(Bengali Short Story)
আমার প্রিয় বন্ধুর নাম আচ্ছেলাল যাদব।
না, আচ্ছেলাল কোনও মানুষ নয়, সে ছোট্ট একটি কাঠবেড়ালি। এই লম্বা ও লোমশ লেজ তার। পিঠে যথারীতি সাদা লম্বা দাগ। রোজ সকাল হলেই গাছ বেয়ে, খাল পেরিয়ে, রাস্তা ডিঙিয়ে চলে আসে আমার অফিসের জানালায়। এখানে এসে, সে কোনওদিন পেট থাবড়ায়, আবার কোনওদিন জুলজুল করে দেখে। মানে, ওকে খাবার দাও। বিস্কুট, পাঁউরুটি, ছোলা-বাদাম যা আছে ওকে দাও। না থাকলে নিজের টিফিন থেকে হলেও ওকে দাও। (Bengali Short Story)
আচ্ছেলাল প্রথম আসে সকাল দশটায়।
তারপরে আবার, বারোটায়।
তারপরে তিনটে নাগাদ। (Bengali Short Story)
অফিস থেকে আমি বেরোই পাঁচটায়। আগে ঘরের জানালা বন্ধ করে দিয়ে যেতাম। এখনও যাই। তবে পুরোটা টেনে বন্ধ করি না, দু-আঙুল ফাঁক রেখে দিই। সেখানে রেখে দিই একটি বিস্কুট। যাতে আচ্ছেলাল সকালের ব্রেকফাস্টটা সারতে পারে।
এমনি করে চলতে চলতে আচ্ছেলালের সঙ্গে আমার গভীর বন্ধুত্ব হয়ে গেল। এখন সে আমার টেবিলে উঠে আসে।অফিসের কাজ করতে করতে আমি আর আচ্ছেলাল গল্প করি। (Bengali Short Story)

কী গল্প?
এই যেমন, আচ্ছেলাল কতক্ষণ ঘুমায়। সারাদিন কী কী বদমাইশি করে। আচ্ছেলালের আর কোনও ভাইবোন আছে কি না— এইসব।
আমি প্রশ্ন করি, আচ্ছেলাল উত্তর দেয়। আবার কখনও কখনও আচ্ছেলাল আমার কাছে নানা কথা জানতে চায়, আমি সেগুলি তাকে জানাই। যেমন—
আমার বাড়িতে ল্যাপটপ আছে না ডেস্কটপ। আমি কি নিজেই রান্না করি না কেউ করে দেয়। আমি পরদিন ওর জন্য কী কী খাবার আনব বলে ঠিক করেছি— ইত্যাদি ইত্যাদি। (Bengali Short Story)
দরজার পাশে একটি কলিংবেল। আমি বোতামে চাপ দিলাম। খানিক পরে এক বৃদ্ধ এসে দরজা খুললেন। বললেন, কী চাই।
এইভাবে বন্ধুত্ব গভীর হলে, একদিন সকাল সকাল অফিস থেকে বেরিয়ে আমি আচ্ছেলালের বাড়ি যাই। সে আগে থেকেই বলে রেখেছিল, কোন পথে গেলে ওর বাসায় গিয়ে পৌঁছতে পারব। সেইমতো যাই।
গিয়ে দেখি, এক মজা পুকুরের ধারে পেল্লায় দোতলা বাড়ি— এখনকার দিনে যা তিনতলা বাড়ির সমান উঁচু। বাড়ির ছাদে বিশাল এক জলট্যাঙ্ক। সেখানেই এক আড়ালে থাকে আচ্ছেলাল আর ওর বাবা, মা। না, আচ্ছেলালের কোনও ভাইবোন নেই। (Bengali Short Story)
প্রাচীন বাড়িটার দরজা বন্ধ। দরজার পাশে একটি কলিংবেল। আমি বোতামে চাপ দিলাম। খানিক পরে এক বৃদ্ধ এসে দরজা খুললেন। বললেন, কী চাই।
বললাম, আচ্ছেলালের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।
বৃদ্ধ অবাক হয়ে বললেন, আচ্ছেলাল! এমন নামে এ বাড়িতে কেউ থাকে না। আপনি ভুল বাড়িতে এসেছেন। বললাম, না। ভুল আমার হয়নি। বাড়ির ঠিকানা, রাস্তা, এই মজা পুকুর— সব মিলে যাচ্ছে। (Bengali Short Story)
তখন বৃদ্ধ একটু ভেবে বললেন, আপনি কি তবে হুপুসের সঙ্গে দেখা করতে চান?
এবার আমি অবাক। বললাম, হুপুস কে? এমন নামে তো কাউকে চিনি না!
