Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

বন্ধুত্বের রং বদল

সংকেত ধর

মার্চ ২৩, ২০২৬

Color Change Of Friendship
Bookmark (0)
Please login to bookmark Close
(Color Change Of Friendship)

‘কিন্তু সেটিই শেষ কথা নয়। সেটি ট্র্যাজেডিও নয়। সে মহৎ কিছু করছে না, তার দারিদ্র যাচ্ছে না, তার অভাব মিটছে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও সে জীবন বিমুখ হচ্ছে না! সে পালাচ্ছে না, এস্কেপ করছে না, সে বাচঁতে চাইছে! সে বলছে বাচাঁর মধ্যেই সার্থকতা, তার মধ্যেই আনন্দ। He wants to live…’

‘অপুর সংসার’-এর ঐতিহাসিক এই সংলাপটি প্রণব বা পুলুকে বলছিল অপু। অনিল আর প্রণব ছাড়া কলেজ লাইফে তার কাছের বন্ধু ছিল না কেউ। অপুর সংলাপ মনে থাকলেও, সেই পুলুকে হয়তো বহু বাঙালিরই আর মনে নেই। অপুর নানা কাজে সায় দিয়েছে সে। গভীর‌ রাতে রাজপথে হাঁটতে হাঁটতে বন্ধুর জীবনদর্শন শুনেছে। বন্ধুত্বে নিহিত ভালবাসার দায়ও বারবার স্বীকার করেছে। অপুও তেমন স্বীকার করেছে অপর্ণাকে রক্ষার দায়। পুলুরই তো মামাতো বোন ছিল অপর্ণা। বন্ধুর বোনের বিয়েতে হইহুল্লোড় আর ছুটি কাটানোর ইচ্ছে নিয়ে পুলুর মামার বাড়ি গিয়েছিল অপু। কিন্তু সেখানে গিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হবে, তা কি আর ভেবেছিল? 


আরও পড়ুন: নহি যন্ত্র, মোরা AI


বিভূতিভূষণ লিখছেন— ‘আকাশ থেকে পড়িলেও অপু এত অবাক হইত না।’ অপর্ণাকে দেখে অপুর ভাল লেগেছিল ঠিকই। মনে পড়ে গিয়েছিল একটা ইংরেজি উপন্যাসের লাইন— ‘Do they breed goddesses in slocum magna?’। কিন্তু বিয়ের কথা সে দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি। শেষমেশ বন্ধুত্বের বন্ধনই যেন অপুকে সংসারে বাঁধল। পুলু না থাকলে বুঝি দেখা হত না অপর্ণার ‘অনুশোচনা’ কাটিয়ে ওঠার মধুরতম দৃশ্য। দেখা হত না একটা ঘর আর একটা ব্যালকনির দাম্পত্য। সর্বোপরি আমাদের দেখা হত না কাজলের সঙ্গেও; যে শুধু অপুর নয়, গোটা ট্রিলজির উত্তরাধিকার।

অপু-পুলুর থেকেও বেশিক্ষণ রাজপথে হেঁটেছিলেন সুনীল-শক্তি-শরৎ-সন্দীপন। কলকাতার রাত্রিশাসক। 

কৃত্তিবাসের পাতায় জন্মানো বন্ধুত্ব বাংলা সাহিত্যের খনি হয়ে উঠেছিল

কৃত্তিবাসের পাতায় জন্মানো বন্ধুত্ব বাংলা সাহিত্যের খনি হয়ে উঠেছিল। একের পর এক অসামান্য লেখকদের পেয়েছিল সেই সময়ের বঙ্গদেশ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বন্ধুত্ব একইরকম থাকেনি। কৃত্তিবাস বন্ধ হল। ছড়িয়েছিটিয়ে গেল সবাই। সময়ের ব্যস্ততা কেড়ে নিল অনেকগুলো আড্ডা আর বিকেল। 

