধুয়ে যাচ্ছে পালামৌ। বর্ষাকাল। জঙ্গলে টিকে থাকার পক্ষে সবচেয়ে খারাপ সময়। সাপ, জোঁক, পেটের অসুখ আর জাঙ্গল ম্যালেরিয়া। শোয়া বসার একটা জায়গা জোগাড় করাই ভীষণ কঠিন। নিজেকে আপাদমস্তক পলিথিন শিটে মুড়ে বসে থাকা রাতের পর রাত। সেটা ছিল শ্রাবন মাসতিনদিন ধরে লাগাতার বৃষ্টি অঝোরে। ক্যাম্প চেঞ্জ করছিল আমাদের স্কোয়াড। পথে একটা পাহাড়ি নদী। এমনিতে গরমকালে প্রায় মরা, শুকনো। বর্ষায় ভয়ঙ্কর স্রোত। প্রায় ডুবজল। একটু এদিক ওদিক হলেই ভাসিয়ে নিয়ে যাবে খড়কুটোর মতো। পাথরে বাড়ি খেয়ে মৃত্যু অবধারিত। ওপারে বড় একটা পাথরের গায় দড়ি ছুঁড়ে ফাঁসিয়ে নদী পেরোচ্ছিলাম আমরা। হঠাৎ পিছন থেকে ‘ফ্যাট’ শব্দ একটা। জলে একটা ছোট আলোড়ন উঠলো। স্কোয়াডে সবার শেষে ছেলেটা। মহেশ। ডুবে গেল জলে। একটা ভাঙ্গা শালতির মতো ভাসতে ভাসতে তিরবেগে নদীর বাঁকে মিলিয়ে গেল দেহটা। পাড় থেকে সরসতীয়ার তীব্র চীৎকার – “জলদি ভাগো! গোলি চালা রহা কুত্তা লোগ!” কথা শেষ হবার আগেই ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ছুটে আসতে শুরু করল নদীর ওপারে পাহাড়ের ওপর থেকে। আমাদের সামনেও খাড়া পাহাড়। প্রায় পাড়ের গা থেকেই উঠে গ্যাছে সোজা ওপর দিকে। ঘুরে গিয়ে গুলি চালিয়েই পাহাড়ের দিকে ছুটছিলাম সবাই। বৃষ্টিতে চোখ ঝাপসা। তার মধ্যেই চোখে পড়ছিল পাহাড়ের খাঁজে উঁকিঝুকি মারা স্নাইপারদের হেলমেট, ছোপকা ছোপকা জংলা ছাপের উর্দি আর ইনস্যাস রাইফেলের নল। টিকটিকির মতো পাহাড় বেয়ে উঠছিল সবাই। খাড়া পাহাড়। এমনিতে গরম বা শীতকালে খাঁজে খাঁজে পা রেখে ওঠাটা খুব কঠিন নয়। বিশেষত যারা জঙ্গলে থাকে। কিন্তু বর্ষাকালে চড়াটা খুব বিপদজনক। পদে পদে পা পিছলে পড়ে যাবার সম্ভবনা। সবাইকে উঠিয়ে একদম শেষে আমি আর জুনা। চারপাশে গুলি ছুটে এসে পাথরের গায়ে লেগে ছিটকে যাচ্ছিল টিং টাং শব্দে। চড়তে চড়তে প্রায় চূড়ার কাছে পৌঁছে গেছি। আর মাত্র হাত পাঁচেক বাকি। চূড়াটা টপকাতে পারলেই দুশমনের বুলেটের নাগালের বাইরে আমরা। ঠিক এই সময় একটা গুলি সটান এসে বিঁধে গেল জুনার পায়ে। খাঁজ থেকে পিছলে পড়ে যাবার মুহূর্তে ওর হাতখানা ধরে ফেললাম আমি। আমার হাতের মুঠোয় ঝুলছিল ও। চিৎকার করে বললাম – “পাতথর মে পাও রাখনে কা কোশিস কোর জুনা!” প্রাণপণ চেষ্টা করছিল ও। কিন্তু পারছিল না কিছুতেই। এদিকে জলে ভেজা হাতের মুঠো পিছলে যাচ্ছিল, আলগা হয়ে আসছিল ক্রমাগত। উপায় না দেখে বেল্ট লাগানো ক্যাম্বিসের ছোট ব্যাগটা, যেটার মধ্যে আরও টুকিটাকি জিনিসের সঙ্গে নোট খাতাটাও ছিলো, কাঁধ ঝাকিয়ে নামিয়ে দিলাম। হাত ছেড়ে ব্যাগটা ধরে ঝুলতে থাকল জুনা। আমার হাতে ধরা বেল্টের আর একদিক। চিৎকার করছিলাম পাগলের মতো। “হিম্মৎ রাখ জুনা। তুঝে কুছ নেহি হোগা। ম্যায় তুঝে নিকাল লুঙ্গা ইঁহাসে!” ঠিক তখনই দ্বিতীয় গুলিটা এসে লাগল ঠিক শিরদাঁড়ার মাঝখানে। নিমেষে ঠোঁটের কষ বেয়ে উঠে আসা রক্ত। আমার দিকে তাকিয়ে বড় বড় চোখে সেই পাগলি হাসিটা হাসলো জুনা। জড়ানো গলায় ফিসফিস করে বল – “তো হামার কানিয়া রাজা, ইস জিন্দেগী কে লিয়ে ইতনাহি …”। পড়পড় করে ছিঁড়তে থাকা বেল্টের শব্দ। তিন চারশো ফুট নীচে ভীমবেগে বয়ে যাওয়া ভয়ঙ্কর পাহাড়ি নদী। ব্যাগটাকে বুকে আঁকড়ে ধরে একটা পাখীর মতো ভাসতে ভাসতে নীচে নেমে গেল জুনা। জলে পড়ার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত ওই একইরকম চোখে আমার দিকে চেয়েছিল ও। ঠোঁটের কোনে তখনও লেগে থাকা সেই পাগলি হাসি। আগুনে দিনের নোটখাতা, বন্ধুর ঠিকানা সব নিয়ে জলে ভেসে গেল জুনা

ঘটনার দু’দিন পরে কমরেড রামারাজু এলেন আমার কাছে। “লাল সালাম কমরেড। আমাকে অন্ধ্রে ফিরে যেতে হচ্ছে। পার্টির নির্দেশ। যাবার আগে একটা জিনিস দিয়ে যেতে চাই তোমাকে। আশা করি তুমি না করবে না।” বলেই ব্যাগ খুলে বেহালাটা বের করে তুলে দিলেন আমার হাতে। তারপর আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন – “অ্যাজ আ কম্যুনিস্ট আই ডোন্ট বিলিভ ইন এক্সিস্টেন্স অফ গড অর এনি টাইপ অফ সুপারন্যাচারাল পাওয়ার। স্টিল আই থিংক যতবার তুমি এটা বাজাবে ততবার জুনা এসে বসবে তোমার পাশে। ভালো থেকো।” তারপর আর একটা কথাও না বলে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে।”

রাত আর ঠাণ্ডা দুটোই বাড়ছে জঙ্গলে। পাথরের ওপর কম্বল মুড়ি দিয়ে বসে থাকা দুটো ছায়ামূর্তি। নির্বাক, নীরব। আসলে নীরবতাও তো কখনও কখনও অনেক কথা বলে।

অনেক রাতে ঘুম ভেঙে গেল অভিরূপের। হাতের রেডিয়াম ঘড়ি সময় বলছে দুটো বেজে দশ। একটা ভারি মিঠে করুণ সুর খেলে বেড়াচ্ছে চারপাশে। কম্বল থেকে বেরোতেই হাত পা কেটে নিলো ঝাড়খণ্ডের ঠাণ্ডা। তবু কম্বল মুড়ি দিয়ে বাইরে এসে দাঁড়ালো। প্রথম রাতের কুয়াশা কেটে গিয়ে ঝকঝকে আকাশ। অযুতকোটি তারা। জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে জঙ্গল। সুরটাকে অনুসরণ করে এগিয়ে গেলো খানিকটা। তারপর থমকে দাঁড়াল। দুরে সেই পাথরটার ওপর বসে তন্ময় হয়ে বেহালা বাজাচ্ছে অবিনাশ। কান খাড়া করে সুরটাকে ধরার চেষ্টা করলো অভিরূপ। না, কোন গুরুগম্ভীর গান বা গণসঙ্গীত নয়। একটা বহু পুরোনো হিন্দি গানের সুর। ‘রহে না রহে হাম, মহকা করেঙ্গে / বনকে কলি বনকে শবা, গাতে রহেঙ্গে …’। তার ছুঁয়ে উঠে আসা সেই মিষ্টি করুন সুর হাহাকার হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে বিস্তীর্ণ জ্যোৎস্নাস্নাত অরন্যভুমিতে।

