(Dhakir Chhele)
‘ঢাকির ছেলে কাঁসি বাজাবে না তো কি কেষ্টঠাকুরের মতো বাঁশি বাজাবে? যা বলচি তাই করো, সাতে করে নে যাও।’
সহদেব বলার চেষ্টা করেছিল ‘একোনো হাতে বোল ফুটিনি। এ বচরটা থাক, সামনের বচর নে যাবো’। তাতে লাভ তো হয়নি, উল্টে মানিকের পিঠে ঘা কতক কিল চড় পড়েছিল, ‘ও বুজিচি। ছেলেরে বাদ দে ভাইপোরে নে যাবা। বাবুদের কমপেস না কি! সেকেনের বালো মন্দ সব ওই গুল্লুরে খাওয়াবা, ইদিকে আমার মানিক পুজো-গন্ডার দিনি কলমি শাগ সেদ্দ দিয়ে রেশনের চালের ভাত খাবে! ঠিক ধরি ফেলিচি তুমার মতলব।’
সহদেব ঢাকির ছেলে মানিক ওদের পাড়ার ছেলেদের থেকে একটু আলাদা। পাঁচ বছর বয়সে ওদের পাড়ার ছেলেমেয়েরা খিচুড়ি স্কুলে যায় ঠিকই, কিন্তু ওই পর্যন্ত। বই-পত্তর খুললেও অক্ষরের বদলে চোখ থাকে গোটা গোটা ডিমের দিকে। মানিক ওদের থেকে একটু দূরে বসে স্লেট-পেন্সিল দিয়ে হাতের লেখা মকশো করে, নিজের নাম, বাবার নাম, ঠিকানা সবই লিখতে পারে। ওর আগ্রহ দেখে শিখা দিদিমণি খুব খুশি। স্কুল ছুটি হয়ে গেলেও আরও কিছুক্ষণ ওকে পড়ায়।
দিদিমণি একদিন সহদেবকে ডেকে বলেছেন, ‘মানিকের পড়াশোনায় খুব মাথা। ওকে একটু যত্নে রেখো, দেখবে তোমার মুখ উজ্জ্বল করবে।’ কথাটা সহদেবের খুব মনে ধরেছে, তাই ঠিক করেছে মানিককে পুজোয় কাঁসি বাজাতে নিয়ে যাবে না। তাছাড়া ওই টুকুন ছেলে! ও কি দুর্গাপুজোর মতো অত বড় পুজোর ঝক্কি সামলাতে পারে? ভাইপোটা বড় হয়েছে, ও পারবে। কিন্তু সে কথা মেনকাকে বোঝাবে কে? তার যত উল্টোপাল্টা কথা!

শেষমেশ মেনকার কথাই শুনতে হল। মানিক ওর মাকে খুব ভয় পায়। চুপিচুপি বাবাকে বলল, তুমি বাবুদের ফোন করে বলো, আমি বায়না করছি। দেখো বাবুরা ঠিক রাজি হবে। তুমার পাতের থেকে একমুঠো ভাত দিও বাবা, আমার পেট ভরে যাবে।
মহাদেব কমপ্লেক্সের বাবুরা খুব ভাল। বোসবাবু বললেন, বাচ্চা ছেলে আসতে চাইছে যখন নিয়ে এসো। মেনকা খুব খুশি, বাক্স খুলে মানিককে পরিস্কার জামা পরিয়ে, কপালে কাজলের টিপ পরিয়ে দিল। মানিক জামা প্যান্টের সঙ্গে বই-খাতা নিতে ভোলেনি। সময় পেলে পড়বে, স্কুল খুললে দিদিমণি পরীক্ষা নেবে। মেনকা ভাল করে গুল্লুকে বলে দিল, ‘মাঝে মাঝে ভাইকে কাঁসি বাজাতে দিবি, ওকে তো শিখতে হবে! যা খাবি মানিককে দিয়ে খাবি।’
আসলে সহদেব মানুষটা ভাল, দুই ভাই নকুল আর সহদেব মাকে নিয়ে শান্তিতেই ছিল। কিন্তু, মেনকার খুব মুখ, তাই নকুল মাকে নিয়ে আলাদা থাকে। তবে মায়ের খুব খেয়াল রাখে সহদেব।
