নুরেমবার্গ মেডিকাল ট্রায়াল ও আই জি ফারবেন (পর্ব ২)

নুরেমবার্গ মেডিকাল ট্রায়াল ও আই জি ফারবেন (পর্ব ২)

IG_Farben_Defendants Wikimedia Commons
নুরেমবার্গ মেডিকাল ট্রায়াল Wikimedia Commons
নুরেমবার্গ মেডিকাল ট্রায়াল Wikimedia Commons
নুরেমবার্গ মেডিকাল ট্রায়াল Wikimedia Commons
নুরেমবার্গ মেডিকাল ট্রায়াল Wikimedia Commons

নাৎসি জমানায় জীবন্ত মানুষের দেহের ওপরে কি ভয়াবহ, নৃশংস এবং বীভৎস সব পরীক্ষা চালানো হয়েছিল তার একটা অনুমান করা যাবে। আমরা মনে রাখব যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে যখন মেডিক্যাল জ্ঞানের নামে এই কল্পনাতীত ঠাণ্ডা মাথার হিংস্রতার খবর পৃথিবীর সামনে আসে তখন সমস্ত স্বাভাবিক, সভ্য মানুষ এবং চিকিৎসক মেডিক্যাল এথিক্সের একটি নতুন গঠন দেবার চেষ্টা করেন, যার নাম নুরেমবার্গ কোড। “পারমিসিবল মেডিক্যাল এক্সপেরিমেন্টস” অংশে ১০টি পয়েন্টের এই কোডের প্রথম পয়েন্ট বা বাক্যটি হচ্ছে – “কোন মানুষের সজ্ঞানে, স্বেচ্ছায় অনুমতি দান চূড়ান্তভাবে জরুরী।” আজ যাকে আমরা “ইনফর্মড কনসেন্ট” বলি তার সূচনাবিন্দু এই নুরেমবার্গ কোড। প্রাক-নুরেমবার্গ এবং নুরেমবার্গ-উত্তর মেডিক্যাল এথিক্সের ক্ষেত্রে আকাশ পাতাল প্রভেদ ঘটে গেল।

মানুষের শরীরে যেসব পরীক্ষাগুলো চালানো হয়েছিল সেগুলো একবার দেখে নিই।

(১) অতি-উচ্চতার পরীক্ষা

৬০,০০০ ফুট থেকে হঠাৎ করে ৪০,০০০ হাজার ফুটে নেমে এলে জার্মান বৈমানিকদের শরীরে কি ধরনের প্রভাব পড়তে পারে এটা বোঝার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল এই হতভাগ্য বন্দীদের। এদেরকে কে অত্যন্ত কম বায়ুচাপের চেম্বারের মধ্যে ঢোকানো হতো দেহের ওপরে কম বায়ুচাপের ফলাফল বো্ঝার জন্য। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হতভাগ্য বন্দীর মৃত্যু ঘটত। 

(২) দাহ্য বস্তু এবং বোমার পরীক্ষা

বন্দীদের দেহে প্রথমে অতিদাহ্য ফসফোরাস জ্বালিয়ে ক্ষত তৈরি করা হতো। এরপরে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে দেখা হতো কি প্রভাব পড়ে। স্বাভাবিক নিয়মেই অধিকাংশ বন্দী মারা যেত।

(৩) অতি কম তাপমাত্রার পরীক্ষা

এ পরীক্ষাগুলোর আরেকটা নাম ছিল “হাইপোথার্মিয়া এক্সপেরিমেন্ট”। জার্মান বৈমানিকেরা বিমান ভেঙ্গে বরফ ঠাণ্ডা জলে পড়লে কী হতে পারে সেটা বোঝার জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বন্দীদের উলঙ্গ করে সজ্ঞানে হিমাঙ্কের নীচের তাপমাত্রার জলে ফেলে দেওয়া হতো। কখনো কখনো এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত জলে চুবিয়ে রেখে শরীরে এর প্রভাব মাপা হত। পরবর্তী সময়ে এই পরীক্ষাগুলোর বৈজ্ঞানিক অসারতা প্রমাণ করার জন্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল-এর মতো পত্রিকায় “নাৎসি সায়ান্স – দ্য ডাচাউ হাইপোথার্মিয়া এক্সপেরিমেন্ট” শিরোনামে প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল – এমনই ছিল এসব এক্সপেরিমেন্টের প্রভাব।

(৪) সমুদ্রের জলের পরীক্ষা

বন্দীদের পানীয় সমস্ত জল বন্ধ করে দিয়ে কেবল সমুদ্রের জল খেতে দিয়ে, তাদের দেহে রক্তনালী দিয়ে সমুদ্রের জল ইঞ্জেকশন করে মাপা হত সহনক্ষমতার মাত্রা। অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যে বেশিরভাগ বন্দীর মৃত্যু ঘটত। 

