Tags Posts tagged with "রবীন্দ্রনাথ"

রবীন্দ্রনাথ

চেনা কবি — অচেনা রবি ( ৭ )

রবীন্দ্রনাথ যখন শিলাইদহে নিজের পুত্রকন্যাদের নিয়ে গৃহবিদ্যালয় শুরু করেনওই একই সময়ে কবির দাদা বীরেন্দ্রনাথের পুত্র বলেন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মবিদ্যালয় স্থাপনে ভীষনভাবে সচেষ্ট হয়েছিলেন। যেহেতু দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর পরিবারের ছিলেন সর্বময় কর্তা, তাই তাঁর সম্মতি ছাড়া বা অগোচরে সংসারের ব্যয়সম্পর্কিত কোনো কাজই করা হত না। তাই দুজনের দুই প্রান্তে গড়া দুটি স্বপ্নের কথা দেবেন্দ্রনাথ অনুমোদিত যে ছিল বলাবাহুল্য। বলেন্দ্রনাথের অকাল প্রয়ানে তাঁর পরিকল্পিত যে ব্রহ্মবিদ্যালয়ের ভবনটি নির্মিত হয়েছিল, কবির মেজদা সত্যেন্দ্রনাথ সেই প্রস্তাবিত বিদ্যালয় ভবনের দ্বারোদঘাটন করেছিলেন ২২ ডিসেম্বর ১৮৯৯ সালে। অবাক হবার ব্যাপার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হলেও ব্রহ্মবিদ্যালয় চালানোর দায়িত্ব কিন্তু নাতির অকাল প্রয়ানের পর দেবেন্দ্রনাথ কারো উপর দেননি।

এদিকে মৃণালিনীদেবী শিলাইদহে থাকতে না চাওয়ায় রবীন্দ্রনাথ ১৯০১ সালের জুন মাসে শিলাইদহ থেকে কলকাতায় স্ত্রীকে চিঠিতে লিখলেন,

এখানকার নির্জনতা আমাকে সম্পূর্ণ আশ্রয় দান করেছে, সংসারের সমস্ত খুঁটিনাটি আমাকে আর স্পর্শ করতে পারচে নানির্জনতায় তোমাদের পীড়া দেয় কেন তা আমি বেশ বুঝতে পারচি….।” 

সেই চিঠিরই শেষের দিকে স্ত্রীকে আশ্বাস দিয়েছিলেন এই বলে ‘এর পরে যখন সামর্থ্য হবে তখন এর চেয়ে ভালো জায়গা বেছে নিতে হয়তো পারব’। জুন থেকে ডিসেম্বর,  মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই বিকল্প ‘ভালো জায়গা’ তিনি পেয়ে চলে এসেছিলেন শান্তিনিকেতনে। মহর্ষির উৎসাহ ও আশীর্বাদকে সঙ্গে নিয়ে ১৯০১ সালের ২২ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে রবীন্দ্রনাথের ব্রহ্মবিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। যেহেতু তিনি শান্তিনিকেতনের জমির মালিক নন, এস্টেটের একজন সাধারণ সভ্য, তাই মাসিক দুশো টাকা মাসোহারা জুটত তাঁর। এমতাবস্থায় নানাবিধ, বিশেষ করে আর্থিক প্রতিকূলতাকে সঙ্গে করে কবি ব্রহ্মবিদ্যালয়কে এগিয়ে নিয়ে চললেন।

