(Naihati Refugee Colony)
ভাগীরথীর পূর্বে গড়ে ওঠা জনপদগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বৈচিত্র্যপূর্ণ ছিল ‘নবহট্ট’, কালক্রমে যা হয়ে উঠেছে নৈহাটি। শিয়ালদহ রানাঘাট শাখার মেন লাইনে, যে স্টেশন থেকে ট্রেন বদলে ব্যান্ডেল যেতে হয়, সেই স্টেশনের নাম নৈহাটি জংশন। নৈহাটি মানে সিংহভাগ বাঙালির কাছে বড়মার পুজো, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মভিটে, সমরেশ বসুর বাসস্থান।
কিন্তু এইসবের আড়ালে রয়ে গিয়েছে এক অভূতপূর্ব ইতিহাস। যে ইতিহাস ঘাঁটলে ধেয়ে আসে দারুণ প্রশস্তি। অজস্র কালপুরুষের দিকে চেয়ে থাকলে যেমন শূন্যতা ঘিরে ধরে, ঠিক তেমনই নৈহাটির ইতিহাসে এক অদ্ভুত শূন্যতা আছে। যে শূন্যতায় আছে তন্ত্রের উৎপত্তি এবং কালীপুজো, বাস্তুহারা কলোনির গড়ে ওঠা, স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় গুপ্তসমিতির গল্প, গজা তৈরির ইতিহাস, গুড়ের হাটের প্রসঙ্গ, শ্রেষ্ঠ আমের প্রসঙ্গ, মাছ চাষের ইতিহাস এবং আরও কত কী। আরও কত কত ইতিহাসের টুকরো, যা কালক্রমে অবহেলায় ভেসে যাওয়ার জোগাড়। ভাগীরথীর পূর্বে একে একে পটপরিবর্তন হয়েছে, নতুন ইতিহাস লেখা হয়েছে। মোছাও হয়েছে কতকিছু। তবুও রয়ে গিয়েছে অদ্ভুত ওই প্রশস্তি ও শূন্যতা। (Naihati Refugee Colony)
আরও পড়ুন: মংপুতে মৈত্রেয়ী দেবী
ভাগীরথীর পূর্ব তীরে অবস্থিত ছোট গ্রাম নৈহাটি ক্রমশ বাড়তে বাড়তে ১৮৬৯ সালে সরকারিভাবে পৌরসভার স্বীকৃতি পায়। সে সময় নৈহাটি পৌরসভার সীমানা ছিল, উত্তরে কাঁচড়াপাড়া বাগের খাল, পশ্চিমে ভাগীরথী নদী, পূর্বে মাঝিপাড়া, শিবদাশপুর, মাদ্রাল ও দক্ষিণে ইচ্ছাপুর। অঞ্চলটির আয়তন ছিল প্রায় সাড়ে আঠারো বর্গমাইল। ভাগীরথী, যমুনা, সুতীনদী, নেহাই খাল পরিবেষ্টিত ভূখণ্ডকে ইতিহাসের পাতায় বলা হয়েছে ‘বৃহত্তর নৈহাটি’। (Naihati Refugee Colony)

বহু বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে ভাগীরথীর পূর্বপারের এই জনপদ এগিয়েছে। দেশভাগের পূর্ববর্তী সময়ে যাঁরা এপার বাংলায় এসে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে দিন গুজরান করছিলেন, তারাই একটা সময়ের পরে নিশ্চিত ভবিষ্যতের তাগিদে গড়ে তোলে বাস্তুহারা কলোনি। বাস্তুহারা কলোনি বললেই আমাদের সামনে যে ছবিটা ভেসে ওঠে, সেই ছবির সূচনা এই নৈহাটি থেকেই। ‘অতীতের নৈহাটি’ বইটিতে ‘বিজয়নগরের ইতিহাস’ প্রবন্ধে শান্তিময় মুখোপাধ্যায় উল্লেখ করেছেন, সারা বাংলার প্রথম বাস্তুহারা কলোনি গঠিত হয় নৈহাটির বিজয়নগরে এবং দ্বিতীয় যাদবপুরের বিজয়গড়ে। যদিও এই নিয়ে অনেক দ্বিমত আছে। তিনি উল্লেখ করেছেন, ১৯৪৯ সালের ৪ অক্টোবর, নৈহাটিতে প্রথম বাস্তুহারা কলোনি গড়ে ওঠে। তবে এই তথ্য মানতে রাজি নন বহু গবেষক। (Naihati Refugee Colony)