গুল্লু খুব সরল সোজা ছেলে, কাকির সব কথায় ঘাড় নাড়ল। পড়া মাথায় না ঢুকলেও ভাইয়ের হাত ধরে খিচুড়ি স্কুলে নিয়ে যায়। আসলে সহদেব মানুষটা ভাল, দুই ভাই নকুল আর সহদেব মাকে নিয়ে শান্তিতেই ছিল। কিন্তু, মেনকার খুব মুখ, তাই নকুল মাকে নিয়ে আলাদা থাকে। তবে মায়ের খুব খেয়াল রাখে সহদেব। মায়ের জন্য সুযোগ পেলেই কিছু না কিছু আনে। গুল্লু আর মানিককে আলাদা চোখে দেখে না সহদেব।
প্রথমবার রেলগাড়িতে চেপে মানিকের আনন্দ আর ধরে না। তবে, ট্রেনের দুলুনিতে কিছুক্ষণ পরেই ঘুমিয়ে কাদা। ঘুম ভাঙল সেই দমদম গিয়ে। সেখান থেকে আবার গাড়িতে উঠে বিরাটি স্টেশনে নামল। অনেকটা রাস্তা, তাও গুল্লু আর মানিককে নিয়ে হাঁটতে শুরু করল সহদেব। হাঁটা ছাড়া উপায়ই বা কী! অটোতে ঢাক নিয়ে ওঠা যাবে না আর খরচও অনেক। বুঝতে পারছে ছেলে, ভাইপো দু’জনেরই খুব কষ্ট হচ্ছে। যদিও, গ্রামের ছেলে ওরা, হাঁটা অভ্যেস আছে। কিন্তু, শহরের রাস্তায় গাড়ি-ঘোড়া, মানুষজনের ভিড়, তার উপর ভাঙা খোয়া ওঠা রাস্তা! যখন মহাদেব কমপ্লেক্সে পৌঁছল ছেলে দুটো, খিদে-তেষ্টায়-পরিশ্রমে একেবারে নেতিয়ে পড়েছে।
বোসবাবু খুবই ভাল মানুষ, ওদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। মানিককে দেখে বললেন, ‘করেছ কী সহদেব? এত্তটুকুনি ছেলেকে কেউ হাঁটিয়ে আনে? নিশ্চয় পায়ে ফোস্কা পড়ে গিয়েছে। এই নাও চাবি, প্রতিবার যে ঘরটায় থাকো, সেখানেই যাও। তোমাদের খাবার রাখা আছে, হাত-পা ধুয়ে খেয়ে নাও।’
মানিককে কাছে ডেকে নাম জেনে জুতোটা খুলতে বললেন। গুল্লু এগিয়ে এসে ভাইয়ের জুতো খুলতেই অরিজিৎ বাবু দেখলেন, সত্যিই মানিকের পায়ে ফোস্কা পড়েছে। উনি বললেন, ‘তোমরা যাও, আমি মানিকের জন্য একটা মলম নিয়ে আসছি।’
মানিক পড়াশোনা করে বড় মানুষ হবে, কিন্তু মেনকা সহদেবের কথাকে পাত্তা দেয় না। বলে, ঢাকির ছেলে ঢাক বাজাবে, বামুন হয়ে চাঁদ ধরার বড় শখ!
এই অরিজিৎ বাবুই সহদেবকে এখানে নিয়ে এসেছিলেন। তখন সহদেবের বিয়েও হয়নি, সেই থেকে দশ বছর ধরে এখানে ঢাক বাজাচ্ছে। সহদেবের ইচ্ছা ও যখন পারবে না, গুল্লু কাজটা করবে। মানিক পড়াশোনা করে বড় মানুষ হবে, কিন্তু মেনকা সহদেবের কথাকে পাত্তা দেয় না। বলে, ঢাকির ছেলে ঢাক বাজাবে, বামুন হয়ে চাঁদ ধরার বড় শখ!