ব্রহ্মবিদ্যালয়ের আদিতে ছাত্রদের জীবনযাত্রা খুবই কঠোর ছিল। ব্রহ্মবিদ্যালয়ে তখন একটিমাত্র বাড়িই সম্বল ছিল। একতলায় তিনটি ভাগ করে তার একভাগে শিক্ষকদের বাসস্থান, একটি ভাগে পাঠচর্চা এবং আরেকটি ভাগে থাকা এবং পাঠ দুইই হত। খুব ভোরে উঠে ঘর ঝাঁট দিয়ে প্রাতঃকৃত্য করতে মাঠে যেতে হত। সেই থেকে ‘মাঠ করা’ কথাটি আজও এখানে প্রচলিত। এরপর ভুবনডাঙার বাঁধে স্নান সেরে এসে লাল বা হলুদ আলখাল্লা পরে এক একটা গাছের নিচে সংস্কৃত মন্ত্র সহযোগে উপাসনা করতে হত। এরপর হালুয়া জাতীয় খাবার দিয়ে প্রাতরাশ হত। খাওয়া সারা হলে আধঘন্টা মাটি কুপিয়ে ক্লাস শুরু হত। দশটা নাগাদ বিরতি। পছন্দমতো খেলা, হারমোনিয়ম বাজিয়ে গান বা গল্পের বই পড়া ছিল বিরতির রুটিন। এগারোটায় মধ্যাহ্ন ভোজে নিরামিষ আহার খেয়ে সাড়ে বারোটা থেকে আরেক দফা ক্লাস শুরু হত। তিনটে নাগাদ পনেরো মিনিটের বিশ্রাম পেত ছেলেরা। তারপর আবার ক্লাস করে বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ শেষ হত। এরপর খেলাধুলো। সাড়ে ছটা নাগাদ ফের উপাসনায় বসতে হত। সন্ধ্যা পার হত গানে গল্পে। এমনকী রবীন্দ্রনাথ উদ্ভাবিত নানাধরনের খেলা ছিল বিনোদনের অঙ্গ। সান্ধ্যভোজন হলে পর রাত ন’টায় শয্যাগ্রহণ। একেবারে তপোবনের আদর্শে চলা এই বিদ্যালয়টি ক্রমে ব্রহ্মচর্যাশ্রমে পরিনত হল। শিষ্যরা যেন গুরুগৃহে বাস করে তাঁর আদর্শে দীক্ষিত হতে লাগল। 

এই কঠোর কঠিন দায়িত্ব পালন করলেন কবিবন্ধু ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়। তিনিই কবিকে ব্রহ্মচর্যাশ্রমের শিক্ষাগুরু হিসেবে প্রথম ‘গুরুদেব’ ডাকে অভিষিক্ত করেন। 

কিন্তু কে এই শিক্ষাব্রতী, যাঁকে কবি শান্তিনিকেতনে নিয়ে এসেছিলেন বিদ্যালয় পরিচালনার জন্য? কেমনভাবেই বা কবির সঙ্গে ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়ের পরিচয় ঘটে??  ১৯০১ সালের গ্রীষ্মকাল। কবির ‘নৈবেদ্য’ প্রকাশিত হল, তখন The Twentieth Century নামের মাসিক পত্রের জুলাই মাসে নরহরি দাস নামে জনৈক এই কাব্যগ্রন্থের সুদীর্ঘ সমালোচনা লেখেন। নরহরি দাস আসলে ব্রহ্মবান্ধবের ছদ্মনাম। রবীন্দ্রনাথ পরবর্তীকালে ‘আশ্রমবিদ্যালয়ের সূচনা’ প্রবন্ধে এই সমালোচনা প্রসঙ্গে লিখেছিলেন

…( নৈবেদ্যের ) রচনাগুলির যে প্রশংসা তিনি ব্যক্ত করেছিলেন সেকালে সে রকম উদার প্রশংসা আমি আর কোথাও পাইনি।তিনি অকুন্ঠিত সম্মান দিয়েছিলেন।…” 