কিছুটা অভিমান করেই ‘আমাদের সামান্য কথা’য় শক্তি লিখেছিলেন, ‘শহরের উত্তর দিকটায় আমরা কেউ রাজনীতি ছেড়ে, কেউ ইস্কুল-কলেজ ঘুচিয়ে, কেউ মধ্যমগ্রাম ত্যাগ করে ‘কৃত্তিবাস’ পতাকার নিচে এসে দাঁড়ালুম। যে যেমনটা লিখতে পারে, পদ্যে যতদূর পরীক্ষা করতে সাহস পায়— তাদের জন্যে ‘কৃত্তিবাস’।… আমরা বুড়ো হয়েছি। আমার মাথায় একরাশ কালো-পাকা চুল, সুনীলের হাতের লোম, বুকের চুল শাদা। শরৎ দিল্লিতে বাড়ি বদলে স্ত্রীপুত্র ছাড়া নির্বান্ধব হাউস-খাসে, উৎপল বিলেতে– অনেকে কলকাতায় থেকেও একার সিংহাসনে। সমরেন্দ্র, প্রণব, মোহিত, শঙ্কর, তারাপদ, কবিতা, আনন্দ, সুধেন্দু প্রভৃতির সঙ্গে কালেভদ্রে দেখা হয়।’ শক্তিজায়া  মীনাক্ষী চট্টোপাধ্যায় তাই লেখেন, ‘একা হয়ে যাওয়ায় শক্তির প্রবল আপত্তি ছিল। যে বাড়ি না ফিরে, ক্ষণে ক্ষণে বন্ধুর বাড়ি চলে যায়, তার কি একা থাকা মানায়?’

গুপীর গান শুনলেই পালিয়ে যাচ্ছে তার বাবার দোকানের খদ্দের। মাঠ থেকে গরুরা দড়ি ছিঁড়ে পালাচ্ছে। গান গাওয়ার জন্যই তো গুপীকে তাড়িয়ে দিল গোটা গ্রাম। বাঘারও একই হাল হল। হাতে মিষ্টির হাঁড়ি ধরিয়ে মিষ্টি কথায় বিদায় করল গ্রামবাসীরা। বনের ভিতর ভাগ্যিস তাদের দেখা হল।

যোগাযোগ কমলেও কিছু বন্ধুত্ব হারিয়ে ফেলা দুরূহ। একরাশ সাফল্যের পাশাপাশি অনেক ব্যর্থ স্বপ্ন নিয়েও শেষমেশ বেঁচে থাকে সেই সব বন্ধুত্বগুলো। বেঁচে থাকে বলেই শক্তির প্রয়াণের পর সুনীল লেখেন, ‘…সমস্ত শব্দের মাত্রা ও ছন্দ হঠাৎ হারিয়ে যায়, সাদা পৃষ্ঠা জ্বলজ্বল করে/ শক্তি নেই, কবেকার সেই দুজনে মিলে লেখা লেখার খেলা হঠাৎ শেষ হয়ে গেল…’

বন্ধুত্ব কখনও এভাবেই বাউন্ডুলে করে, কখনও আবার বেঁধে ফেলে জীবনে। যেমন বেঁধেছিল গুপী আর বাঘাকে। গ্রামে থাকতে কীই বা জীবন ছিল গুপীর? গুপীর গান শুনলেই পালিয়ে যাচ্ছে তার বাবার দোকানের খদ্দের। মাঠ থেকে গরুরা দড়ি ছিঁড়ে পালাচ্ছে। গান গাওয়ার জন্যই তো গুপীকে তাড়িয়ে দিল গোটা গ্রাম। বাঘারও একই হাল হল। হাতে মিষ্টির হাঁড়ি ধরিয়ে মিষ্টি কথায় বিদায় করল গ্রামবাসীরা। 

শুধু গুপীর গান বা বাঘার ঢোল শুনলে কি ভূতেরা খুশি হত? নাকি ঠিকমতো জমত ভূতুড়ে রাজপুত্রের বিয়ে?

বনের ভিতর ভাগ্যিস তাদের দেখা হল। দেখা হল বলেই তো ভূতেরা তাদের যুগলবন্দী শোনার সুযোগ পেল। সে যুগলবন্দী ভাল লাগল ভূতেদের। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী আমাদের জানালেন, গুপী-বাঘাকে একসঙ্গে বায়না করে নিয়ে গিয়েছিল ভূতের দল। নিয়ে গিয়েছিল ভূতের রাজার ছেলের বিয়েতে। শুধু গুপীর গান বা বাঘার ঢোল শুনলে কি ভূতেরা খুশি হত? নাকি ঠিকমতো জমত ভূতুড়ে রাজপুত্রের বিয়ে?

