(Bhaskar Chakraborty)
খাতায়-কলমে এখন শীত ফেরার পথে। আমরা, যারা সামান্য পাঠক, একই সঙ্গে স্বভাবদোষে কল্পনাবিলাসী, তারা প্রতিটি ঋতুর সঙ্গে শিল্পের সংযোগ খুঁজে বেড়াই, এবং তা নিয়ে সাধ্যমতো মজলিশি কথাবার্তা, আলোচনা করতে চাই।
শীতকাল এদিক দিয়ে খানিক উচ্চস্থানেই অবস্থান করে। শীতকাল সংক্রান্ত অনেক লেখা রয়েছে, অনেক লেখা হচ্ছে এবং দূর কিংবা অদূর ভবিষ্যতেও তার গতিময় ধারা বজায় থাকবে। তবে, আমাদের, বাঙালিদের কাছে শীতকাল নিয়ে একেবারে কিংবদন্তী লাইন বলতেই মনে পড়ে জীবনানন্দের ‘এইসব শীতের রাতে আমার হৃদয়ে মৃত্যু আসে;’। অবশ্য তার চেয়েও আগে মনে পড়ে, কবি ভাস্কর চক্রবর্তীর প্রবাদপ্রতিম কবিতা থেকে উঠে আসা লাইন— ‘শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা’। (Bhaskar Chakraborty)
আরও পড়ুন: পবিত্র একাকীত্বের হৈমন্তিক কবি: শক্তি চট্টোপাধ্যায়
তবে, এই লেখাটিতে তাঁর সেই প্রথম কাব্যগ্রন্থ নিয়ে আলোচনা করার অভিপ্রায় নেই, বরং আলোচনার বাসনা শেষ কাব্যগ্রন্থ ‘জিরাফের ভাষা’ নিয়ে। (Bhaskar Chakraborty)
বাংলা কবিতার পাঠক যাঁরা, তাঁরা জানেন ভাস্করের কবিতার সম্পর্কে। তাঁর ভাষা, শব্দচয়ন, স্বর, দর্শন ও এসবের মাধ্যমে সর্বোপরি তাঁর বক্তব্য ও খোঁজ। কবিতার ব্যাপারে যাওয়ার আগে তাই, কাব্যগ্রন্থটি সম্পর্কে কয়েকটি প্রাথমিক তথ্য জানা জরুরি— কবিতাগুলি লেখা হয়েছে ১৯৯৭-২০০৪ সালের মধ্যে, গ্রন্থাকারে প্রকাশিত ২০০৫ সালে। নামহীন, স্রেফ সংখ্যা দিয়ে চিহ্নিত। (Bhaskar Chakraborty)
কাব্যগ্রন্থের নামটি আকর্ষণীয়। ভাস্কর তাঁর গ্রন্থের নাম দিচ্ছেন ‘জিরাফের ভাষা’। শুনে বা পড়ে আকর্ষণীয় মনে হলেও, তার পেছনে বিশেষ কারণ আছে কি না, এ নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন বা আগ্রহ দেখাবে না কেউ। কিন্তু, যদি লেখাগুলি ধারাবাহিকভাবে এবং প্রয়োজনে পর্যায়ক্রমে পড়া হয়, তাহলে কবিতাগুলির স্বর ও বক্তব্য এবং কাব্যগ্রন্থের নাম পাশাপাশি রেখে বোঝার চেষ্টা করলে একটা যোগসূত্র পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। বৈজ্ঞানিকভাবে, কর্ডাটা পর্বের পর্বের প্রাণী জিরাফের গলার আওয়াজ ২০ হার্জ়েরও নীচে; ফলে, জিরাফের আওয়াজ মানুষ শুনতে পায় কম। মজার বিষয় হল, এখানে একটি কাব্যগ্রন্থের নাম হল সেই প্রাণীটির ভাষার নামে। লক্ষণীয় বিষয়, কবি হয়তো সে কারণেই কবিতার আয়তন খুব সামান্য করেছেন; প্রত্যেকটি কবিতা মাত্র পাঁচ লাইনের। ৪৮টি নামহীন কবিতায় সাজানো এই বই। (Bhaskar Chakraborty)