(৪) ম্যালেরিয়ার ও টিবির পরীক্ষা

ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো এবং কী ওষুধের ব্যবহার জানতে বন্দীদের দেহে ম্যালেরিয়া এবং টিবির জীবাণু বারংবার প্রবেশ করানো হতো। প্রসঙ্গত, বন্দীদের রক্তে ফেনল (কার্বলিক অ্যসিড) এবং গ্যাসোলিন ইঞ্জেকশন দেবারও অনেক প্রমাণ আছে। পরিণাম? মৃত্যু।

(৫) মাস্টার্ড গ্যাসের পরীক্ষা

মাস্টার্ড গ্যাসের ক্ষতের চিকিৎসা কিভাবে করা যায় এজন্য বন্দীদের দেহে কৃত্রিমভাবে ক্ষত তৈরি করা হতো। যাদের মৃত্যু হত তারা বোধহয় বেঁচে যেতো! যারা বেঁচে থাকতো তাদের পরিণতি বোঝার জন্য একটি ছবি দিচ্ছি। প্রত্যেকের হাতে এবং অন্যান্য স্থানে অত্যন্ত বড়ো বড়ো ব্লিস্টার হয়েছে।

(৬) সালফানিলামাইডের পরীক্ষা

সেসময়ে পেনিসিলিন আবিষ্কৃত হলেও মূলত সালফার যৌগের অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার প্রধান ছিল। এজন্য হাতে-পায়ে কৃত্রিমভাবে ক্ষত এবং ইনফেকশন তৈরি করা হত। কিভাবে? স্ট্রেপ্টোকক্কাস, গ্যাস গ্যাংগ্রিন এবং টিটেনাসের ব্যাক্টেরিয়া দিয়ে প্রথমে সংক্রামিত করা হত। সেই ক্ষতে কাঠের টুকরো গুঁজে, কাঁচের টুকরো ঢুকিয়ে দিয়ে বীভৎস অবস্থা সৃষ্টি করা হত। এবার ওষুধ দিয়ে দেখা হতো কী ফলাফল হয়। 

(৭) স্পটেড ফিভার বা টাইফাস নিয়ে পরীক্ষা

শতকরা ৯০ ভাগ বন্দী মারা যেত। এছাড়াও ছিল বিভিন্ন বিষাক্ত পদার্থ নিয়ে পরীক্ষা। সব মিলিয়ে ৫,০০,০০০ জিপসি, অন্তত ২৫০,০০০ প্রতিবন্ধী মানুষ, এবং ৩০,০০,০০০-র বেশি সোভিয়েট যুদ্ধবন্দী নাৎসি অত্যাচারের বলি হল।

অতঃপর

আমাদের কাছে ঐতিহাসিক শিক্ষা হিসেবে এল ইতিহাসের যে কোন বাঁকে সর্বগ্রাসী, পরমত-অসহিষ্ণু ডিকটেটরশিপ যখন রাজত্ব করে সেসময়ে বিজ্ঞান রাষ্ট্রের দর্শন দিয়ে পরিচালিত হয়। আমরা করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে ভারত সরকারের দেওয়া নতুন নিদান একবার মিলিয়ে নিতে পারি কিংবা আয়ুশ পাঠ্যক্রমের জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধি বা বিভিন্ন সময়ে অতিলৌকিক বিজ্ঞান নিয়ে সজোরে প্রচার করা – এগুলোকেও বিবেচনায় রাখব।

দু-তিনটে গোড়ার প্রশ্ন এখানে প্রায় সবাইকেই ভাবাবে মনে হয়। 

(১) হিটলারের জমানায় জার্মান বিজ্ঞানিদের এরকম ভয়াবহ আচরণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মহলে, বিশেষ করে ইংল্যান্ড এবং আমেরিকার তরফে, রাশ টানার চেষ্টা করা হলনা কেন? পল ওয়েন্ডলিং তাঁর “নাৎসি মেডিসিন অ্যান্ড দ্য নুরেমবার্গ ট্রায়ালস” গ্রন্থে বলছেন – “সোভিয়েটের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জার্মান বিজ্ঞানিরা সম্ভাব্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হত।” ঐ গ্রন্থেই আরেক জায়গায় বলছেন – “নাৎসি ঔষধের উদ্দেশ্য ছিল সমাজের জাতিগত বিভেদের জায়গাটা শক্তিশালি করে তোলা। আই জি ফারবেনের মনোপলি ক্যাপিটালিজম তারই প্রমাণ।” ভারতবর্ষে উচ্চ বর্ণের প্রাধান্যনির্ভর যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি নির্মাণের চেষ্টা চলছে এবং তাতে কর্পোরেট পুঁজি যেভাবে রসদ সরবরাহ করছে তাতে আমরা সেসময়ের একটা ছায়া বোধহয় দেখতে পাবো।