রাজার ছেলের বিয়েতে যেমন শুধু গান বা শুধু ঢোলের বাদ্যি শুনতে ভাল লাগে না, তেমনই পড়তে ভাল লাগে না একা অজিতের গল্প। বাবার ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স বিপুল বলে তার ইচ্ছে, বাকি জীবনটাও সাহিত্য করে কাটিয়ে দেবে। বিয়ের চক্করে না পড়ে, তাই চিনেবাজারে মেস ভাড়া করে একাই থাকছিল। মেসে থাকতে থাকতেই একদিন অতুলচন্দ্র মিত্রের সঙ্গে আলাপ। যুবকটি এসেছিল ঘর খুঁজতে, কিন্তু মেসের সব ঘর ভর্তি তখন। মেস মালিক ডাক্তারবাবু ভাগিয়েই দিচ্ছিলেন। শেষ মুহূর্তে অজিত অতুলকে নিজের ঘরে থাকতে দিল। সেদিন তার সঙ্গে রুম শেয়ার না করলে, আজীবন এত গল্পের জোগান কি পেত অজিত? অতুল মিত্রই সেই পাড়ার খুনগুলোর সমাধান করল। পরে জানা গেল, ওসব অতুল-ফতুল ভুয়ো নাম, যুবকটির আসল নাম ব্যোমকেশ বক্সী। ওরফে সত্যান্বেষী।

শঙ্কর আর আলভারেজ বন্ধু না হলে, আমাদের বোধহয় চাঁদের পাহাড় দেখা হত না। আলভারেজকে শঙ্কর বাবার মতো শ্রদ্ধা করত। আলভারেজও তাকে সন্তানের মতো স্নেহ করত। কিন্তু দুজনের মধ্যে অজান্তেই গড়ে উঠেছিল অসমবয়সি বন্ধুত্ব।

আচমকা বন্ধুত্ব যেমন অপরাধজগতে নিয়ে গিয়ে ফেলতে পারে, তেমনই ফেলে দিতে পারে গভীর অনিশ্চয়তায়। ঠিক যেভাবে পড়ে গিয়েছিল শঙ্কর। সেদিন বেলা তিনটের সময় মাছ ধরে ফিরছিল সে। কড়া রোদের মধ্যে হঠাৎ কানে এল অস্ফুট কণ্ঠস্বর। আওয়াজ লক্ষ করে কিছুটা এগিয়ে যেতেই দেখল, ইউকা গাছের নিচে বসে আছে একজন ইউরোপিয়ান। পরে সেই লোকটা গল্প শোনাল এক অদ্ভুত গুপ্তধনের। যে গুপ্তধন লুকিয়ে আছে রিখটার্সভেল্ড পর্বতমালার কোনও এক নদীর গুহায়। আলভারেজকে সেদিন স্টেশন ঘরে এনে সুশ্রুষা করল সে। তারপর বেরিয়ে পড়ল এক ‘ভয়ঙ্কর সুন্দর’ অ্যাডভেঞ্চারের টানে।

শঙ্কর আর আলভারেজ বন্ধু না হলে, আমাদের বোধহয় চাঁদের পাহাড় দেখা হত না। আলভারেজকে শঙ্কর বাবার মতো শ্রদ্ধা করত। আলভারেজও তাকে সন্তানের মতো স্নেহ করত। কিন্তু দুজনের মধ্যে অজান্তেই গড়ে উঠেছিল অসমবয়সি বন্ধুত্ব। তাই তো আলভারেজের মৃত্যুর পর বিভূতিভূষণ লিখলেন, ‘ওঃ সে কি ভীষণ রাত্রি! যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন এ রাত্রির কথা সে ভুলবে না।…সম্মুখে বন্ধুর মৃতদেহ। ভয় পেলে চলবে না। সাহস আনতেই হবে মনে।’

এক সময়ের নিন্দাবিদ্ধ কবির ঢাল হয়ে উঠলেন বুদ্ধদেব বসু

বন্ধু বলতে যখন সত্যিই কেউ থাকে না, তখন একা লাগে বৈকি। ভয়ও হয়‌। সেই ভয়, আশঙ্কা, অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা থেকেই কি জীবনানন্দ দাশ লিখে ফেলেছিলেন ‘সফলতা নিষ্ফলতা’? নিখিল ও বাণেশ্বরের মোড়কে টেনে এনেছিলেন নিজের ও বুদ্ধদেব বসুর ভিতরকার টানাপোড়েন? জীবনানন্দ তখন শুধুই নিন্দা ও সমালোচনার শিকার। পাঠক, সাহিত্যিক কেউই ছাড়ছে না তাঁকে। তার মধ্যেই কল্লোল পত্রিকায় ‘নীলিমা’ কবিতাটা পড়ে, তরুণ বুদ্ধদেব ছুটে গেলেন অগ্রজ কবির সঙ্গে আলাপ করতে। 

