(Artificial Intelligence)
আমাদের ছোটবেলায় ‘ছাত্রবন্ধু’ নামে একধরনের বই ছিল। অন্য বইগুলোর চেয়ে যথেষ্ট স্থূলকায়, তাতেই সব বিষয়ের প্রশ্নোত্তর সাজানো থাকত। ফণিভূষণ ঘোষ প্রণীত সেই বই প্রায় অবশ্যম্ভাবী রাখা থাকত প্রত্যেক সিরিয়াস ছাত্রের টেবিলে; ডিকশনারি বা জ্যামিতি বক্সের মতোই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে। (Artificial Intelligence)
তারপর এল ইন্টারনেট, আর গুগল-যুগ। জটিল অঙ্ক হোক বা বিজ্ঞানের কোনও রাসায়নিক সমীকরণ, সমস্যায় পড়লে সমাধানের খোঁজে, তার কাছেই হাত পাতত আপামর ছাত্রকুল। ‘ছাত্রবন্ধু’ নিঃশব্দে সরে গিয়ে এভাবেই একদিন জায়গা করে দিল মোবাইল-বাহিত এই নব্য ‘সিধুজ্যাঠা’-কে। (Artificial Intelligence)
আরও পড়ুন: পেটেন্ট আবেদনকারী জগদীশচন্দ্র ও তাঁর কৃত্রিম চোখ
ইনি আবার কাউকে ফেরান না; জটিল অঙ্কের সমাধান বা বিজ্ঞানের কোনও সূত্রের ব্যাখ্যা— সবেতেই তিনি অনায়াস, সফল। আন্তর্জালের বিপুল ভাণ্ডার থেকে নমুনা প্রশ্নমালা খুঁজে এনে, মক টেস্ট দিয়ে প্রস্তুতি ঝালিয়ে নেওয়ার কাজে, গুগল দীর্ঘকাল ধরে নেট-সড়গড় ছাত্রদের কাছে আশীর্বাদ ছিল। (Artificial Intelligence)
সেই গুগল সার্চ ইঞ্জিনও কালের নিয়মে পিছিয়ে গিয়ে, এবার জায়গা করে দিয়েছে এআই-কে। এআই আমাদের জীবনে আশীর্বাদ না অভিশাপ, তা এখনও নিশ্চিত করে বলার মতো পরিস্থিতি আসেনি। তবে, সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার মাঝখানে সে যে বেশ জাঁকিয়ে বসেছে, তাতে কারও সন্দেহ থাকার কথা নয়। (Artificial Intelligence)

আগে আমরা গোটা সন্ধ্যে একটা ‘উৎপাদকে বিশ্লেষণ’ নিয়ে ধ্বস্তাধস্তি করে মেলাতে না পারলে রেখে দিতাম, পরের দিন প্রাইভেট টিউটর এলে তাঁর সামনে ফেলে দেব বলে। জানতাম, তিনি করে দিতে পারবেনই। স্কুলে বাংলার টিচার যে রচনাটি পরের দিন লিখে নিয়ে যেতে বললেন, সেটা বাড়ি এসে কোনও বইয়ে খুঁজে না পেলে অত চিন্তা করতাম না। জানতাম, বাড়ির শিক্ষককে বললে তিনি ঠিক লিখে দেবেন। (Artificial Intelligence)
কিন্তু এখন? একালের পড়ুয়া ওসব প্রাইভেট টিউটরের ধার ধারে না। সে জানে মুঠোয় ধরা ওই মুশকিল আসানের কাছে সমস্যাটা ঠিকভাবে তুলে ধরতে পারলে নিমেষে মিলবে সমাধান। ফলে, আগেকার আমলের ছাত্রবন্ধু হোক বা হালের প্রাইভেট টিউটর, দুইয়েরই কঠোর বিকল্প হয়ে উঠেছে এআই। (Artificial Intelligence)
শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান বা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলিও এআই-কে কাজে লাগাচ্ছে। শিক্ষাদানের উপকরণ (লার্নিং মেটেরিয়াল) আগের চেয়ে অনেক বেশি ছাত্র-কেন্দ্রিক হয়ে উঠছে।
