(Winter)
আরও পড়ুন: বনজ কুসুম: পর্ব – [১] [২] [৩] [৪] [৫] [৬] [৭] [৮] [৯] [১০] [১১] [১২] [১৩] [১৪] [১৫] [১৬] [১৭] [১৮] [১৯] [২০]
সংক্রান্তি পেরিয়ে পৌষ ফুরিয়ে গেলো। আসলে সেভাবে ঠিক ফুরিয়ে যায়নি। উত্তুরে হাওয়ার কাঁপন লাগিয়ে, পৌষলক্ষ্মীর ঝাঁপিখানি সোনার ধানে ভরে দিয়ে, তবে না সে রেহাই পেলো। ঘরে ঘরে নতুন চালের পিঠে হলো, পায়েস হলো। এ গাঁয়ে, সে গাঁয়ে ছেলে-বুড়োর দল চড়ুইভাতি নিয়ে মেতে উঠলো। তাদের বাজনা আর জগঝম্পের ঢেউ আছড়ে পড়লো গাছগাছালির উপরে। বানরের দল বন ছেড়ে পালালো। শুধু কি পালালো! মানুষের গেরস্থালিতে ঢুকে পড়ে মুলোটা, বেগুনটা ছিঁড়ে মুখে দিলো, আলুবাড়ি (আলুর জমি) তছনছ করলো। এইসব নিয়ে পৌষের জবুথবু দিন চলে গেলো ওই। (Winter)

ওর চলে যাওয়ার খোঁজ রাখলো গেরস্থালির ক্যালেন্ডার, চাল কোটার মেশিন আর খেজুর রসের কারিগর। মকরের চানে যারা গিয়েছিল, তারা ফিরে এলো এক ঝোলা গল্প নিয়ে। সে গল্পে রাজ্য-রাজনীতি থেকে আন্তর্জাতিক কোন্দল ঢুকে পড়ল হুড়মুড় করে। মকরের চানের চেয়ে সেই গল্পের নেশা ঢের বেশি আনন্দের। কেবল কেউ কেউ একথা টের পেল – আজ থেকে তিলে তিলে দিন বড় হবে আবার। সেই এক তিল বড় হওয়া দিন আর কুয়াশার ভোর ঠেলে অবশেষে এলো মাঘ। (Winter)

রাঢ় দেশের গাঁয়ে গাঁয়ে এই পয়লা মাঘেই তো ব্রহ্মদৈত্যের পুজো। তবে এ পুজোয় মন্ত্রতন্ত্র বড় নয় গো, বড় হলো অন্তরের ডাক। তুমি সামান্য ফল প্রসাদই দাও না কেন! বাবার পুজোয় এক মুঠো চিঁড়ে আর ভিরে (গুড়) হলেই হলো। তিনিই তো সারা বচ্ছর এই আবাদি জমি পাহারা দেন। মানুষের রোগ-জ্বালার উপশম করেন। তাঁর কল্যাণেই মানুষের ভাঙা হাড় জোড়া লাগে, চষা ক্ষেতে দক্ষিণের আলো এসে পড়ে। বাবার নামে তাই মেলা বসে। সে মেলা ব্রহ্মদৈত্যের মেলা নামেই খ্যাত।
কোনও গ্রামে আবার হাঁড়ির মেলাও হয়। মানুষেরা দরাদরি করে মেটে হাঁড়ি কেনে, কলসি কেনে। কলসিতে কি মানুষ কেবল জল রাখে! চাল রাখে, গুড় রাখে, আরও কত কী রাখে, তার কোনও ঠিক আছে! (Winter)