সহদেবের শখ যে এভাবে পূর্ণ হবে কখনও ভাবেনি। দশ বছর পূর্তি উপলক্ষে এবার আলোর মালায় ঝলমল করছে চারিদিক। বিভিন্ন রকম ইভেন্ট আছে প্রতিদিন। বাইরে থেকে কত কত নামী লোকজন আসছে। এসব দেখে মানিক খুব খুশি। ঠাকুরের সামনে দাঁড়িয়ে প্রণাম করে বলল, ‘ঠাকুর আমায় আশিব্বাদ করো, আমি বড় হয়ে এখেনে একখান বাড়ি কিনে সবারে নিয়ে থাকব।’

ঠাকুর ওর কথা শুনতে পেলেন কি না কে জানে! কিন্তু কিসু মানিককে চোখ বুজে বিড়বিড় করতে দেখে, মানিকের মুখের কাছে কান নিয়ে কথাটা শুনে হেসে গড়াগড়ি। তারপর যাকে পাচ্ছে, তাকেই বলছে আর হেসে গড়িয়ে পড়ছে।
বাব্বা! ঢাকির ছেলের শখ কত!
কথাটা অরিজিৎ বাবুর কানে যেতেই মানিককে কাছে ডেকে নিয়ে বললেন, ‘এই জায়গা তোর ভাল লেগেছে? গ্রাম ছেড়ে, মাকে ছেড়ে থাকতে পারবি?’
মানিককে শিখা দিদিমণি বলেছেন, ভাল করে পড়াশোনা করতে হলে শহরে যেতে হবে। সেই কথাটা মনে করে বলল, ‘হ্যাঁ, থাকতে পারব। আমি তো রাত্তিরে ঠাকুরমার কাছে থাকি।’
অরিজিৎ বাবু এবার হেসে ফেললেন, এইটুকু একটা গ্রামের ছেলে মানিক, কিন্তু খুব বুদ্ধি এই ছোট্ট মাথায়। অরিজিৎ বাবু প্রথম দিনই মানিককে দেখে কেমন যেন মায়ায় পড়ে গেছেন। ওঁর কাজের মেয়েটাকে দিয়ে মানিককে সাবান শ্যাম্পু দিয়ে স্নান করিয়ে ভাল দু’সেট জামা প্যান্ট কিনে দিয়েছেন।
‘আজ রাতে আমার ঘরে থাকতে পারবি?’
‘পারব, কিন্তু জ্যেঠি যদি রাগ করে?’
‘জ্যেঠি কে?’
‘তুমার বউ’
অরিজিৎ বাবু এবার হেসে ফেললেন, এইটুকু একটা গ্রামের ছেলে মানিক, কিন্তু খুব বুদ্ধি এই ছোট্ট মাথায়। অরিজিৎ বাবু প্রথম দিনই মানিককে দেখে কেমন যেন মায়ায় পড়ে গেছেন। ওঁর কাজের মেয়েটাকে দিয়ে মানিককে সাবান শ্যাম্পু দিয়ে স্নান করিয়ে ভাল দু’সেট জামা প্যান্ট কিনে দিয়েছেন। পায়ের ফোস্কার জন্য মলমের ব্যবস্থাও করেছেন। অরিজিৎ বাবুর ছেলে আমেরিকায় থাকে, মানিকের বয়সি একটা নাতিও আছে। কিন্তু ছেলে-বৌমা এদেশে আর আসবে না। আবার ওঁদেরও নিজের দেশ ছেড়ে পাকাপাকিভাবে ওখানে যাওয়ার ইচ্ছে নেই।
এখানে এসে মানিকের একটা জিনিস খারাপ লাগছে। ওকে কেউ নাম ধরে ডাকছে না। সকলেই ঢাকির ছেলে বলে ডাকছে। আর তো দুটো দিন, তারপরে ওরা এখান থেকে চলে যাবে। তবে ওই জ্যেঠা, জ্যেঠির জন্যে মন কেমন করবে। গুল্লু ভাইকে মানা করেছে। এখানকার কারও সঙ্গে যেন না খেলে। কোনও বাড়ির মধ্যে আটকে পড়লে খুঁজে পাওয়া যাবে না। এখানে সব নম্বর দেওয়া আছে। মানিক দেখেছে, কিন্তু ও এখনও ইংরাজি পড়তে শেখেনি বলে বুঝতে পারেনি। কিসু, ওর কয়েকটা বন্ধু মানিকের হাত ধরে টেনে বলছিল, চল ছাদে চল। ওখানে গিয়ে খেলব। গুল্লু অনেক কিছু জানে, ও এর আগে দু’বার এসেছে। ভাইকে বারণ করেছে, খবরদার! ওই বাক্সে উঠবি নে, মাঝপথে খারাপ হয়ে গেলে শূন্যে ঝুলে থাকতে হবে।