(২) যে চিকিৎসকেরা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে এরকম ভয়াবহ অত্যাচার করেছে কিংবা বর্তমানের গুয়ান্তানামো বে বা আবু ঘ্রাইবের মতো বীভৎস অত্যাচার কেন্দ্রে যে চিকিৎসকেরা মিলিটারি অত্যাচারকে প্রলম্বিত আর কার্যকরী করার জন্য সাহায্য করছে তারা যখন বাড়িতে ফেরে, নিজের পরিচিত জগতে ফেরে তখন তো তারা নিজেদের স্বাভাবিক প্রেমিক সত্তা, পিতৃ সত্তা কিংবা বন্ধু সত্তা খুঁজে পায়। তাহলে এরকম দ্বৈত সত্তা কিভাবে জন্ম নেয়? নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসন-এ রবার্ট জে লিফটন এর একটা ব্যাখ্যা দিচ্ছেন – প্রকৃতপক্ষে চিকিৎসক সত্তার একটি দ্বৈতায়ন বা “ডাবলিং (doubling)” হয়। চিকিৎসকের নিজের স্বাভাবিক সত্তার সাথে এক বিযুক্তিকরণ (ডিসোসিয়েশন) ঘটে এবং একইসাথে অতাচারের প্রক্রিয়ার সাথে ডাক্তারের সামাজিকীকরণ (socialization) হয় – এই বিশেষ সময়কাল জুড়ে। ডাক্তাররা যখন স্বভাব শান্ত মানুষের হাতে মার খায় কিংবা মব লিঞ্চিং-এ যেসব সাধারণ মানুষেরা অংশগ্রহণ করে তাদেরকে দিয়ে আমরা এই “ডাব্লিং” বা দ্বৈতায়ন অনেকটা বুঝতে পারব।

(৩) এটা ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে আর পাঁচটা পেশার মতো মেডিসিনের পেশাকেও রাষ্ট্র প্রবলভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। শুধু তাই নয়, সামাজিক এবং রাজনৈতিক শক্তি “মেডিক্যাল ইথস” বা মেডিসিনের মানস সত্তাকে দৃঢ়ভাবে প্রভাবিত করতে পারে। জার্নাল অব আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন-এর একটি প্রবন্ধে (Lessons from the Third Reich) মন্তব্য করা হয়েছিল – “A major lesson from the Nazi era is the fundamental ethical basis of medicine and the importance of an informed, concerned, and engaged profession.” অস্যার্থ, নাৎসি মেডিসিন থেকে একটি প্রধান শিক্ষা হলো যে মেডিসিনের মৌলিক নৈতিকতার ভিত্তি কি হবে এবং পেশাগতভাবে সচেতনভাবে বুঝে সক্রিয় অংশগ্রহণের গুরুত্ব কতটা এ বিষোয়গুলো বূঝে নেওয়া।

এই সামগ্রিক বিষয়টি অন্য মাত্রা পেয়ে যায় হিটলার-মুক্ত বর্তমান পৃথিবীতে – আমেরিকার গণতান্ত্রিক সমাজে। ১৯৬৪ সালে আমেরিকার ব্রুকলিনে Jewish Chronic Disease Hospital-এ ২২ জন রোগীর দেহে ক্যান্সার কোষের ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়েছিল – “Sins of Omission – Cancer Research Without Informed Consent”। বিষটি নিয়ে হইচই শুরু হওয়ার পরে বিচার শুরু হয়।

প্রবন্ধের শুরুতে উল্লেখিত আইজি ফারবেন কোম্পানির ম্যানেজার অটো অ্যামব্রোস “কঠোর” সাজা ভোগ করে ১৯৫২ সালে মুক্তির পরে এক ডজন কোম্পানির ম্যানেজার হয়েছিলেন। তার মধ্যে একটি কোম্পানি সজ্ঞানে বর্তমানে নিষিদ্ধ ওষুধ থ্যালিডোমাইড তৈরি করত। থ্যালিডোমাইডের ব্যবহারে গর্ভবতী মায়ের ৪০% ক্ষেত্রে বিকলাঙ্গ শিশু জন্ম নিতো। আইজি ফারবেনগোষ্ঠীর একটি কোম্পানি বায়ারের সাথে (Bayer) আরেক কুখ্যাত মারণান্তক বহুজাতিক কোম্পানি মনসান্টো-র সংযুক্তি হয়। এরা ডেমোক্র্যাটিক রিপাব্লিক অব কঙ্গোয় সামরিক অভিযানের সাথী হয়ে বিভিন্ন খনিজ সম্পদ লুন্ঠন করছে। তার মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান হল কোল্ট্রান – একটি খনিজ পদার্থ যা থেকে নায়োবিয়াম এবং ট্যান্টালাম এই দুটি মহামূল্য ধাতু পাওয়া যায়। মিলিটারি-মেডিক্যাল-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সের বৃত্তটি সম্পূর্ণ হল।