এরপর বঙ্গদর্শনে নানা রচনার সুবাদে দুজনের ঘনিষ্ঠতা বেড়েছিল। 

ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়

ব্রহ্মবান্ধবের পূর্ব নাম ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। হুগলী জেলার খন্যানের এই যুবক ছাত্রজীবনে কেশবচন্দ্র সেনের সংস্পর্শে এসে ১৮৮৭ সালে ব্রাহ্মধর্ম প্রচার শুরু করেন। সিন্ধুদেশেও যান সেই কারণে। সেই সময়ে খুড়তুতো ভাই কালীচরণের প্রভাবে প্রথমে প্রোটেস্ট্যান্ট ও পরে ক্যাথলিক সম্প্রদায়ভুক্ত হন। খৃস্টধর্ম প্রচারে নেমে পড়েন, যদিও তাঁর গায়ের বসন ছিল গৈরিক। ১৯০১ সালে স্বামী বিবেকানন্দের প্রভাবে হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করে ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায় নাম নেন। ১৯০২ ০৩ সালে বেদান্ত প্রচারের জন্য বিলেত যান, সেখানে অক্সফোর্ড ও কেম্ব্রিজে হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে বক্তৃতা দিয়ে জনপ্রিয় হন। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ‘রোমান ক্যাথলিক সন্ন্যাসী, অপরপক্ষে বৈদান্তিক — তেজস্বী, নির্ভীক, ত্যাগী, বহুশ্রুত ও অসামান্য প্রতিভাশালী’ বলেছেন।

কবি যখন শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয় শুরু করেন সেই খবর পেয়ে কবির আহ্বানে ব্রহ্মবান্ধব একেবারে গোড়ায় তাঁর কয়েকটি শিষ্য ও ছাত্র নিয়ে আশ্রমে যোগ দিয়েছিলেন। যেহেতু রবীন্দ্রনাথের বিদ্যালয় সম্বন্ধে কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না, তাই বিদ্যালয়ের সমস্ত কাজ গিয়ে পড়েছিল ব্রহ্মবান্ধব এবং আরেক শিক্ষক রেবাচাঁদের উপর।

সেই সময়ে কবি এই আশ্রমের জন্য তাঁর পরিচিতদের কাছে ছাত্র সংগ্রহ করে দিতেও অনুরোধ করেছিলেন!! 

শুভানুধ্যায়ী, ব্রক্ষবান্ধব উপাধ্যায়কেও তিনি দুটি অনুরোধ করেছিলেন!! একটি আশ্রমের শিক্ষকতায় অংশ নিতে!!

এবং দ্বিতীয়টি হল ছাত্র জোগাড় করতে!! উনি প্রথম প্রস্তাবে রাজি হননি!! কিন্তু চারটি ছাত্র জোগাড় করে দিয়েছিলেন!! নিয়মিত শিক্ষাকার্যে তিনি অংশগ্রহণ করেননি। অথচ  শিক্ষকতা না করেও কলকাতা থেকে তিনি মাঝে মাঝেই শান্তিনিকেতনে চলে আসতেন!! এসে এখানকার নিয়মশৃঙ্খলা এবং পঠনপাঠন দেখতেন!! রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সেসব নিয়ে পরামর্শও করতেন!!  রবীন্দ্রনাথ তাঁর সঙ্গে এই সাক্ষাতের একটি বর্ণনা লিখেছিলেন এক জায়গায়

শান্তিনিকেতন আশ্রমে বিদ্যায়তন প্রতিষ্ঠায় তাঁকেই আমার প্রথম সহযোগী পাই!! এই উপলক্ষ্যে কতদিন আশ্রমের সংলগ্ন গ্রামপথে পদচারণ করতে করতে তিনি আমার সঙ্গে আলোচনাকালে যেসকল দুরূহ তত্ত্বের গ্রন্থিমোচন করতেন আজও তা মনে করে বিস্মিত হই!!” 

আশ্রমের রূপ ও বিকাশ’ শীর্ষক প্রবন্ধমালার ‘আশ্রমবিদ্যালয়ের সূচনা’তে রবীন্দ্রনাথ আরো লিখলেন,

তখন উপাধ্যায় আমাকে যে গুরুদেব উপাধি দিয়েছিলেন আজ পর্যন্ত আশ্রমবাসীদের কাছে আমাকে সেই উপাধি বহন করতে হচ্ছে। আশ্রমের আরম্ভ  থেকে বহুকাল পর্যন্ত তার আর্থিক ভার আমার পক্ষে যেমন দুর্বহ হয়েছে, এই উপাধিটিও তেমনি। অর্থকৃন্ত্ত এবং উপাধি কোনোটাকেই আরামে বহন করতে পারি নে।…”