১৯৪৭ সালের আগস্টে দেশভাগ ঘোষণার সময় পূর্ববঙ্গের হিন্দু জনগোষ্ঠী বুঝতেই পারেনি, সামনে কী ভয়ংকর অনিশ্চয়তা অপেক্ষা করছে। ধীরে ধীরে দাঙ্গা, ভয়, অর্থনৈতিক বঞ্চনা এবং প্রশাসনিক অবহেলার ফলে পূর্ববঙ্গের বহু মানুষকে ঘরছাড়া হতে হয়। নদীপথ ও রেলপথে তাঁরা পশ্চিমবঙ্গে এসে পৌঁছান। আশ্রয় নেন আত্মীয়ের বাড়িতে, স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে, খোলা মাঠে। নৈহাটির আশপাশের এলাকা, এই উদ্বাস্তু স্রোতের একটি বড় আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে। নৈহাটির বিজয়নগরের ইতিহাস শুধুই একটি এলাকার ইতিহাস নয়, দেশভাগ-পরবর্তী পূর্ববঙ্গীয় উদ্বাস্তু জীবনের এক সংক্ষিপ্ত দলিলও। (Naihati Refugee Colony)
নৈহাটি স্টেশনের পূর্বদিকে অবস্থিত বিজয়নগর। সেই সময় এই স্থানটি ছিল জঙ্গলে ভরা। বিজয়নগর অঞ্চলে প্রথমদিকে যে বসতি তৈরি হয়েছিল, তা ছিল সম্পূর্ণ অবৈধ ও অনির্দিষ্ট। জঙ্গলাকীর্ণ জমি পরিষ্কার করে, ঝুপড়ি বানিয়ে মানুষ থাকতে শুরু করে। অধিকাংশ পরিবারই ছিল সর্বস্বান্ত, না ছিল টাকা, না ছিল জমির দলিল। (Naihati Refugee Colony)
এই অস্থির পরিস্থিতিতে ১৯৪৯ সালের ৪ অক্টোবর ‘বাস্তুহারা সমিতি’ গঠিত হয়। এই সংগঠনের জন্মই বিজয়নগরের ইতিহাসে মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
এই জমিগুলোর বড় অংশই ছিল রেলের, সরকারি খাস জমি কিংবা প্রভাবশালী জমিদারদের পরিত্যক্ত সম্পত্তি। ফলে প্রায়ই উচ্ছেদের ভয় দেখা দিত। পুলিশ, প্রশাসন এবং কখনও কখনও স্থানীয় প্রভাবশালীদের সঙ্গে সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। এই অস্থির পরিস্থিতিতে ১৯৪৯ সালের ৪ অক্টোবর ‘বাস্তুহারা সমিতি’ গঠিত হয়। এই সংগঠনের জন্মই বিজয়নগরের ইতিহাসে মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সমিতির মূল লক্ষ্য ছিল, উদ্বাস্তুদের ঐক্যবদ্ধ করা, বসতির ভিত শক্ত করা এবং প্রশাসনের সঙ্গে সংগঠিতভাবে মোকাবিলা করা। (Naihati Refugee Colony)
সমিতির সভাপতি মহাদেব ভট্টাচার্য ছিলেন অত্যন্ত দূরদর্শী। তিনি বুঝেছিলেন, শুধু ঘর তুললে চলবে না, এই বসতিকে টিকিয়ে রাখতে সামাজিক শৃঙ্খলা, শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। জমি বণ্টনের ক্ষেত্রে বাস্তুহারা সমিতি একটি নির্দিষ্ট নীতি গ্রহণ করে। এলোমেলো দখলের বদলে জমিকে প্লটে ভাগ করা হয়, রাস্তা রাখা হয়, খোলা জায়গা সংরক্ষণ করা হয়। প্রতিটি পরিবারকে নির্দিষ্ট পরিমাণ জমি দেওয়া হয়, যাতে ভবিষ্যতে পাকা ঘর নির্মাণ করা যায়। (Naihati Refugee Colony)