**********
সচ?” টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়লেন রণজিৎ সিং রাঠোর। চওড়া চৌকোনা চোয়াল পাথরের মত শক্ত। ধনুকের মতো কুঁচকে রয়েছে মোটা ভ্রুজোড়া। উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপছে মুখের পেশি। টেবিলের উল্টোদিকে দাঁড়ানো একটা মাঝবয়সী লোক। আদিবাসীরোগা, কালো। হাতে উল্কি। কানে মাকড়ি। গলায় কালো কারসুতোর তাবিজ। মুখে হাঁড়িয়ার গন্ধ ভকভক করছে। পাশে দাঁড়ানো সঞ্জীব পাঠক। ডেপুটি কমান্ডান্ট। পিছনে ব্যাটেলিয়ানের আরও দুজন উচ্চপদস্থ অফিসার। “স্যার, ইয়ে হায় টিংড়ি। বিলংস টু ট্রাইবাল কমিউনিটি। হামলোগকা পুরানা মুখবির (ইনফর্মার)। ভেরি রিলায়েবল। ওর কাছে খবর আছে আগামীকাল বিকেলে নক্সালাইটদের একটা হিউজ স্কোয়াড চান্দেয়া আর লাতেহারের মাঝামাঝি একটা জায়গায় আসবে। লোকাল ট্রাইবালরা জায়গাটাকে তিনিপাহাড় নামে ডাকে। নীচে এ্যাপ্রক্স হাফ কিলোমিটার একটা ফাঁকা জমি। টিংড়ির পাওয়া ইনফর্মেশন অনুযায়ী কাল বিকেল নাগাদ জায়গাটা পেরোবে ওরা। ওই হাফ কিলোমিটার পথটা ওদের কোর এরিয়ার বাইরে পড়ে। তারপরেই ঘন জঙ্গল। রাস্তাটা পেরিয়েই ফের ওদের জোনে ঢুকে পড়বে ওরা। সবসে বড়া খবর, ওহ ওয়ান আইড অবিনাশ, ওহ ভি রহেগা স্কোয়াড কে সাথ।”

অবিনাশ!’ সঞ্জীবের মুখে নামটা শোনামাত্র বাঘের মত চকচক করে উঠলো রাঠোরের দুচোখ। “ওকে সঞ্জীব, উই উইল স্ট্রাইক দেম রাইট অন দিস হাফ কিলোমিটার প্লেইন ল্যান্ড। আর ওহ শালা অবিনাশ কানিং জাঙ্গল ফক্স চালিশ শাল সে জাদা পোলিস ঢুন্ড রহা উসকো। মগর হাত নেহি লাগা। আব …” বলতে বলতে উত্তেজনায় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন রাঠোর। “সঞ্জীব, তুমি ইমিডিয়েটলি স্টেট পোলিস আর সি আর পি এফের হেড কোয়ার্টারকে অ্যালার্ট করে দাও। টেল দেম টু সেন্ড অ্যাজ মাচ ফোর্স এ্যাজ পসিবল। জয়েন্ট অ্যামবুশ হবে। আর এই লোকটাকে ইনফর্মেশন কনফার্মড না হওয়া পর্যন্ত রিম্যান্ডে রাখো।” টিংরির দিকে আঙুল দেখালেন রাঠোর।

স্যর, আরও একটা খবর আ ইয়ং ম্যান, কাঁধে রাকস্যাক আর ক্যামেরা। মোস্ট প্রবাবলি দ্যাট রিপোর্টার ফ্রম কোলকাতা তাকেও দেখা গেছে ওদের সঙ্গে। সে ব্যাপারে কী হবে।” নীচু গলায় কথাগুলো বললেন সঞ্জীব।

লিসন সঞ্জীব।” স্থির চোখে সঞ্জীবের দিকে তাকালেন কোবরার চীফ কমান্ডান্ট। “আমরা ওকে ওয়ার্ন করেছিলাম। তা সত্ত্বেও উনি গ্যাছেন এ্যাবসলিউটলি এ্যাট হিজ ওন রিস্ক। উই উইল ট্রাই আওয়ার লেভেল বেষ্ট টু সেভ হিম। তারপরেও ইফ সামথিং হ্যাপেনস, সেটাকে কো ল্যাটারাল ড্যামেজ হিসেবেই ধরে নিতে হবে। ও কে? … আর শালা অবিনাশ, দেখতা হু ক্যায়সে বাচকে নিকলতা হায় তু।” উত্তেজনায় টেবিলে সজোরে একটা ঘুষি মারলেন রাঠোর।

সেই সত্তরের দশক। স্কুলের একটা বাচ্চা ছেলে রাস্তার লড়াই অ্যাতো বন্ধু কমরেডের হারিয়ে যাওয়া। বাতাসে বোমা, গুলি, বারুদের গন্ধ শুকতে শুকতে ধরা পড়ে জেলখানায়। ফের জেল ভেঙ্গে বেড়িয়ে ভাসতে ভাসতে এ গলি ও রাস্তা এসে ওঠা এই পালামৌর জঙ্গলে তিন যুগের বেশি সময় ধরে লম্বা একটা রক্ত আর আগুনের নদী সাঁতরাতে কোথায় এসে ঠেকলো নৌকোটা, ভেবে দেখেছেন কখনও?” ভাঙ্গাচোরা পরিত্যক্ত হাভেলীটার দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা ছুড়ে দিলো অভিরূপ। বারান্দায় বিশাল মোটা থামে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অবিনাশ। চোখ সামনে হাভেলীর দীঘিটায়। জাল ফেলে গ্রামের মানুষদের মাছধরা শেখাচ্ছে স্কোয়াডের লোকজন। সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে হাসলো অভিরূপের কথায়। “ঠেকলো এসে এমন একটা ঘাটে যেখানে মেয়েদের জঙ্গলে কাঠকুটো কুড়োতে গিয়ে আর ফরেস্ট গার্ডদের হাতে হেনস্থা হতে হয় না। কেন্দুপাতা আর মহুয়াফলের কনট্রাকটর বানিয়ারা আর কাউকে ঠকাতে সাহস পায় না। রোজগার আর খাবার সমানভাগে ভাগ করে খায় সবাই। নিজেদের মধ্যে জাতপাত নিয়ে লড়ে না কেউ যে স্বপ্নটা এই অ্যাতোটুকু বয়স থেকে দেখে এসেছি। এরকম একটা দেশ, হয়তো পুরোটা নয় তবু দেশের মধ্যে অন্যরকম একটা দেশ। গরিব মানুষের রাজ, ডিক্টেটরশিপ অফ দ্য প্রলেতারিয়েত। কথাগুলো বলার সময় চকচক করছিল একচোখ।

চলবে…

গত পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/ketjel-pakhi-the-bird-with-the-fiery-wings-bengali-novel-17/

ইমার্জেন্সি উঠে গ্যালো। ইন্দিরা গান্ধীর কংগ্রেস গভর্নমেন্ট হেরে গ্যালো ইলেকশনে। দিল্লীর মসনদে জনতা পার্টি। বাংলায় জ্যোতিবাবুরা ক্ষমতায় এলেন ডেমোক্রাসির ঢাকঢোল বাজিয়ে। আমাদের প্রত্যেকটা গেরিলা স্কোয়াডে অন্তত একটা ট্রানজিসটার মাস্ট। গান আর খবর শুনতাম খুব। তো সেই রেডিও আর কালেভদ্রে জঙ্গলে পৌঁছে যাওয়া খবরের কাগজ থেকে জানতে পারছিলাম পশ্চিমবঙ্গের জেলে আটকে থাকা আমাদের কমরেডদের ছেড়ে দিচ্ছে নতুন সরকার। কলকাতা থেকে আসা কমরেডদের কাছে টুকরো টাকরা ভাবে শুনতে পাচ্ছিলাম প্রতীপদা, তন্ময়, অমিতেশ স্যরদের শহীদ হওয়ার ঘটনা। আগুনের দিনের সাথী সব। আগুন বুকে নিয়েই চলে গেল। প্রশান্তটা তো আগেই গিয়েছিল। এদিকে ডাক্তারদা, তীর্থদা, দেবাঞ্জনদেরও খবর নেই কোন। এর মধ্যেই পাখীর পালকের মতো ভেসে আসা একটুকরো ভালো খবর। জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু, জিগরি দোস্ত, কমরেড ইন আর্মস সুদীপ্ত। দমদমের পুরোন বাসা ছেড়ে সেন্ট্রাল ক্যলকাটার মুসলমান মহল্লায় উঠে চলে গ্যাছে ওরা। অনেক কষ্টে ওর ঠিকানাটা জোগাড় করে চিঠিও লিখেছিলাম একটা। শহরে পার্টির কাজ নিয়ে যাওয়া এক কমরেডকে দিয়ে পোস্টও করিয়েছিলাম। উত্তর আসেনি। আর আসবেই বা কী করে? ঠিকানাই তো দিইনি। দেবোই বা কীভাবে? এই হাজার হাজার মাইল ছাড়িয়ে থাকা রেড করিডরে আমার ঠিকানাই বা কোথায়?”