ভাস্করের এই কবিতাগুলি ফার্স্ট পার্সন ন্যারেটিভ স্টাইলে লেখা। অর্থাৎ, কবি নিজেই তাঁর বক্তব্য, দৃষ্টিভঙ্গি ও দর্শন বোঝাচ্ছেন, অথবা, যদি ধরি এই কবিতাগুলির বক্তা অন্য কেউ, সেক্ষেত্রেও তিনি তাঁর নিজের বক্তব্যই তুলে ধরছেন। তবে, এই বক্তব্য শুধু একপেশে বক্তব্য হয়েই থাকছে না। একটি অদৃশ্য বন্ধন রয়েছে, একটি আবরণ রয়েছে, যা সরালে দেখতে পাওয়া যায়, আসলে কবিতাগুলি কোনও একাকী ব্যক্তির কথা নয়। বরং, একটি কথোপকথন— সেই কথোপকথন পাঠকের সঙ্গে হতে পারে, নাগরিক সমাজের সঙ্গেও হতে পারে; যে নাগরিক সমাজের অংশ তিনি নিজেও; যে নাগরিকদের স্বর হয়ে উঠেছেন তিনি। কবিতাগুলির এত স্বল্প আয়তন যেন আমাদের স্বল্প আয়ুর জীবনের পরিপূরক। দৈনন্দিন নাগরিক জীবন, ব্যস্ততা, ক্লান্তি, হতাশা, মুক্তি, চাহিদা এবং নিরন্তর নিষ্ঠুর এই চক্রে আবর্তিত হতে থাকা মানুষ তাঁর কবিতার মূল উপাদান। কিছু কবিতার লাইন, এবং সেইসব লাইনের ব্যাখ্যায় উপাদানগুলিকে ধরার চেষ্টা করা যাক বরং—
‘শেষমেশ ইচ্ছেগুলো উধাও হয়েছে/ স্বপ্নগুলো হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে এদিক-সেদিক/ কী তুমি করতে পারো/ হে উন্মাদ/ দিন আর রাত শুধু লেখা আর লিখে যাওয়া ছাড়া’
প্রথম কবিতাতে উনি লিখছেন— ‘শেষমেশ ইচ্ছেগুলো উধাও হয়েছে/ স্বপ্নগুলো হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে এদিক-সেদিক/ কী তুমি করতে পারো/ হে উন্মাদ/ দিন আর রাত শুধু লেখা আর লিখে যাওয়া ছাড়া’— এই হল প্রথম কবিতা। এই কয়েকটি লাইন এবং শব্দে যেন উনি স্টেটমেন্ট দিয়ে গেলেন। ভাস্করের কবিতার অন্যতম একটি লক্ষণীয় বিষয়, তাঁর ভাষা ও শব্দপ্রয়োগ। খুব অচেনা কোনও শব্দ নয়, তৎসম কোনও শব্দ ব্যবহারে একটি উপরি গাম্ভীর্য নয়, বরং সাধারণ যে-কোনও মানুষ বা পাঠক পড়ে ‘আরে! এ তো আমার কথা!’ বলে ভাবতে পারবেন, এমনভাবেই উনি লেখেন। এখানে আমরা দেখতে পেলাম— হুমড়ি খেয়ে এদিক-সেদিক পড়ে থাকা স্বপ্ন। দেখলাম, একজন ব্যক্তি যাঁকে এখানে ‘উন্মাদ’ বলা হচ্ছে, আর আছে দিন-রাত এক করে কবিতা লেখার কথা, যা ছাড়া সেই উন্মাদের কিছুই করার নেই। (Bhaskar Chakraborty)
এখন কথা হচ্ছে, একজন উন্মাদ হয়েছে কেন? আর উন্মাদই যদি, তাহলে তার সুস্থতা দরকার সবার প্রথমে। সুস্থ হওয়ার চেষ্টা না-করে, কেন ‘দিন আর রাত শুধু লেখা আর লিখে যাওয়া ছাড়া’ ধরনের নিরাশার কথা বলছেন ভাস্কর? কী লেখা? সব ছেড়ে কেন লেখার প্রয়োজন? এটাই কি তবে সুস্থতার পথ বা উপায়? আসলে কবি এখানে এক নগরজীবনের নিষ্পেষিত মানুষের বয়ান তুলে ধরেছেন। ‘উন্মাদ’ বলতে হয়তো insane-এর কথা বলছেন না। বরং, helplessness-এর কারণে যে mental turmoil তৈরি হয় নিত্যদিন, তার কথা বলছেন। (Bhaskar Chakraborty)