শুধু তাই? যে-কোনও বিষয়ের প্রশ্নের চটজলদি উত্তর খুঁজে দেওয়ার পাশাপাশি এআই-কে কাজে লাগানো যাচ্ছে, কোনও অধ্যায় থেকে নমুনা প্রশ্নোত্তর বানিয়ে দেওয়া, পাঠ্য বইয়ের নির্দিষ্ট কিছু অংশ থেকে দরকারি তথ্য গুছিয়ে পরপর সাজিয়ে দেওয়া, বা নির্দিষ্ট পাঠপরিকল্পনা বানিয়ে দেওয়ার মতো হরেকরকম কাজেই। প্রাইভেট টিউটর ধারণাটাকেই এআই যেন আস্তে আস্তে মুছে ফেলে চলেছে। নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থী আজ যে-কোনও প্রয়োজনে দ্বারস্থ এআই-এর। (Artificial Intelligence)
শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান বা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলিও এআই-কে কাজে লাগাচ্ছে। শিক্ষাদানের উপকরণ (লার্নিং মেটেরিয়াল) আগের চেয়ে অনেক বেশি ছাত্র-কেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। প্রত্যেকটা ছাত্রের জন্য আলাদাভাবে পঠন-সহায়ক উপকরণ তৈরি করে দেওয়া এখন জলভাত। চার্ট, টেবল বা ছকের মাধ্যমে ছাত্রের উন্নতি-অবনতিকেও ‘মেপে’ দিচ্ছে এআই। ফলে সেইমতো ছাত্রের পড়াশোনা ‘ইম্প্রুভ’ করার প্ল্যানও সাজিয়ে ফেলা যাচ্ছে চট করে। (Artificial Intelligence)

ক্লাসরুম হোক বা প্রাইভেট কোচিং, এআই এখন ছাত্র-শিক্ষক উভয়ের কাছেই ভরসা। উত্তরোত্তর এই ভরসা বাড়বে, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। ইউনেস্কো-র পরিসংখ্যান বলছে, উন্নত দেশগুলোয় দুই-তৃতীয়াংশ স্কুল-ছাত্র এখন এআই টুল কাজে লাগিয়ে হোমটাস্ক সেরে ফেলছে। (Artificial Intelligence)
আমাদের দেশ এ-ব্যাপারে কতটা এগিয়ে? প্রথম এডুকেশন ফাউন্ডেশনের অ্যানুয়াল স্ট্যাটাস অব এডুকেশন রিপোর্ট বলছে, এই দেশের ১৪-১৬ বছর বয়সি ছেলেমেয়েদের প্রায় ৭৬ শতাংশ মোবাইল ব্যবহার করে স্রেফ সোশ্যাল মিডিয়া ঘাঁটার জন্য। শিক্ষালাভের জন্য মোবাইলকে কাজে লাগায় মাত্র ৫৭ শতাংশ। প্রায় ১৮,০০০ গ্রামের সাড়ে ৬ লক্ষ ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সমীক্ষাটি করা হয়েছিল। এর অর্থ স্পষ্ট, গোটা দেশের প্রায় অর্ধেক টিন-এজের ছেলেমেয়ে মোবাইলকে যে ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম বা ভিডিও গেমের বাইরে এনে শিক্ষালাভের জন্যও কাজে লাগানো যায়, আর সেটা খুবই ভালভাবে, এইটাই জানে না। (Artificial Intelligence)
ফোন কি কাঙ্ক্ষিত উত্তরণ ঘটায় নব্য প্রজন্মের? ভিডিও গেম আর সোশ্যাল মিডিয়ায় বুঁদ হয়ে থাকা নব্য প্রজন্মের কতজন সত্যিকারের শিক্ষালাভের উদ্দেশ্যে এআই-এর মুখোমুখি হয়?