আসলে মানুষের এই গার্হস্থ্য দিন নানা রকমের সুতো দিয়ে গাঁথা। সে সুতোর বুননে তুমি যদি একবার ঢুকে পড়েছ, তবে আর রেহাই নেই। বাংলা ক্যালেন্ডার তুমি দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখোনি, তবু কী আশ্চর্য দেখো – একখানা লোকজ যাপন দিয়ে বোনা আছে তোমার দিনগুলো। এও তো এক রকমের কৌমজীবন। যে জীবন একদা ছিল, যে জীবন আজ আর নেই – তবু কী নিপুণ তার গ্রন্থনা। সে পিঠে হোক, মুলো হোক, অথবা নিছক শীতল ষষ্ঠীর সূত্রে একখানা বছরভিত্তিক যাপনকে স্থির করে দিয়েছে। আর ভাবতে অবাক লাগে এত কিছুর পরেও সেসব কিছু কিছু করে টিকে আছে অভ্যাসের মতো। (Winter)
নারীতন্ত্র আর পুরুষতন্ত্র দিয়ে গড়া মানুষের রান্নাঘরখানা। তাকে সংক্রান্তি আর অরন্ধন দিয়ে চিনতে চাওয়া বোকামি। যে মেয়েটি নরম রোদ্দুরে বসে বসে রাঙালু পোড়া দিয়ে পয়রা গুড় খাচ্ছে, তাকে আর বিচলিত করে লাভ কী!
সেসব অভ্যাসের ভাল-মন্দ নিয়ে আজ কথা বলার সময় নয়। বরং ভাবলে ভালই লাগে – বসন্ত পঞ্চমীর পরদিন ঘরে ঘরে যে অরন্ধন হয়, তার মধ্যে বিশ্রাম পায় শিলনোড়াখানি। আসলে সে তো নয়, বিশ্রাম পায় একখানা শ্রমজীবী হাত। যে হাত বাটনা বেটে বেটে ক্লান্ত। একদিনের ছুটিতে তার আদৌ কি কিছু এসে যায়! যায় না, তবু কেউ তো ভেবেছিল তার কথাও। সমবেদনাকে এই রান্নাঘর ঠিক কীভাবে চিনেছিল, তার স্পষ্ট ধারণা করা কঠিন। প্রতিটি জীবন নিজের মতো করে বড় হয়। যাঁরা বিশ্বাস করতেন – ‘ঝি জব্দ শিলে আর বউ জব্দ কিলে’, তারা কি এমন অরন্ধনের দিনে খানিক হতাশ হতেন? (Winter)

নারীতন্ত্র আর পুরুষতন্ত্র দিয়ে গড়া মানুষের রান্নাঘরখানা। তাকে সংক্রান্তি আর অরন্ধন দিয়ে চিনতে চাওয়া বোকামি। যে মেয়েটি নরম রোদ্দুরে বসে বসে রাঙালু পোড়া দিয়ে পয়রা গুড় খাচ্ছে, তাকে আর বিচলিত করে লাভ কী!
সময়ের অক্ষরে নতুন নতুন বর্ণমালা লেখা হবে। এই পৌষ আর মাঘের দিন, কবেকার কোন ভেঙেচুরে যাওয়া কৌমকে কেবলই জুড়ে জুড়ে গল্প বলতে চাইবে, জানি না। (Winter)

তবুও মেটে হাঁড়ির মেলা আর মুড়ির মেলা আশ্বাস দেয় খানিক। এখনও মেটে হাড়ি কেনে তাহলে লোকে! বাসন দিয়ে ঘেরা রান্নাঘরের কিছু কিছু পিছুটান থাক না হয়। অবাঞ্ছিত গ্রাম জীবন নিজেও কি জানে এসব! জগঝম্পের চড়ুইভাতি আর মেটে হাড়ির মেলা, দুটি ব্যতিক্রমী জীবনের মতো জেগে থাকে মাঘের সকালে – কুয়াশা আর সর্ষেফুলের গন্ধে। (Winter)
মেথি ফোড়নে সর্ষেবাটায় সরলপুঁটি
উপকরণ : সরল/সরপুঁটি মাছ, সর্ষের তেল, মেথি, সাদা-কালো মেশানো সর্ষেবাটা, কাঁচালঙ্কা, নুন, হলুদ, ধনেপাতা।