সহদেবের বুক ঢিব ঢিব করছে, মানিক কি ছবি আঁকতে পারে নাকি? কেন যে বাবু ওকে বসিয়ে দিল! চা ঢালতে গিয়ে একবার তো কাপ উপচে পড়ে গেল। ভাগ্যিস দিদিমণির ভাল কাপড়ে পড়েনি। যাকগে বাবু যখন বসিয়ে দিয়েছে, থাক বসে।
সহদেব মোটেই সময় পায় না মানিককে দেখার। ঢাক বাজানো ছাড়াও বাবুরা যখন যা বলে, করে দেয়। সেদিন বলে দিয়েছে, বাইরে থেকে অনেক লোক আসবে, এখানকার বাচ্চারা নাচ, গান করবে, ছবি আঁকবে। চেয়ার গুছিয়ে সাজিয়ে রাখতে হবে। সবাইকে চা-পকোড়া দিতে হবে।
সহদেব সেই কাজে ব্যস্ত ছিল। হঠাৎ মাইকে মানিকের নাম বলতে খুব অবাক হল। আশ্চর্য হয়ে দেখল, বোস বাবু মানিকের হাত ধরে একপাশে বসিয়ে দিল। সহদেবের বুক ঢিব ঢিব করছে, মানিক কি ছবি আঁকতে পারে নাকি? কেন যে বাবু ওকে বসিয়ে দিল! চা ঢালতে গিয়ে একবার তো কাপ উপচে পড়ে গেল। ভাগ্যিস দিদিমণির ভাল কাপড়ে পড়েনি। যাকগে বাবু যখন বসিয়ে দিয়েছে, থাক বসে।

সহদেবের চমকানোর বাকি ছিল তখনও। বাইরের মানুষের সামনে মানিক একখানা কবতে বলে ফেলল। কী যেন বললো, পশ্ন। মানিকের সাহস দেখে গুল্লুর চোখ বড় বড় হয়ে গিয়েছে। ও তিন বছর ধরে জ্যাঠার সঙ্গে আসছে, কিন্তু কারও সঙ্গে কোনওদিন কথাই বলেনি।
ও মা! মানিক গেল কোথায়? সহদেব গুল্লুর হাতে পকোড়া দিল কিন্তু মানিককে দেখতে পেল না। আবার খোঁজার মতো সময়ও পেল না। কমপ্লেক্সের সেক্রেটারি বাবুকে ডাকতে চলে গেল, যাওয়ার আগে গুল্লুকে বলে গেল মানিককে পকোড়া খাওয়াতে।
সবাই ছবি তুলছে, হল্লা করছে, কিন্তু মানিককে দেখা যাচ্ছে না। গুল্লু ভয়ে, চিন্তায় কেঁদে ফেলল, ও খাবার খাওয়ার কথা ভুলে গেল।
কিন্তু গুল্লু তো মানিককে দেখতেই পাচ্ছে না। ওদিকে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা এক একজন এক একরকম সেজে এসে সামনে দাঁড়াচ্ছে। সবাই ছবি তুলছে, হল্লা করছে, কিন্তু মানিককে দেখা যাচ্ছে না। গুল্লু ভয়ে, চিন্তায় কেঁদে ফেলল, ও খাবার খাওয়ার কথা ভুলে গেল।
হঠাৎ একটা ছোট ছেলে নিমাই সেজে আসতে সবাই বলাবলি করতে লাগল, ‘এ কে বল তো? কী চমত্কার লাগছে, সাক্ষাৎ গৌরাঙ্গ।’
গুল্লুরও কেমন যেন লাগল। তালের বড়া খাওয়ার সময় পাড়ায় পাড়ায় নিমাই সাজিয়ে নিয়ে বেরোনো হয় সেইবার মানিক নিমাই সেজেছিল, কিন্তু মানিকের তো মাথায় চুল আছে। এ তো ন্যাড়া!