চারপাশে চেপে বসা গাঢ় নিকষ অন্ধকার। তবু অভিরূপের মনে হল একটা প্রচণ্ড চাপা কষ্ট যেন বুকচেরা দীর্ঘশ্বাস হয়ে উঠে এলো উল্টোদিক থেকে। “এখানে আসার সময় একটা ছোট নোটখাতা কিনে এনেছিলাম। ফেলে আসা জীবনের টুকরো-টাকরা ঘটনা, এখানকার নানা অভিজ্ঞতা লিখে রাখতাম তাতে। সুদীপ্তর ঠিকানাটাও ছিল সেই নোটবইয়ে। পুরোন লালচে হয়ে যাওয়া পাতা। তবুও তো ছিল সঙ্গে ।”

ছিল মানে? এখন নেই?” প্রায় চেঁচিয়ে উঠলো অভিরূপ। নিজের কানেই যা অদ্ভুত ঠেকলো।

নাঃ, নেইজঙ্গলের ওপার অসীম নিস্তব্ধতার মধ্যেও খুব আস্তে শোনালো উত্তরটা।

জুনা। জুনা মাঝি। ছিপদোহর ব্লকের গণ্ডগ্রামে বাড়ি। মুশাহর সম্প্রদায়ের মেয়ে। দাদনের টাকা শোধ না করতে পারায় ওকে ওর বাপ মার থেকে কিনে নিয়েছিল বুড়ো ভূমিহার মোড়ল যজ্ঞেশ্বর চৌধুরী। ঘরে বাতে পঙ্গু বউ। জানোয়ারটা রোজ রাতে ধর্ষণ করতো জুনাকে। তারপর উঠে গিয়ে বউয়ের পাশে শুয়ে পড়তো। খাটের তলায় কুকুরের শেকল দিয়ে বাঁধা থাকতো জুনা। এদিক ওদিক হাতড়ে হাতড়ে একটা উকো জোগাড় করেছিল। সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর নিয়ম করে উকো ঘষে ঘষে শেকলটা কাটতো জুনা, রোজ। এই করতে করতে একদিন মাঝরাতে সত্যিই কেটে গেল শেকলটা। ঘরের দেয়ালে টাঙানো একটা ধানকাটা হাঁসুয়া। যজ্ঞেশ্বর আর ওর বউ তখন বিছানায় ঘুমিয়ে কাদা। দেয়াল থেকে খুলে নিয়ে পরপর দুটো কোপ। টুঁ শব্দটি কাড়ার সুযোগ পায়নি কেউ। বিড়ালির মত পা টিপে টিপে দরজা খুলে বেরিয়ে এসছিল জুনা। হাতে রক্তমাখা খোলা হাঁসুয়া। একটুও শব্দ না করে খিড়কি দরজার ভারি খিলটা নামিয়েই দৌড়োতে শুরু করেছিল দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে। কতক্ষণ দৌড়েছিল জানা নেই। একসময় জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেছিল মাটিতে। পরদিন জঙ্গলের ধারে আমাদের একটা টহলদার স্কোয়াডের লোকজন উপুড় হয়ে পড়ে থাকা জ্ঞানহীন জুনাকে দেখতে পায়। হাতের মুঠোয় তখনও হাঁসুয়াটা ধরা ছিলো। ধরাধরি করে দেহটা উঠিয়ে ক্যাম্পে নিয়ে এসেছিল ওরা।

স্কোয়াডের লোকজনদের শুশ্রূষায় খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠছিলো জুনা। কিন্তু ভয়ঙ্কর একরোখা আর জেদী। একফোঁটা বিশ্বাস করতো না কাউকে। বিশেষত ছেলেদের। সামনে গেলেই ফ্যাঁশ করে উঠতো বুনো নেউলের মতো। স্কোয়াডের মেয়েদের হাল না ছাড়া নাছোড় চেষ্টায় সেটা কাটতে শুরু করলো একটু একটু করে। আসলে মানুষের ওপর বিশ্বাসটাই হারিয়ে ফেলেছিল ও। সেটা ফিরতে লাগলো ধীরে ধীরে। তবে স্কোয়াডের সঙ্গে থাকলেও দলের কাজকর্ম, পার্টি ক্লাস, ট্রেনিং এসব ব্যাপারে উৎসাহ ছিলো না একেবারে। ওকে নিয়ে কী করা হবে সে ব্যাপারে ধন্ধে পড়ে গেছিলাম আমরা সবাই। এরকম চলতে থাকলে ওকে স্কোয়াডে রাখা যাবে না আবার ছেড়ে দিলেই বা যাবে কোথায়? সমস্যায় জেরবার পুরো স্কোয়াড। চিন্তাভাবনায় সবাই যখন অস্থির তখনই একদিন ঘটে গেল সেই চমকে দেওয়া ঘটনাটা।

ক্যাম্পের পাশে বিশাল এবড়ো খেবড়ো ফাঁকা মাঠ। স্থানীয় মানুষের ভাষায় ‘টাঁড় জমিন’। সেখানে স্কোয়াডের ছেলেমেয়েদের রানিং প্র্যাকটিস করাচ্ছিলো সরসতীয়া। জোলা সম্প্রদায়ের মেয়ে। পোড়খাওয়া গেরিলা নেত্রী। বহু যুদ্ধের অভিজ্ঞতা। স্কোয়াড লীডার। হঠাৎই মাঠের পাশ থেকে ভেসে আসা খিলখিল হাসির শব্দ। সবাই দেখলো খোলা মাঠের ধারে একটা উঁচু পাথরের ওপর বসে হেসে কুটিপাটি হচ্ছে জুনা। বিরক্ত সরসতীয়া এগিয়ে গেল ওর দিকে – “কা রে? বাওরি (পাগলি) কি তরহা কাহে হাস রহি হায়?”

হাসুঙ্গি নেহি তো কা রোউঙ্গি?” হেসে লুটিয়ে পড়তে পড়তে উত্তর দিলো জুনা। “তুমহারা ছোকড়া ছোকড়ি লোগ তো বিলকুল বয়েলগাড়ি কা মাফিক দওড়তা হায়হাসি আর থামছিলো না মেয়েটার। মাথা গরম হয়ে গেল সরসতীয়ার। চোখে সরু করে জিজ্ঞেস করলো – “তু উনলোগোঁসে আচ্ছা দওড় সকেগি?”

নেহি তো কা? একবার ময়দান মে উতার কে তো দেখো।” গলা আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। যেন দৌড়োনোটা কোন ব্যাপারই না। বাছা বাছা স্কোয়াড মেম্বার সব। মাইলের পর মাইল দৌড়োনোর অভ্যেস রোজ। মাথায় রক্ত চড়ে গেল সরসতীয়ার। রাগে গুমগুম করে উঠে বললো – “আ, ময়দান মে উতারকে দিখা কিতনা বড়া হিরনিয়া (হরিণী) হায় তু।” শোনামাত্র পাথর থেকে লাফ দিয়ে নেমে এলো জুনা। একটু দুরে দাঁড়িয়ে পুরো ঘটনার ওপর নজর রাখছিলাম আমি। কতই বা বয়স তখন আমার। মাত্র বছর দশেক হল এসেছি জঙ্গলে। মনে হল কালো চকচকে একটা ফনা তোলা কেউটে যেন পিছলে নামলো মাঠে। তারপর সোজা গিয়ে দাঁড়ালো লাইনের সামনে। গাছকোমর করে পেঁচিয়ে বেঁধে নিলো শাড়িটা। তারপর মুচকি হাসলো তিরচোখে সরসতীয়ার দিকে চেয়ে।

দওড় শুরু করো।”

ওহ লোগ কে কান্ধা পে বন্দুক হায়। তু খালিহাত দওড়েগি কা?” পরিহাসের হাসি সরসতীয়ার ঠোঁটের কোনে।

ওহলোগকো বন্দুক ফেকনে বোলো অওর মেরে কান্ধে পে বন্দুক চড়হা দো। ফির শুরু করো।” ঠাণ্ডা গলায় জবাব দিয়েছিলো জুনা। মাঠে চুপ মেরে গ্যাছে সবাই ওর কথা শুনে। আর একটাও কথা না বলে এগিয়ে গিয়ে সটান লাইনে দাঁড়িয়ে পড়লো জুনা। সরসতীয়ার “এস্টার্ট” চীৎকার। এরপর যেটা ঘটলো সেটা ভাষায় বর্ণনা করার ক্ষমতা আজও নেই আমার। জলপাই ইউনিফর্ম আর কেডস পড়া ঝাড়া হাতপা ট্রেইনড গেরিলাদের অন্তত দু হাত আগে বিদ্যুৎ ঝলকের মতো দৌড়োচ্ছে একটা শোনচিতোয়া (কালোচিতা)। খালি পা। কাঁধে বন্দুক। দৌড় শেষ হবার পর মনে হলো এই মূহুর্তে বিশাল একটা ভূমিকম্প ঘটে গ্যাছে মাঠে। ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাওয়া চোখ। ঝুলে পড়া চোয়াল। বিস্ময়ে ওর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে সবাই। এমনকি সরসতীয়াও। অবাক করা ঘোরটা কাটিয়ে ওর দিকে এগিয়ে গেলাম আমি। “বন্দুক চালানা শিখোগে?”