এই লেখাটির কথাটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ এবং সাধারণের চেনা। শিল্প একজন শিল্পীর বড় অস্ত্র, যা তাঁকে প্রতিরক্ষা দেয়। অন্যদিকে, এই শিল্পের দ্বারা তিনি নিজেকে এবং সময়কে বর্ণনা করেন, ব্যাখ্যা করেন, প্রকাশ করেন। এই যে বলা হল– প্রতিরক্ষা এবং প্রকাশ করার উপায়, দুটি কোথাও গিয়ে আন্তঃসম্পর্কিত; একজন কবি বা যে-কোনও সংবেদনশীল মানুষ, খুব সহজে এবং গভীরভাবে একটি বিষয়কে আত্মস্থ করেন। তেমনই, যখন তাঁর কিছুই করার থাকে না, নিরুপায় এবং সে-কারণে অসহায় বোধ করেন, তখন তিনি restless হয়ে পড়েন, তাকেই কবিতার ভাষা ‘উন্মাদ’ বলছে। (Bhaskar Chakraborty)
‘প্রতিরক্ষা’ বলার কারণ— একজন এমনতর মানুষ, সবকিছুতে ক্লান্তি, হতাশা খুঁজে পাওয়ায়, এবং তৎসত্ত্বেও বলার বা জানানোর উপায় না-পেয়ে নিজেকে আঘাতের পথ বেছে নেয়। এই destructive idea বা force থেকে বাঁচায় লেখা। যখন তিনি বোঝেন বা দেখেন, লেখাও একধরনের প্রতিবাদ জানানোর উপায়। নিজের বক্তব্যটুকু লিখে রাখাও একধরনের লড়াই; স্বাধীন চিন্তা, বক্তব্য তুলে ধরা ও লেখার মধ্য দিয়ে তা অন্যদের জানানোও এক বিকল্প পথ হতে পারে। তখন তিনি সেই উন্মাদনা থেকে বেরিয়ে স্বাভাবিক ও গঠনমূলক জীবনে ফিরে আসেন বা সে চেষ্টাটুকু করেন। (Bhaskar Chakraborty)
‘এখন ঘরের মধ্যে প্রেতের মতন বেঁচে থাকা/ একটা জীবন থেকে আরেকটা জীবন কত দূর/ কথা নেই গানও সব হেসেখেলে হারিয়ে গিয়েছে/ বাদুড়ের মতো দিনরাত-/ ‘আমরা কেউ কারো নই’
এই বিচ্ছিন্নতাবোধ ভাস্করের কবিতায় নতুন নয়, বা সামান্য কয়েকবার তার উল্লেখ পাওয়া গেছে, এমনও নয়। বরং তাঁর সারাজীবনের লেখায় যে কয়েকটি বিষয় basic element হয়ে এসেছে, তার মধ্যে বিচ্ছিন্নতাজনিত একাকীত্ব বা loneliness অন্যতম প্রধান। মনে রাখতে হবে, এই loneliness কিন্তু solitude নয়, বরং তার থেকে যথেষ্ট আলাদা এবং নেগেটিভ। কবিতা থেকে এরকম একটি উদাহরণ দেওয়া যাক— ২ নং কবিতায় উনি লিখছেন: ‘এখন ঘরের মধ্যে প্রেতের মতন বেঁচে থাকা/ একটা জীবন থেকে আরেকটা জীবন কত দূর/ কথা নেই গানও সব হেসেখেলে হারিয়ে গিয়েছে/ বাদুড়ের মতো দিনরাত-/ ‘আমরা কেউ কারো নই’, ভাবতে ভাবতে, দিন ফুরিয়ে এল… (Bhaskar Chakraborty)

এখানে যখন ভাস্কর লিখছেন ‘প্রেত’ শব্দটি, তখন স্বাভাবিকভাবে আমাদের জানতে ইচ্ছে হয়, ওই মানুষটির কীসের অভাব বা আকাঙ্ক্ষা? এর উত্তর হয়তো পরের লাইনগুলো পড়লে পাওয়া যেতে পারে। ‘একটা জীবন থেকে আরেকটা জীবন কত দূর’ লাইনটি পড়লে যে চাপা গোঙানির আওয়াজ শোনা যায়, তা মানুষের সঙ্গ পাওয়ার একান্ত বাসনায়। এখানে কবি যেন এক অবসরজীবনের অবয়ব ফুটিয়ে তুলেছেন। যে-জীবনে অবসর আছে, অফুরান সময় আছে, চাইলে অনেক কিছুই করার আছে, করতে পারেন। কিন্তু এইসব তাঁকে আরও একা করে দিচ্ছে, তাঁর জীবন, তাঁর বেঁচে থাকাকে আরও মন্থর ও বিষময় করে দিচ্ছে। (Bhaskar Chakraborty)