বুদ্ধদেব বসুর ‘প্রগতি’ ও ‘কবিতা’ পত্রিকায় তারপরই একে একে প্রকাশিত হতে থাকল জীবনানন্দ দাশের দুর্ধর্ষ সব কবিতা। অগ্রজ কবির সাহিত্যচর্চায় অনুজ কবির বন্ধুসম উপস্থিতি খোলনলচে বদলে দিল বাংলা কবিতার। এক সময়ের নিন্দাবিদ্ধ কবির ঢাল হয়ে উঠলেন বুদ্ধদেব বসু। আজ জীবনানন্দ দাশ বাংলা কবিতার জগতে ঈশ্বরসম। কিন্তু তাঁরই ‘সফলতা নিষ্ফলতা’ উপন্যাস কেন এই অনুজ কবির পাশে থাকাকে অস্বীকার করতে চাইল? নিখিলের আড়ালে জীবনানন্দ সত্যিই কি বাণেশ্বররূপী বুদ্ধদেবকে ঠুকলেন নানাভাবে? 

বন্ধুত্বের অভাব যেমন শূন্যতা ঘিরে ধরে, তেমনই কখনও কখনও ঘিরে ধরতে পারে একরাশ অস্বস্তি। বেকারত্বের জ্বালায় দুই বন্ধুর একজন তাই বাসস্ট্যান্ডের বাউন্ডুলে হয়, অন্যজন হয় বড়বাজারের দালাল। গাড়িতে পাশে বসে থাকা মেয়েটির পরিচয় জেনে কুঁকড়়ে যায় সোমনাথ। পাপবোধের উপর যেন বিছিয়ে দেওয়া হল আরও কিছুটা অস্বস্তি বা গ্লানি।

কেতকী কুশারী ডাইসন অবশ্য উপন্যাসটির সম্পাদক ভূমেন্দ্র গুহর এই ‘দাবি’ মানতে নারাজ। ‘তিসিডোর’-এ কেতকী লিখলেন, বাণেশ্বরকে বুদ্ধদেব বসু বলে দেখানোর ব্যাপারে ভূমেন্দ্র গুহ মাত্রাতিরিক্ত জোরারোপ করেছেন। এই দাবি যথোপযুক্ত নয়। এসব তর্কবিতর্ক পেরিয়েও অবশ্য জীবনানন্দ দাশের জীবনে বন্ধুহীন অধ্যায়টা প্রকটই থেকে যায়। যে সময়টা তাঁর কলেজের চাকরি গেল, ভাইয়ের টাকাতেই প্রতিটা দিন গুজরান হল, লেখার জন্য পাঠক ও সাহিত্যিক মহল থেকে ধেয়ে এল তাচ্ছিল্য, যে কর্মহীন দীর্ঘ পাঁচ বছরে মাত্র একটি কবিতা লিখলেন, সে সময়টা কি ভীষণভাবে মনের মতো কোনও বন্ধু খুঁজছিলেন কবি?

বন্ধুত্বের অভাব যেমন শূন্যতা ঘিরে ধরে, তেমনই কখনও কখনও ঘিরে ধরতে পারে একরাশ অস্বস্তি। বেকারত্বের জ্বালায় দুই বন্ধুর একজন তাই বাসস্ট্যান্ডের বাউন্ডুলে হয়, অন্যজন হয় বড়বাজারের দালাল। গাড়িতে পাশে বসে থাকা মেয়েটির পরিচয় জেনে কুঁকড়়ে যায় সোমনাথ। তার ডিল ফাইনাল করতে নারীশরীরের ভেট পরিবেশনের দায়িত্ব নিয়েছিল সুকুমারের বোন। পাপবোধের উপর যেন বিছিয়ে দেওয়া হল আরও কিছুটা অস্বস্তি বা গ্লানি।