এই হলেন ব্রক্ষবান্ধব উপাধ্যায়। রবীন্দ্রনাথকে আশ্রমগুরু হিসেবে প্রথম গুরুদেবআখ্যা তিনিই দিয়েছিলেন!!” সেই ডাক আজও শান্তিনিকেতনের পথে প্রান্তরে আনাচে কানাচে কেমন বারে বারে বেজে যায়। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে। এই ডাকের মধ্যেই যে রবিঠাকুর শান্তিনিকেতনে বেঁচে আছেন সকলের কাছে।

চেনা কবি অচেনা রবি ()

তেরোটি সন্তান প্রসব করার পর গর্ভে যখন তাঁর অষ্টম পুত্র এল তখন বয়স আনুমানিক ৩৫ বছর!!

এর ঠিক তেরো বছর দশমাস পর সেই অষ্টম পুত্রটিই একটি ভয়ঙ্কর রাতের কথা লিখেছিলেন,

তখন কত রাত্রি জানি না, একজন পুরাতন দাসী আসিয়া চীৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিল

ওরে, তোদের কী সর্বনাশ হল রে!!’… 

স্তিমিত প্রদীপের অস্পষ্ট আলোকে ক্ষণকালের জন্য জাগিয়া উঠিয়া হঠাৎ বুকটা দমিয়া গেল, কিন্তু কী হইয়াছে ভালো করিয়া বুঝিতেই পারিলাম না!!” 

বোঝার কথাও নয়।তাঁর তখন বয়স ভারী অল্প।

সেদিনের সেই নিশ্চুপ নির্জন রাতের প্রহর পার করে যখন পূবাকাশে প্রথম আলোর চরণধ্বনি শোনা গেল, তখন বাইরের বারান্দায় এসে তিনি দেখলেন

তাঁহার সুসজ্জিত দেহ প্রাঙ্গণে খাটের উপর শয়ান!!” 

তখনও তাঁর তেরো বছরের অনভিজ্ঞ চোখ বিশ্বাস করতে চায়নি সে দৃশ্যের ভয়ঙ্কর রূপটি!! 

মৃত্যূ যে ভয়ংকর সে দেহে তাহার কোনো প্রমাণ ছিল না…!!”

মৃত্যূর সে ভয়ঙ্কর রূপটিকে তিনি টের পেলেন যেমন করে তা বর্ণনা করলেন তাঁর সুললিত লেখনীর আঁচড়ে,

কেবল যখন তাঁহার দেহ বহন করিয়া বাড়ির সদর দরজার বাহিরে লইয়া গেল!!” 

আর সকলের সঙ্গে যখন 

তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ শ্মশানে চলিলাম তখনই শোকের সমস্ত ঝড় যেন একেবারে এক দমকায় আসিয়া মনের ভিতরটাতে এই একটা হাহাকার তুলিয়া দিল…” 

যে হাহাকারের কথা এরপর তাঁর বালক মনে অনুরণিত হতে লাগল বারবার

এই বাড়ির এই দরজা দিয়া মা আর একদিনও তাঁহার নিজের ঘরকরনার মধ্যে আপনার আসনটিতে আসিয়া বসিবেন না!!”…. 