শিখাও গে তো শিখুঙ্গি অওর ওহ ভি তুমলোগোঁসে আচ্ছা। গোলি ভি মারুঙ্গি একদম নিশানা পে। ‘গুড়ুম!’ অওর মামলা ঠাণ্ডা।” একচোখ টিপে আঙ্গুলে ট্রিগার টেপার ভঙ্গি করেছিল জুনা।

সেই শুরু বছর খানেকের মধ্যে জঙ্গলের কোনায় কোনায়, পাহাড় থেকে লাফ দিয়ে নেমে আসা ঝোরার স্রোতে, রাতের বেলা গাঁও বুড়োদের মজলিসে, হাঁড়িয়ার আড্ডায়, থানা আর সি আর পি এফ ক্যাম্পগুলোয় ঘুরে বেড়াতে লাগলো নামটা। জুনা। জুনা মাঝি। পুতলীবাঈ অফ পালামৌ, ক্সাল রানী, জাঙ্গল টেরর, খতরনাক আতঙ্কি, টাইগ্রেস অফ লাতেহার । পুলিশ, সি আর পি এফ, জোতদার, বানিয়া, মুখবীর (ইনফর্মার) মিলিয়ে একডজনেরও বেশি খুনের পরোয়ানা ওর মাথার ওপর। মাথার দাম লাখ ছাড়ালো কিছুদিনের মধ্যেই।

এর মধ্যেই দেখতাম আমার চোখে চোখ পড়লেই ফিক করে হাসতো ও। কেমন যেন অন্যরকম। বাকি সব হাসির সঙ্গে মেলে না। প্রথম প্রথম বুঝতাম না। অস্বস্তিও হচ্ছিল কীরকম। হাসিটা কিন্তু থামলো না। বরং আরও গা ঘেঁষে এগিয়ে আসতে লাগলো দিন কে দিন। স্কোয়াডের নিয়মশৃঙ্খলা মেনে চলায় তেমন একটা উৎসাহ ছিলো না ওর। দেখা হলেই পাশ কাটিয়ে যাবার সময় বুকে একটা আলতো কিল, কোমরে কনুয়ের খোঁচা অথবা খিলখিলে হাসিতে ফেটে পড়া। প্রমাদ গুনলাম আমি। এড়িয়ে যাবার, চোখে চোখ না মেলানোর চেষ্টা করছিলাম যথাসাধ্য। আবার মনে মনে বেশ বুঝতে পারছিলাম ওই বড় বড় চোখদুটোর তাকানো আর খিলখিলে পাগলি হাসিটা নিশিতে পাওয়া মানুষের মতো টানছে আমাকে। এসবের মধ্যেই একদিন ঘটে গ্যালো ঘটনাটা। স্কোয়াড মেম্বারদের সাথে বসে আলোচনা করছি, হঠাৎ সেখানে এসে হাজির জুনা। সবার চোখের সামনে দিয়ে হাত ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে ঠেস দিয়ে দাঁড় করিয়ে দিলো একটা গাছের গুঁড়িতে। একঝটকায় কোমর থেকে রিভলবারটা টেনে বের করে ঠেসে ধরলো পাঁজরে। তারপর আমার অন্ধ চোখটায় আঙুল বুলিয়ে হিসহিস করে উঠলো সাপিনীর মতো। – “তু হামার কানিয়া রাজা। অওর কিসিকা নেহি, সমঝা? হিম্মৎ হায় তো না বোলকে দিখা। এক গোলি সিধা দাগ দুঙ্গি তেরে সিনে পে। দুসরি গোলি খুদ কে খোপড়িয়া মে ব্যস! দোনোহি শহীদ একসাথ। শোচনে কে লিয়ে সির্ফ সাতদিন টাইম হ্যায় তেরে পাশ।” বলে রিভলবারটা ফের কোমরে গুঁজে যেমন এসেছিল তেমনই চলে গ্যালো দুমদুম করে।

মিলিটারি ডিসিপ্লিন মেনে চলা একটা পার্টি। তারমধ্যে এরকম একটা ঘটনা। হতভম্ব সবাই। ফুশফাশ, গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লো প্রতিটা স্কোয়াডে। রামারাজুর কানেও কথাটা পৌঁছলো। একদিন ডেকে পাঠালেন আমাকে। বেশ খানিকটা ভয়ে ভয়েই গেলাম ওনার কাছে। সরাসরি আমার চোখে চোখ রাখলেন রামারাজু – “কমরেড, আমার মনে হচ্ছে বাঘিনীটার জন্য একটা বাঘ দরকার। আমার অনুরোধ তুমি এই দায়িত্বটা নাও। বিকজ উই জাস্ট কান্ট অ্যাফোর্ড টু লুজ সাচ ভ্যালুয়েবল কমরেডস লাইক বোথ অফ ইউ।” এরপর উনি ডাকলেন জুনাকে। একটু দুরেই দাঁড়িয়েছিলো মুখ গোঁজ করে। কমরেড অবিনাশ কা সাথ রহনা চাহতি হায়?” প্রশ্ন করলেন রামারাজু। মুহূর্তে গোঁজ ভাবটা কেটে গিয়ে বিদ্যুতের মতো ঝিলিক দিয়ে উঠলো বড় বড় দুটো চোখ। সদ্য জন্মানো একটা শিশুর মতো হাসি মুখ জুড়ে – “হাঁ হাঁ কমরেড দাদা।”

তো পার্টিকা হর নিয়ম মানকে চলনা পড়েগা, মঞ্জুর?” গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন রামারাজু। মুহূর্তে ফের শক্ত চোখমুখ – “আপ সির্ফ একবার হামার কানিয়া রাজাকো ‘হাঁ’ করা দো। উসকে বাদ য্যায়সা বোলেগি ওয়সাহি করেঙ্গে হাম। মাঙ্গোগে তো জান ভি মঞ্জুর।”

ফাল্গুন মাসের রাত। চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে টাঁড় জমিন, দুরের টিলাপাহাড়। ধামসা মাদল বাজিয়ে নাচছে গাইছে জঙ্গলের মেয়েমরদ। সার দিয়ে দাঁড়িয়ে গেরিলা স্কোয়াড মেম্বাররা। সামনে দাঁড়ানো কমরেড রামারাজু। মাঠ, জঙ্গল, পাহাড়, নদী, কমরেডস সবাইকে সাক্ষী রেখে রেডবুক হাতে নিয়ে জোড় বেঁধেছিলাম আমরা। তারপর হাতে হাত ধরে সোজা হেঁটে উঠে গিয়েছিলাম টিলাপাহাড়ের চূড়ায়। সেখানে সারারাত গান গেয়েছিলো জুনা। নেচেছিলো পাগলির মতো। আমি বেহালা বাজিয়েছিলাম আর দেখেছিলাম। সে এক আদিম জংলী চিতাবাঘিনীর নাচ। যখন সে নাচ থামলো তখন ডিমের কুসুমের মতো লাল রঙের সূর্য উঠছে টিলাপাহাড়ের পিছন থেকে।

এদিকে সময় কেটে যাচ্ছিল ঝড়ের মতোযুদ্ধ আর প্রেম পাশাপাশি হাঁটছিল হাত ধরাধরি করে। পার্টি শর্ত দিয়েছিলো ছ’মাস একসঙ্গে থাকতে পারবো আমরা। তারপর স্কোয়াড বদল হবে।

চলবে

গত পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/ketjel-pakhi-the-bird-with-the-fiery-wings-bengali-novel-16/

তাছাড়া সারাজীবন পুলিশের মার খেয়ে আর পালাতে পালাতে হাজারটা চোটের ব্যথা আর রোগজ্বালা বাসা বেঁধেছে শরীরে। তোদের ভারবোঝা হয়ে যাবো আমি। বিপদে পড়বি তোরা। আমি জানি তোরা চলে যাবার পর সব সন্দেহ এসে পড়বে আমার ওপর। আমাকে অনেক রগড়াবে ওরা। চাই কি জানেও মেরে দিতে পারে। তবুও তসল্লি (সান্ত্বনা) একটাই, সারাজীবন গুনাহর রাস্তায় হাঁটলেও শেষ বেলায় একটা নেক (সঠিক) কাজ করলাম। পরওয়ার্দিগার বোধহয় আমার সব গুনাহ (পাপ) মাফ করে দেবেন এর জন্য। যা বেটা, বদর বদর।” হেসে আমার কাঁধে একটা চাপড় মেরেছিল চাচা।

