(Republic Day)
রাষ্ট্র মানবসভ্যতার ইতিহাসে খুব প্রাসঙ্গিক এক বিষয়। চিন্তক-ভাবুক-দার্শনিকরা রাষ্ট্র নিয়ে কম ভাবেননি। ভেবেছেন, এবং ভাবনা লিপিবদ্ধও করেছেন। রাষ্ট্র সম্পর্কিত তাঁদের সে সমস্ত রচনা গুরুত্বসহকারে পঠিত ও আলোচিত হয়ে আসছে রাষ্ট্রব্যবস্থার আদিকাল থেকে। পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে তা নিয়ে বিদ্যায়তনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে চর্চাও অব্যাহত। গ্রন্থাগার আলো করে রয়েছে এই বিষয়ক তত্ত্ব-তথ্য সম্বলিত তাবৎ গ্রন্থরাজি। বর্তমানে ইন্টারনেটের কল্যাণে তা গ্রন্থাগারের বাইরেও সহজলভ্য, চাইলেই আমরা পড়ে ফেলতে পারি। কিন্তু বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র বলতে আমাদের ঠিক কী মনে হচ্ছে, আধুনিক দৃষ্টিতে সেটা একটু তলিয়ে দেখলে কেমন হয়! (Republic Day)
তা কি রাষ্ট্রের কোনও আধুনিক ভাষ্য তুলে ধরতে পারে? নিশ্চয়ই তুলে ধরতে পারে, কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন, নতুনকে স্বীকার করে নেওয়ার মতো মানসিক প্রস্তুতি এবং গভীর মননশীলতা। মননের গভীরতা মোটেও সহজসাধ্য নয়; কিন্তু ‘আরও গভীরে যাওয়া’র ইচ্ছা থেকেই যে এই রাষ্ট্রচিন্তার উৎপত্তি, তা অনস্বীকার্য। (Republic Day)
রাষ্ট্র কথাটা ভাবতে বসলে, স্বাভাবিকভাবেই এক রাশভারি নির্দয় কঠোর-কঠিন সত্তা মনে জেগে ওঠে। মনে হতে থাকে রাষ্ট্র মানে অধিকার— স্বৈরাচার ও স্বেচ্ছাচারের অধিকার, খেয়াল-খুশির অধিকার। রাষ্ট্র মানুষকে অধিকার দেয় হিংসার, সন্ত্রাসের। অধিকার কেড়ে নেয় স্বাধীন প্রাণের, মুক্তচিন্তার। শক্তিশালী রাষ্ট্র মানে স্পর্শকাতর রাষ্ট্র, যার নিজের সীমার বাইরে শেষ হয়ে যায় সমস্ত সংবেদনশীলতা; যে নিজের গায়ে একটা টুসকি পর্যন্ত সহ্য করতে পারে না, যে বিশ্বাস করে জিরো টলারেন্সে। (Republic Day)
শক্তিশালী রাষ্ট্র মানে স্পর্শকাতর রাষ্ট্র, যার নিজের সীমার বাইরে শেষ হয়ে যায় সমস্ত সংবেদনশীলতা।
মজার ব্যাপার, ব্যক্তিগত জীবনে ক্ষমতালিপ্সু এবং অসংবেদনশীল আমরাও যেন হয়ে উঠেছি অনেকটা রাষ্ট্রেরই প্রতিভূ। রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য মানুষের মধ্যে আরোপিত হওয়ার কারণে, অধুনা প্রত্যেক ব্যক্তি-মানুষই তাই এক-একটা রাষ্ট্র, প্রত্যেক রাষ্ট্রই মনুষ্য সমান। রাষ্ট্র মূষিককে লালন-পালন করে, আবার প্রয়োজনে চরম ক্ষিপ্রতায় মূষিক শিকার করে। রাষ্ট্র মার্জার পোষে; কখনও কখনও সেই মার্জারকে যথেচ্ছ মূষিক ভক্ষণেরও অধিকার দেয়! ক্ষমতা কিন্তু সম্পূর্ণ কেন্দ্রীভূত থাকে রাষ্ট্রের হাতে। তাই মার্জার মূষিক শিকার করলেও, তার নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রযন্ত্র নিজের হাতেই রাখে। চক্ষুলজ্জার কারণে অনেক সময় তাকে মার্জার-তাড়নেও প্রবৃত্ত হতে দেখা যায়। নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার থাকার ভান করে, অপরের কাঁধে বন্দুক রেখে উদ্দেশ্যসাধন করতে হয়। (Republic Day)