পদ্ধতি: সরপুঁটি মাছ কেটে বেছে ধুয়ে নিন। নুন, হলুদ মাখিয়ে রাখুন কিছুক্ষণের জন্য। সাদা-কালো সর্ষে মিশিয়ে একটা কাঁচালঙ্কা দিয়ে বেটে নিন। এবার কড়াই বসিয়ে তেল গরম হতে দিন। তেল গরম হয়ে গেলে মাছগুলি সাঁতলে বা হালকা করে ভেজে তুলে নিন। সরপুঁটি মিষ্টি মাছ, অসুবিধা না হলে খুব বেশি কড়া করে না ভাজাই ভাল। ওই তেলেই মেথি আর কাঁচালঙ্কা চিরে ফোড়ন দিন। ফোড়নের গন্ধ বেরোলে সর্ষেবাটা আর হলুদ জলে গুলে ছেঁকে সেই জলটি দিন। নুন দিন। ঝোল ফুটে উঠলে মাছ দিন। ঝোল বেশ গা-মাখা হয়ে এলে ধনেপাতা আর কাঁচালঙ্কা ছড়িয়ে রান্না শেষ করুন। শীতের দিনে সরপুঁটি মাছ খেতে ভাল। (Winter)
চই পিঠা
উপকরণ: চালের গুঁড়ো, নুন, সাদা তেল, শুকনো লঙ্কা, কাঁচালঙ্কা, রসুন কুচি, পেঁয়াজ কুচি (চাইলে নাও দিতে পারেন), মটরশুঁটি, ধনেপাতা। কেউ চাইলে ডিমও দিতে পারেন।

পদ্ধতি: চালের আটা শুকনো খোলায় নেড়ে নিন। একটি পাত্রে অল্প পরিমাণে জল ফুটতে দিন। ফুটে উঠলে চালের গুঁড়ো দিয়ে নেড়েচেড়ে ঢাকা দিয়ে রাখুন। হাত সওয়া গরম হলে খুব ভাল করে মেখে নিন। এবারে অল্প অল্প করে মণ্ড নিয়ে গোল বা পুলি পিঠের মতো গড়ে নিন। ভিতরে কোনও পুর দিতে হবে না। সবগুলি গড়া হয়ে গেলে, একটি পাত্রে জল বসিয়ে মুখে একটি জালি বসান। পুলিগুলি ভাপিয়ে নিন। ভাপানো হয়ে গেলে পুলিগুলি হালকা ঠান্ডা করে নিন।
এবারে একটি ছুরি বা বটি দিয়ে পুলি গুলি ছোটো ছোটো টুকরোয় কেটে নিন। একটি কড়াইয়ে তেল দিন। তেল গরম হলে শুকনো লঙ্কা, কুচিয়ে রাখা রসুন এবং লঙ্কা, চাইলে পেঁয়াজ ভেজে নিন। সেদ্ধ করে রাখা আধবাটা মটরশুঁটি দিন। নুন দিন। পুরো মশলাটা তৈরি হয়ে গেলে কুচিয়ে রাখা পিঠে গুলো দিয়ে ভাল করে মিশিয়ে নিন। চাইলে ডিম ভেজে ঝুরি ঝুরি করেও মেশাতে পারেন। সকাল বা বিকেলের জলখাবারে অল্প ধনেপাতা ছড়িয়ে পরিবেশন করতে পারেন চই পিঠা। (Winter)
অমৃতা ভট্টাচার্য (জ.১৯৮৪-) শান্তিনিকেতনের জল হাওয়ায় বড়ো হয়েছেন। পাঠভবনে তাঁর পড়াশোনা। পরে বিশ্বভারতীর বাংলা বিভাগ থেকে বাংলা উপন্যাসে বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে গবেষণা করেছেন। পড়িয়েছেন জগদ্বন্ধু ইনস্টিটিউশনে এবং পরে চারুচন্দ্র কলেজে। বর্তমানে স্বেচ্ছাবসর নিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলের দেশজ রান্না নিয়ে কাজ করছেন। স্বপ্ন দেখেন পুঁজির প্রতাপের বাইরে অন্যরকম জীবনের, খানিকটা যাপনও করেন তা। যে হাতে শব্দ বোনেন সেই হাতেই বোনেন ধান, ফলান সব্জি। দেশ-বিদেশের নানা-মানুষের অন্যরকম জীবন দেখতে ভালোবাসেন। তাঁর লেখা স্মৃতিগ্রন্থ ‘বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ ’ এবং 'রেখেছি পত্রপুটে' পাঠকের সুসমাদর পেয়েছে।