পালাবার জন্য পরদিন বিকেলবেলাটাকেই বেছে নিয়েছিলাম আমরা। গিণতির জন্য সেলে ঢোকাবার আধঘণ্টা আগে বেরিয়ে যেতে হবে। রীতিমতো পাঁজি জোগাড় করে দেখে নেওয়া হয়েছিল সময়টা। তখন গঙ্গায় জোয়ার থাকে না। তাছাড়া ওপারে পৌঁছোতে পৌঁছোতে সন্ধে নেমে পড়বে প্রায়। অন্ধকার আমাদের সাহায্য করবে। দলে কল্লোলদা, প্রদ্যোতদা, কালাচাঁদদা, আমি ছাড়া আরও চারজন। সবার প্রথমে কুয়োয় নেমেছিলাম আমি। তারপর দুমিনিটের গ্যাপে গ্যাপে বাকি সাতজন। আদিগঙ্গার পাঁক-কালো জল কখনও কোমর, কখনও বুক সমান। ঠেলে ঠেলে পেরিয়ে যেতে সময় লেগেছিলো আরও মিনিট দশেক। কাদায় মাখামাখি হয়ে হাঁচোড়পাঁচোড় করে পাড়ে উঠেই ঢুকে পড়েছিলাম ঘিঞ্জি বস্তি আর পুরোন বাড়িগুলোর সরু সরু গলির মধ্যে। এঁকেবেকে পেরিয়ে যাচ্ছিলাম গলিগুলো। ঠিক সেই সময় হঠাৎই মনে হলো এই বোধহয় শেষবারের মতো ছেড়ে যাচ্ছি শহরটাকে। মার সঙ্গে আর দেখা হবে না কোনদিন! ভাবামাত্র দাঁড়িয়ে পড়লাম শকলাগা মানুষের মতো। যে করে হোক মার সঙ্গে শেষবারের মতো, অন্তত একবার দেখা করে যেতে হবেই। মুহূর্তে ঘুরে গিয়ে হাঁটা লাগালাম উল্টোদিকে। দশ পনেরো পা এগিয়েছি এই সময় পেছন থেকে একটা হাত, খামচে ধরলো কাঁধটা। প্রদ্যোতদা। আমি নেই দেখে ও অনেকটা এগিয়ে গিয়েও ফিরে এসছে ফের। “ওদিকে কোথায় যাচ্ছিস গাধা! জলদি পা চালা। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যেতে হবে এলাকাটা ছেড়ে।” গঙ্গার ওপার থেকে ততক্ষণে ‘পিই ই’ আওয়াজে বাজতে শুরু করেছে পাগলী সাইরেন। গলির মোড়ে, বস্তিবাড়িগুলোর পায়রার খোপের মত জানলায়, জলের কলের লাইনে মানুষজনের ভয় আর উদ্বেগ মাখানো মুখ। ফিসফাস কথার টুকরো। “নকশাল! … জেল ভেঙে পালিয়েছে!” দ্বিধা আর পিছুটানটা কেটে গেল এক মুহূর্তে। প্রদ্যোতদার হাত ধরে টেনে দৌড় দৌড় এ রাস্তা ও রাস্তা বহু রাস্তা ঘুরে সেই দৌড় একদিন এসে থামলো পালামৌর জঙ্গলে। পেছনে ফেলে এলাম অনেক কিছু। আমার শহর, খালধারের ধচাপচা বস্তি, পার্কের পাশে তিনতলা ইস্কুলবাড়ি, ফুটবল ম্যাচ, জিততাল গুলি খেলা আর ঘুরির প্যাঁচ, রাস্তার লড়াই, শ্রী, উত্তরা, রুপবাণীর লাইনে মারামারি, নিজের থেকেও প্রিয় সব বন্ধুবান্ধব কমরেডস, মায়ের শাড়িতে ধোঁয়া আর ডালের গন্ধ সেই ছোটবেলা থেকে ভালোলাগা প্রায় সবটুকু।

এখানে এসেও সে যে কি ভয়ঙ্কর কষ্ট। জঙ্গল, জোঁক, মশার কামড়, না খেয়ে পাগলের মত হেঁটে যাওয়া দিনের পর দিন, রাতের পর রাত। ক্ষিদে তেষ্টা আর হাঁটার ধকল সহ্য না করতে পেরে মাঝেমাঝেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাচ্ছি দলের প্রায় প্রত্যেকে। ফের উঠে পথ হাঁটছি। ক্ষিদের জ্বালায় বুনো ফল, শাকপাতা, গেছো শামুক, জংলি ইদুর, শেকড়কন্দ, ব্যাঙের ছাতা কিছু বাদ দিচ্ছি না। খাবার দাবার চিনি না। কোনটা বিষাক্ত আর কোনটা নয়। ফলে থেকে থেকে মারাত্মক পেটের রোগে ভুগছি। আমাদের মধ্যে প্রথম মারা গেল জাইরুল। কমরেড জাইরুল ইসলাম। মুর্শিদাবাদে বিশাল অবস্থাপন্ন জোতদার বাড়ির ছেলে। আমারই বয়সী। ক্ষিদের ঠেলায় ব্যাঙের ছাতা ধরনের কি একটা ছিঁড়ে খেয়েছিলো গাছের গোড়া থেকে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে শুরু ভেদবমি আর জলের মতো পায়খানা। ওষুধপত্তর কিচ্ছু নেই। পুরো চব্বিশ ঘণ্টা কাটেনি বিশাল ঝাঁকড়া একটা মহুয়া গাছের নীচে গোর দেওয়া হয়েছিল কমরেড জাইরুলকে। জঙ্গলে প্রথম শহীদ।

মাস তিনেক বাদে জঙ্গলে প্রথম সাফল্যের মুখ দেখলাম আমরা। এর আগে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হাঁটার সময় আদিবাসীদের সঙ্গে মাঝেমধ্যেই দেখা হয়ে যেত আমাদের। দূর থেকে আমাদের দেখতো ওরা। খানিকটা সন্দেহ আর ভয় মেশানো দৃষ্টিতে। আকার ইঙ্গিতে খাবার চাইলে বা কথা বলতে গেলেই একছুটে মিলিয়ে যেত গভীর জঙ্গলে। ডাকাতটাকাত ভাবতো বোধহয় আমাদের। ওদের মধ্যে একজন মংটু। ওর বউ তুতিয়া। জঙ্গলে গেছিলো কাঠ কুড়োতে। কাঠ কুড়িয়ে ফেরার পথে ওকে ধরেছিলো দুই ফরেস্ট গার্ড। চেক করার নামে বিট অফিসে নিয়ে গিয়ে বারবার ধর্ষণ করেছিল দুজন মিলে। তারপর ভীষণ রকম আহত আর অচৈতন্য দেহটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে গেছিল জঙ্গলের রাস্তায়। এরকম ঘটনা প্রায়ই ঘটতো জঙ্গলে। যথেচ্ছ আদিবাসী মেয়ে ভোগ করার খোলা ছুট দিয়ে ওদের পাঠানো হতো এখানে। তার ওপর কন্ট্রাক্টরদের কাছে কাঠচুরির মোটা হিস্যা। এইসব এলাকায় ডিউটি পাওয়াটা যে কোন ফরেস্ট গার্ডের কাছে অনেকটা ‘প্রাইজ পোস্টিং’এর মতো।

রাস্তার ওপর স্ত্রীর অচৈতন্য দেহটার সামনে বসে ডুকরে কাঁদছিল মংটু। চারপাশে ভিড় করে দাঁড়ানো আদিবাসীরা। ঠিক এরকম একটা সময়ে আমাদের দলটার সঙ্গে দেখা হয়ে যায় ওদের। একফোঁটা আদিবাসী ভাষা জানা না থাকলেও কান্নাকাটির কারণটা বুঝে নিতে অসুবিধে হয়নি একটুও। সেই রাতেই বিট অফিস অ্যাটাক করি আমরা। মদ খেয়ে ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোচ্ছিল ওই দুই হারামজাদা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই খাটিয়া সমেত দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলে তুলে আনা হয় দুজনকে। বাকি কাজটা করে দিয়েছিল মংটুদের হাতের টাঙ্গি। আগুন ধরিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিল বিট অফিস। সেই শুরু। জঙ্গলের কোনায় কোনায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে গেছিল খবরটা। মংটু আর তুতিয়া। আমাদের দলে প্রথম আদিবাসী রিক্রুট। উপরি পাওনা গার্ডদের দুটো বন্দুক আর গুলিভর্তি বড় একটা বাক্স। স্কোয়াডের প্রথম অস্ত্র।