এই স্মৃতিচারণ রবীন্দ্রনাথ, মা’কে নিয়ে করেছেন।

কবির মা, সারদাসুন্দরী দেবীর পরিচয় দিতে গেলে জানা যায়, মাত্র ছয় বছর বয়সে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে বিয়ে হয়ে যশোর জেলার দক্ষিণডিহি থেকে এসেছিলেন। জ্ঞানদানন্দিনী দেবী তাঁর শাশুড়ির বিয়ের কথা বলতে গিয়ে লিখেছিলেন,

তাঁর [ সারদা দেবীর ] এক কাকা কলকাতায় শুনেছিলেন যে আমার শ্বশুরমহাশয়ের জন্য সুন্দরী মেয়ে খোঁজা হচ্ছে। তিনি দেশে এসে আমার শাশুড়িকে ( তিনি তখন ছয় বৎসরের মেয়ে ) কলকাতায় নিয়ে গিয়ে বিয়ে দিলেন। তখন তাঁর মা বাড়ি ছিলেন না — গঙ্গা নাইতে গিয়েছিলেন। বাড়ি এসে মেয়েকে তাঁর দেওর না বলে কয়ে নিয়ে গিয়েছেন শুনে উঠোনে এক গাছতলায় গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদতে লাগলেন। তার পরে সেখানে পড়ে কেঁদে কেঁদে অন্ধ হয়ে মারা গেলেন।…” 

খুবই মর্মান্তিক এ কাহিনি। সারদা দেবী যখন জোড়াসাঁকোর ভিটেতে প্রবেশ করেন তখন দ্বারকানাথের রমরমা অবস্থা। কথিত আছে পুত্রবধূর সৌভাগ্যকে ব্যবসার সাফল্য ধরে নিয়ে দ্বারকানাথ বালিকা সারদা দেবীকে এক লক্ষ টাকার হিরেমুক্তো বসানো খেলনা (?) উপহার দিয়েছিলেন। 

তা কেমন দেখতে ছিলেন জোড়াসাঁকো বাড়ির এই রত্নগর্ভা কর্তা মা?? কী বলছেন অবন ঠাকুর তাঁর ‘ঘরোয়া’তে??

কর্তাদিদিমাকে দেখেছি। তাঁর ছবিও আছে,…। ফোটো দিন দিন ম্লান হয়ে যাচ্ছে ও যাবে, কিন্তু তাঁর সেই পাকা চুলে সিঁদুরমাখা রূপ এখনও আমার চোখে জ্বলজ্বল করছে, মন থেকে তা মোছবার নয়। কর্তাদিদিমা রূপসী ছিলেন, কিন্তু ওই ছবি দেখে কে বলবে। ছবিটা যেন কেমন উঠেছে।…”

জ্ঞানদানন্দিনী দেবী তাঁর শাশুড়ি সম্পর্কে অবশ্য আরো তথ্য দিয়েছেন। 

আমার মনে পড়ে বাবামশায় যখন বাড়ি থাকতেন আমার শাশুড়িকে একটু রাত করে ডেকে পাঠাতেন, ছেলেরা সব শুতে গেলে। আর মা একখানি ধোয়া সুতি শাড়ী পরতেন, তারপর একটুখানি আতর মাখতেন। এই ছিল তাঁর রাতের সাজ।…”

এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায় সেই আমলে স্বামীর সঙ্গে সচরাচর দেখা হওয়াটাও কত দুর্লভ ছিল স্ত্রীদের। কবির মায়ের যে বিদ্যার প্রতি অনুরাগ ছিল সেকথা জানা যায় স্বর্ণকুমারী দেবীর লেখা থেকে,

মাতাঠাকুরানী ত কাজকর্মের অবসরে সারাদিনই একখানি বই হাতে লইয়া থাকিতেন। চাণক্যশ্লোক তাঁহার বিশেষ প্রিয় পাঠ ছিল, প্রায়ই বইখান লইয়া শ্লোকগুলি আওড়াইতেন। তাঁহাকে সংস্কৃত রামায়ণ পড়িয়া শুনাইবার জন্য প্রায়ই কোনো না কোনো দাদার ডাক পড়িত।…”

রবীন্দ্রনাথও জীবনস্মৃতিতে মায়ের এই মার্বেল কাগজ মোড়া কোণ ছেঁড়া রামায়ণের কথা লিখেছেন। 

এরপর পরবর্তী দীর্ঘ ছয় দশকেরও উপর তাঁর বুকের উপর দিয়ে এমন নানা শোকের ছায়া ক্রমাগত দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছে!! 