ভদ্রলোক হা হা করে হেসে বললেন, সে হল আমার পোষা কাঠবেড়ালি। (Bengali Short Story)
আচ্ছেলাল গেল কোথায়? কদিন ধরে আমার অফিসেও যাচ্ছে না। আমি ভাবলাম আচ্ছেলালের হল কী? অসুস্থ হয়ে পড়ল নাকি!
আমি বললাম, অহ্! তাহলে ঠিক বাড়িতেই এসেছি। আসলে ওকে আমি আচ্ছেলাল বলেই ডাকি। আচ্ছেলাল যাদব। ওর বাড়ির নাম যে হুপুস, সেটা জানা ছিল না।
ভদ্রলোক বললেন, আসুন আসুন, ভেতরে আসুন। হুপুস এখন নেই। তাতে কী? আপনি বসুন, দুটি কথা হোক; ততক্ষণে হুপুস এসে যেতেও পারে।

আচ্ছেলাল গেল কোথায়? কদিন ধরে আমার অফিসেও যাচ্ছে না। আমি ভাবলাম আচ্ছেলালের হল কী? অসুস্থ হয়ে পড়ল নাকি! (Bengali Short Story)
আরে না না, ও দিব্যি আছে। খেলছে, ছুটছে, খাচ্ছে— কোনওদিকেই কোনওকিছুর কমতি নেই।
বলে ভদ্রলোক আমাকে একগ্লাস ঠান্ডা জল দিলেন। সঙ্গে আধগ্লাস কোলা। বললেন, গরমে এসেছেন, খান।
ঠান্ডা পানীয় গলাধঃকরণ করে বললাম, ও তাহলে আমার অফিসে যাচ্ছে না কেন?
বৃদ্ধ বললেন, আসলে ও একটা বাড়ি খুঁজছে। কারণ ক’দিন পরে এটি ভেঙে ফেলা হবে। তার আগে নতুন একটা বাসস্থান খুঁজে ফেলতে চাইছে।
অবাক হয়ে বললাম, ভেঙে ফেলা হবে কেন? (Bengali Short Story)
বৃদ্ধ বললেন, কারণ এ বাড়িটা আমি প্রোমোটারের হাতে দিয়ে দিয়েছি। সামনের মাস থেকেই এই বাড়ি ভাঙার কাজ শুরু হবে। বাড়ি ভেঙে ফ্ল্যাট হবে। আমি একটা ফ্ল্যাট পাব। ততদিনে প্রোমোটার আমাকে অন্য একটি ফ্ল্যাটে শিফট করবে। কিন্তু সেখানে কাঠবেড়ালি থাকার ব্যবস্থা নেই! ফলে হুপুসকে সেখানে রাখতে পারব না। তাই ও নিজের ব্যবস্থা করে নিচ্ছে। (Bengali Short Story)
ইতিমধ্যে দুটি কাঠেবড়ালি এসে জড়ো হয়েছে। সম্পর্কে তারা আচ্ছেলালের মা ও বাবা। ওরা জানতে এসেছে, আচ্ছেলাল ফিরল? কোনও খোঁজ পেল ঘরের?
শুনে চুপ করে গেলুম।
বৃদ্ধ চা করে আনলেন। লাল চা, চিনি ছাড়া। তিনি নিজেও নিলেন। একটা চামচ নিয়ে চায়ের ভেতর ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন, সমস্যা কী বলুন তো? ও থাকার উপযুক্ত ঠাঁই এখনও জোগাড় করে উঠতে পারেনি। আমার এখানে এতবড় বাড়ি, বাগান; এমনটি এ শহরে আর কোথায় পাবে? কোথাও নেই। সব বিক্রি হয়ে ফ্ল্যাট হয়ে গিয়েছে। কেবল আমারটাই বাকি ছিল। সেটাও প্রোমোটারের খপ্পরে চলে গেল। (Bengali Short Story)
চায়ে চুমুক দিয়ে বললাম, বেচলেন কেন? খুব কী দরকার ছিল? ছিল। বলে বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।
ইতিমধ্যে দুটি কাঠেবড়ালি এসে জড়ো হয়েছে। সম্পর্কে তারা আচ্ছেলালের মা ও বাবা। ওরা জানতে এসেছে, আচ্ছেলাল ফিরল? কোনও খোঁজ পেল ঘরের? না পেলে ওদের কী হবে? (Bengali Short Story)

বৃদ্ধ ওদের দু’জনকে দু’টি মেরি বিস্কুট দিলেন। ওরা সেই দু’টিকে তুলে নিয়ে ঘরের কোণে গিয়ে খেতে লাগল।
বৃদ্ধ বললেন, এই বাড়ি করেছিলেন আমার দাদুর বাবা, তিনি একজন জাহাজি ছিলেন। প্রচুর টাকা কামিয়েছেন। অনেকটা জমি কিনে এই বাড়িখানা তিনি বানান। সঙ্গে পুকুর ও বাগান। যে মজা পুকুরটি দেখলেন, সেটা আমাদেরই। (Bengali Short Story)
বললাম, তারপর?