ইতিমধ্যেই বিহারের শহরাঞ্চল, অন্ধ্র, বাংলা থেকে জেলভাঙ্গা আর লুকিয়ে থাকা আরও কমরেডস ঢুকতে শুরু করেছেন। দেখতে দেখতে বড়সড় সংগঠন গড়ে উঠলো আমাদের, এই বিশাল পালামৌ ছোটনাগপুর – বস্তার – দণ্ডকারণ্য অঞ্চল জুড়ে। রাষ্ট্র আর প্রশাসনের বেশ কিছুদিন সময় লাগলো আমাদের মতিগতি বুঝে উঠতে। যখন বুঝতে পারলো তখন দেরী হয়ে গ্যাছে অনেকটাই। তবে দেরী হয়ে গেলেও হাত গুটিয়ে বসে রইলো না ওরাও। সমস্ত নখদাঁত বের করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লো আমাদের বিরুদ্ধে। পুলিশ – সি আর পি এফ – প্যারামিলিটারি ফোর্স আমাদের দাপটে এইসব অঞ্চলে জমি হারাতে থাকা জোতদার – জমিদার – বানিয়া, উঁচুজাতের বড়লোকেরা সব এককাট্টা হয়ে গ্যালো নকশালদের বিরুদ্ধে। আর এদিকে দুনিয়ার যতো গরীবগুর্বো দলিত আদিবাসী জোট বেঁধে দাঁড়িয়ে পড়লো আমাদের পক্ষে। সেই লড়াইয়ের আঁচ শুধু জঙ্গলেই আটকে রইলো না। বিদ্যুতের মতো ছড়িয়ে পড়লো আরা – ভোজপুর – গয়া – আওরঙ্গবাদ – জেহানাবাদ – নালন্দা – বৈশালির মতো সমতল জেলাগুলোতেও। আমাদের স্কোয়াডগুলোকে ‘লাল দস্তা’, ‘লাল সেনা’ নামে ডাকতে শুরু করলো স্থানীয় মানুষজন। উল্টোদিকে তৈরি হল রনবীর সেনা, গৈরিক সেনা, ব্রহ্মর্ষি সেনা, লোরিক সেনা, সানলাইট সেনা উঁচুজাত আর বড়লোকদের প্রাইভেট আর্মি। পেছনে সরাসরি মদত পুলিশ আর প্রশাসনেরশয়ে শয়ে গরীব – দলিত – আদিবাসীদের খুন করে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিতে শুরু করলো ওরা। পাল্টা মারের রাস্তায় নেমে পড়লাম আমরাও। জোতদার – জমিদার – বালিয়াদের হাভেলী অ্যাটাক, অ্যাকশন, গণ আদালত, মৃত্যুদণ্ড চলতে থাকলো সমানতালে। পুরোপুরি যুদ্ধ পরিস্থিতি। যুযুধান দুপক্ষ। এরকম একটা ভয়ঙ্কর লড়াইয়ের দিনে শহীদ হলো প্রদোতদা। চান্দোয়ায় এক সুদখোর বানিয়ার বাড়িতে অ্যাকশন সেরে ফিরে আসছি, একটা মকাইক্ষেতের মধ্যে আমাদের ঘিরে ফেললো রণবীর সেনার লোকজন। সংখ্যায় আমাদের প্রায় তিনগুন। দুপক্ষের মধ্যে টানা গুলির লড়াই। উল্টোদিক থেকে ছোঁড়া একটা গুলি সরাসরি এসে লাগে প্রদ্যোতদার বুকে। মকাইক্ষেতের মধ্যে দিয়ে গুলি চালাতে চালাতে নিরাপদ জায়গায় টেনে এনেছিলাম শরীরটাকে। তখনও বেঁচে ছিল প্রদ্যোতদা। মুখ দিয়ে রক্ত উঠে আসছিল চলকে চলকে। পাগলের মত চীৎকার করছিলাম, কাঁদছিলাম হাউহাউ করে – “তোমার কিচ্ছু হবে না দাদা শহর থেকে ডাক্তার তুলে নিয়ে আসবো। একদম চিন্তা কোরো না।” ঘোলাটে চোখের চাউনি চিকচিক করে উঠেছিল এক সেকেন্ডের জন্য। ফিকে একটা হাসি – “আমার লড়াই শেষ কমরেড। তুই কিন্তু লড়াইটা ছাড়িস না। নিশানা যেন ঠিক থাকে …”। থিরথির করে কাঁপতে থাকা ঠোঁট। তারপর আমার কোলে মাথা রেখে স্থির হয়ে যাওয়া বরাবরের জন্য।

কোয়েল নদীর ধারে কমরেডদের লাল সেলাম আর চিতার দাউ দাউ আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছিল প্রদ্যোতদা আর সঙ্গে লম্বা একটা পথচলার ইতিহাস। শুনলে হয়তো অবাক হবেন জেল পালিয়ে আমরা যে আটজন প্রথম এখানে এসেছিলাম তার মধ্যে একমাত্র আমি ছাড়া কেউই আজ আর বেঁচে নেই। কল্লোলদা চলে গিয়েছিলো জাঙ্গল ম্যালেরিয়ায়। দুদিনেরও কম সময়ে ব্রেনে পৌঁছে গিয়েছিলো রোগটা। পুলিশের কুমিংয়ের মধ্যে রয়েছি তখন। ডাক্তার ডাকা যায়নি। কালাচাঁদদা মরেছিলো সাপের কামড়ে। বাকিরা কালাজ্বর, পেটের অসুখ আর পুলিশ এনকাউন্টারে। আমার ডেস্টিনি হয়তো আজও আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে পালমৌর জঙ্গলে, আপনাকে এই লম্বা পথ হাঁটার গল্পটা শোনানোর জন্য। “দীর্ঘ একটা শ্বাস টানলো অবিনাশ। চোখ তুলে তাকিয়ে রইলো, ‘ট্রি ই ই’ শব্দে নিস্তব্ধতাকে চিরে দিয়ে উড়ে গেল কোন রাতচরা পাখি। সেই উড়ে যাওয়ার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো মানুষটা। তারপর আকাশ থেকে চোখ নামিয়ে তাকালো অভিরূপের দিকে। লাতিন আমেরিকার বিদ্রোহী কবিগায়ক ভিক্তর হারার ‘উনা উন ভেজ রেভেল্যুশনারিও’ (ওয়ান্স আ রেবেল) গানটার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল অভিরূপের। একটা লোক। সেই ছোটবেলা থেকে লড়তে লড়তে ক্লান্ত। একটা জীবন ভীষণ অন্যরকমভাবে বাঁচা আর পেরিয়ে আসা বিপদসংকুল একটা রাস্তা অ্যাতোটা সময় ধরে। সাধারন চেনাশোনা চৌহদ্দির একদম বাইরে। কোন প্রশ্ন না করে একদৃষ্টে অবিনাশের দিকে তাকিয়ে রইলো অভিরূপ। কিছুক্ষণ বাদে নিরবতা ভাঙ্গলো উল্টোদিক থেকেই – “প্রদ্যোতদা, কল্লোলদারা তো চলে গ্যালো। ওদের রক্তে মজবুত হওয়া এখানকার মাটিতে ভরসার পা গেড়ে বসলো আমাদের। জঙ্গলের বুকে গরীব মানুষের রাজ কায়েম হলো। এদিকে বাইরে থেকে আরও প্রচুর কমরেড চলে আসতে লাগলেন জঙ্গলে। একটা ফুল ফ্লেজেড গেরিলা আর্মি। কদিন বাদে এলেন কমরেড রামারাজু। অন্ধ্রের মানুষ। পার্টির সর্বোচ্চ স্তরের নেতা। ছোটখাটো চেহারা। মাথায় টাক। মুখে সবসময় লেগে থাকা মিষ্টি হাসি। ভীষণ ভালোমানুষ একটা চেহারা। আমাকে খুব পছন্দ করতেন। দুর্দান্ত বেহালা বাজাতেন মানুষটা, আমার গানবাজনার ঝোঁক দেখে অবসর সময়ে বেহালাটা নিয়ে বসিয়ে দিতেন আমাকে। হাতে ধরে শেখাতেন। আমিও উৎসাহ পেয়ে গেলাম খুব। জাঙ্গল মার্চ, অ্যাকশন প্ল্যান, পার্টি ক্লাস ঠাসা কর্মসূচী সারাদিন। তার মাখখানে সামান্য ফাঁক পেলেই বেহালাটা নিয়ে বসে পড়তাম। প্রদ্যোতদাদের ধরিয়ে দেওয়া বই পড়ার নেশাটাও ফের পেয়ে বসলো কমরেড রামারাজুর হাত ধরে। এবার ইংরিজী বই। দেশ বিদেশের। মনে আছে, প্রথম যেদিন এডগার স্নোর লেখা ‘রেড স্টার ওভার চায়না’ বইটা আমার হাতে তুলে দিলেন উনি, আমি তো আঁতকে উঠেছিলাম “ইংরিজী”। হেসেছিলেন রামারাজু। ঠিক কল্লোলদার মতো করে। প্রায় হুবহু একই কথা। “পড়ো, প্রথমবারে বুঝতে না পারলে অথবা ভালো না লাগলেও। দেখবে বইয়ের সঙ্গে থাকতে থাকতে একদিন ঠিক ভালো লেগে যাবে। অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেছিল কমরেড দাদার কথা। তারপর তো কত বইই না পড়লাম অ্যাতোগুলো বছরে। রেজি দেব্রের ‘রেভল্যুশন উইদিন রেভল্যুশন’, লুই মারিঘেল্লার ‘গেরিলা ওয়ারফেয়ার, চার্লি চ্যাপলিনের ‘হিয়ার আই এ্যাম’, মার্টিন লুথার কিংয়ের ‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’ । এদিকে দেশের পরিস্থিতিও পাল্টাচ্ছিলো দ্রুত।

চলবে

গত পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/ketjel-pakhi-the-bird-with-the-fiery-wings-bengali-novel-15/

একটা ভয়ঙ্কর অবস্থা চারপাশে। আর ঠিক তখনই অন্যদিকে বাঁক খেল জীবন। আরেকটা নতুন অধ্যায়। ঘুরে যাওয়া আনকোরা, প্রায় অচেনা একটা রাস্তায়।