ফলত, তিনি সঙ্গ চাইছেন; বন্ধুসঙ্গ। এই হারিয়ে যাওয়ার ব্যাখ্যাটি যে নেহাত এই প্রবন্ধলেখকের দুষ্ট ও তদ্রূপ অনুর্বর মস্তিষ্কের ফসল নয়, তা কবি নিজেই কবিতার তৃতীয় লাইনে লিখে জানিয়েছেন— ‘কথা নেই গানও সব হেসেখেলে হারিয়ে গিয়েছে’– পুরাঘটিত বর্তমানে লেখা লাইনটি বুঝিয়ে দেয়, কিছু কাজ শেষ হয়েছে। অর্থাৎ, আগে ‘কথা’ ছিল, ‘গানও সব হেসেখেলে’ আগে ছিল, এখন নেই। এ-যেন মনে করায় রবীন্দ্রনাথের ‘আমাদের গেছে যে দিন, একেবারেই কি গেছে?’। যাই হোক, ‘বাদুড়ের মতো দিনরাত’ কথাটি ভীষণ অর্থবহ। (Bhaskar Chakraborty)
‘রেখেছি আত্মার জন্যে সুসজ্জিত সামান্যই মাছ-মাংস কিছু।/ অনিদ্রার এলাকায় আজ একা হেঁটে পৌঁছে গেছি/ আমি তো বলি না শুধু: নিঃসঙ্গতা,/ এই বিষবৃত্ত থেকে, বুঝি শুধু, বেরোতে হবেই -/ তোমার জীবন থেকে মিনিট দশেক তুমি আমাকে দেবে কি/?’
বাদুড় বলতে আমাদের মনে যে-কয়েকটি সাধারণ ছবি আসে, সেগুলি হল– নিশাচর, অন্ধকার ও ঝুলন্ত। ভাস্কর এই তিনটি গুণের সঙ্গে কীভাবে মানুষকে মেলাচ্ছেন, এবং অন্য এক দিক তুলে ধরছেন, তা-ও লক্ষ্যণীয়। শ্রেণিগত দিক থেকে মানুষ স্তন্যপায়ী, আবার বাদুড়ও স্তন্যপায়ী। বাদুড় যেমন রাতে সক্রিয় হয়ে ওঠে, মানুষও একইভাবে রাতের অন্ধকারে, নৈঃশব্দ্যে নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথনে মেতে ওঠে। উভয়ের নিশাচর হয়ে ওঠার পিছনে রয়েছে নির্দিষ্ট কারণ বা উদ্দেশ্য। ‘ঝুলন্ত’ থাকাটা অন্য কিছুই নয়, হয়তো, আশা-নিরাশার মাঝে দোদুল্যমান বোঝাতে চাওয়া; জানাতে চাওয়া জীবনের অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা ও পূর্বাভাসহীন পতনের সম্ভাবনা। (Bhaskar Chakraborty)
আমরা যে বিষয়টি প্রায়শই এড়িয়ে যাই ভাস্করের লেখা থেকে তা হল, তাঁর ঐশ্বরিক বোধ বা চিন্তা; ওঁর মধ্যে মূলত আধ্যাত্মিকতা বা নিজেকে খুঁজে পাওয়া ও প্রতিষ্ঠা করার বা হয়তো হারিয়ে ফেলারও প্রবণতা আছে। Life এবং beyond life-কে একই ঘাটে স্নান করিয়ে দেওয়ার মন্ত্র তিনি আয়ত্ত করেছেন নিজ দক্ষতায়। শরীর তাঁর কাছে আত্মা হয়ে যায়, আর কখনও অদৃশ্য আত্মাই স্পর্শযোগ্য শরীর হয়ে ওঠে। ‘রেখেছি আত্মার জন্যে সুসজ্জিত সামান্যই মাছ-মাংস কিছু।/ অনিদ্রার এলাকায় আজ একা হেঁটে পৌঁছে গেছি/ আমি তো বলি না শুধু: নিঃসঙ্গতা,/ এই বিষবৃত্ত থেকে, বুঝি শুধু, বেরোতে হবেই – / তোমার জীবন থেকে মিনিট দশেক তুমি আমাকে দেবে কি/?’ —এই বলে কবিতাটি শেষ হচ্ছে। এই যে মেজাজ, প্রতিটি কবিতায় তার নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার লক্ষ করা যাচ্ছে। ভাস্কর ডিপ্রেসড হন, ঈশ্বরের খোঁজ করেন, মুক্তি পেতে চান, আবার এই সমাজ-সংসার-পরিবার ইত্যাদিকে ভালবাসেন। (Bhaskar Chakraborty)