গুল্লু দু’হাতে দুটো শালপাতার বাটি নিয়ে সহদেবকে খুঁজতে গেল। আর তখনই মাইকে প্রতিযোগিতার ফলাফল ঘোষণা হল। সবাই অবাক হয়ে শুনল, দুটো ইভেন্টে মানিক চন্দ্র দাস প্রথম হয়েছে আর একটা ইভেন্টে দ্বিতীয়। কিন্তু কে এই মানিক চন্দ্র দাস?
সবাই খুব উত্সুক মানিক চন্দ্র দাসকে দেখার জন্য। এই কমপ্লেক্সে কি নতুন এসেছে?
সবাইকে অবাক করে অরিজিৎ বাবুর হাত ধরে মানিক চন্দ্র দাস এল। কিসু চেঁচিয়ে উঠল, ‘এই তো ঢাকির ছেলে! ও অতগুলো প্রাইজ পেল?’
ঘোষক কিসুকে ডেকে বললেন, ‘তোমার বাবা হয়তো রেলে কাজ করেন, তেমন মানিকের বাবা ঢাক বাজান। তোমাকে রেলের ছেলে বললে ভাল লাগবে শুনতে? তেমনি ওকে ঢাকির ছেলে না বলে ওর নাম ধরে ডাকবে।’
তোমাদের সব কিছু আমাদের খুব ভাল লেগেছে, তবে যারটা সব থেকে ভাল হয়েছে সেই তো প্রথম পুরস্কার পাবে। এই তো ছবিগুলো টাঙানো আছে। তোমরা সবাই গিয়ে দেখো, কার ছবি সব থেকে ভাল হয়েছে।’
কিসু বলল, ‘আমার বাবা বড় কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার, রেলে কাজ করে না।’
‘বাহ্ সে তো খুব ভাল কথা, কিন্তু আমাদের বেঁচে থাকতে হলে সবাইকে প্রয়োজন। মানিকের বাবা ঢাক না বাজালে পুজো কী করে হত বলো? আর আমরা তো তোমাদের এখানে এই প্রথম এলাম, আজকেই তোমাদের সঙ্গে পরিচয় হল। তোমাদের সব কিছু আমাদের খুব ভাল লেগেছে, তবে যারটা সব থেকে ভাল হয়েছে সেই তো প্রথম পুরস্কার পাবে। এই তো ছবিগুলো টাঙানো আছে। তোমরা সবাই গিয়ে দেখো, কার ছবি সব থেকে ভাল হয়েছে।’
ছবিগুলো দেখে সবাই এক বাক্যে স্বীকার করল, মানিক চন্দ্র দাসের ছবিই সেরা। এইটুকু সময়ের মধ্যেই ওদের গ্রামের নিখুঁত ছবি এঁকেছে। এমনকী ধানখেতের উপর দিয়ে উড়ে যাওয়া পাখি পর্যন্ত। এর আগে মানিক কখনও কাগজে ছবি আঁকেনি। একা একা বসে স্লেটে ছবি আঁকত। অবশ্য পৌষ সংক্রান্তির দিন ঠাকুরমার সঙ্গে নিকোনো উঠোনে ঢেঁকি, গোয়ালঘর এসব আঁকত।
পুজো শেষ, এবার বাড়ি ফেরার পালা। অরিজিৎ বাবু সহদেবকে বললেন, ‘তোমার ছেলে খুব মেধাবী, ওকে কি লেখাপড়া করাতে চাও?’