এই পরিকল্পিত দৃষ্টিভঙ্গির ফলেই বিজয়নগর ধীরে ধীরে অন্য বহু উদ্বাস্তু কলোনির থেকে আলাদা হয়ে ওঠে। সমিতির আর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল সমবায় মনোভাব। অনেক পরিবার একা টিকে থাকতে পারছিল না। তাদের জন্য খাদ্য, ঋণ এবং পারস্পরিক সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়। পূর্ববঙ্গে যাঁরা কৃষিকাজ করতেন, তাঁরা এখানে ছোট জমিতে চাষ শুরু করেন। কেউ দোকান, কেউ কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ নেন। অর্থনৈতিক পুনর্গঠন বিজয়নগরের সামাজিক স্থিতি তৈরি করে। শিক্ষাক্ষেত্রে বিজয়নগরের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। (Naihati Refugee Colony)
উদ্বাস্তু পরিবারগুলোর মধ্যে শিক্ষিত মানুষের অভাব ছিল না। তাঁদের উদ্যোগেই একের পর এক প্রাথমিক বিদ্যালয় গড়ে ওঠে। এই স্কুলগুলিই ছিল শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ার প্রথম ধাপ। পরে সরকারি স্বীকৃতি পাওয়ার পর বিদ্যালয়গুলি নৈহাটির শিক্ষা মানচিত্রে স্থায়ী জায়গা করে নেয়। শিক্ষার পাশাপাশি শুরু হয় সাংস্কৃতিক চর্চা। নাট্যদল, পাঠচক্র, গ্রন্থাগার গড়ে ওঠে। (Naihati Refugee Colony)
বিজয়নগরের ইতিহাসে বেদনাও কম নয়। বহু পরিবার সরকারি স্বীকৃতি পাওয়ার আগেই এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। কেউ কেউ চরম দারিদ্র্যের কারণে অন্য জায়গায় চলে গিয়েছেন।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিজয়নগর শুধু উদ্বাস্তুদের আশ্রয়স্থল রইল না। সেখানে গড়ে উঠল বাজার, ক্লাব, সামাজিক সংগঠন। স্থানীয় রাজনীতিতেও সক্রিয় হয়ে ওঠেন বিজয়নগরের মানুষ। নাগরিক পরিষেবা, পানীয় জল, বিদ্যুৎ, রাস্তা সব কিছুর জন্যই বারবার আন্দোলন শুরু হল। এই আন্দোলনগুলিই বিজয়নগরের মানুষকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তুলেছিল। (Naihati Refugee Colony)
বিজয়নগরের ইতিহাসে বেদনাও কম নয়। বহু পরিবার সরকারি স্বীকৃতি পাওয়ার আগেই এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। কেউ কেউ চরম দারিদ্র্যের কারণে অন্য জায়গায় চলে গিয়েছেন। তবু যাঁরা থেকে গিয়েছেন, তাঁরা বিজয়নগরকে শুধু বসবাসের জায়গা নয়, নিজেদের অস্তিত্বের প্রতীক করে তুলেছেন। (Naihati Refugee Colony)

