(Valentines Week)
শীতের আমেজে বইমেলার উষ্ণতা বাঙালি জীবনের ক্যালেন্ডারে স্বমহিমায় রাজপাট দখল করে বসেছে। জেলা থেকে মহানগর- সর্বত্র চোখে পড়ার মতো ভিড়। আন্তর্জাতিক স্তরে কলকাতা, ফ্রাঙ্কফুর্ট বুক ফেয়ারকে রীতিমতো টক্কর দেয়। এবারও ব্যতিক্রম নয়। বইমেলা শেষ হতেই খবরে ‘ফুটফল’ নিয়ে বেশ কয়েকটি ওজনদার সংখ্যাতত্ত্ব নজরে এল। কিন্তু বই আদতে পড়ছে ক’জন? প্রশ্নটার প্রতিফলন রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বা আরও নির্দিষ্ট করে বললে ভোট বিজ্ঞানে খুবই প্রচলিত- কতটা জনসমর্থন ভোটে রূপান্তরিত হচ্ছে। ঠিক তেমনই কতটা জনসমাগম বই পড়ায় রূপান্তরিত হচ্ছে?
সম্প্রতি ব্রিটিশ শিক্ষা সচিব ব্রিজেট ফিলিপ্সন এই প্রশ্নটাই আবার তুলে দিয়েছেন। বিভিন্ন সংবাদপত্রে যা নিয়ে বেশ লেখালেখি হয়েছে। ডিজিটাল দৈত্যের থাবায় বই পড়া নিঃসন্দেহে কমেছে। লাস্যময়ী সমাজমাধ্যমের ঝাপটায় ডালিমের লালের মতো জমাট বেঁধেছে তার কষ্টগুলো। তাই এই ঈষদ্উষ্ণ সাড়া ও একরাশ মনখারাপের মাঝে হারিয়ে যাওয়া প্রেমিক-পাঠককে ভ্যালেনটাইনস সপ্তাহে খোলা চিঠি লিখতে কলম ধরেই নিজেকে উজাড় করে দিল বইয়ের প্রেমিকা সত্তা।
আরও পড়ুন: স্বপ্নের চারাগাছে জল দেওয়ার গল্প ‘অঙ্ক কি কঠিন’
প্রিয় পাঠক-প্রেমিক,
‘হাতের উপর হাত রাখা খুব সহজ নয়,
সারা জীবন বইতে পারা সহজ নয়
এ কথা খুব সহজ, কিন্তু কে না জানে
সহজ কথা ঠিক ততটা সহজ নয়’
রগরগে দুনিয়ার দগদগে বাস্তব এটাই। কবি শঙ্খ ঘোষ কঠিন সত্যটা সহজ কথায় বুঝিয়েছিলেন। কিন্তু প্রেমিকার মন যে বড়ই অবুঝ। তাই মানতে পারিনি। চটজলদি চটকের দুনিয়ায় আমার সঙ্গে প্রেম হয়তো আটপৌরে। বেশ ‘আউটডেটেড’। মলাটের মাঝে ভারী চেহারা ও ভারিক্কি মেজাজ নিয়ে বেজায় ট্রোল হতে হয়। কপালে জুটেছে কিছু খাসা খাসা বিশেষণ। কখনও রাস্তায় ওজন দরে ইজ্জত লুটছে, কখনও অন্ধকার ঘরে ধুলোবন্দি করে রাখছে। বইমেলায় বা শখের ‘রিডিং সেশন’ আমোদে-আহ্লাদে পুরোনো প্রেম ঝালিয়ে নেয় বটে। কিন্তু কয়েক পশলায় কি মনের দাবানল নেভে?

