(Boral Shib Mandir)
শ্রাবণের বর্ষাস্নাত সকালে যখন প্রথম কাদায় ভরা বকুলতলার মাঠ পেরিয়ে এগিয়ে যাই জোড়া শিবমন্দিরের দিকে, এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়, সময় যেন এখানে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়েছে। আড়াইশো বছরের পুরনো টেরাকোটা মন্দির দু’টো বনজঙ্গলে ঘেরা এক অযত্নের মাঝে দাঁড়িয়ে। দেখে মনের ভিতর এক অদ্ভুত অনুভূতি জেগেছিল— যা আসলে বিস্ময় আর শ্রদ্ধার মিশেল। (Boral Shib Mandir)
কলকাতার দক্ষিণ প্রান্তে, ভাঙাচোরা, চমকপ্রদ এই শিব মন্দিরের কাছে যেতেই বিস্ময়! জরাজীর্ণ মন্দিরে লালচে-বাদামি টেরাকোটার দেওয়াল জুড়ে শ্যাওলার আলপনা। বহু যুগ আগে শিল্পীদের নিপুণ হাতে সেজেছিল দেবালয়; বাহারি কলকা, ফুল, লতাপাতা, দেব-দেবীর মোটিফে তাঁদের হাতের ছোঁয়া, প্রতিটি খাঁজে তাঁদের প্রাণ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু জায়গায় ভেঙে গিয়েছে, ফাটল ধরেছে, গাছের শিকড় ঢুকে গিয়েছে— তবু সেই ক্ষয়ের মধ্যেই একটা অদম্য জীবনীশক্তি লুকিয়ে আছে, যেন বেঁচে ওঠার এক আর্তি। (Boral Shib Mandir)
আরও পড়ুন: শতবর্ষ পেরিয়ে প্রদীপ কুমার
আমার বন্ধু তমালের (শিল্পী তমাল ভট্টাচার্য) কাছে, বোড়ালের এই জোড়া শিবমন্দিরের গল্প শুনেছি আগেই। আসলে আগে এই অঞ্চল ছিল এক অজ পাড়া গাঁ এবং সুন্দরবনের অংশ। হুগলি নদীর দক্ষিণ ধারা আদিগঙ্গা নাম নিয়ে কালীঘাট পেরিয়ে রসার মধ্য দিয়ে, সিরিটি হয়ে বৈষ্ণবঘাটার পাশ দিয়ে সাগরে মিশেছিল চক্রতীর্থের কাছে। (Boral Shib Mandir)

ছত্রভোগ নদীবন্দর হয়ে সমুদ্রপথে বাণিজ্য হত, এটাই ছিল অন্যতম প্রধান trade route। মনসামঙ্গল কাব্যে এই পথের বর্ণনা আছে। ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বার সঙ্গে সঙ্গে, বসতি ও জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায়। আদিগঙ্গার মজা খাতের চিহ্ন আজ প্রায় অবলুপ্ত। কিন্তু প্রাচীন মন্দির, পুকুর, ঘাট এই নদীর স্মৃতি বয়ে নিয়ে চলেছে। বোড়ালে সেন যুগের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনও পাওয়া গিয়েছে। (Boral Shib Mandir)
১৬৯৮ শকাব্দ অর্থাৎ ১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দে জমিদার টিকারাম ঘোষের তৈরি মন্দির দুটো শুধু পাথর-ইটের স্তূপ নয়— এ যেন বাংলার নদীমাতৃক গ্রামের হৃৎপিণ্ড। যেখানে একসময় আদিগঙ্গার স্রোত বয়ে যেত, আর মানুষের হাতে তৈরি শিল্প চিরকালের জন্য ধরা দিত। (Boral Shib Mandir)

দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ দেখতে পাই এক বায়োস্কোপওয়ালাকে, ম্যাজিক বাক্স নিয়ে মাঠের মাঝে দাঁড়িয়ে। তাঁকে ঘিরে জড়ো হয়েছে ছেলেপুলের দঙ্গল। মাঠের পাশে জরাজীর্ণ মন্দির দু’টোকে কেমন যেন চেনা চেনা লাগে। (Boral Shib Mandir)
বুঝতে অসুবিধে হয় না এই জরাজীর্ণ জোড়া মন্দির আর তার পাশে বকুলতলার মাঠ আসলে সেই লোকেশন, যেখানে হরিহর মন্দিরে প্রণাম করে দূর দেশে যাত্রা করেন, আর অপু-দুর্গা চোখ রাখে ম্যাজিক লণ্ঠনে।
মন্দিরের উল্টোদিকে ভগ্নপ্রায় একটি ঘরের মধ্যে দেখি ‘পথের পাঁচালী’-র অপু-দুর্গা দাঁড়িয়ে। তমাল ধরিয়ে দেয় পাশ থেকে ‘এখানেই বসেছিল ক্যামেরা, মনে পড়ছে?’, বোঝাবার জন্য মুঠোফোনে দেখায় সাদা-কালো দৃশ্যের ক্লিপিংস। বুঝতে অসুবিধে হয় না এই জরাজীর্ণ জোড়া মন্দির আর তার পাশে বকুলতলার মাঠ আসলে সেই লোকেশন, যেখানে হরিহর মন্দিরে প্রণাম করে দূর দেশে যাত্রা করেন, আর অপু-দুর্গা চোখ রাখে ম্যাজিক লণ্ঠনে। (Boral Shib Mandir)