প্রকাশকের ঘর থেকে ঠিকমতো টাকা পেলে ৪৮ বছরেই বোধহয় দাঁড়ি টানত না তাঁর কলম

মানুষ যদি রং বদলাতে পারে, তবে কেন নয়? রং বদলানো বন্ধুরা তাই আগেও ছিল, আজও আছে। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময় বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরেই তো ‘অতসীমামী’ গল্পটা লিখলেন কিংবদন্তি সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। তারপরেই তাঁর জয়যাত্রা শুরু। ওই গল্পটা না লিখলে বাংলা সাহিত্যের ভীষণ ক্ষতি হত। কিন্তু গল্পটা লিখে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কি খুব লাভ হল? পড়াশোনা লাটে তুলে, চাকরিবাকরি না করে, তাঁর ফুল টাইম সাহিত্যপ্রেম কী দিল তাঁকে? মৃগী রোগ, মানসিক অসুস্থতা, অসুস্থ বাবা, অনাহার, দারিদ্র্য, আধপেটা জীবন, মদ-বিড়ির নেশা, জোড়াতালি দেওয়া খাট আর বস্তির ঘর ছাড়া আর কী পেলেন তিনি? বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা, সম্মান ইত্যাদি প্রভৃতি অনেক কিছুই হয়তো পেলেন। কিন্তু, প্রকাশকের ঘর থেকে ঠিকমতো টাকা পেলে ৪৮ বছরেই বোধহয় দাঁড়ি টানত না তাঁর কলম।

মনেপ্রাণে কমিউনিস্ট হলেও দল থেকে আশানুরূপ আর্থিক সাহায্য পাননি। সরকারের থেকে সাহায্য নিতে চাননি। নিজের প্রকাশকদের কাছে বারবার প্রতারিত হয়েছেন। রোগে ভরা শরীর নিয়ে তারপরেও লিখে গিয়েছেন একের পর এক কালজয়ী সাহিত্য। এমনই কালজয়ী যে, মৃত্যুর পর একটা লরিতে ধরল না শ্রদ্ধার্পিত ফুল। দরকার পড়ল আরেকটা লরির। সেই প্রথম বোধহয় খাটের বদলে পালঙ্কে শুয়েছিলেন মানিক। মরদেহের উপর রাখা ফুলের ভারে চিড় ধরে গিয়েছিল পালঙ্কের একটি পায়ায়। অথচ আগের দিন হাসপাতাল নিয়ে যাওয়ার জন্য একটা ভাল অ্যাম্বুলেন্সও জোটেনি তাঁর। 

শ্রেণির তফাত নিষ্পাপ ছোট্ট শিশুদেরও বন্ধু হতে দেয় না। ‘টু’-তে বড়লোক ছেলেটি তাই গরিব ঘরের ছেলেটির খেলা নষ্ট করেই সুখ পায়। ওটাই তার খেলা, বা বন্ধুত্বের ধরন! বাঁশির সুর ঢাকা পড়ে যায় খেলনা ট্রাম্পেটের বেসুরে। এয়ার গানের তাকে মরে যায় ফুরফুরে ঘুড়িটা।

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় অনুযোগ করেছিলেন, ‘বৌদি এমন অবস্থা, আগে টেলিফোন করেননি কেন?’ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ত্রী কমলা দেবীর উত্তর ছিল, ‘তাতে যে পাঁচ আনা পয়সা লাগে ভাই।’ মৃত্যুর পর এত ফুল কেনা গেল। অথচ মৃত্যুর আগে, সেদিন পাঁচ আনা পয়সা  দেওয়ার মতো একজনও ছিল না। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতাটা তাই ‘বন্ধু’দের উদ্দেশ্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বগতোক্তি বলেও ধরে নেওয়া যায়— ‘ফুলগুলো সরিয়ে নাও,/ আমার লাগছে/ মালা জমে জমে পাহাড় হয়/ ফুল জমতে জমতে পাথর।’ পাথুরে বন্ধুত্ব সরিয়ে নেওয়াই ভাল।

