একবিংশ বর্ষ/ ৪র্থ সংখ্যা/ ফেব্রুয়ারি ১৬-২৮, খ্রি.২০২১

 

‘আড়াই’ টপকালেই দিলীপদার পরোটা-আলুরদম

‘আড়াই’ টপকালেই দিলীপদার পরোটা-আলুরদম

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
অলঙ্করণ শুভময় মিত্র
অলঙ্করণ শুভময় মিত্র

অনেকেই ভাবেন নরেন্দ্রপুরের ছেলে মানেই নিপাট গুডি গুডি টাইপের| বেশ ধার্মিক| মদ – সিগারেট ছোঁয় না| নেশা ভাং করা তো দূরের কথা — নাম শুনলেই আঁতকে ওঠে| পড়াশোনা আর কেরিয়ার ছাড়া কিছুই বোঝে না| হোস্টেলের সব নিয়ম মেনে চলে চিরকাল|

যে সময়ের কথা বলছি (আশির দশকের মাঝামাঝি), এগারো – বারো ক্লাস তখন কলেজে পড়ান হত| স্কুলের নিয়মের বেড়াজাল পেরিয়ে কলেজে এসে দেখলাম প্রায় একইরকম নিয়মাবলী| কিন্তু বিশাল এলাকা নিয়ে কলেজ| হোস্টেল বিল্ডিং তিনটিও বিরাট| নিয়ম অনেক থাকলেও নিয়ম ভাঙার সুযোগও ছিল ততোধিক| নরেন্দ্রপুরের জীবনের নানা দিক নিয়ে অনেক জায়গায় লিখেছি| আজ কয়েকটা নিয়ম ভাঙার কথা লিখছি|

নরেন্দ্রপুর কলেজে তিনটি হোস্টেল ছিল — বলা হত ভবন| ব্রহ্মানন্দ, রামকৃষ্ণানন্দ ও গৌরাঙ্গ ভবন| নরেন্দ্রপুরে প্রত্যেকটি ভবনই ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের শিষ্যদের নামে| ব্যতিক্রম ছিল গৌরাঙ্গ ভবন| নিয়মকানুন কার্যকর করার ব্যাপারেও এই ভবন ছিল ব্যতিক্রমী| বেশ খানিকটা ঢিলেঢালা| আমরা থাকতাম গৌরাঙ্গ ভবনে| কোথায় কোনও নিয়ম ভেঙে খানিকটা মুক্তির স্বাদ পাওয়া যাবে, সব সময় আমাদের মাথায় ঘুরত|

এই পাঁচিল ঘেঁষে অনেকটা জায়গায় ঘন ঝোপ-ঝাড়| তার পাশ দিয়ে পায়ে চলা শর্টকাট রাস্তা হয়ে গিয়েছিল| দুই আর তিন নম্বর গেটের মাঝামাঝি,পাঁচিলের একটা জায়গা খানিকটা নিচু ছিল কোনও কারণে| এই গলতার নামই ছিল আড়াই বা থ্রি পয়েন্ট ফাইভ|

সকালে-সন্ধ্যায় প্রেয়ার হলে প্রার্থনায় যোগদান বাধ্যতামূলক ছিল| এর অন্যথা হলে কলেজ থেকে বহিষ্কার পর্যন্ত হতে পারতো| ভোরবেলা উঠেই প্রেয়ার হলে যেতে মন চাইত না অনেকেরই| বিশেষ করে শীত আর বর্ষায়| আবার স্বর্ণালী সন্ধ্যার মুখে সেখানে ঢুকতেও ইচ্ছে করত না অনেক সময় | আমাদের ব্যাচের ছেলেদের প্রেয়ার হলে একটু বেশি মাত্রায় গরহাজির দেখে মহারাজ অ্যাটেনডেন্স রেজিস্টারের ব্যবস্থা করলেন| প্রেয়ার হলের ঠিক মুখে রেজিস্টার নিয়ে বসে থাকাটা হয়ত ভালো দেখাবে না, তাই ঠিক হয় অনিলদা আর কানাইদার ঘরে হাজিরা দিয়ে প্রেয়ার হলে যেতে হবে| প্রথম কদিন একটু বুঝে নিতে সময় লাগল আমাদের| হাজিরা দিয়ে গোমড়া মুখে, ঘুম চোখে প্রেয়ার হলে গিয়ে বসতে লাগলাম| কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই বোঝা গেল, হাজিরা দিয়ে এসে সটান ঘরে ফিরে ঘুমিয়ে পড়লে কেউই ধরতে পারবেন না| ধুতি পরে হাজিরা দিতে যেতে হতো| বাড়তি ঘুমের সময়টুকুর জন্য আমরা ধুতি পরেই শুতে যেতাম| এতে ভোরবেলায় খানিকটা সময় বাঁচত| আধ্যাত্মিক উন্নতির বদলে যারা তামসিক ঘুমকে এতটা গুরুত্ব দেয়, তাদের নিয়ে মহারাজ হতাশ হয়ে পড়েন কিছুদিন পর| অনিলদা – কানাইদার ঘরের হাজিরাও বন্ধ হয়ে যায় একসময়|