এখন সেই বাড়ি বিক্রি করে দিচ্ছি। আমার টাকার কোনও অভাব নেই। ছেলেও ভাল চাকরি করে। কিন্তু সে এখন আমেরিকার নাগরিক। সেখানের মেয়ে বিয়ে করেছে; এখানে আর ফিরবে না, তার ছেলেপুলেরাও ফিরতে চায় না। আমি মরলে এই বাড়ি ভূতের বাড়ি হবে। তাই বেচে দিলাম। অনেক টাকাও পেলাম। কারণ পুকুর আর বাগানও বেচে দিয়েছি। দু-কামরার একটা ফ্ল্যাট পাব। সেখানেই বাকি জীবন আরামে কাটবে। কিন্তু হুপুস আর তার বাবা-মায়ের কী হবে, তাই নিয়ে অল্প চিন্তায় আছি। (Bengali Short Story)
এই সময়ে আচ্ছেলাল এসে গেল। সে আমাকে দেখে অবাক। আবার খুশিও হল। বললে, স্যার যে। বৃদ্ধ বললেন, তুই ফিরলি? যাই তোর জন্যে কিছু খাবার আনি। (Bengali Short Story)
আমি বললাম, থাকার ব্যবস্থা কিছু হল আচ্ছেলাল? সে বললে, একটা বাড়ির খোঁজ পেয়েছি, বুঝলে স্যর। কাল থেকে সেখানে থাকব।
— বিস্কুট দিও না।
— তবে?
— বাদাম।
— আনা নেই।
— তবে জিভেগজা আনো।
— সেও নেই।
— তোমার ঘরে কিছুই থাকে না।
— আলুসেদ্ধ করা আছে, আনছি। ওই খা।
বলে বৃদ্ধ ভেতরের ঘরে চলে গেলেন। আমি বললাম, থাকার ব্যবস্থা কিছু হল আচ্ছেলাল? সে বললে, একটা বাড়ির খোঁজ পেয়েছি, বুঝলে স্যর। কাল থেকে সেখানে থাকব। (Bengali Short Story)
বললাম, কোথায়?
— গঙ্গার ধারে। একটা পোড়ো বাড়ি।
— ভূত থাকে নাকি?
— আরে না! দুটি প্যাঁচা আর একটা গন্ধগোকুল থাকে। ভূত নেই।
— তা ওরা তোমাকে থাকতে দেবে কেন? কীভাবে বশ করলে ওদের?
— গল্প বলে।
— গল্প!

— হ্যাঁ। যে গল্প তুমি আমাকে তোমার অফিসে বলো, সেই গল্পই ওদেরকে বললাম। ওরা গল্প শুনে খুব খুশি। এমন গল্প কোথায় পাবে? গল্প বলার কেউ লোক নেই কি না! অফিসে যে এমন চাপান-ওতোর হয়, ওরা জানতই না, ভেবে দেখো! ওরা বলেছে আমাদের থাকতে দেবে। এই বুড়োটাকে কেমন দেখলে? (Bengali Short Story)
— ভালই তো! কোলা খাওয়ালো।
— সে খাও। তবে বুড়ো ভাল নয়। পয়সার লোভ খুব।
— এমন বলছ কেন?
