Hemanga Biswas
কেবল বাংলার প্রচলিত লোকসুরই নয়, শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস আকৃষ্ট হয়েছিলেন ভারতের নানা প্রান্তের এবং চিনের প্রচলিত গানের সুরের প্রতিও। ‘কল্লোল’, ‘তির’, ‘লাল লণ্ঠন’ নাটক বা ‘শঙ্খচিল’ গান নির্মাণে পাওয়া যায় সেইসব সুরের ছোঁয়া। চিনের সঙ্গে ছিল তাঁর বহুদিনের সম্পর্ক। প্রথমবার যক্ষ্মার চিকিৎসার জন্য তিনি ওখানে গিয়েছিলেন ১৯৫৭তে, ছিলেন প্রায় ৩০ মাস। এরপর কোটনিস স্মারক সমিতির প্রতিনিধি হয়ে ১৯৭৪এ আরও একবার যাত্রা, এবং পাঁচ বছর পরে চিন সরকারের আমন্ত্রণে, সস্ত্রীক। লোকসভায় চিন সম্পর্কে তিনি বক্তব্য রাখেন ১৯৭৪এ।
বর্তমান বাংলাদেশের সিলেট জেলার মিরাশী গ্রামে বাঙালি সঙ্গীতশিল্পী, কবি, লেখক এবং সুরকার হেমাঙ্গ বিশ্বাসের জন্ম। ১৯২৮এ হবিগঞ্জ হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে ভর্তি হন শ্রীহট্ট মুরারিচাঁদ কলেজে। এখানেই তিনি জড়িয়ে পড়েন স্বাধীনতা আন্দোলনে। পিতা হরকুমার বিশ্বাস ছিলেন চুনারুঘাট পরগনার জমিদার। জমিদার বাড়ির সন্তান হয়েও জমিদারি বিলাসের পরিবর্তে তাঁর মন পড়ে থাকত মাঠঘাটের শ্রমজীবী মানুষজন এবং তাঁদের জীবনসংগ্রাম ও গানের প্রতি। এই কারণেই তিনি গৃহত্যাগ করেছিলেন। ক্রমে জনতার গান তাঁর কাছে হয়ে ওঠে মুক্তি ও শ্রেণি সংগ্রামের গান। এজন্য তিনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন সিলেট, হবিগঞ্জ বা অবিভক্ত বাংলার নানা প্রান্তে।
ভিডিও: আলোর পথযাত্রী: শতবর্ষে সুরের সলিল
তিনি মনে করতেন, লোকসঙ্গীত গুরুমুখী নয়, গণমুখী। সেজন্যেই তিনি গণসংগীতে ধারণ করেছিলেন জনগণের চেতনাকে। দেশে তখন স্বাধীনতার দাবিতে ক্রমে জন্ম নিচ্ছে এক বিপ্লবী চেতনার। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন এই গানই হয়ে উঠবে গণসংগ্রামের হাতিয়ার। অতএব নিজেকে যুক্ত করে ফেলেন শ্রমিক-কৃষকের অধিকার রক্ষার রাজনৈতিক আন্দোলনে। কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন চল্লিশের দশকের গোড়ায়। রাজনৈতিক কারণে ১৯৩০, ৩২ এবং ১৯৪৮ সালে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। কারাগারের অনিয়ম এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকার ফলে দ্বিতীয় বার তিনি যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হন। এই রোগের কারণেই অবশ্য মুক্তি পান তিনি। শরীর ভেঙে পড়লেও মন কিন্তু ভেঙে পড়েনি।
দেশজুড়ে এক অভিন্ন সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ভাবনা নিয়ে ১৯৪৩-এ জন্ম হয় ভারতীয় গণনাট্য সংঘ বা ‘আইপিটিএ’-র। এই সংগঠনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, নিরঞ্জন সেন বা বিনয় রায়দের সঙ্গে এগিয়ে আসেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস। ক্রমে এখানে নতুন গান এবং সুরের যে ধারার প্রচলন হয়, তার শীর্ষে ছিলেন তিনি। জ্যোতিপ্রকাশ আগরওয়ালের সহায়তায় ‘অসম গণনাট্য সংঘ’ প্রতিষ্ঠা করেন, ১৯৪৭-এ।