পৃথিবীতে সবাই সবার বন্ধু হতে পারে। চাইলেই সম্ভব। কিন্তু বাধা প্রচুর! যেমন শ্রেণির তফাত নিষ্পাপ ছোট্ট শিশুদেরও বন্ধু হতে দেয় না। ‘টু’-তে বড়লোক ছেলেটি তাই গরিব ঘরের ছেলেটির খেলা নষ্ট করেই সুখ পায়। ওটাই তার খেলা, বা বন্ধুত্বের ধরন! বাঁশির সুর ঢাকা পড়ে যায় খেলনা ট্রাম্পেটের বেসুরে। এয়ার গানের তাকে মরে যায় ফুরফুরে ঘুড়িটা। শ্রেণির তফাতের কারণেই বন্ধুত্বটা শেষমেশ বন্ধুত্ব থাকে না অপু-দুর্গা আর সতু-রাণুর মধ্যে। দুর্গা আম কুড়োতে গেলে খেঁকিয়ে ওঠে সতু। রাণু প্রতিবাদ করলেও, দুর্গাকে তাড়াতে তার একটুও বাঁধে না। ‘দেবযান’-এ যতীনের মতো দুর্গাকেও যদি পুষ্প স্বর্গের আমবাগানটা দেখিয়ে দিত, বেশ হত!

Color Change Of Friendship
অজ্ঞাতনামা প্রিয়তম বন্ধুর উদ্দেশ্যে লিখে চলেছেন একের পর এক গান

কত বিপরীত স্বভাবের মানুষদেরও বন্ধু হয়ে উঠতে দেখা যায়। ‘গোরা’ আর বিনয় যেমন আদর্শে ভিন্ন হলেও একই পথের পথিক হয়। শ্রীবিলাসের বন্ধু্প্রীতি শচীশকে উৎসাহ জোগায় ‘চতুরঙ্গ’-এ। সম্পর্কের দুরূহ জটিলতা এড়িয়েও ‘চোখের বালি’তে মহেন্দ্রর সঙ্গে বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখে বিহারী। খেলার মাঠে ইন্দ্রনাথ না থাকলে শ্রীকান্তকে কেই বা বাঁচাত? অন্নদাদিদির বিদায়ের পর সেই ইন্দ্রনাথও বিদায় নেয় অচিরে। শ্রীকান্তর কি মনে পড়ে ইন্দ্রনাথকে? বিপরীত স্বভাবের বন্ধু সবসময় পাশে থাকে, তা নয়। কখনও কখনও উপহার দেয় চরম শত্রুতাও। উদারতার সুযোগ নিয়ে তাই নিখিলেশের ‘ঘরে-বাইরে’ সর্বত্র ক্ষতি করে সন্দীপ। 

সমাজের ক্রুরতায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে বন্ধুর মাথায় লাঙল বসিয়েছিল গফুর। জানতে ইচ্ছে করে, ফুলবেড়ের চটকলে যাওয়ার পর মহেশের মতো আর কেউ কি তার বন্ধু হল? খুব অল্প সময়ের  আলাপেও সুতা-মজুর আর মাঝি যেন বন্ধু হয়ে উঠেছিল ‘আদাব’-এ। আরেকটিবার মাঝিকে যদি বারণ করত সুতা-মজুর, পরের দিন ঈদ পরব কি খুশির হত না? কিশোর বা সুবলের কেউ একজন সেই রাতে জেগে পাহারা দিলে, কিশোর বোধহয় পাগল হত না। তিতাসের বুকে অন্যদের সঙ্গে মাছ ধরতে গিয়ে প্রাণ হারাত না সুবলও। স্কুলছুট বয়স থেকে সে যে কিশোরের সঙ্গেই মাছ ধরেছে বরাবর।

কিছু বন্ধুত্বের গভীর রং ফিকে হয়ে যায় একটা বয়সে পৌঁছে। আবার, কিছু বন্ধুত্বের ফিকে রং গভীর হয়ে ওঠে তখন। ছিন্নপত্রের তৃতীয় চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ সকৌতুকে সাক্ষাৎ প্রার্থনা করছেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বন্ধু শ্রীশচন্দ্র মজুমদারের। আবার সেই তিনিই অজ্ঞাতনামা প্রিয়তম বন্ধুর উদ্দেশ্যে লিখে চলেছেন একের পর এক গান।