আমি তো খুচরো প্রেমে অভ্যস্ত নই। আজীবন প্রেমিকের রাতজাগা ভোর দেখেছি, হৃদয়ের কোলাহল শুনেছি, আদুরে রোদ্দুর মন বুঝেছি। একান্তে কথা বলেছি। একলা জীবনের হাত ধরেছি। সাক্ষী ছিল সময়ের পেয়াদারা। সাক্ষী ছিলাম আমরা। আমার প্রেমিক, আমার পাঠক। আর আমি।
সম্পর্কে চিড় ধরেছিল বছর দশ-পনেরো আগেই। সুখের সংসারে আগুন ধরাতে এল ‘হট এন্ড হ্যাপেনিং’ সোশ্যাল মিডিয়া। জীবনের দাপাদাপিতে এমনিই একে অপরকে সময় দিতে পারছিলাম না। সেখানে গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো হাজির হল ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ। প্রত্যেকেই স্মার্ট, অনেকটা সাম্যবাদী। আর তাই বোধহয় পিছিয়ে গেলাম আমি। (Valentines Week)
তোমার সঙ্গে আমার প্রেম ছিল অনেকটা কিশোর কুমারের গানের মতো, ‘এক পলকে একটু দেখা/আরো একটু বেশি হলে ক্ষতি কি/যদি কাটেই প্রহর পাশে বসে/মনের দুটো কথা বলে ক্ষতি কি’।
দুরন্ত সময়ের সঙ্গে গা ভাসাতে পারলাম না। আদতে সমাজমাধ্যমের অনুভূতিগুলো মোটা দাগের। লাইক, লাভ, অ্যাংরি, কেয়ার, লাফ, স্যাড, ওয়াও ক্লিকেই কেল্লাফতে! কমবেশি পাঁচ-ছটা অপশনের মধ্যে ঘোরাফেরা করে। সময়ের তাগিদটাও কম। হঠাৎ বন্ধ, হঠাৎ শুরুর মাঝে কোনও কিছু হারানোর নেই। ফেলে আসার রেশ নেই। আমি হয়তো অপেক্ষারত প্রেমিকার মতো। দিনের শেষে ফিরে এসে আবার অভিসার। বাস-ট্রেন-ট্রামের ব্যস্ততার ফাঁকে মুখরোচক প্রেম আমার জন্য নয়। তোমার সঙ্গে আমার প্রেম ছিল অনেকটা কিশোর কুমারের গানের মতো, ‘এক পলকে একটু দেখা/আরো একটু বেশি হলে ক্ষতি কি/যদি কাটেই প্রহর পাশে বসে/মনের দুটো কথা বলে ক্ষতি কি’। (Valentines Week)
আমার হাত ধরেই তো স্পেনের রাখালবালক মিশরের ধনসম্পদ খুঁজতে বেরিয়ে নিজেকে খুঁজে পায়। অথবা শ্যামনগর জুটমিলের বাঁধাধরা নিশ্চয়তা থেকে বেরিয়ে শঙ্করের সাক্ষাৎ হয় আফ্রিকার সিংহ, ব্ল্যাক মাম্বা, রোডেশিয়ান মনস্টার, হীরক খনির পাহারাদার বুনিপ, দৈত্যসম পাহাড়, অভেদ্য বন্য অরণ্য, কালাহারি মরুভূমি ও মাসাই উপজাতির সঙ্গে। আমার চোখ দিয়েই তুমি প্রেমিক হয়ে উঠলে। ‘ঠাকুমার ঝুলির’ সারল্য থেকে ব্যর্থ প্রেমের কামড় বুঝতে ‘দেবদাস’ পড়তে হয়। অথবা তথাকথিত নিষিদ্ধ প্রেমের স্বাদ পেতে ‘হঠাৎ নীরার জন্য’। (Valentines Week)

জীবনকে বোঝার জন্যও তো ছিলাম আমি। রবীন্দ্র রচনাবলী বা শরৎ রচনা সমগ্র। একঘেয়েমি কাটাতেও ভরসা ছিলাম। টিনটিনের দুঃসাহস থেকে হ্যারি পটারের আশ্চর্য দুনিয়া। হাঁদা-ভোঁদার দুরন্ত দুষ্টুমি থেকে ক্যালভিন এন্ড হবস’-র বিস্ময় বিশ্ব। ৩৭টা নাটক ও ১৫৪টা সনেট লেখা শেক্সপিয়রের মুখোমুখি হয়েই প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছ তুমি। প্রেম, পাপ, আশা, আকাঙ্ক্ষা, বন্ধুত্ব, বর্ণবিদ্বেষ, উচ্চাশা, প্রতিশোধ, মৃত্যু ও মুক্তি। আমার স্পর্শেই সবটুকুর অনুভূতি পেয়েছিল আমার প্রেমিক। (Valentines Week)