ছোট থেকে শুনতাম কলেজে প্রক্সি দেওয়ার ব্যাপারটা| বেশ মজা লাগত| কলেজে এক একটা ক্লাসে প্রায় পঁচাশি জন| জয়েন্ট ক্লাস হলে দেড়শোর ওপর| অধ্যাপকরা বেশির ভাগ ছাত্রদের নামে চিনতেন না| আমাদের মনে হল প্রক্সি দেওয়ার এমন সুবর্ণ সুযোগ ছাড়া ঠিক হবে না| পার্সেন্টেন্জও ঠিক থাকবে আর ওই সময় একঘেয়ে ক্লাসের হাত থেকে বেঁচে খানিকটা নিয়মভাঙার মজাও পাওয়া যাবে| একটা প্রক্সি টিম তৈরি হল| ঠিক করে দেওয়া হত কাকে কোনদিন ক্লাসে যেতেই হবে টিমের তরফে| যারা ক্লাস কাটতে চাইবে, সেদিনকার প্রক্সি টিমের ছেলেকে পিরিয়ড, নাম আর রোল নাম্বার দিয়ে দিতে হবে আগে থেকে| ভালোই চলছিল প্রক্সি টিমের কাজকর্ম| একদিন প্রক্সি টিমের অন ডিউটি ছাত্রের হাতে সাতটি রোল নম্বর এল| সে খেয়াল করে নি যে সাতটি নম্বরই পরপর ছিল| ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সে খুব গম্ভীর গলায় ‘ইয়েস স্যার’ বলা শুরু করে| ক্রমে গলা মিহি করতে হয়| সাত নম্বরে এসে তাকে প্রায় বামা-কন্ঠে ‘ইয়েস স্যার’ বলতে হয়| অধ্যাপক বলে ওঠেন — নরেন্দ্রপুর কলেজ তো বয়েজ কলেজ বলেই জানতাম| কবে যে কো-এড হয়ে গেল, বুঝতেই পারলাম না|

সিনেমা দেখতে গেলে একটা প্লাস্টিকের ব্যাগে একটা মানানসই বই নিয়ে যেত অনেকে| সেই ব্যাগ রাজপুরের রুম্পা হলের সিটে পেতে বসলে ছারপোকার কামড় থেকে বাঁচা যেত| আর প্রশ্নের মুখোমুখি হলে বলা যেত — একটু পুকুরপাড়ে খোলা হাওয়ায় বসে পড়াশোনা করে এলাম|

তখন এসপ্লানেডের সিনেমা হলে দাপিয়ে ইংরেজি ছবি চলত| নিউ এম্পায়ার, গ্লোব, লাইটহাউস, যমুনা| নরেন্দ্রপুর থেকে খানিকটা দূর পড়লেও, আকর্ষণটা ছিল অমোঘ| ক্লাস কেটে সারাদিনের মতো যাওয়ার অসুবিধে ছিল| একটা প্ল্যান ভাল চলত| কলেজ স্ট্রিট থেকে বই কিনতে যাওয়ার কথা বললে গেট-পাস পাওয়া যেত| আর সারাদিন বাইরে থাকার ছাড়| কিন্তু অসুবিধে একটাই — ফিরে আসার পর, কী বই কেনা হল, মহারাজ দেখতে চাইতে পারেন| তারও একটা সমাধান বের করা হয়| কলেজ স্ট্রিট থেকে একসঙ্গে অনেকগুলো বই কেনা হত| তার ভেতর গোটা দুই বই একটা ছোট ব্যাগে নিয়ে সটান চলে যাওয়া হত এসপ্লানেড| পাশাপাশি দুটো হলের টিকিট কাটা হত| পরপর দুটো শোয়ের– নুন আর ম্যাটিনি| নুন শোয়ের শেষে নিজাম থেকে চট করে খেয়ে নেওয়া যেত বিরিয়ানি আর কাবাব| অনেকের সিগারেটে ঠোঁটে খড়িও এই সময় — এস্প্লানেডেরই কোনও সিগারেটের দোকান থেকে| এইভাবে জনা তিন-চার বন্ধু বেশ ফুরফুরে একটা দিন কাটিয়ে, সন্ধ্যা পেরিয়ে ফিরে আসত নরেন্দ্রপুরে| তবে এত পরিকল্পনা বা খরচ তো সবসময় করা যেত না| যেমন ধরুন, রাজপুরের ‘রুম্পা’ য় ‘সাগর’ এসেছে| দেখা ছবি| কিন্তু সেই তারুণ্যের উষালগ্নে ডিম্পল কাপাডিয়াকে বারবার দেখেও আশ মিটত না| কখনও বা ইচ্ছে করত মেনগেটের বাইরে দিলীপের দোকানের পরোটা-আলুর দম খেতে| তখন ভরসা আড়াই বা সাড়ে তিন|