কিছু বন্ধুত্বের গভীর রং ফিকে হয়ে যায় একটা বয়সে পৌঁছে। আবার, কিছু বন্ধুত্বের ফিকে রং গভীর হয়ে ওঠে তখন। ছিন্নপত্রের তৃতীয় চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ সকৌতুকে সাক্ষাৎ প্রার্থনা করছেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বন্ধু শ্রীশচন্দ্র মজুমদারের। আবার সেই তিনিই অজ্ঞাতনামা প্রিয়তম বন্ধুর উদ্দেশ্যে লিখে চলেছেন একের পর এক গান। জীবনের শেষ দিন  পর্যন্ত। সেই গানে আজ বাঙালিও তার বন্ধু খুঁজে পায়। রক্তমাংসের বন্ধু না হলেও, বাঙালি ফিরে পায় বন্ধুত্ব, কাঙ্খিত অনির্বাণ বন্ধুসুখ।

তথ্যসূত্র:

জীবনানন্দ দাশ-এর স্মরণে (পুনর্পাঠ) – বুদ্ধদেব বসু

সফলতা নিষ্ফলতা: বুদ্ধদেব-জীবনানন্দ সম্পর্কের বাস্তব আখ্যান? – বিদিশা বিশ্বাস

একা বিমর্ষ, অনর্গল বন্ধুরাই শক্তির বেঁচে থাকার শক্তি – মীনাক্ষী চট্টোপাধ্যায়

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু, ‘সব মরণ নয় সমান’ – সুকল্প চট্টোপাধ্যায়

মহেশ, শ্রীকান্ত – শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসসমূহ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাসসমূহ ও ছিন্নপত্র

সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা ও শর্টফিল্ম

শক্তি – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, পাথরের ফুল – সুভাষ মুখোপাধ্যায়, আদাব – সমরেশ বসু, জন অরণ্য – শঙ্কর, গুপী গাইন বাঘা বাইন – উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, তিতাস একটি নদীর নাম – অদ্বৈত মল্লবর্মণ

মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Author Sanket Dhar

বইয়ের প্রতি অগাধ ভালবাসা। প্রিয় ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও প্রিয় বিষয় বাংলার আঞ্চলিক সংস্কৃতি। সাধারণ নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষদের জীবনধারা হয়ে উঠেছে আগ্রহের কেন্দ্র। হিন্দুস্থান টাইমস বাংলা ও এবিপি আনন্দে জীবনযাপন ও স্বাস্থ্য বিভাগের সাংবাদিক ছিলেন। পড়াশোনা অর্থনীতি নিয়ে।

Picture of সংকেত ধর

সংকেত ধর

বইয়ের প্রতি অগাধ ভালবাসা। প্রিয় ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও প্রিয় বিষয় বাংলার আঞ্চলিক সংস্কৃতি। সাধারণ নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষদের জীবনধারা হয়ে উঠেছে আগ্রহের কেন্দ্র। হিন্দুস্থান টাইমস বাংলা ও এবিপি আনন্দে জীবনযাপন ও স্বাস্থ্য বিভাগের সাংবাদিক ছিলেন। পড়াশোনা অর্থনীতি নিয়ে।
Picture of সংকেত ধর

সংকেত ধর

বইয়ের প্রতি অগাধ ভালবাসা। প্রিয় ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও প্রিয় বিষয় বাংলার আঞ্চলিক সংস্কৃতি। সাধারণ নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষদের জীবনধারা হয়ে উঠেছে আগ্রহের কেন্দ্র। হিন্দুস্থান টাইমস বাংলা ও এবিপি আনন্দে জীবনযাপন ও স্বাস্থ্য বিভাগের সাংবাদিক ছিলেন। পড়াশোনা অর্থনীতি নিয়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Subscribe To Newsletter

কথাসাহিত্য

বিতস্তা ঘোষাল
জীবনানন্দ দাশ

সংস্কৃতি

আহার

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়
অমৃতা ভট্টাচার্য
শ্রুতি গঙ্গোপাধ্যায়

বিহার

সুমিত্রা দেবনাথ
কাকলি মজুমদার
মধুছন্দা মিত্র ঘোষ

কলমকারী

প্রেমেন্দু বিকাশ চাকী
অরিজিৎ মৈত্র
অনির্বাণ ভট্টাচার্য

ফোটো স্টোরি

নির্মাল্য চ্যাটার্জি
দেবার্চন চ্যাটার্জি

উপন্যাস

[adning id="384325"]
[adning id="384325"]

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.
  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.
  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.
  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).
  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

 

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com