(Samit Bhanja)
‘গল্প হলেও সত্যি’, ‘ঝিন্দের বন্দি’, ‘হাঁসুলি বাঁকের উপকথা’-র মতো বিখ্যাত সব ছবি করে ততদিনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন পরিচালক তপন সিংহ। একডাকে তখন তাঁকে চেনে টলিপাড়া। এমনই একদিন তাঁর ঘরে রীতিমতো ধাক্কা দিয়ে ঢুকলেন এক দামাল ছেলে। পরিচালকের চোখে চোখ রেখে বললেন, ‘অভিনয় করতে চাই’। পরিচালকের মেজাজ যাঁরা জানেন, তাঁরা সকলে ভয়ে তটস্থ। অথচ ভয়ের লেশমাত্র নেই ছেলেটির চোখে মুখে। পরিচালকের আর সাধ্য কী এমন ছেলেকে ফেরান! জুটে যায় ছোট এক চরিত্রে অভিনয়ের বরাত।
এর কিছু বছর পর তপন সিংহের হাত ধরেই বাংলা ছবি নতুন করে পেল এক আধুনিক অভিনেতাকে। তপন সিংহের ‘আপনজন’, সত্যজিৎ রায়ের ‘অরণ্যের দিনরাত্রি, তরুণ মজুমদারের ‘ফুলেশ্বরী’-র মতো কালজয়ী সব ছবিতে দুর্দান্ত অভিনয়ের জেরে বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শকদের মনে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন, তিনি শমিত ভঞ্জ।
১৯৪৪ সালের ২ জানুয়ারি তমলুকে জন্ম এই কিংবদন্তি অভিনেতার। অভিনয়ের শুরু স্কুলে নাটক করার মধ্যে দিয়েই। অভিনয়ের টানে বাবার সঙ্গে অশান্তি করে পলিটেকনিক পড়া মাঝপথেই ছেড়ে দিয়ে তমলুক থেকে চলে আসেন কলকাতা। যোগ দেন সবিতাব্রত দত্তর দল ‘রূপকার’-এ। প্রথমে সেখানেই বেশ কিছু নাটকে অভিনয় করতে থাকেন। তবে এতে মন ভরেনি ভবিষ্যতের নায়কের, সিনেপাড়ায় কাজের চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। এভাবেই ভূমেন রায়ের ‘নিশাচর’ ছবিতে ভিড়ের দৃশ্যে অভিনয়ের সুযোগ এসে যায়। এরপর বিভূতি লাহার ‘বাদশা’ ছবিতে আবারও একটি ভিড়ের দৃশ্যে হাজির হওয়ার সুযোগ পান তিনি। কিন্তু সিনেমায় অভিনয় বলতে যা বোঝায়, তা যেন কিছুতেই হয়ে উঠছিল না।
ভিডিও: অনন্য অরুন্ধতী: জন্মশতবর্ষে ফিরে দেখা (১৯২৪-১৯৯০)
এর মধ্যেই তপন সিংহের ‘হাটে বাজারে’ ছবিতে মোটর মেকানিকের চরিত্রে অভিনয় করে সিনেজগতে কিছুটা পরিচিতি অর্জন করেছেন শমিত ভঞ্জ। পুলিশ ইনস্পেকটরের ছোট্ট চরিত্র পেয়েছিলেন বলাই সেনের ‘কেদার রাজা’ ছবিতেও। সেখান থেকেই তাঁর কাজ তপন সিংহের পছন্দ হয়েছিল। শেষমেশ সুযোগ এসে গেল তপন সিংহের ‘আপনজন’ ছবিতে ‘ছেনো’ চরিত্রে অভিনয়ের। যা তাঁর অভিনয়ের গুণে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি আইকনিক চরিত্র হিসেবে আজও অমর হয়ে আছে। তবে এই ছবি মুক্তির পর প্রচুর খ্যাতি পেলেও, সিনেমায় কাজ পেতে তেমন কোনও সুবিধা হয়নি তাঁর।