সত্যজিৎ রায় ‘অপুর পাঁচালী’ (‘My Years with Apu’)-তে লিখেছেন, ‘ফিল্ম সোসাইটির সদস্য মনোজ মজুমদার এই গ্রামের খোঁজ দিয়েছিলেন। …গ্রামের নাম বোড়াল’। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস “আম আঁটির ভেঁপু” (প্রথম প্রকাশ: ১৯২৯, সিগনেট প্রেস) নিয়ে সত্যজিৎ রায় ছবি বানান ১৯৫৫ সালে, বিশ্ব সিনেমার দরবারে যা এক ইতিহাস। (Boral Shib Mandir)
উপন্যাসের নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের সঙ্গে সত্যজিৎ মিল খুঁজে পান গোপালনগর গ্রামের, যেখানে বিভূতিভূষণ শেষ জীবনে শিক্ষকতা করতেন। সেখানেই শুরু হয়েছিল শুটিং। কিন্তু পরে কিছু সমস্যার কারণে, শেষ পর্যন্ত বেছে নেন বোড়াল গ্রামকে। কারণ, কলকাতা থেকে মাত্র ৪ মাইল দূরে, যাতায়াত সহজ, আর উপন্যাসের সঙ্গে গ্রামের চেহারা মিলে যায়। (Boral Shib Mandir)

আগেই বলেছি, মন্দির দু’টো টেরাকোটা গঠনশৈলীর। নির্মাণকাল ১৬৯৮ শকাব্দ (অর্থাৎ ১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দ), ২০২৬ সালে যার আড়াইশো বছর পূর্ণ হয়েছে। প্রতিষ্ঠাতা টিকারাম ঘোষের উত্তরসূরিরা বর্তমানে থাকেন মন্দিরের পূর্বে, তাঁদের বসত বাড়িতে। (Boral Shib Mandir)
সময়ের অগ্রগতিতে মন্দির ক্রমশ জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে। ছাদ হয়ে যায় ভঙ্গুর, গাছ-লতা জন্মায়, বিবর্ণ দেওয়াল জুড়ে দেখা দেয় অসংখ্য ফাটল।
এখনও মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ এবং দৈনিক পুজোর দায়িত্ব তাঁদেরই। সময়ের অগ্রগতিতে মন্দির ক্রমশ জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে। ছাদ হয়ে যায় ভঙ্গুর, গাছ-লতা জন্মায়, বিবর্ণ দেওয়াল জুড়ে দেখা দেয় অসংখ্য ফাটল। (Boral Shib Mandir)

বর্ষাস্নাত সেই সকালে ভাল খবর শোনালেন প্রখ্যাত সংরক্ষণ স্থপতি ডঃ নীতা দাশ। আড়াই শতাব্দী প্রাচীন মন্দির এবার সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হবে তাঁর নেতৃত্বে, ‘Revival of the Art and Craft of Terracotta for the Conservation of Terracotta temples along the Adi Ganga, Kolkata, through Capacity Building and Community Engagement’ প্রকল্পে। (Boral Shib Mandir)
এতে সাহায্য করে Queen Elizabeth II Platinum Jubilee Commonwealth Heritage Skills Training Programme (Commonwealth Heritage Forum)। এই প্রোগ্রাম কমনওয়েলথ দেশের বিপন্ন ঐতিহ্য রক্ষায় প্রশিক্ষণ ও অর্থ দেয়। (Boral Shib Mandir)

সেদিন এক অদ্ভুত আনন্দ বোধ করেছিলাম। আসলে ইতিহাসকে ভুলে বর্তমানকে বোঝা সম্ভব নয়। সুতরাং ধর্মীয় ব্যাপার বাদ দিলেও, এই মন্দির স্থাপত্য আসলে একটা সময়কে মনে করিয়ে দেয় আমাদের। (Boral Shib Mandir)
সংরক্ষণের কাজ তখনই ফলপ্রসূ ও সফল হয়, যদি মন্দিরের আশেপাশের জনসাধারণকে সংরক্ষণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে একাত্ম করে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়।
ঘোষ পরিবারের সম্মতি এবং আরও কয়েকজন বিশেষজ্ঞের সহায়তায়, একটি মন্দিরের কাজ আজ শেষ হয়েছে। দীর্ঘ পাঁচ মাস ধরে চলা এই কাজের মূল অংশটি ছিল, পুরনো মন্দিরের ভেঙে পড়া ছাদ, চির ধরা দেওয়াল, ফটক ও অন্দরের ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলির মেরামত। পাশাপাশি পুরনো টেরাকোটা মোটিফের নতুন ইট তৈরি করে সেগুলো বদলে দেওয়া। (Boral Shib Mandir)

