পঞ্চকেদারের উৎস সন্ধানে (শেষ পর্ব)

কল্পেশ্বরের পথে দেবগ্রাম

মাথায় চিন্তা নিয়ে শুতে গেলাম। সকাল সকাল উঠে প্রস্তুত হয়ে বাইরে আসি। বৃষ্টি থেমেছে। কিন্তু পাতলা মেঘের আস্তরণে গোটা এলাকা ঢাকা। বাহনের জন্যে অপেক্ষা, গন্তব্যের নাম  সাগর। যা হোক করে গাড়ি একটা পাওয়া গেল। পৌঁছলাম সাগর। ছোট জায়গা, কিন্তু যেহেতু রুদ্রনাথ যাত্রীরা এখান থেকে যাত্রা শুরু করে সেই জন্য লোকসমাগম আছে। 

মালবাহক ঠিক করে যাত্রা শুরু করি। গোড়া থেকেই চড়াই। কিছুক্ষণ পরে এল ছোট্ট গ্রাম গঙ্গলগাঁও। অল্প কয়েকঘর লোকের বাস, দুএকটা  ঝুপড়ি দোকান। বিশ্রাম করি, দমের ঘাটতি পুষিয়ে নিই। আবার চড়াই ভাঙা। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে রাস্তা, পাথর ফেলা। আবার ধার দিয়ে দিয়ে সিমেন্টের বাঁধানো নালার মতন। গ্রাম্য সেচ ব্যবস্থা। উঠছি তো উঠছিই। একসময় দেখি রাস্তা দিব্যি সুন্দর, কিন্তু চড়াই প্রাণান্তকর। যখন মনে হচ্ছে আর পারছি না, সেই সময় জঙ্গলের শেষে দেখি সবুজ ঘাসে ঢাকা গড়ানে বুগিয়াল। জায়গার নাম পানার। রুদ্রনাথের যাত্রাপথে সবচেয়ে সুন্দর জায়গা এই পানার। 

রুদ্রনাথের পথে পানার গ্রাম
রুদ্রনাথের পথে পানার গ্রাম।

এবার একটু সময় নিয়ে বসে সঙ্গে আনা শুকনো খাবার মুখে দিই। শরীরে শক্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করি। মালবাহক উৎসাহ দেয়। বলে, এ বার শেষ চড়াই। আশা নিয়ে ধীরে ধীরে উঠতে থাকি। বাঁ দিকে হিমালয়ের তুষারশৃঙ্গেরা যেন দুহাতে আলিঙ্গন করার জন্য উন্মুখ। খুব সরু একটা গিরিশিরার মধ্যে দিয়ে উঠে আসি এই পথের সবচেয়ে উঁচু বিন্দুতে। পিত্রাধার। এরপর আর চড়াই নেই, ঘাসে ঢাকা পাহাড়ের গাঁ বেয়ে বেয়ে পথ। মাঝে পঞ্চধারা নামে কয়েকটি জলধারা অতিক্রম করতে হয়। ততক্ষণে দূরে দেখা যায় মন্দির। পা আর চলছে না,  কিন্তু মন ছুটে চলে। অবশেষে এসে পৌঁছাই মহাদেবের দুয়ারে। সাধারণ ইঁট দিয়ে তৈরী মন্দির। আলাদা করে কোন জগমোহন নেই। একটি ঘর, সেটিই গর্ভগৃহ। মন্দিরের মাথায় রঙিন পতাকা। পূজা শেষ করে পুরোহিতেরই ঠিক করে দেওয়া একটি ঘরে আশ্রয় নিই। একে দুর্গম, তায় আবহাওয়া খুব একটা ভালো নয়। তাই পূণ্যার্থীর সংখ্যা খুবই কম। 

আস্তে আস্তে সন্ধ্যা নামে চরাচরে। চারদিকে অপার নীরব শান্তি। সন্ধ্যারতির শঙ্খঘণ্টা বেজে ওঠে। কতিপয় যাত্রী আমরা জড়ো হই গর্ভগৃহে। মনপ্রাণ ভরে দেবাদিদেবের আরতি দেখে পূর্ণ প্রাণে আস্তানায় ফিরে আসি। 