সহদেব হাত জোড় করে বলল, ‘চাই তো বাবু, এই কথা খিচুড়ি ইস্কুলের দিদিমণিও বলেছে। কিন্তু মেনকা মানে মানিকের মা’র একই কথা— বামুন হয়ে চাঁদ ধরতি যেও না। ওর বাপ-দাদা যা করেছে, তাই করবে। কিন্তু আমি চাই আমার মানিক লেখাপড়া শিখে একখানা ভাল মানুষ হোক।’
বাড়ি ফিরে গুল্লু যাকে দেখছে, তাকেই আনন্দ করে ভাইয়ের পুরস্কার পাওয়ার কথা বলছে। গুল্লুর মনটা আসলেই খুব ভাল। বাবুরা মানিককে তিনটে জামা আর ওকে একটা জামা দিয়েছে। তা নিয়ে কোনও দুঃখ নেই ওর। ভাই শহরে পড়বে এই আনন্দে নাচছে।
অরিজিৎ বাবু বললেন, ‘ঠিক আছে তোমরা বাড়ি যাও। আমি কিছুদিন পরে তোমার বাড়ি গিয়ে মানিককে নিয়ে আসব। কথা চলছে, এখানে একটা ভাল হোমে ওকে ভর্তি করে দেব। চিন্তার কিছু নেই, টাকাপয়সা দিতে হবে না।’
বাড়ি ফিরে গুল্লু যাকে দেখছে, তাকেই আনন্দ করে ভাইয়ের পুরস্কার পাওয়ার কথা বলছে। গুল্লুর মনটা আসলেই খুব ভাল। বাবুরা মানিককে তিনটে জামা আর ওকে একটা জামা দিয়েছে। তা নিয়ে কোনও দুঃখ নেই ওর। ভাই শহরে পড়বে এই আনন্দে নাচছে।

মানিক জানত, বাড়ি গেলে ওর জামা থেকে মা একটাও গুল্লু দাদাকে দেবে না। তাই আগেই ওর একটা জামা দাদার ব্যাগে ঢুকিয়ে দিয়েছে। মানিকও খুব খুশি, শহরে পড়ে অনেক বড় হবে। তাই বোস জ্যাঠার দেওয়া বইগুলো ভাল করে পড়ছে, না পারলে শিখা দিদিমণির কাছ থেকে বুঝে নিচ্ছে। শিখা দিদিমণিও খুব খুশি, বারবার করে বলছেন মানিক যেন খারাপ ছেলেদের সঙ্গে না মেশে।
গুল্লুর মুখে মানিক কলকাতা চলে যাবে শুনে, মেনকা গুল্লুকে এই মারে তো সেই মারে! মানিক এসে মাকে জড়িয়ে ধরে না থামালে লঙ্কাকাণ্ড বেঁধে যেত।
বোস বাবু এলেন ডিসেম্বর মাসে। ওঁর সঙ্গে আরও দু’জন ভদ্রলোক ছিলেন। সহদেব মেনকা, মানিকের ঠাকুরমা সবার সঙ্গে কথা বললেন। শিখা দিদিমণিও ছিলেন, মানিক আগে থাকতে দিদিমণিকে বলে রেখেছিল, যাতে ওর মা ঝামেলা না করতে পারে। আশ্চর্যের ব্যাপার মেনকা রাজি হয়ে গেল। কাগজপত্রে সই-সাবুদ হলে মানিক চলে গেল বোস জ্যেঠার সঙ্গে। গুল্লু তো ভাই চলে যাবে শুনে সকাল থেকেই কাঁদছিল। মেয়ে বিয়ে হয়ে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার সময় যেমন সবাই কাঁদে, পাড়ার লোকজন সবাই চোখের জল মুছছিল। মানিক গাড়িতে ওঠার সময় ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলল।
কোনও কাজই ছোট নয়, এই কথাটা কবে যে সবাই বুঝবে? একটু সুযোগ-সুবিধা পেলে ওর মতো গ্রামের ছেলেমেয়েরাও পারবে ভাল জায়গায় পৌঁছতে। তাই মেডিকেল পড়ার মাঝেই মানিক অনলাইনে ফ্রি কোচিং সেন্টার খুলেছে। ওর বন্ধুরা পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