রাষ্ট্র আসলে কল বিশেষ। খাঁচাকলের মধ্যে আটক মূষিককে নিয়ে ছেলেখেলা করে। ইচ্ছা হলে প্রাণে মেরে দেয়, শখ চাপলে বেকসুর খালাস করে দেয়। কিন্তু পুরোটাই তার ইচ্ছাধীন। মূষিকের ইচ্ছা-অনিচ্ছায় দৃকপাত বা কর্ণপাতের কোনও প্রয়োজনই বোধ করে না। মূষিকেরও কণ্ঠস্বর থাকতে পারে— এ তার কল্পনার অতীত। আর কখনও কোনও মূষিক যদি তাকে বিব্রত করে, তাহলে তো কথাই নেই! তাকে শেষ করার আগে দু’বার ভাবে না। এমন হাড়-হিম করা আতঙ্কের মধ্যে রেখে তার মৃত্যু সুনিশ্চিত করে যে, বেড়ালের উদ্যত থাবায় অকস্মাৎ মৃত্যুকে পর্যন্ত সে আশীর্বাদ মনে করে। (Republic Day)
সংখ্যায় লঘু হওয়াটা তাদের অপরাধ এবং এই অপরাধ যেন তারা দগদগে ঘায়ের মতো সহ্য করে।
রাষ্ট্র ঠিক করে দেয়, শুধু সংখ্যার জোরে কোন মূষিকরা কোন মূষিকদের ওপর প্রভুত্ব বিস্তার করবে; আর সংখ্যালঘু মূষিকরা সবসময় চাপে থাকবে। সেই চাপ কমানোর জন্য তারা যদি গোষ্ঠীচেতনাঋদ্ধ কৌম জীবনযাপন করতে চায়, তাহলেও সমালোচিত হতে হয়। সংখ্যায় লঘু হওয়াটা তাদের অপরাধ এবং এই অপরাধ যেন তারা দগদগে ঘায়ের মতো সহ্য করে— যন্ত্রণায় কাতর হলেও তাদের যেন বাক্যস্ফূর্তি না হয়। প্রেম-ভালবাসার মতো অকারণ ভাবাবেগে তারা কাউকে মহীয়ান করে তুললেও, সংখ্যাগুরুর প্রতিনিধি যেন প্রয়োজনে তার ছল-চাতুরি কাজে লাগাতে পারে এবং সময়-সময় হিংস্র দাঁত-নখসহ নিজের আসল রূপ প্রকাশ করতে পারে। (Republic Day)

রাষ্ট্র একটা ধারণা, একটা বিমূর্ত সত্তা। পুরোটাই অনুভববেদ্য। কেউ অনুভব করতে চাইলে, করতে পারে। আবার করতে না-চাইলে, না-ও পারে। যখন যে বা যারা ক্ষমতায় থাকে, রাষ্ট্র তাদের অঙ্গুলিহেলনেই চলে। সে পুরুষ হতে পারে, নারী হতে পারে, সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় বা মৌলবাদী দল হতে পারে, হতে পারে স্বৈরাচারী শাসক, এমনকি মূষিককূলও। আধুনিক রাষ্ট্র হয়ে উঠতে গেলে তাকে রজ্জুতে সর্পভ্রমের আতঙ্কে ভুগতে হয়, ঘৃণা করতে জানতে হয়, সংকীর্ণ স্বার্থান্বেষী হতে হয়। মননে বুনে নিতে হয় সন্দেহ, মজ্জায় বহন করতে হয় আধিপত্যবাদ; আর বাইরে সুমহান হওয়ার ভন্ডামি প্রদর্শন করতে হয়। (Republic Day)
আধুনিক পৃথিবীতে রাষ্ট্রের হয়ে ওঠা উচিত ছিল কল্যাণকামী। কিন্তু তা আভিধানিক শব্দ হয়েই রয়ে গেল।
আধুনিক পৃথিবীতে রাষ্ট্রের হয়ে ওঠা উচিত ছিল কল্যাণকামী। কিন্তু তা আভিধানিক শব্দ হয়েই রয়ে গেল। বাস্তবে রাষ্ট্র হয়ে উঠল সন্ত্রাসবাদী, দিতে লাগল সন্ত্রাসে উস্কানি। তৈরি হল গালভরা শব্দ-লব্জ— স্টেট স্পন্সরড টেররিজম। কিন্তু সন্ত্রাসবাদে এই মদতের মাধ্যমে রাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে নিজের।