প্রগতিশীল লেখক শিল্পীদের আমন্ত্রণে তিনি প্রথম কলকাতায় গান গাইতে আসেন ১৯৪২ সালে। অতঃপর জোরদার হয় তাঁর ভাবনা। লোকসঙ্গীতের সুর মিলে যেতে থাকে গণসঙ্গীতের মধ্যে। ‘কিষাণ ভাই তোর সোনার ধানে বর্গী নামে’ বা ‘তোমার কাস্তেটারে দিও জোরে শান’- ইত্যাদি গানে তখন জনজোয়ারে ঢেউ উঠেছিল বাংলা থেকে আসাম। ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, বাউল, জারি-সারি প্রভৃতি বাংলার আত্মার সুরকে তিনি কাজে লাগিয়েছিলেন রাজনৈতিক প্রতিবাদের ক্ষেত্রে। মনে করা যেতে পারে হোরি গাবের সুরে বাঁধা ‘বাঁচব বাঁচব রে আমরা, ভাঙা বুকের পাঁজর দিয়া নয়া বাংলা গড়ব’ গানখানির কথা।
ভিডিও: ভারতীয় সংগীতের দুঃখ রাতের রাজা : মুকেশ
‘মাউন্টব্যাটেন মঙ্গলকাব্য’, ‘আমরা তো ভুলি নাই শহিদ’, ‘লঙ্গর ছাড়িয়া নাওয়ের দে’ বা ‘মন কান্দে পদ্মার চরের লাইগা’- ইত্যাদি গান ইতিহাস হয়ে রয়েছে। চিন থেকে ফিরে লিখেছিলেন ‘আমি যে দেখেছি সেই দেশ’ বা সাঁওতাল বিদ্রোহ স্মরণে রেখে ‘উর্র তাং তাং’। হাছন রাজা থেকে মুর্শিদী গানের সুরকেও আত্মস্থ করেছিলেন তিনি।
সিলেটে তাঁর সহযোগী ছিলেন বিনোদবিহারী চক্রবর্তী, কুমুদ গোস্বামী এবং অশোকবিজয় রাহা। সত্তর দশকে তৈরি করেন ‘মাস সিঙ্গার্স’ নামে নিজের একটি গানের দল। নিজে কণ্ঠ দিয়েছিলেন ঋত্বিক ঘটকের ‘কোমল গান্ধার’ চলচ্চিত্রে। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন ছাড়াও ১৯৫২র ভাষা আন্দোলনের সময়ে তাঁর লেখা ‘ঢাকার ডাক’ নামক ব্যালাড আলোড়ন সৃষ্টি করে। কাজ করেছিলেন সোভিয়েত দেশ পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে। অনেকগুলি উল্লেখযোগ্য বই লিখেছিলেন অসমিয়া এবং বাংলা ভাষায়। বেশির ভাগ বাংলা লেখা সংকলিত হয়েছে ‘উজান গাঙ বাইয়া’ এবং ‘হেমাঙ্গ বিশ্বাস রচনা সংগ্রহ’ বইতে।
গণসংগীতের এই আপোসহীন প্রহরীকে ঢাকায় ১৯৮১ সালের ৬ মার্চ এক গণসংবর্ধনা দেওয়া হয়। সেদিন তাঁর লেখা ‘ঢাকার ডাক’ আপ্লুত করে বাংলাদেশের অগণিত মানুষকে। অতএব তিনিই বলতে পারেন, ‘আমার গান আমার একার সৃষ্টি নয়, একটা আন্দোলনের সৃষ্টি’।
বাংলালাইভ একটি সুপরিচিত ও জনপ্রিয় ওয়েবপত্রিকা। তবে পত্রিকা প্রকাশনা ছাড়াও আরও নানাবিধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে থাকে বাংলালাইভ। বহু অনুষ্ঠানে ওয়েব পার্টনার হিসেবে কাজ করে। সেই ভিডিও পাঠক-দর্শকরা দেখতে পান বাংলালাইভের পোর্টালে,ফেসবুক পাতায় বা বাংলালাইভ ইউটিউব চ্যানেলে।