আমার চেনা গন্ধটাও কি ভুলে গেলে? শখ করে কেতাবি নাম রেখেছিলে বিবলিওস্মিয়া। তুমিই বলেছিলে, ‘নতুন বইয়ের গল্প শুঁকে ফুলের মতো ফুটবে’। মুক্ত বিহঙ্গের মতো নীলাকাশে উড়তে চেয়েছিলে ডানা মেলে। কল্পনার আলিঙ্গনে জাপটে ধরেছিলে আমায়। প্রচণ্ড শীতে একটু উষ্ণতার জন্য আমার গন্ধেই মেতেছিলে। ভেবেছিলাম ‘কাঁধে মাথা রেখে তোমার, হব এ দিগন্ত পার’। কিন্তু বাধ সাধল তোমার সাধের রিলস, পডকাস্ট, ভিডিও ব্লগের ফাস্ট ফুড। চাতক পাখির মতো আমি প্রেমের অপেক্ষায় নস্টালজিয়ায় বন্দি হলাম। (Valentines Week)
ফুড কোর্টের দয়ায় অঙ্কটা সম্মানজনক, রিলস বা আপডেটসের দাক্ষিণ্যে মুখটা ঝকঝকে। কিন্তু আড়ালে আবডালে গভীর অসুখ। এখন নাকি আমাকে শুনতে চায়, পড়তে চায় না। অডিও স্টোরির কনসেপ্ট প্রায় এক দশক পুরনো কিন্তু পালে হাওয়া লেগেছে কোভিড পরবর্তী দুনিয়ায়। সময়ের চাহিদায় একরকম সহজ পাঠ।
বইমেলা বা বইপাড়ায় অপরিণত আঙুলের স্পর্শ, আমাকে ঘিরে তর্ক-বিতর্ক, আমার অক্ষরে বা পুরোনো বাঁধাইয়ের গন্ধে ভালবাসার প্রথম চুমুক, সবই আজ সেপিয়া টোনের অতীত। দ্বিমত থাকতেই পারে। কেউ বলবে গালভরা গল্প শুনি অমুক দিনের ‘ফুটফল’ নয়া রেকর্ড গড়ল। (Valentines Week)
কিন্তু সত্যিই তাই? ফুড কোর্টের দয়ায় অঙ্কটা সম্মানজনক, রিলস বা আপডেটসের দাক্ষিণ্যে মুখটা ঝকঝকে। কিন্তু আড়ালে আবডালে গভীর অসুখ। এখন নাকি আমাকে শুনতে চায়, পড়তে চায় না। অডিও স্টোরির কনসেপ্ট প্রায় এক দশক পুরনো কিন্তু পালে হাওয়া লেগেছে কোভিড পরবর্তী দুনিয়ায়। সময়ের চাহিদায় একরকম সহজ পাঠ। একটা সময় ছিল শুধু আমার সঙ্গে একান্ত যাপনের জন্য আইরিশ নাট্যকার জর্জ বার্নার্ড শ বানিয়েছিলেন ছয় বর্গমিটারের ‘উডেন সামারহাউস’। শ’স কর্নার বলেই বেশি পরিচিত। আর আজ সব সম্পর্কের মধ্যেই তৃতীয়ের অনুপ্রবেশ। (Valentines Week)

সময়ের তাগিদে সবকিছুই বদলেছে। লাইব্রেরির নীরব অন্দরে দেখা করতাম, সময় কাটাতাম। আজ সময়টাই নেই ব্যস্ত পৃথিবীর। উপন্যাস, ছোট গল্প, কবিতা, নাটক। নবসাজে, নবরূপে পেয়ে বারে বারে বলেছ ‘তোমারেই যেন ভালবাসিয়াছি/শত রূপে শত বার/জনমে জনমে/যুগে যুগে অনিবার’। এই প্রেমটা ছিল রোজকার। বাঙালির আলুসেদ্ধ ভাতের মতো। যেমন কয়েকদিন আলাদা থাকলেই আনচান করে, মান-অভিমানের পালা চলে। (Valentines Week)
দূরত্ব বাড়ছে। প্রেমের মৃতনগরীতে এখনও খড়কুটো আঁকড়ে বেঁচে আছি। রাতের নিয়ন আলোয় এখনও খুঁজি আমার প্রেমিককে, আমার পাঠককে। তোমার চোখ বুজে এলে এখনও চাই বুক চিতিয়ে তোমার বুকে আশ্রয় নিতে। কাকভোরে ঘুম পেলে তোমার মাথার বালিশ হতে। মনখারাপে তোমার মতোই আমারও ভরসা অনুপমের কথাগান। তাই সেখান থেকেই ধার নিয়ে বলি, ‘নেই তুমি আগের মতো/আলগা সোহাগের মতো/ভালবাসার দাগের মতো/তুমি আর আগের মতো’। কথায় বলে, যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ। মোহ কেটে গেলে একদিন বোধহয় এই বন্দরেই ফিরবে তুমি, সাতসাগরের নাবিক। (Valentines Week)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
বিদ্যুৎক্ষেত্রে ১৫ বছরের ওপর কর্পোরেট কম্যুনিকেশন পেশাদার যার হৃদয় এখনও ইংরেজি সাহিত্য এবং সাংবাদিকতায় আটকে। দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া এবং দ্য ডেকান ক্রনিকল-এ কাজ করা এই প্রাক্তন সাংবাদিকের প্রথম প্রেম লেখালেখি, বই পড়া ও সিনেমা নিয়ে অবিরাম কথা বলা।