— বাড়িটা বেচছে কেন? থাকলে কী হত? আমার মতো আরও কিছু কাঠবেড়ালি, পশুপাখি, জীবজন্তু এখানে বাস করতে পারত। আমি বুড়োকে কত করে বারণ করেছিলাম, শুনল না। বলল, আমার ভিটেতে ঘুঘু চরবে? তার চেয়ে বেচে দেওয়া ভাল। আমি বললাম, ঘুঘু বলে সে কি পাখি নয়? বললাম, বুড়ো, তোমার নাম হবে। তুমি মারা গেলে পশুপাখিরা দু’হাত তুলে তোমাকে আশীর্বাদ করবে, তুমি স্বর্গে যেতে পারবে, আমাদের কাছে তুমি প্রাতঃস্মরনীয় হবে। কিন্তু কিছুতেই শুনল না, বাড়ি সেই বেচেই দিল। কত টাকা পেয়েছে! আর এখন দেখো, কাঠবেড়ালি পুষে তাকে বাদাম দিতে পারে না, আলুসেদ্ধ খাওয়াচ্ছে। তাও চন্দ্রমুখী নয়, জ্যোতি আলু। (Bengali Short Story)
বৃদ্ধ আলুসেদ্ধ নিয়ে চলে এলেন। একটি গোটা আলু খোসা ছাড়িয়ে ফেলে দিলেন আচ্ছেলালের সামনে। আচ্ছেলাল সেটিকে গ্রোগ্রাসে খেতে লাগল।
ওর কথা শুনে হেসে ফেললুম।
আচ্ছেলাল বলে, তুমি এই কিপটে বুড়োর চেয়ে শতগুণে ভাল। আমাকে বাদাম খাওয়াতে। না পারলে ফুলুরি। কোনওদিন বেসনের বড়া। কতরকম খাবার আনতে বাড়ি থেকে, আমার জন্য। আর বিস্কুট তো ছিলই। নানা ধরনের মিষ্টি বিস্কুট, কুকিজ। তবে এসব আমি আর খেতে পাব না। বনের ফলমূল খেয়েই দিন কাটাতে হবে। কারণ তোমার সঙ্গে আর দেখা হবে না। (Bengali Short Story)
শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল। বললাম, দেখা হবে না কেন?
— পোড়ো বাড়িটা তোমার অফিস থেকে অনেক দূরে যে! আমি তোমার কাছে আসব কী করে?
চুপ করে গেলাম। বৃদ্ধ আলুসেদ্ধ নিয়ে চলে এলেন। একটি গোটা আলু খোসা ছাড়িয়ে ফেলে দিলেন আচ্ছেলালের সামনে। আচ্ছেলাল সেটিকে গ্রোগ্রাসে খেতে লাগল। (Bengali Short Story)
চলে আসার সময় আচ্ছেলাল গেট অব্দি এল। বলল, টা-টা স্যর।
বললাম, তুমি আমার বন্ধু। এতদিন তুমি বন্ধুকৃত্য করেছ, এবার আমি করব।
আচ্ছেলাল বলল, মানে! (Bengali Short Story)
বললাম, এতদিন তুমি অনেক পথ পেরিয়ে, নালা টপকে, কুকুর এড়িয়ে, গাছ বেয়ে আমার কাছে গিয়েছ। আমার সঙ্গে সুখ-দুখের গল্প করেছ। এবার আমি তোমার কাছে যাব। অফিস থেকে বেরিয়ে তোমার সঙ্গে দেখা করে, গল্প করে তবে বাড়ি ফিরব। তুমি ছাড়া মনের কথা কাকে বলব? অফিসের এইসব গোপন কথা তুমি যদি না শোনো কে শুনবে? তোমার কাছ থেকে পাঁচকান হওয়ার ব্যাপার নেই। আমি তোমাকে ভরসা করি। (Bengali Short Story)
আমাকে তুমি এত ভালবাসো স্যর! আচ্ছেলাল কেঁদে ফেলল।
আমাকে তুমি এত ভালবাসো স্যর! আচ্ছেলাল কেঁদে ফেলল। (Bengali Short Story)
বললাম, কাল পোড়ো বাড়িতে তোমার জন্যে কী খাবার নিয়ে যাব? খুশিতে সে এক পাক নেচে নিল। তারপরে বলল, মাখম বিস্কুট।
— আর?
— ছোট একটা ক্রিম কেক।
— এই?
— হ্যাঁ। পরেরদিনের ফিরিস্তি পরেরদিন বলব।
খুশি মনে রাস্তায় পা দিলাম। ততক্ষণে দিনের আলো মরে এসেছে। বৃদ্ধ জোড়হাতে নমস্কার করে আমাকে বললেন, অক্ষয় হোক আপনাদের বন্ধুত্ব।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
১৯৭৬ সালের জাতক অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী গল্প লিখছেন ছাত্রাবস্থা থেকেই। দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় তাঁর প্রথম গল্প প্রকাশ পায় আদ্রা, পুরুলিয়া থেকে প্রকাশিত "টুকলু" পত্রিকায়। পরবর্তীতে অসংখ্য গল্প অজস্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর প্রথম ছোটগল্পের বই "মশাট ইস্টিশনের মার্টিন রেল"-এর জন্য পেয়েছেন নমিতা চট্টোপাধ্যায় সাহিত্য পুরস্কার। লেখক বাংলা সাহিত্যে এম.এ পাশ। জীবিকা চাকরি। তিনি ভালোবাসেন মাঠে- ঘাটে ঘুরতে ও অতি সাধারণ মানুষদের সঙ্গে মিশতে। যাদের কেউ দেখেও দেখে না, যাদের কথা কেউ বলে না, যাদের কেউ শুনেও শোনে না--অনিরুদ্ধ তাদের কথাই বলেন।