সেলে আমার সেলমেটদের মধ্যে প্রদ্যোতদা আর কল্লোলদা। একজন যাদবপুর এঞ্জিনিয়ারিং। অন্যজন প্রেসিডেন্সী। সঙ্গে আরও কয়েকজন। এদিকে আমি তো তখনও উঁচু ক্লাসের দাদাদের ভাষায় ‘লুম্পেন প্রলেতারিয়েত।’ ছোটবেলা থেকে বেড়ে ওঠা স্বভাবটাকে পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারিনি তখনও। মাঝেমাঝেই গালাগাল দিয়ে ফেলি। মাথা গরম করে তেড়ে যাই এর তার দিকে। যদিও লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ার পর থেকেই একটু একটু করে কাটছিল সেটা। প্রতীপদা, ডাক্তারদাদের হাত ধরে। আর অমিতেশ স্যর। আমার জীবন নামে জাহাজটার ক্যাপ্টেন। একটু একটু করে পাল্টে দিচ্ছিলেন আমাকে। যেন গঙ্গার পাড় থেকে তুলে আনা একতাল নরম মাটি। ছেনে ছেনে মূর্তি তৈরি করার চেষ্টা করছিলেন একটা। সে সুযোগ আর পেলেন কই। তার আগেই তো পার্টির কাজ নিয়ে গ্রামে চলে গেলেন। আর এদিকে সময়ও তো ছোট হয়ে আসছিল দিন কে দিন। খালপাড়ের বস্তি থেকে উঠে আসা একটা রাগী ছেলে। ‘লুম্পেন প্রলেতারিয়েত’ থেকে ‘প্রলেতারিয়েত’ হয়ে ওঠার আগেই তো ধরা পরে চালান হয়ে জেলে। ডাক্তারদা, প্রতীপদা, অমিতেশ স্যরদের শেষ না করতে পারা কাজটা ফের নতুন করে শুরু হলো জেলে এসে। প্রদ্যোতদা, কল্লোলদাদের হাত ধরে। আমাকে কি ভালোটাই না বাসতো ওরা। লকআপে আমিই সবার চেয়ে ছোট। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমার সঙ্গে কথা বলতো ওরা। গল্প শোনাতো। দেশবিদেশের গরীবগুর্বো মানুষের লড়াইয়ের গল্প। আমার কথা শুনতো। কথার মাঝেমাঝেই হাসতে হাসতে ফেটে পড়তো আমার বলার কায়দায়। আবার কথার মাঝখানে মুখ ফসকে একটা গালাগাল বেড়িয়ে পড়লেই মাথার পেছনে একটা চাঁটি আর কান ধরে পাঁচবার ওঠবোস, প্রত্যেকবার। আমাকে বোঝাত প্রদ্যোতদা। “এই যে কথায় কথায় রেগে গিয়ে গালাগাল দিয়ে এর ওর দিকে তেড়ে যাস তুই, এটা আসলে তোর দুর্বলতা। আসলে মনের কোনে কোথাও শত্রুপক্ষ সম্পর্কে একটা ভয়ের জায়গা রয়েছে তোর। আর সেটাকে ঢাকা চাপা দিতেই উৎকট গর্জন, গালাগাল এসবের প্রয়োজন হয় তোর। এগুলো কাটিয়ে ওঠ। দেখবি একদিন আমাদের সবার চেয়ে বড় রেভল্যুশনারি হবি তুই। আ ট্রু গেরিলা ওয়ারিয়ার। কারণ আমরা সবাই যেখান থেকে এসেছি পিওর মিডল এ্যান্ড আপার মিডল ক্লাসেস, সেই পেটিবুর্জোয়া ভাইসেস থেকে ভয় পেয়ে, নানা ধরনের লোভ আর সুযোগ সুবিধার হাতছানিতে পিছিয়ে আসার একটা প্রবণতা থাকতেই পারে আমাদের মধ্যে। কিন্তু তুই …” আমার দিকে উজ্জ্বল চোখে তাকিয়েছিলো প্রদ্যোতদা। “তুই যেখান থেকে উঠে এসেছিস, ওই বস্তির ঘর, নোংরা, আবর্জনা, দুর্গন্ধ, দারিদ্রের সাথে চোয়াল কষা লড়াই, এগুলো তোকে শক্ত করেছে রোজ। ইচ এ্যান্ড এভরি মোমেন্টস ইন ইওর লাইফ। তাই তোর লোভের পিছুটান অনেক কম।” কি সুন্দর বলতো প্রদ্যোতদা। মনের মধ্যে হাতুড়ি দিয়ে ঠুকে দিতো একেকটা শব্দকে। ঠিক অমিতেশ স্যরের মতো। স্যরের কাছে গল্প শুনতাম। এবার শুরু হলো নিজে পড়ার পালা, কল্লোলদাদের চাপে পড়ে। সেলে লুকিয়ে লুকিয়ে আনা হতো সেসব বই। লি শাও চির ‘হাউ টু বি আ গুড কম্যুনিস্ট’, ‘জয়া শুরার গল্প’, হেমিংওয়ের ‘ফর হুম দ্য বেল টোলস’, আরও অনেক বই। এদিকে নিজের তো স্বপন কুমার আর হাঁদা ভোঁদা ছাড়া আর কিছু পড়ার অভ্যেস নেই কোনদিন। মাঝে মাঝেই পড়তে পড়তে বিরক্ত হয়ে “দুত্তেরি, নিকুচি করেছে তোমাদের পড়ার!” বলে বই ছুড়ে ফেলে দিতাম। এগিয়ে আসতো কল্লোলদা। কাঁধে হাত রেখে অদ্ভুত শান্ত একটা হাসি হেসে নীচুগলায় বলতো – “পড় পড়, হাল ছাড়িস না। দেখবি পড়তে পড়তেই একদিন ঠিক ভালো লেগে যাবে।” আর অবাক কাণ্ড। হচ্ছিলোও ঠিক তাই। ধীরে ধীরে ঢুকে যাচ্ছিলাম বইয়ের অক্ষরগুলোর মধ্যে। চেটেপুটে খাচ্ছিলাম প্রতিটা পাতাকে। অনুভূতিটা অনেকটা সেই স্নানের সময় জল ঢুকে অনেকদিন বন্ধ হয়ে থাকা কানের পর্দা হঠাৎ খুলে যাওয়ার মতো। শোঁ শোঁ করে খোলা হাওয়া ঢুকছে। প্রথম যেদিন ভুপেন্দ্র কিশোর রক্ষিতরায়ের ‘ভারতে সশস্ত্র বিপ্লব’ – এর মতো ইয়া মোটা বইটা পড়ে শেষ করলাম। সে আনন্দ বলে বোঝানো যাবে না। বইটা সেলের মেঝেতে নামিয়ে রেখেই চিৎকার করে লাফ দিয়ে উঠেছিলাম –“আমি পেরেছি! আমি পেরেছি!!”

এদিকে জেলের পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়ে উঠছিল দিন কে দিন। রাষ্ট্র যেন ঠিকই করে ফেলেছিল জেলের মধ্যে কাউকে আর বাঁচিয়ে রাখবে না। মাঝে মাঝেই পাগলি ঘণ্টি বেজে উঠছিল জেল কাঁপিয়ে। বেপরোয়া লাঠিচার্জ, চরাগোপ্তা গুলি, বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারা চলছিল সমানে। এরকমই একটা পাগলির দিন শহীদ হলো বেহালার সাগরদা, বাবলুদা। মারতে মারতে দোতলা থেকে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয় সাগরদাকে। থেঁতলে কিমা পাকানো মাংসের মতো হয়ে গেছিল শরীরটা।

সেই রাতে জেলে কেউ খায়নি। ফুঁপিয়ে কাঁদছিল কমরেডরা। গলা ফাটিয়ে স্লোগান তুলেছিল অনেকে। আমার কাঁধে চোট। পাঁচহাতি ডাণ্ডার মার। মুখের একপাশটা ফুলে ঢোল। ধুম জ্বর আর শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা। বারবার মনে হচ্ছিল এভাবে চলতে থাকলে একদিন জেলের মধ্যেই মরে যাবো আমি। সাগরদা – বাবলুদাদের মতো। অমিতেশ স্যরের কথা মনে পড়ছিল খুব। ক্লাসে গল্পটা শুনিয়েছিলেন স্যর। একটা পাখির গল্প। দক্ষিন আমেরিকার আমাজনের জঙ্গলে দেখতে পাওয়া যায়। সেখানকার আদিবাসীরা কেতজেল নামে ডাকে পাখীটাকে। বন্দী অবস্থায় বেশিদিন বাঁচেনা পাখীটা। নিজেকে অনেকটা ওই পাখীটার মতো মনে হচ্ছিল। বুকের মধ্যে ওর ডানার ঝাপটানি শুনতে পাচ্ছিলাম যেন। খাঁচা কেটে আকাশে উড়তে চাইছে কেজেল। আর সেই ওড়ার সুযোগটা তৈরি হচ্ছিল বেশ কিছুদিন ধরেই।