এর কিছু বছর পর শচীন অধিকারীর ‘শপথ নিলাম’ ছবিতে বিপ্লবী দীনেশ মজুমদারের চরিত্রে অভিনয় করার পরই শমিত ভঞ্জের অবস্থার বদল ঘটতে শুরু করে। শুটিং চলার মাঝেই রবি ঘোষ তাঁকে খবর দেন, “মানিকদা তোকে খুঁজছেন”। সত্যজিতের সঙ্গে শমিতের পরিচয় ছিল না। শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায় শমিতকে লেক টেম্পল রোডের বাড়িতে পৌঁছে দেন। এরপরই বাংলা সিনেমায় আরও একটি অনবদ্য চরিত্র ‘হরি’র জন্ম হয়। শমিত ভঞ্জ ‘আপনজন’-এর পর তাঁর অভিনয় জীবনের আরও এক মাইল ফলক ছুঁয়ে ফেলেন। তাঁর নিজের বয়ানে, “যে মুহূর্তে খবর ছড়াল সত্যজিৎ রায় আমাকে নিয়েছেন, অমনি যেন টালিগঞ্জের লোকেরা নড়েচড়ে বসল।”
‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ মুক্তি পায় ১৯৭০ সালে। সেই বছরই অজিত গঙ্গোপাধ্যায় পরিচালিত ‘রূপসী’ ছবিটিও মুক্তি পায়। ১৯৭১-এ তাঁর মুক্তি পাওয়া ছবির সংখ্যা চার। যার মধ্যে ‘জননী’, ‘আটাত্তর দিন পরে’, দীনেন গুপ্তর ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’ যেমন রয়েছে, তেমনই আছে হৃষীকেশ মুখোপাধ্যায়ের হিন্দি ছবি ‘গুড্ডি’। এই ‘গুড্ডি’ দিয়েই হিন্দি ছবির জগতে প্রথম পা রাখা।
ভিডিও: আলো-ছায়ায় হারাধন – জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য
এরপর আরও তিনটি হিন্দি ছবিতে কাজ করেছেন। ‘ওহি রাত ওহি আওয়াজ’, ‘অনজানে মেহমান’ ও ‘কিতনে পাস কিতনে দূর’। ১৯৭২-এর পর থেকে ’৯৫ পর্যন্ত প্রতি বছরই শমিত ভঞ্জের চার-পাঁচটি করে ছবি মুক্তি পেতে থাকে। এর মধ্যে তপন সিংহের ‘হারমোনিয়াম’, ‘সবুজ দ্বীপের রাজা’, তরুণ মজুমদারের ‘ফুলেশ্বরী’, ‘গণদেবতা’, বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর ‘ফেরা’ যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে বাংলা বাণিজ্যিক ছবিও।
শুধু অভিনয়ই নয়, কয়েকটি বাংলা ছবিও পরিচালনা করেছেন শমিত ভঞ্জ। তাঁর পরিচালিত প্রথম ছবি ‘ওরা চারজন’ (১৯৮৮)। এতে নায়ক নায়িকা ছিলেন প্রসেনজিৎ এবং দেবশ্রী রায়। এছাড়াও পরিচালনা করেছেন ‘সাধারণ মেয়ে’ (১৯৯১), ‘রাজার রাজা’ (১৯৯৪), ‘বনফুল’ (১৯৯৬) এবং ‘ধর্ম যুদ্ধ’ (১৯৯২)। শমিত ভঞ্জের পরিচালিত সর্বশেষ ছবি ‘ভালোবাসা’ (১৯৯৭)। তবে ‘উল্টো পাল্টা’ নামে তাঁর পরিচালিত একটি সিনেমা শেষ পর্যন্ত মুক্তি পায়নি।
আপনজনের ছেনোর মতোই তিনি ছিলেন যৌবনের দূত। বাংলা সিনেমার ‘দামাল ছেলে’। উত্তম-পরবর্তী প্রজন্মের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় নায়ক ছিলেন শমিত ভঞ্জ। কিন্তু বাংলা সিনেমা চিনতে পারেনি তাঁকে। আজ তাঁর জন্মদিনে আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা বাংলা সিনেমার এই ‘আধুনিক’ নায়ককে!
বাংলালাইভ একটি সুপরিচিত ও জনপ্রিয় ওয়েবপত্রিকা। তবে পত্রিকা প্রকাশনা ছাড়াও আরও নানাবিধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে থাকে বাংলালাইভ। বহু অনুষ্ঠানে ওয়েব পার্টনার হিসেবে কাজ করে। সেই ভিডিও পাঠক-দর্শকরা দেখতে পান বাংলালাইভের পোর্টালে,ফেসবুক পাতায় বা বাংলালাইভ ইউটিউব চ্যানেলে।