মানিককে অন্ত্যোদয় আশ্রমে ভর্তি করে দিয়েছিলেন অরিজিৎ বাবু। প্রতি মাসে টাকাও দিয়েছেন আশ্রমে। মানিক ওঁর মুখ রেখেছে। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক সবেতেই নব্বই শতাংশের বেশি নম্বর পেয়েছে। সরকারি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়েছে। অরিজিৎ বাবু আর ওঁর স্ত্রী মাধুরী দেবী নিজের ছেলের জন্যও বোধহয় এত খুশি হননি। এখন ওঁদের দু’জনেরই বয়স হয়েছে। মানিক পড়াশোনার মাঝে যতটা পারে, ওঁদের দেখাশোনা করে। শিখা দিদিমণির সঙ্গে ফোনে কথা বলে, শুধু ঠাকুরমার সঙ্গেই কথা হয় না। এই দু’বছর হল সবার মায়া কাটিয়ে ঠাকুরমা দাদুর কাছে চলে গিয়েছে।
মানিকের গুল্লুদাদা এখন নামকরা ঢাকি। সহদেব ওর সঙ্গে কাঁসি বাজায়। সময় পেলে মানিক পুজোর সময় আসে কমপ্লেক্সে। কখনও ঢাক কাঁধে তুলে নেয়, কখনও কাঁসি। এখন আর কেউ ওকে ঢাকির ছেলে না বললেও মানিক জানে, ও তো আসলে ঢাকির ছেলে। তার জন্য গর্ববোধ করে। কোনও কাজই ছোট নয়, এই কথাটা কবে যে সবাই বুঝবে? একটু সুযোগ-সুবিধা পেলে ওর মতো গ্রামের ছেলেমেয়েরাও পারবে ভাল জায়গায় পৌঁছতে। তাই মেডিকেল পড়ার মাঝেই মানিক অনলাইনে ফ্রি কোচিং সেন্টার খুলেছে। ওর বন্ধুরা পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
মানিকের স্বপ্ন সত্যি হল অবশেষে। মহাদেব কমপ্লেক্সে একটা ফ্ল্যাট নিয়ে গ্রাম থেকে মা-বাবাকে নিয়ে এসেছে। একদিকে ওর জন্মদাতা মা-বাবা, অন্যদিকে ওর শিক্ষাদাতা পিতা-মাতা। দু’জনকেই দেখাশোনা করছে, সন্তানের দায়িত্ব পালন করছে। ভেবেছিল গুল্লুর ছেলেকেও লেখাপড়া শেখাবে। কিন্তু, সে ওর বাবার মতো, বই দেখলে পালায়।
কমপ্লেক্সের পুজো তিন দশক পার করল এ বছর। সেই উপলক্ষে মায়ের পুজোয় ফিতে কাটবে ডক্টর মানিক চন্দ্র দাস।
কার্ড হাতে পেয়ে মানিক ঠিক করে নিল, এই কাজটার উপযুক্ত মানুষ হলেন অরিজিৎ জ্যেঠু। তিনিই আস্তাকুঁড়ে পড়ে থাকা একটা ছোট্ট বট গাছের চারাকে তুলে এনে, তাকে যত্ন করে বাঁচিয়ে মহীরুহ করেছেন, এ সম্মান তাঁর। তা না হলে ঢাকির ছেলে কখনও ডক্টর মানিক চন্দ্র দাস হতে পারত না।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
অঙ্ক নিয়ে পড়াশোনা। অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ককর্মী। নেশা লেখা, ভ্রমণ, নাটক পরিচালনা, নির্দেশনা, বাচিক শিল্প, অভিনয়, গান রচনা, সমাজসেবা (ভারতীয় রেডক্রস সোসাইটির আজীবন সদস্য এবং চক্ষুদানে অঙ্গীকারবদ্ধ)। শুকতারা, কিশোরভারতী , মৌচাক, প্রসাদ, জলফড়িং, কফি হাউস, গৃহশোভা, গণশক্তি, সুখবর ও বিভিন্ন ওয়েবজিনের নিয়মিত লেখক। ২০টি মঞ্চসফল নাটকের পরিচালক ও প্রযোজক ও আঠেরোটি নাটকের রচয়িতা। প্রকাশিত বই ২১টি, সম্পাদনা ৪টি। বিভিন্ন মাধ্যমে গল্প বলার জন্য ‘গল্পদিদি’ নামে জনপ্রিয়।