আরও স্পষ্টভাবে আমরা এটি দেখতে পাব, যখন উনি একাকীত্বের কবলে পড়েও জীবন, বা বলা ভাল নিঃসঙ্গতাকে ঘুরিয়ে প্রশ্ন করে বলেন, জানতে চান– ‘নিঃসঙ্গতা, এসেছ অনেক দিন, তারপর যেতে চাইছ না কেন আর?’- এখানে নিঃসঙ্গতাকে যেমন personify করেছেন, তেমন নিজেও যেন সেই মূর্ত কিন্তু বিমূর্তমান নিঃসঙ্গতার agent হয়ে গেছেন। আর প্রশ্নটি সর্বজনীন হয়ে উঠেছে। মানুষ মুক্তি চায়, কিন্তু কীভাবে? এই প্রশ্ন আমাদের বিহ্বল করে দেয় বলেই হয়তো কবি বলেন- ‘যখনই মৃত্যুর কথা মনে পড়ে, ইচ্ছে করে, সিগারেট ধরাই’। (Bhaskar Chakraborty)
‘জীবনের ঘূর্ণি’ আর ‘মৃত্যুর ঘূর্ণি’-র ফাঁসে যখন প্রাণ ওষ্ঠাগত, তখন কোন ঈশ্বর আমাদের তা থেকে মুক্তি দিতে পারে আমরা জানতে চাই না, বুঝতে চাই না; আমরা মানুষকেই পাই, নারী-পুরুষের দ্বন্দ্ব পেরিয়ে, ‘স্মার্ট হিংস্রতা’ পেরিয়ে, ধসে পড়া একটা দেশের ‘তামসিকতার’ দিকে তাকিয়ে ভাস্কর বলতে চান, বলতে পারেনও– ‘এইসব সারেগামা পেরিয়ে তোমার কাছে দু-ঘণ্টা বসতে ইচ্ছে করে’; কিন্তু তাতেও সমস্যা– আসলে দুঃখ, হতাশা, একাকিত্ব এবং মুক্তির আকাঙ্খা এত বেশি সংক্রামক, অন্যের চাওয়া দেখে নিজেও উত্তেজিত হয়ে যায়। (Bhaskar Chakraborty)
‘তোমাকে দুঃখিত করা আমার জীবনধর্ম নয়/ চলে যেতে হয় বলে চলে যাচ্ছি, নাহলে তো, আরেকটু থাকতাম’
তখন শান্তির খোঁজে আসা নিরীহ ও সংবেদনশীল মানুষটি নিজেই নিজেকে দোষ দিতে থাকে, দায়ী করতে থাকে অন্যকে অজান্তে দুঃখ দিয়ে ফেলার জন্য। যদিও কবির ইচ্ছে বা মানসিকতা বা ধর্ম কোনওটাই তা ছিল না, ফলে পুনরায় এই absurd life বা absurd existence-এ নিজের অর্থ খুঁজে না পেয়ে চলে যান tragic hero-র মতন, আর মুগ্ধ দর্শকের মতো শব্দহীন পাঠক আমরা শুনতে পাই তাঁর সলিলকি– ‘তোমাকে দুঃখিত করা আমার জীবনধর্ম নয়/ চলে যেতে হয় বলে চলে যাচ্ছি, নাহলে তো, আরেকটু থাকতাম’। এভাবেই আমরা অন্ধকার থেকে পুনরায় অন্ধকারের দুয়ারে পৌঁছে নিজেদের নিরর্থক জীবন থেকে না মুক্তি পাই, না পাই স্বস্তি, না পাই প্রশ্নের সঠিক উত্তর, সমাধান। জিরাফের ভাষা তখন আর জিরাফ নামের কোনও পশুর ডাক থাকে না। অব্যর্থভাবে হয়ে ওঠে মানুষের গোঙানি, কান্না, হাহাকার, হতাশার চিৎকার। (Bhaskar Chakraborty)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
কবিতা লেখার একটি চেষ্টা রয়েছে। সম্প্রতি যোগ হয়েছে কোনও একটি বিষয়ের ওপর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাবনাচিন্তা প্রকাশের একটি চেষ্টা। এর বাইরে বিশেষ কী আর পরিচিতি দেওয়া যেতে পারে, সত্যিই জানা নেই।