নরেন্দ্রপুরে আশ্রম জুড়ে বেশ কয়েকটা বড় গেট আছে| এক-একটা গেট , এক-একটা বাস স্টপ| বিরাট উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা আশ্রম| এই পাঁচিল ঘেঁষে অনেকটা জায়গায় ঘন ঝোপ-ঝাড়| তার পাশ দিয়ে পায়ে চলা শর্টকাট রাস্তা হয়ে গিয়েছিল| দুই আর তিন নম্বর গেটের মাঝামাঝি,পাঁচিলের একটা জায়গা খানিকটা নিচু ছিল কোনও কারণে| এই গলতার নামই ছিল আড়াই বা থ্রি পয়েন্ট ফাইভ| বাংলা আর ইংরেজিতে কেন যে এই নামের গরমিলটা ছিল, তা জানা যায় নি কোনওদিন | হুট্ করে ক্যাম্পাস থেকে বেরতে হলে এই আড়াই ছিল ভরসা| বেশ খানিকটা হ্যাঁচর-প্যাঁচোড় করে পাঁচিলের মাথায় উঠে ধুপ করে অন্যদিকে লাফিয়ে পড়তে হত| ল্যান্ড করার পর এক মুক্ত পৃথিবী — বাঁ দিকে রাজপুর| ডান দিকে কলকাতা| নরেন্দ্রপুর তখনও শহর কলকাতার বাইরে| আর তার ঠিক সামনেই শর্মাজী নামের এক বুদ্ধিমান ব্যক্তি এক ধাবা মতো খুলে বসলেন| একটা ছাউনির নিচে কয়েকটা চেয়ার টেবিল| আর বাইরে দুটো চৌকি| রুটি, ডিম আর প্লেন তড়কা, চিকেন আর মাটন কষা পাওয়া যেত| হোস্টেলের একঘেয়ে খাবার থেকে খানিক মুখ বদলাতে আড়াই টপকানোর হার খুব বেড়ে গেল| হঠাৎ দেখা গেল আড়াইয়ের দুটো ইঁট খসিয়ে দিয়েছে কে বা কারা| এতে টপকানো কাজটা আরও একটু সহজ হয়ে যায়| যতবার সারানো হত, ততবারই ইট খসিয়ে দেওয়া হতো| একসময় সারানোও বন্ধ হয়ে গেল| পাঁচিলের ফোকর দুটো বরাবরের জন্য রয়েই গেল|

আশ্রমে ঢোকার সময় মেনগেট দিয়েই ঢোকার রেওয়াজ ছিল| মহারাজদের সামনাসামনি পড়ে গেলে অবশ্য জুতসই গল্প খাড়া করতে হত| সিনেমা দেখতে গেলে একটা প্লাস্টিকের ব্যাগে একটা মানানসই বই নিয়ে যেত অনেকে| সেই ব্যাগ রাজপুরের রুম্পা হলের সিটে পেতে বসলে ছারপোকার কামড় থেকে বাঁচা যেত| আর প্রশ্নের মুখোমুখি হলে বলা যেত — একটু পুকুরপাড়ে খোলা হাওয়ায় বসে পড়াশোনা করে এলাম|

কলেজ স্ট্রিট থেকে বই কিনতে যাওয়ার কথা বললে গেট-পাস পাওয়া যেত| আর সারাদিন বাইরে থাকার ছাড়| কিন্তু অসুবিধে একটাই — ফিরে আসার পর, কী বই কেনা হল, মহারাজ দেখতে চাইতে পারেন| তারও একটা সমাধান বের করা হয়| কলেজ স্ট্রিট থেকে একসঙ্গে অনেকগুলো বই কেনা হত| তার ভেতর গোটা দুই বই একটা ছোট ব্যাগে নিয়ে সটান চলে যাওয়া হত এসপ্লানেড|