১৯০৮ সালে শান্তিনিকেতনের উপাসনা মন্দিরের এক উপদেশে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন এক স্বপ্নের কথা!! 

আমার একটি স্বপ্নের কথা বলি!! আমি নিতান্ত বালককালে মাতৃহীন!! আমার বড়ো বয়সের জীবনে মার অধিষ্ঠান ছিল না!! কাল রাত্রে স্বপ্ন দেখলুম, আমি যেন বাল্যকালেই রয়ে গেছি!! গঙ্গার ধারের বাগানবাড়িতে মা একটি ঘরে বসে রয়েছেন!! মা আছেন তো আছেনতাঁর আবির্ভাব তো সকল সময়ে চেতনাকে অধিকার করে থাকে না!! আমিও মাতার প্রতি মন না দিয়ে তাঁর ঘরের পাশ দিয়ে চলে গেলুম!! বারান্দায় গিয়ে এক মুহূর্তে আমার কী হল জানিনেআমার মনে এই কথাটা জেগে উঠল যে, মা আছেন!! তখনই তাঁর ঘরে গিয়ে তাঁর পায়ের ধুলো নিয়ে তাঁকে প্রণাম করলুম!! তিনি আমার হাত ধরে আমাকে বললেন, “তুমি এসেছ!!” এই খানেই স্বপ্ন ভেঙে গেল…..” 

সন্তানদের প্রতি তাঁর উদাসীনতার কথা পারিবারিক নানা রচনা থেকে জানা যায়। যদিও রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞরা একে উদাসীনতা বলতে নারাজ। তাঁদের মতে এটি বনেদি বাড়ির একটা পারিবারিক প্রথামাত্র। 

প্রসঙ্গক্রমে রবীন্দ্রনাথের ভাগ্নি সরলা দেবীর একটি স্মৃতিচারণ দেখা যাক্।

মায়ের আদর কী তা জানিনে, মা কখনো চুমু খাননি, গায়ে হাত বোলাননি। মাসিদের ধাতেও এসব ছিল না। শুনেছি কর্তাদিদিমার কাছ থেকেই তাঁরা এই ঔদাসীন্য উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন।…”

রবীন্দ্রনাথও তাঁর মায়ের পরশ নাপাওয়ার যন্ত্রণাকে ব্যাখ্যা করেছিলেন এমন করে,  

মাকে আমরা জানিনি, তাঁকে পাইনি কখনো!! তিনি থাকতেন তাঁর ঘরে তক্তাপোশে বসে, খুড়ির সঙ্গে তাস খেলতেন!! আমরা দৈবাৎ গিয়ে পড়তুম সেখানে, চাকররা তাড়াতাড়ি আমাদের সরিয়ে আনতযেন আমরা একটা উৎপাত!! মা যে কী জিনিস তা জানলুম কই আর!!” 

অভিমানে তাই বলেছিলেন

তাই তো তিনি আমার সাহিত্যে স্থান পেলেন না!!” 

কী যে নিদারুণ করুণ ঘটনা!!.. 

পরবর্তীকালে তিনি একটি গান বেঁধেছিলেন এমন

আঁধার দেখে তরাসেতে //

চাহিলাম তোর কোলে যেতে // 

সন্তানেরে কোলে তুলে নিলি নে // 

ছেলের প্রাণে ব্যথা দিয়ে // 

যদি, মা, তোর জুড়ায় হিয়ে //

ভালো, ভালো, তাই তবে হোক–// 

অনেক দুঃখ সয়েছি // 

মা, আমি তোর কী করেছি….!!”

সারাজীবন এত গান কবিতা গল্প উপন্যাসের রচনা করেছেন যিনি, তিনি তাঁর সমগ্রজীবনে একটি গ্রন্থও মা’কে উৎসর্গ করে যাননি!! 

ভাবলে শুধু অবাক নয়, তাঁর অভিমানের পরশ টের পাওয়া যায়!!

রেসিপি

error: Content is protected !!