ভুবনগ্রামের মানুষ বুঝে উঠতে পারছে না, রাষ্ট্র সত্য না সন্ত্রাস? আগে তবু তার মাঝে মাঝে মনে হত, হয়তো রাষ্ট্র সত্য। কারণ সন্ত্রাস কখনও শেষ সত্য হতে পারে না। বর্তমানে আর গান্ধীবাদী দর্শনে আস্থা রাখতে না পেরে, বাধ্য হয়ে সে দেখছে আস্তে আস্তে রাষ্ট্রকে সরিয়ে সন্ত্রাস-ই সর্বেসর্বা হয়ে উঠছে। সে-ই দখল করছে সেন্টার স্টেজ। এইভাবে চলতে থাকলে আর কিছুদিনের মধ্যেই না শুনতে হয়— রাষ্ট্র তোমার দিন গিয়াছে! (Republic Day)
দেশপ্রেমের মোড়কে তাদের মধ্যে রাষ্ট্রচেতনা সঞ্চারিত হলে, সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মানুষ হয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মনে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করতে পারে।
রাষ্ট্রবাসী…? জনগণ…? যে যার নিজের চিন্তায় ব্যস্ত। অপরের জন্য আর বিন্দুমাত্র সময় নেই। তারা কী ব্যস্ত, কী ব্যস্ত! অথচ অধিকাংশ সময়-ই অশ্বডিম্ব ছাড়া আর কিছুই প্রসব করে না। জনগণের সার্বিক স্বার্থ জড়িত থাকলে বা নেতাদের দ্বারা চালিত হলে, তারা রুষ্ট হয়ে হিস্টিরিয়াগ্রস্তের মতো আচরণ করতে পারে। খেলা ভেবে পাথর ছুঁড়ে মারতে পারে শৃঙ্খলিত একক প্রাণকে। উল্লাসে গণপিটুনিতে মেতে উঠতে পারে। দেশপ্রেমের মোড়কে তাদের মধ্যে রাষ্ট্রচেতনা সঞ্চারিত হলে, সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মানুষ হয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মনে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করতে পারে, ধর্মীয় উৎসবে ধর্মকে দূরে সরিয়ে রেখে হুজুগে পাবলিক হয়ে উদ্দেশ্যহীনতায় ভেসে যেতে পারে, কিন্তু প্রকৃত সত্য বা আগুনে পোড়া বাস্তবকে সামলানোর দক্ষতা বা যোগ্যতা তাদের নেই। (Republic Day)

রাষ্ট্রীয় নাগরিক হিসাবে রাষ্ট্রের যে কোনও উদ্দেশ্যমূলক কর্মসূচি বা প্রোপাগান্ডাকে তোল্লাই দেওয়াই তারা মনে করে সুমহান দায়িত্ব পালন। তাদের কাছে তা অবশ্য কর্তব্যও বটে। এ হেন মানসিক অবস্থানের কারণে রাষ্ট্রকে প্রতিপ্রশ্ন তো দূরের কথা, নিজেদের নির্লজ্জ বশ্যতামূলক আচরণকেই তারা প্রশ্ন করতে ভুলে গিয়েছে অনতি অতীতে। তাই আর তাদের মনে নেই, তারা রাষ্ট্র নির্মাণ করেছ না রাষ্ট্র তাদের! (Republic Day)
দেশ বললেই কেমন যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে দেশমাতৃকার ছবি! দেশ যেন স্নেহবৃত্ত বৈ আর কিছু নয়।
রাষ্ট্র মানে কি দেশ? সাধারণ বুদ্ধিতে মনে হতে পারে রাষ্ট্র মানে তো দেশ-ই। কিন্তু সত্যিই তা-ই? রাষ্ট্র আর দেশের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য কিন্তু আছে, পার্থক্যটা সত্তার। দেশ বললেই কেমন যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে দেশমাতৃকার ছবি! দেশ যেন স্নেহবৃত্ত বৈ আর কিছু নয়। সে আশ্রয় দেয়, প্রশ্রয় দেয়, ভালবাসতে শেখায়, শাসন জানে না, শাসন করলেও ভালবাসার শাসন— তাতে নিজের কষ্টবৃদ্ধি ছাড়া আর কিছু হয় না।

দেশ তো সাধারণ মানুষ ছাড়া কিছু নয়। সেই সাধারণ মানুষ পাপকে পাপ বলে স্বীকার করে ঘৃণা করতে ভুলে যায়— তাদের ভয়, পাছে তাদের পাপকেও অন্য কেউ ঘৃণা করে— তাদের প্রতিভূ দেশও আর শুধু শুধু এসব গুরুত্বহীন ব্যাপারে মাথা ঘামাতে চায় না। তার চেয়ে রাষ্ট্র হয়ে ওঠার সাধনায় সিদ্ধিলাভের জন্য ধর্মীয় ব্যাপারে সক্রিয়তা, শাসক-বিরোধীদের প্রতি অতি সক্রিয়তা এবং যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলায় অতিরিক্ত সক্রিয়তা দেখানো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। তাই দেশও সেই কবি, সেই রাষ্ট্রনেতাকে খুঁজে বেড়ায়, যাঁদের কাব্যে, বাক্যে সে আবার সকল দেশের সেরা হয়ে উঠতে পারে। (Republic Day)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
পেশায় শিক্ষক দিলীপকুমার ঘোষের জন্ম হাওড়ার ডোমজুড় ব্লকের দফরপুর গ্রামে। নরসিংহ দত্ত কলেজের স্নাতক, রবীন্দ্রভারতী থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। নেশা ক্রিকেট, সিনেমা, ক্যুইজ, রাজনীতি। নিমগ্ন পাঠক, সাহিত্যচর্চায় নিয়োজিত সৈনিক। কয়েকটি ছোটবড় পত্রিকা এবং ওয়েবজিনে অণুগল্প, ছোটগল্প এবং রম্যরচনা প্রকাশিত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে 'সুখপাঠ' এবং 'উদ্ভাস' পত্রিকায় রম্যরচনা এবং দ্বিভাষীয় আন্তর্জালিক 'থার্ড লেন'-এ ছোটগল্প প্রকাশ পেয়েছে।