কলেজ জীবনের শেষ দিন| পরীক্ষা হয়ে গেছে| পরের দিন বাড়ি ফিরে যাওয়ার পালা| আমার বন্ধু কৌশিক গাঙ্গুলী (বর্তমানে বিখ্যাত চিত্রপরিচালক) আর আমি ঠিক করলাম শর্মাজীর ধাবাতে গিয়ে জমিয়ে খাব| আবার কবে আসা হবে ফিরে| কৌশিক পড়ত আর্টস বিভাগে, আমি সায়েন্স| ভিন্ন রুটের বাস ধরার পালা চৌরাস্তা থেকে| সেদিন আর পাঁচিল টপকানো নয়| মেনগেট দিয়েই বেরোলাম| রাত হয়ে গিয়েছিল বেশ| তাও দারোয়ান বলল না কিছু| অনেক স্বপ্ন নিয়ে নাড়াচাড়া করলাম দুজনে| রুটি আর ডিম-তড়কা খেতে খেতে| আশ্রমে ফিরে বললাম — চল, একবার মন্দিরে যাই| মন্দির বন্ধ হয়ে গেছে ততক্ষণে| দুজন মিলে মন্দির প্রদক্ষিণ করলাম সাতবার| তারপর ফিরে গেলাম যে যার হোস্টেলে| কলেজের অনেক রাতের ভেতর সেই রাতটা জেগে রয়েছে স্মৃতির ভেতর| নদীর ভেতর জেগে থাকা চরের মতো|

বহু বছর পর আমার এক বন্ধু — যার পড়াশোনার ট্র্যাক রেকর্ড তুলনাহীন — মাধ্যমিক, উচ্চ-মাধ্যমিকে প্রথম পাঁচে, IIT, IIM , মার্কিনি নামি কোম্পানির দামি চাকরি — তার সঙ্গে বসেছি বিলেতে আমার বাড়ির লনে| বিলেতি গ্রীষ্মের আলোছায়া মাখা গোধূলি| কয়েকটি পানীয়ের পর বন্ধু একটু আনমনা হয়ে বলেছিল — এত বছর তুই আর আমি মোটামুটি একই জায়গায়| আমি বা তুই কেউই নোবেল প্রাইজ পাব না| কর্পোরেট যাঁতাকলে পড়েই দিনগুলো কেটে যাবে| তুই জীবনের অনেকটা সময় নিজের মতো করে বেঁচেছিস| আমি শালা জীবনে কোনওদিন দমই ফেলতে পারলাম না| শুধু নিয়মই মেনে গেলাম……

Tags

শুভময় মিত্র
শুভময় মিত্র
শুভময় মিত্র আদতে ক্যামেরার লোক, কিন্তু ছবিও আঁকেন। লিখতে বললে একটু লেখেন। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে অনেকরকম খামখেয়ালিপনায় সময় নষ্ট করে মূল কাজে গাফিলতির অভিযোগে দুষ্ট হন। বাড়িতে ওয়াইন তৈরি করা, মিনিয়েচার রেলগাড়ি নিয়ে খেলা করা, বিজাতীয় খাদ্য নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করা ওঁর বাতিক। একদা পাহাড়ে, সমুদ্রে, যত্রতত্র ঘুরে বেড়াতেন। এখন দৌড় বোলপুর পর্যন্ত।

4 Responses

  1. দারুন লিখেছিস! পাঞ্চো, তোদের ভবনের সেই বিখ্যাত তাস খেলা আর তারপর ধরা পড়ে একজনের ব্রহ্মচারীকে বলা- “চুপ! আমি তোমার চেয়ে লম্বা মানে তোমার চেয়ে বড়!” লিখলি না!🤣

Please share your feedback

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shahar : Body Movements vis-a-vis Theatre (Directed by Peddro Sudipto Kundu) Soumitra Chatterjee Session-Episode-4 Soumitra Chatterjee Session-Episode-2 স্মরণ- ২২শে শ্রাবণ Tribe Artspace presents Collage Exhibition by Sanjay Roy Chowdhury ITI LAABANYA Tibetan Folktales Jonaki Jogen পরমা বন্দ্যোপাধ্যায়

SUBSCRIBE TO NEWSLETTER