দেশভাগের অভিঘাতে জন্ম নেওয়া নৈহাটির বিজয়নগর এবং যাদবপুরের বিজয়গড় একই ঐতিহাসিক ক্ষত থেকে উঠে এলেও তাদের গঠনের চরিত্র ও বিকাশের পথ ছিল ভিন্ন। বিজয়গড় মহানগর সংলগ্ন রাজনৈতিক ও শিক্ষাকেন্দ্রিক পরিবেশে দ্রুত সাংগঠনিক শক্তি অর্জন করে। ছাত্র আন্দোলন, বামপন্থী সংগঠন ও মধ্যবিত্ত শিক্ষিত উদ্বাস্তুদের উপস্থিতি তাকে দ্রুত সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিচয় দেয়। নগর রাজনীতিনির্ভর সংগঠনের এক সক্রিয় উদাহরণ বিজয়গড়। (Naihati Refugee Colony)
অন্যদিকে বিজয়নগর গড়ে ওঠে নৈহাটির পূর্ব পারে জঙ্গলাকীর্ণ ও অনিশ্চিত জমির উপর, যেখানে উদ্বাস্তুরা প্রথমে আশ্রয় নেয় টিকে থাকার তাগিদে, পরে বাস্তুহারা সমিতির মাধ্যমে জমি প্লট করে বণ্টন করে। এখানে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ছিল শ্রমনির্ভর ও স্বনির্ভর। কেউ ক্ষুদ্র চাষে, কেউ স্থানীয় শিল্প বা জুটমিলে কাজ করে নতুন জীবন গড়ে তোলে। তাই স্থানটি আজ সমবায়ভিত্তিক আত্মরক্ষার এক প্রান্তিক মডেল। (Naihati Refugee Colony)
জনপদকে শুধু মানচিত্রে খুঁজলে তার পূর্ণতা পাওয়া যায় না। তাকে খুঁজতে হয় ভাঙা স্মৃতির ভেতর, উদ্বাস্তুদের গড়া প্রথম ইটের ঘরে কিংবা অজানা কোনও সমিতির রেজিস্টারের হলদে পাতায়।
একটির ইতিহাস অনেকাংশে মৌখিক স্মৃতি ও আঞ্চলিক চর্চায় রয়ে গেছে; অন্যটি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা ও রাজনীতির মাধ্যমে বৃহত্তর কলকাতার ইতিহাসে দৃশ্যমান। এই দ্বৈততা দেশভাগ-পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক রূপান্তরের দুই পৃথক ধারাকেই স্পষ্টভাবে সামনে আনে। (Naihati Refugee Colony)
বিজয়নগর হোক বা বিজয়গড়, প্রত্যেকটি বসতিই দেশভাগের ক্ষতচিহ্নকে পরিণত করেছে সংগঠনের শক্তিতে। তবে ভাগীরথীর পূর্ব তীরে নৈহাটি জনপদকে শুধু মানচিত্রে খুঁজলে তার পূর্ণতা পাওয়া যায় না। তাকে খুঁজতে হয় ভাঙা স্মৃতির ভেতর, উদ্বাস্তুদের গড়া প্রথম ইটের ঘরে কিংবা অজানা কোনও সমিতির রেজিস্টারের হলদে পাতায়। নবহট্ট থেকে নৈহাটি, এই যাত্রাপথ আসলে হারানোর মধ্যেও সৃষ্টি করার ইতিহাস। (Naihati Refugee Colony)
তথ্যসূত্র: অতীতের নৈহাটি, সম্পাদক কিশোর কুমার সাহা
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়াতে ভালবাসেন। খোঁজ রাখেন নিত্যনতুন বিষয়ে। সময় পেলে রান্না করেন। পড়তে ভাল লাগে বুদ্ধদেব গুহের উপন্যাস। শুনতে ভাল লাগে ফসিলস্। আঞ্চলিক ইতিহাস প্রিয় বিষয়।