পরদিন ফেরার পালা। পিত্রাধার পার হয়ে নাওলা গিরিপথ অতিক্রম করে, ধনপাল এবং হানসা বুগিয়াল পার হয়ে একেবারে অনসূয়াদেবীর মন্দিরে এসে থামা। এই অঞ্চলে এই মন্দিরটি সতীমন্দির বলে খ্যাত। এখানে দূরদূরান্ত থেকে দম্পতিরা সন্তান কামনার্থে মানসিক পূজা দেয়। খানিক বিশ্রাম নিয়ে, নিচে নেমে আসি। এ জায়গাটির নাম মণ্ডল। এবার এখান থেকে চামোলি, গোপেশ্বর হয়ে কল্পেশ্বরের পথ ধরব আমরা।

যোশিমঠ থেকে বদ্রীর পথে হেলাং। পুরোটাই গাড়ির রাস্তা। হেলাংয়ে যেখানে শেয়ার জিপ থেকে নামলাম সেখানেই দেখি এক তিনতলা বাড়ি। এখানেই আজ রাত্রিবাস। বাড়িটির পাশ দিয়ে প্রবল গতিতে বয়ে চলেছে অলকানন্দা। এদিকে আমাদের সকলেরই পদযুগলের অবস্থা করুণ। পায়ের ব্যথা আর অলকানন্দার উদ্দাম গর্জনে রাতে ভালো ঘুম এলো না। 

সকালে উঠেই দুঃসংবাদ! হেলাং থেকে গাড়ি যাবে না। রাস্তা ভেঙে গেছে। কী হবে এখন? নেমে যাই অলকানন্দার তীরে, সেখানে ভাঙা রাস্তা পেরিয়ে আবার কিছুটা ওপরে উঠে তবে জিপস্ট্যান্ড। জিপের অপেক্ষায় দোকানে বসে গলা ভেজাই। কিন্তু হায়। জিপের তো আর দেখা মেলে না। দোকানি পাকদণ্ডীর সন্ধান দেয়। বলে, ওই রাস্তা দিয়ে দ্রুত পোঁছনো যাবে গন্তব্যে। কিন্তু শহুরে আরোহী আমরা, সাহসে কুলায় না! তাই গাড়ির রাস্তা ধরেই হাঁটা লাগাই। এ পথটা মোটের উপর বৈচিত্রহীন। দূর থেকে চোখে পড়ে হলুদ, সোনালী, সবুজ, গোলাপি আর লালে নকশা কাটা উপত্যকা। সেই সুন্দরের স্বাদ নিতে নিতে ক্ষণেকের বিশ্রাম। তারপর আবার পদচারণা। মধ্য়ে মধ্যে গ্রাম আসে। সুন্দর, ছিমছাম, পরিচ্ছন্ন। 

আমরা যাব দেবগ্রাম। এ বার শুরু হয়েছে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পাথর পাতা রাস্তা। একসময় জঙ্গল শেষ হয়। দূর থেকে ছবির মতো ভেসে ওঠে দেবগ্রাম। ঘনসবুজ পাহাড়ের নীচে কর্মচঞ্চল রঙিন পাহাড়ি গ্রাম। পিছন থেকে অতন্দ্র প্রহরায় মাঝদুপুরের ঝকঝকে নন্দাদেবী। এদিকে এখানে যাঁর বাড়িতে থাকার কথা, দেখি তাঁর বাড়ি বন্ধ। মাথায় হাত। দোরগোড়াতেই বোচকা বুঁচকি রেখে পা দুটিকে আরাম দিয়েছি কি দিইনি, কোত্থেকে তিনটি দেবশিশুর আবির্ভাব। আমরা প্রশ্ন করি “মালিক কই রে?” উত্তর না দিয়ে দৌড়ে উধাও হয়ে গেল দুটোতে। খানিক পরে কোথা থেকে চাবি এনে ঘর দুয়ার খুলে মালপত্তর সব ঘরে ঢুকিয়ে রাখল। হাঁ করে দেখতে থাকি তাদের অসঙ্কোচ কার্যকলাপ।

ঘরে ঢুকতেই আমার কেন জানি না মনে হল, এখনও বেলা আছে, এখনই দেবদর্শনটা সেরে ফেলা যাক। সঙ্গীরা নিমরাজি। দুই শিশুকে বললাম, “কতদূর রে?” হাসতে হাসতে জবাব দেয়, “এই তো কাছেই, চলুন না!” 