জেলের একপাশে গঙ্গার ধারে লাল পাঁচিলটার একটু দুরে একটা শুকনো কুয়ো। জেল পুলিশ আর গার্ডরাও ঠিকঠাক জানতো না কেন ওটা রয়েছে সেখানে। কিন্তু শওকত চাচা জানতো। শওকত আলি মণ্ডল। ধবধবে পাকা চুল আর দাড়ি। একসময় ক্যানিং লাইনের হাড়কাঁপানো ডাকাত। অনেকগুলো ডাকাতি আর খুনের আসামী। পয়সাওয়ালা গেরস্তের কাপড়ে চোপরে হয়ে যেতো ওর নাম শুনলে। লম্বা মেয়াদী লাইফার এই জেলে। পুরোনো মেট। জেলখানার প্রতিটা ইঞ্চির খবর রাখতো নখের ডগায়। কেন জানিনা আমাকে খুব ভালোবাসতো বুড়ো। সেই ছোটবেলা থেকেই আমার খিদেটা একটু বেশি। ‘চৌকা’ মানে রান্নাঘর থেকে লুকিয়ে চুরিয়ে একবাটি ডাল অথবা একটা মাছের টুকরো, মাঝেমাঝেই এনে খাওয়াতো আমাকে। সেই চাচাই আমাকে শুনিয়েছিলো গল্পটা। ওই কুয়োটার ওপর পাটাতন খাটিয়ে ফাঁসি দেওয়া হতো বিপ্লবীদের। সেই ব্রিটিশ আমলে। কুয়োটার তলায় একটা সুড়ঙ্গ আছে। দীর্ঘদিন অব্যবহারে মাটি আর পলি পড়ে পড়ে বুজে গেলেও সুড়ঙ্গটা রয়েছে। উত্তেজনায় দম আটকে আসছিল আমার – “ফের খোড়া যাবে?” ফিসফিসে গলায় প্রশ্ন করেছিলাম চাচাকে।

সেটা তো তোদের ব্যাপার। তোরা বুঝবি।” মুচকি হেসে উঠে গিয়েছিলো জেলঘুঘু, লাইফার।

সন্ধের পড় গিনতি ফাইল শেষ করে কয়েদি নম্বর মিলিয়ে নিয়ে চলে গেল আর্দালি মেট আর জমাদার সেপাই। সেলের টিমটিমে আলোর নীচে বসে শওকত চাচার কথাটা বললাম প্রদ্যোতদাদের। চুপ করে শুনছিল সবাই। “ইউরেকা!” আমার বলা শেষ হওয়া মাত্র কল্লোলদার মুখ থেকে ছিটকে বেরোলো শব্দটা। সেদিন অনেক রাত পর্যন্ত জেগেছিলাম আমরা। একই সঙ্গে সতর্ক থাকতে হচ্ছিল বারবার টহল দিয়ে যাওয়া গার্ড সেপাই আর সাধারণ কয়েদীদের সম্পর্কে। ওদের মধ্যে দুতিনজন দাগী আসামী যারা আসলে ইনফর্মার। সামান্য আঁচ পেলেও পরদিন সকালেই জেলারের টেবিলে পৌঁছে যাবে খবরটা। নজর রাখতে হচ্ছিল সেদিকেও।

জেলে পার্টি নেতৃত্বের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা চললো দুদিন ধরে। “নো বেল, ব্রেক জেল” – পার্টির ঘোষিত নীতির সাফল্য নির্ভর করছে পরিকল্পনার সফল রুপায়নের ওপর। প্ল্যান অনুযায়ী পরদিন সকালে গিয়ে ধরলাম শওকত চাচাকে। “বাগানে কাজ করতে চাই।” শুনে ফের একবার মুচকি হাসলো বুড়ো। “তবে রে হারামি। শিকলি কাটার মতলব।” তবে মনে মনে কি ভেবেছিলো কে জানে, পরের দিন সকালে ডেপুটি জেলার ভবানন্দ গুছাইতের টেবিলে ডাক পড়লো আমার। টেবিলের পাশে রাখা একটা চেয়ারে পা তুলে বসেছিলো গুছাইত। আমাকে দেখে চোখ নাচালো। ঠোঁটের কোনে শেয়ালে হাসি – “কিরে সেয়ানা? বিপ্লব ছেড়ে শেষ অবধি ফুলের বাগান! তা ভালো, মতিগতি ফিরুক তোদের। তাহলে লেগে যা কাল থেকেই তা দেখিস আবার, সটকানোর প্ল্যানফ্যান ভাঁজিস না যেন। তোদের শালা বিশ্বাস ফিশ্বাস নেই।” কথাগুলো বলার সময় একদৃষ্টে আমাকে মাপছিল গুছাইত। পাক্কা শয়তান লোকটা। জেলে প্রত্যেকটা ‘পাগলী’ আর নকশাল বন্দীদের পিটিয়ে মারার পেছনে সরাসরি হাত ছিল ওর। টেবিলের ওপর রাখা একটা পাথর। ক্যাম্বিস বলের সাইজ। পেপার ওয়েটের বদলে। ইচ্ছে করছিল এক ঝটকায় গলাটা পেঁচিয়ে ধরে ঠুকে দি রগের পাশে। কিন্তু না, এটা তার সময় নয়। অনেক বড় একটা পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে তাতে। অনেক কষ্টে একটা তাঁবেদারি হাসি ঠোঁটের কোনে ঝুলিয়ে রেখে সামলালাম নিজেকে। তারপর ঘাড় নেড়ে বেড়িয়ে এলাম ঘর থেকে।

পরদিন সকাল থেকেই ‘মালি’র কাজে বহাল হয়ে গেলাম আমি আর কালাচাঁদদা। কালাচাঁদ মিস্ত্রী। তারাতলার কারখানায় হাম্বর পেটাতো। লোহাপেটা চেহারা। অসুরের মতো জোর গায়ে। বেহালা এ্যাকশন স্কোয়াডের কর গ্রুপ মেম্বার। বাগানে কাজ করার ফাঁকে ফাঁকে পালা করে কুয়োয় নেমে যেতুম দুজনে পালা করে শওকত চাচার জোগাড় করে দেওয়া মোটা কাছি দড়ি বেয়ে, সঙ্গে বাগানে কাজ করার দুটো মজবুত শাবল আর কোদাল। লাগাতার চলছিল খোঁড়ার কাজ। বাইরে পাহারায় থাকা শওকত চাচা আর দুজনের একজন কেউ। কাছেপিঠে কাউকে আসতে দেখলে বা সামান্য বিপদের গন্ধ পেলেই কোমরে বাঁধা দড়িটার ওপর থেকে একটা হাল্কা টান। সঙ্গে সঙ্গে তরতরিয়ে উঠে আসা দড়ি বেয়ে। অন্ধকার কুয়োর মধ্যে ভ্যাপসা গরম আর দুর্গন্ধ। ছোট টর্চ জ্বালিয়ে খুঁড়তে খুঁড়তে দমবন্ধ হয়ে আসতো। তবু একদিনের জন্যও বন্ধ হয়নি খোঁড়ার কাজ। মাঝে মাঝে রাউন্ডে আসতো গুছাইত। “বাঃ, বেড়ে বাগান করেছিস তো শালারা। ফুলটুল তো ভালোই ফুটেছে দেখছি। কর কর, মন দিয়ে কাজ কর।” কথার জবাবে দাঁত বের করে হাসতাম শুধু। সেপাইদের নিয়ে দুলকিচালে চলে যেতো গুছাইত। এরকম চলতে চলতে মাসখানেক বাদে একদিন। শাবল দিয়ে প্রথম খোঁচাটা মেরেছি মাটিতে, সরু একটা আলোর পিন এসে বিঁধে গ্যালো চোখে। উত্তেজনায় পরপর আরও বেশ কয়েকটা শাবলের খোঁচা। হড়বড় করে দুহাতে মাটি টেনে সরাতেই হাত দশেক দুরে আদিগঙ্গার জল। প্রচণ্ড আনন্দে চিৎকার করে উঠতে গিয়েই মুখে হাত চাপা দিলাম। বেশ কিছুক্ষণ লাগলো নিজেকে সামলাতে। আলগোছে মাটি জড়ো করে সাবধানে বুজিয়ে দিলাম গর্তটা। তারপর উঠে এলাম দড়ি বেয়ে। একটু দুরে গাছে জল দিচ্ছিল কালাচাঁদদা। পাশে খুড়পি হাতে উপুড় হয়ে বসা শওকত চাচা। পোড়খাওয়া জেলঘুঘু আমার মুখ দেখেই মূহুর্তে বুঝে নিলো যা বোঝার। “তা হলে বাচ্চা?” আমাকে ওই নামেই ডাকতো চাচা। “কাজ তো হয়ে গ্যালো। এবার আল্লার নাম নিয়ে ঢিল দাও সবাই মিলে।” সেই মূহুর্তে অদ্ভুত একটা কথা ফসকে বেরোল মুখ থেকে। কেন সেটা আজও জানা নেই। “তুমিও আমাদের সঙ্গে চলো না চাচা। কদ্দিন এভাবে জেলের মধ্যে পচবে? ও আমি কল্ললদাদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে রাজি করিয়ে নেবোখন।” আমার দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত চোখে হেসেছিল সোঁদরবনের বাঘাটে ডাকাত। “সত্যিই মাথার ব্যারাম আছে তোর। আরে পাগলা, অনেক বড় কাজ করতে যাচ্ছিস তোরা। সেখানে আমার মত এঁদোছেঁদো চোরডাকাত

চলবে…

গত পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/ketjel-pakhi-the-bird-with-the-fiery-wings-bengali-novel-14/

রেসিপি

error: Content is protected !!