আর জানলেও সেরকম কোনও কাজে লাগায় না। এমনিতে আমাদের দেশে প্রায় নব্বই শতাংশ বাড়িতেই স্মার্ট ফোন রয়েছে। সেই সূত্রে এটাও মেনে নেওয়া যায় যে, স্কুল-পড়ুয়া প্রায় সব ছাত্রছাত্রীদের কাছে অন্তত সেরকম একটি ফোন (বা বাড়ির যে কারও হোক) আছে। কিন্তু সেই ফোন কি কাঙ্ক্ষিত উত্তরণ ঘটায় নব্য প্রজন্মের? ভিডিও গেম আর সোশ্যাল মিডিয়ায় বুঁদ হয়ে থাকা নব্য প্রজন্মের কতজন সত্যিকারের শিক্ষালাভের উদ্দেশ্যে এআই-এর মুখোমুখি হয়? (Artificial Intelligence)
প্রথাগত ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের বাইরে এসে এআই একজন শিক্ষার্থীর সামনে কী ধরনের সুবিধে এনে দিতে পারছে? এই প্রসঙ্গে বেশ কয়েকটি দিক তুলে ধরা যেতে পারে। যেমন, পারসোনালাইজড লার্নিং (বা ব্যক্তিনির্দিষ্ট শিখন) এআই–এর সবচেয়ে বড় সুবিধে। প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীর দুর্বলতা, সীমাবদ্ধতা বা সামর্থ্য বুঝে নিয়ে, সেইমতো পাঠ্যসূচি থেকে কিছু অংশ বেছে স্টাডি মেটেরিয়াল বানিয়ে, তার হাতে তুলে দিতে পারে। এতে ওই ছাত্র বা ছাত্রী নিজের স্বচ্ছন্দ গতিতে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়।

আকর্ষণীয় বিকল্প শিখন বা অল্টারনেটিভ লার্নিংয়েরও সুযোগ করে দিচ্ছে এআই। খাতায়-কলমে অঙ্ক করা বা হোয়াইট বোর্ডে ডায়াগ্রাম এঁকে জীবন বিজ্ঞান পড়ার ট্র্যাডিশন থেকে অনেকটা সরে এসে, আমরা এখন এসে পৌঁছেছি ভার্চুয়াল বা অগমেন্টেড রিয়েলিটির আমলে। এই জগতে ছাত্র তার চারপাশে গড়ে উঠতে দেখে প্রাচীন শহরের আগাপাশতলা। নিজের চোখেই দেখতে পায় বিজ্ঞানের কোনও জটিল যন্ত্র, বা কোনও পরীক্ষার-নিরীক্ষার সামগ্রিক প্রক্রিয়া। নতুন কোনও ভাষা শেখার পদ্ধতিতেও এসেছে বদল, সেখানে এআই যেন শিক্ষার্থীর বন্ধু৷ (Artificial Intelligence)
যত ইচ্ছে, যখন ইচ্ছে। এআই শিক্ষার্থীর মানসিক বা বৌদ্ধিক গড়ন বুঝে ক্লান্তিহীনভাবে স্টাডি মেটেরিয়াল দিয়ে যাচ্ছে। পাঠ্যাংশ উপযোগী প্রশ্ন-উত্তর বানিয়ে দেওয়া, মূল্যায়ন করা, সেই মূল্যায়ন অনুযায়ী পরবর্তী লক্ষ্য স্থির করে দেওয়া— সবটাই চলে ক্লান্তিহীনভাবে। (Artificial Intelligence)
এআই নির্ভর শিক্ষার অন্ধকার দিকও রয়েছে। প্রথমত, এতে শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত তথ্য এআই-এর ডেটাবেসে সঞ্চিত হচ্ছে। পরবর্তীকালে, যা প্রাইভেসি সংক্রান্ত সঙ্কট তৈরি করতে পারে।
শিক্ষালাভের এই ধরন শিক্ষার্থীর দৈনন্দিন শিখন-প্রক্রিয়ার মধ্যেই বেশ কিছুটা বিনোদনের ছোঁয়াচ এনে দিচ্ছে। এই প্রক্রিয়াতে শিক্ষার্থীকে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতেই হয়। তাই প্রকৃত উৎসাহ থাকলে, শেখায় খামতি থাকবার কথা নয়। (Artificial Intelligence)
তবে এআই নির্ভর শিক্ষার অন্ধকার দিকও রয়েছে। প্রথমত, এতে শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত তথ্য এআই-এর ডেটাবেসে সঞ্চিত হচ্ছে। পরবর্তীকালে, যা প্রাইভেসি সংক্রান্ত সঙ্কট তৈরি করতে পারে। সাইবার অ্যাটাকের সম্ভাব্য বিপর্যয়ের কথাও ভুললে চলবে না। (Artificial Intelligence)
দ্বিতীয়ত, এআই-নির্ভর হওয়া মানেই প্রযুক্তির কাছে নত হতে শুরু করা। তাই শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান আর শিক্ষার্থী, দু’তরফেই বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা গড়ে ওঠে। এর মধ্যে রয়েছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে দ্বিধা, চিন্তায় নতুনত্ব না আসার অভ্যাস বা মাথা খাটানোয় অনীহা। এছাড়াও, মানুষের সঙ্গহীন ভার্চুয়াল জগতে থাকতে থাকতে অসামাজিক হয়ে ওঠার আশঙ্কা তো রয়েছেই। (Artificial Intelligence)