এই কাজে শিল্পী তমাল ভট্টাচার্য (যিনি কালীঘাট মন্দিরেও কাজ করেছেন) নেতৃত্ব দেন। সঙ্গে ছিলেন অনিন্দ্য, নীহার-এর মতন আরও অনেক শিল্পী ও কারিগরেরা। যাঁরা চুন, সুরকি, বালি এবং প্রয়োজন মতো সিমেন্টের মিশেলে ফিরিয়ে দিয়েছেন মন্দিরের পুরনো চেহারা। স্থানীয় ক্লাব, ঘোষ পরিবার এবং আর্ট হিস্টোরিয়ান ডঃ সঞ্জয় সেনগুপ্তও সাহায্য করেন। (Boral Shib Mandir)
এই ধরণের সংরক্ষণের কাজ তখনই ফলপ্রসূ ও সফল হয়, যদি মন্দিরের আশেপাশের জনসাধারণকে সংরক্ষণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে একাত্ম করে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়। তখন এটা শুধু এক সংরক্ষণ প্রকল্প নয়, স্থানীয়দের passion project হয়ে ওঠে। এভাবেই ক্রমশ পরিচিতি লাভ করে, শহরের এক পাশে পড়ে থাকা এক ২৫০ বছরের মন্দির, যার অন্দরে থেকে গিয়েছে একটা সময়ের ইতিহাস। (Boral Shib Mandir)

ঘোষ পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ, ৮৫ বছর বয়সি, তুষার ঘোষের সঙ্গে দেখা মাঠের পাশে। কথায় কথায় জানালেন, তাঁর পূর্বপুরুষের বসত স্থাপন আর মন্দির বানানোর কথা। তারপরেই চোখদুটো চক চক করে উঠল তাঁর— হাতের লাঠিখানা তুলে দেখালেন “ঐ তো ওইখান থেকে দেকছিল দুগ্গা আর অপু আর এদিকে বসেছিল ক্যামেরা, আর এখানে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি”, বিশ্ববরেণ্য মানুষটির উদ্দেশ্যে মাথায় হাত ঠেকালেন অশীতিপর বৃদ্ধ। (Boral Shib Mandir)
ছোট ছোট সাহায্যই গড়ে তুলতে পারে ইতিহাসকে সামনে রেখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন। এটুকুই আমরা দিয়ে যেতে পারি আগামী প্রজন্মকে।
কলকাতার এত কাছে একটি সিনেমা আর এক প্রাচীন মন্দিরকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এক ইতিহাস, যেন বাড়ির কাছেই লুকিয়ে এক ছোট্ট বিশ্ব। যান একদিন, দেখে আসুন নিজের চোখে। খানিক দূরেই দেখা মিলবে অপু-দুর্গার বাড়ির। সম্ভব হলে হাত বাড়িয়ে দিন, নিজেদের এই সংস্কৃতিকে নতুন করে প্রাণ দিতে। ছোট ছোট সাহায্যই গড়ে তুলতে পারে ইতিহাসকে সামনে রেখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন। এটুকুই আমরা দিয়ে যেতে পারি আগামী প্রজন্মকে। (Boral Shib Mandir)
এ শুধু এক মন্দির নয়— এ যেন আমাদের নিজের শিকড়ের দিকে ফিরে তাকানোর জানালা।
তথ্যসূত্র: Wikipedia, commonwealth.org
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
সপ্তর্ষি রায় বর্ধনের জন্ম, কর্ম এবং বর্তমান ঠাঁই তার প্রাণের শহর কলকাতায়। প্রথাগত ছাত্রজীবন কেটেছে কলকাতার পাঠভবন স্কুল, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ এবং যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে। লেখাজোকা, ছবি তোলা, নাট্যাভিনয় আর হেরিটেজের সুলুক সন্ধানের নেশায় মশগুল। সঙ্গে বই পড়া, গান বাজনা শোনা আর আকাশ পাতাল ভাবনার অদম্য বাসনা। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা তিন- "রূপকথার মতো- স্মৃতিকথায় প্রণতি রায়", "খেয়ালের খেরোখাতা" এবং "চব্য চোষ্য লেহ্য পেয়"।
