মহালয়া মানে পিতৃপুরুষের ঋণস্বীকার

497
Tarpan
Tarpan on Mahalaya

অসুররাজ মহিষাসুরের সঙ্গে শতবর্ষব্যাপী যুদ্ধে দেবরাজ ইন্দ্রের পরাজয় ঘটলে মহিষাসুর স্বর্গের অধিপতি হয় | আর এরই ফলে দেবতাদের দুর্গতির অবধি থাকে না | ব্রহ্মাদি সমস্ত দেবগণ তখন সমবেতভাবে বিষ্ণুর শরণাপন্ন হন | শ্রীহরির সম্মুখে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে দেবতারা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন | সেইসঙ্গে ক্রুদ্ধ হয়ে পড়েন শ্রীহরিও | তখন হরি‚ হর ও ব্রহ্মার মুখ থেকে নির্গত হয় মহা তেজ | অন্যান্য দেবতার মুখ থেকেও ক্রমান্বয়ে তেজ নির্গত হতে থাকে | এই সমস্ত একত্রীভূত হয়ে পর্বতের মতো প্রতীয়মান হতে লাগল |

আর সেই তেজঃপুঞ্জ থেকে সমুদ্ভূতা হলেন এক নারী যাঁর প্রভায় ত্রিভুবন প্রোজ্জ্বল হয়ে উঠল | তখন শিবের মুখ থেকে তাঁর মুখের‚ যমের তেজ থেকে তাঁর কেশসমূহের এবং বিষ্ণুর তেজে তাঁর বাহুর সৃষ্টি হল | আর এভাবেই অন্যান্য দেবগণের তেজোরাশি থেকে তাঁর দেহের অন্যান্য অংশ নির্মিত হল | সৃষ্টি হল এক দেবী মূর্তির — তিনিই হলেন মহামায়া | তখন সেই প্রোজ্জ্বল দেবীকে দেখে দেবতারা যেমন আনন্দিত হলেন তেমনি বিবিধ অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে তাঁকে সাজিয়ে তুললেন |

মহাদেব দিলেন শূল‚ কৃষ্ণ চক্র‚ বরুণ শঙ্খ‚ চাপ ও বাণপূর্ণ ইষুধিদ্বয় দিলেন মারুত | ইন্দ্র দিলেন বজ্র ও ঘণ্টা‚ যম দন্ড‚ কাল খড়্গ ‚ প্রজাপতি অক্ষমালা দিলেন‚ অম্বুপতি পাশ‚ ব্রহ্মা দিলেন কমণ্ডলু‚ সুর্য উজ্জ্বল জ্যোতি | অগ্নি দিলেন শীতঘ্নী শক্তি | বিশ্বকর্মা দিলেন পরশু, হিমালয় সিংহ, শেষনাগ সর্পহার, সাগর সদা অম্লান পদ্ম ইত্যাদি |

সজ্জিত হওয়া মাত্রই দেবী গম্ভীরনিনাদী হুঙ্কার দিলেন | আর সেই হুঙ্কার শুনে মহিষাসুর কম্পিত হয়ে ‘কী ব্যাপার’ বলে অনুচরদের খোঁজ নিতে বললেন | অনুচরদের কাছে সেই দেবীর রূপ-মাধুর্য শুনে মহিষাসুর তাকে বিবাহ করতে চাইলেন | কিন্তু দেবী মহিষাসুরের দূতকে তিরস্কার করে তাড়িয়ে দিলে মহিষাসুর ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়ে দেবীকে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশে সসৈন্যে তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করলেন |

দীর্ঘকালব্যাপী যুদ্ধের পর দেবীর হাতে মহিষাসুরের মৃত্যু হয় | তবে কালিকা পুরাণ-মতে মৃত্যুকালে মহিষাসুর দেবীকে বলেন — তাঁর হাতে মরতে সে খুশী | কিন্তু দেবীর যজ্ঞে সেও যেন পূজিত হয় | উত্তরে দেবী বলেন — ‘সমস্ত যজ্ঞভাগ দেবতাদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়ে গেছে | তবে তুমি আমার পদসেবায় সর্বদা নিযুক্ত থাকবে এবং যেখানেই আমার পূজা হবে সেখানেই তুমি পূজিত হবে |’ সেই থেকে মহিষাসুর দেবীর সঙ্গে পূজিত হয়ে আসছে |

মহালয়ার দিন পিতৃপক্ষের সমাপ্তি ও প্রতিপদ থেকে দেবীপক্ষের শুরু | এখন প্রশ্ন হল পিতৃপক্ষ কী? মহাভারতে বর্ণিত কুন্তীর কানীনপুত্র বীর কর্ণ কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করে স্বর্গে গমন করেন | কিন্তু সেখানে তাঁকে খাদ্য হিসাবে দেওয়া হয় সোনাদানা | কর্ণ তখন দেবরাজ ইন্দ্রকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে দেবরাজ বলেন ‘তুমি জীবিতকালে কোনওদিন পিতৃপুরুষকে কোনও খাদ্যদ্রব্য উৎসর্গ করনি | সেজন্য তোমার প্রতি এই বিধান’ |

কর্ণ তখন বলেন – ‘দেবরাজ‚ পূর্বপুরুষদের বিষয়ে আমি অবগত ছিলাম না | যাই হোক এখন আমাকে মর্ত্যে ফিরে গিয়ে সেই পিতৃকার্য করার সুযোগ দিন’ | ইন্দ্র সেই প্রার্থনা পূরণ করলে কর্ণ ১৫ দিনের জন্য মর্ত্যে আসেন ও প্রতিপদ থেকে মহালয়া পর্যন্ত কালে পিতৃকার্য করেন | তাই মহালয়াতে সমাপ্ত পক্ষকে পিতৃপক্ষ বলা হয় | কর্ণের মতোই হিন্দুরা আজও পিতৃপক্ষে তর্পণাদি শ্রাদ্ধ করে থাকে এবং দেবতা ব্রাহ্মণদের খাদ্যদ্রব্যাদি উৎসর্গ করে | প্রকৃতপক্ষে এটি পিতৃপুরুষের ঋণস্বীকার ছাড়া আর কিছু নয় |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.