এআই-নির্ভর শিক্ষার্থী একদিন হয়তো ভুলেই যাবে যে, কোনও এক সময় বাড়িতে একজন স্যর বা ম্যাডাম পড়াতে আসতেন, পড়া আটকে গেলে যাঁর কাছে বুঝে নেওয়া যেত। তাঁর কাছে খুলে বলা যেত ব্যক্তিগত কোনও সমস্যা বা অ্যাচিভমেন্টের সুসংবাদ। সেই দিনগুলো হারিয়ে যেতে বসেছে। দেশের একটা বড় অংশের তরুণ প্রজন্ম কর্মহীন। এআই যেভাবে শিক্ষকের বিকল্প হয়ে উঠছে, আশঙ্কা জাগে, এটাই কি ভবিষ্যৎ? (Artificial Intelligence)
বিশেষত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেভাবে এআই নির্ভর পঠনপাঠনকে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে, তাতে আগামী দিনে এই ট্র্যাডিশন বাড়বে বৈ কমবে না।
বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও প্রয়োজন কমছে কর্মীর। প্রতি বছর যখন হাজার হাজার সরকারি স্কুল বন্ধ হওয়ায় সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমরা শঙ্কিত হই, বছরের পর বছর শিক্ষক নিয়োগে সরকারি স্তরে অনীহা দেখে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি, বা চিন্তিত হই শিক্ষালাভে বঞ্চিত অসংখ্য গরিব ছেলেমেয়েদের কথা ভেবে, তখন এরই উল্টোপিঠে এআই শিক্ষাসহায়তার অপ্রতিরোধ্য উপায় হিসেবে উঠে আসছে। এই চিত্র দেখে আমরা আনন্দিত হব না সংশয়াকূল, সেটা সত্যিই ভেবে দেখবার। বিশেষত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেভাবে এআই নির্ভর পঠনপাঠনকে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে, তাতে আগামী দিনে এই ট্র্যাডিশন বাড়বে বৈ কমবে না। (Artificial Intelligence)

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি সত্যিই একজন জলজ্যান্ত শিক্ষকের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে? এ-কথা সত্যিই, জ্ঞানে বা কাজের দক্ষতায় এআই-কে হারানো কঠিন। তবে সে-ও মানুষের মতোই ভুল করে। নব্য শিক্ষার্থী চটজলদি সমাধানের আশায় এআই-এর মুখাপেক্ষী হয় বটে। তবু এ-কথা ভুললে চলে না, ‘হিউম্যান টাচ’-বিহীন শিক্ষার ভিত্তি দৃঢ় নাও হতে পারে। (Artificial Intelligence)
সমস্যার সমাধানে সে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারে, কিন্তু পাশাপাশি দরকার রক্তমাংসের প্রকৃত শিক্ষককেও।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার, যতই বুদ্ধি থাকুক, কৃত্রিম-ই। সমস্যার সমাধানে সে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারে, কিন্তু পাশাপাশি দরকার রক্তমাংসের প্রকৃত শিক্ষককেও। এমন শিক্ষক, যাঁর একদিকে যেমন শিক্ষাদানে দক্ষতা থাকবে, তেমনই শিক্ষার্থীর কাছে তিনি এআই-কে উপস্থাপিত করবেন শিখন-সহায়ক হিসেব। কখনই তাঁর বিকল্প হিসেবে নয়। একুশ শতকের এক-চতুর্থাংশ পেরিয়ে এসে, আগামী প্রজন্মের কথা ভেবে এটুকু আমরা আশা করতেই পারি। (Artificial Intelligence)
তথ্যসূত্র:
www.unesco.org/en/articles/unesco-dedicates-international-day-education-2025-artificial-intelligence
www.pratham.org/programs/education/aser/
asercentre.org/aser-2024/
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
দেড় দশক শিক্ষকতায় যুক্ত। বিজ্ঞান নিয়ে লেখালিখি পেরিয়েছে দশ বছরের সীমানা। প্রকাশিত বই নয়টি। পড়া আর লেখাই অবসরযাপনের মুখ্য সঙ্গী।