“ওকি রে, দরজায় তালা দিলিনা? মালপত্তর সব…।” ওরা হেসে বলে “এখানে চুরি টুরি হয় না, চলুন।” বোল্ডার ফেলা পথে নিচে নামতে নামতে এক নদীর সঙ্গে দেখা। আবার খুদে গাইডদের শুধোই, “নদীর নাম কি রে?” জবাব আসে- “কল্পগঙ্গা”। কাঠের গুঁড়ি পাশাপাশি জোড়া দিয়ে বাঁধা নড়বড়ে সাঁকোর উপরে পা ফেলে ফেলে পার হয়ে যাই। দেবশিশুরাই পার করে আর কি। আঙুল দিয়ে দেখায়, ওই ওপরে যেখানে পাহাড় থেকে এক বিরাট পাথর পথের ওপর ঝুলে রয়েছে ,তার নীচেই মন্দির। নদীর ধার থেকে অল্প চড়াই ভেঙে ওপরে উঠি।

সিমেন্ট বাঁধানো লম্বা বারান্দার শেষে তোরণ পেরিয়ে ক্ষুদ্র এক প্রকোষ্ঠে বিগ্রহ।ঐ দেবশিশুরাই কোথা থেকে জোগাড় করে আনে ফুল, জ্বালায় ধূপদীপ। আমরা মহাকালের পূজা,আরতি সম্পন্ন করতেই পরম ভক্তিতে আমাদের কপালে হলুদ সিঁদুরের টিকা এঁকে দেয় ওরাই। নিজেরাও লাগায়। এরপর ফেরার পালা। মন্দিরপ্রাঙ্গণ থেকে একই পথে ফিরে আসি রাতের আস্তানায়। ছোট্ট পুরোহিতদের দক্ষিণা তো দিতেই হয়। অর্থমুল্যে তা অবশ্য নেহাতই সামান্য। তাতেই তারা কল্পগঙ্গার ছন্দে নাচতে নাচতে অন্ধকারে হারিয়ে যায়। অবাক হয়ে চেয়ে থাকি ওদের যাত্রাপথের দিকে। 

এ বারের মতো পঞ্চকেদার ছুঁয়ে এসে সাঙ্গ আমাদের পরিক্রমা। শরীর ক্লান্ত। কিন্তু মন আর আত্মাকে যেন চাঙ্গা করে দিয়ে গেল ওই দুই শিশু। কম্বলের ওমে নিশ্চিন্ত উষ্ণতা খুঁজে নিতে নিতে ওদের মুখ দু’টো মনে পড়ে। আর মনে পড়ে মহাকবির দুটি পংক্তি – ‘পথের প্রান্তে আমার তীর্থ নয়। পথের দুধারে আছে মোর দেবালয়!’         

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

afgan snow

সুরভিত স্নো-হোয়াইট

সব কালের জন্য তো সব জিনিস নয়। সাদা-কালোয় উত্তম-সুচিত্রা বা রাজ কপূর-নার্গিসকে দেখলে যেমন হৃদয় চলকে ওঠে, এ কালে রণবীর-দীপিকাকে দেখলেও ঠিক যেমন তেমনটা হয় না। তাই স্নো বরং তোলা থাক সে কালের আধো-স্বপ্ন, আধো-বাস্তব বেণী দোলানো সাদা-কালো সুচিত্রা সেনেদের জন্য।স্নো-মাখা প্রেমিকার গাল নিশ্চয়ই অনের বেশি স্নিগ্ধ ছিল, এ কালের বিবি-সিসি ক্রিম মাখা প্রেমিকাদের গালের চেয়ে।