আউশভিৎসের নতুন ঠিকানা – আবু ঘ্রাইব কিংবা গুয়ান্তানামো বে

পৃথিবীব্যাপী প্রভুত্বের জন্য আমেরিকার যুদ্ধোন্মত্ততা আজ বিশ্ববাসীর কাছে সুবিদিত। তেলের বাজারের দখল রাখার জন্য মধ্যপ্রাচ্যকে একটি সামরিক পরীক্ষাগার বানিয়ে তুলেছে। অন্যত্র খনিজ সম্পদ বা প্রাকৃতিক গ্যাসের জন্য একই ঘটনা ঘটাচ্ছে। আবার অন্যত্র সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে স্ট্র্যাটেজিক পয়েন্ট হিসেবে সামরিক ঘাঁটি রাখছে। একইসাথে সংখ্যায় নাৎসি জমানার মতো না হলেও মাত্রার দিক থেকে একইরকমের অত্যাচার চলছে কুখ্যাত গুয়ান্তানামো বে, আবু ঘ্রাইব, বাগ্রাম বা কিংবা CIA-র “ব্ল্যাক সাইটস”গুলোতে। অসংখ্য প্রামাণ্য দলিল এবং প্রবন্ধ লেখা হয়েছে এসব জায়গায় অত্যাচারের পূর্ণ বিবরণ দিয়ে। আমি একটুখানি উল্লেখ করছি। ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে “আমেরিকান জার্নাল অব পাব্লিক হেলথ”-এর প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত একটি প্রবন্ধের শিরোনাম – “নুরেমবার্গ থেকে গুয়ান্তানামো বে – সন্ত্রাস দমনের যুদ্ধে ডাক্তারদের কীভাবে ব্যবহার করা হয়।” হিটলারের সময়ে “শুদ্ধ রক্ত”কে বর্তমান সময়ে “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” বলে লেখা হচ্ছে আর কি! এ প্রবন্ধে লেখকেরা বুঝতে চাইছেন কিভাবে এবং কেন মেডিক্যাল পেশার সাথে যুক্ত ডাক্তার, নার্স সহ সবধরনের মানুষ তাদের নিরাময় করার এবং সারিয়ে তোলার দক্ষতাকে একদিকে বন্দীদের ওপরে ক্ষত/ক্ষতি সৃষ্টির জন্য আর অন্যদিকে, রাষ্ট্রের তরফে এরকম ভয়াবহ বর্বরসুলভ অত্যাচারকে ধুয়েমুছে নির্বিষ প্রমাণ করার জন্য কাজ করে। শুধু তাই নয়, অত্যাচারকে লক্ষ্যভেদী করার জন্য ফিজিসিয়ান, সাইকিয়াট্রিস্ট সহ অ্যানথ্রপোলজিস্টরাও অংশগ্রহণ করে। 

এই কুখ্যাত বন্দী শিবিরগুলোতে ঘটা বীভৎসতম অত্যাচারের কয়েকটি নাম ধরে বলা যায়। 

(১) ওয়াটারবোর্ডিং – অত্যাচারের এই পদ্ধতিতে বন্দীর (অনেক সময়েই উলঙ্গ) মুখ কাপড় দিয়ে ঢেকে দিয়ে ক্রমাগত জলে চোবানো হয় যতক্ষণ না জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। জ্ঞান হারিয়ে ফেললে ডাক্তাররা শুশ্রূষা করে আবার অত্যাচার করার উপযুক্ত করে তোলে।

(২) ক্রমাগত দেওয়ালের গায়ে ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলা। এক্ষেত্রে বন্দীর মৃত্যু প্রায় অবধারিত।

(৩) শেকল দিয়ে বেঁধে সিলিং থেকে ঝুলিয়ে দেওয়া।

(৪) জোর করে নাক দিয়ে খাওয়ানো।

(৫) ছোট বাক্সের মধ্যে জোর করে একজন বন্দীকে ঢুকিয়ে বন্ধ করে রাখা।

(৬) নগ্ন বন্দীদের একের পরে এক শুইয়ে বা দাঁড় করিয়ে মানব পিরামিড তৈরি করা। এটা একধরনের মজার খেলা ছিল। মহিলা মিলিটারিরাও অংশগ্রহণ করে।

(৭) দিনের পর দিন তীব্র উজ্জ্বল আলোতে ঘুম না পাড়িয়ে রাখা।

(৮) পাশের ঘরে বন্দীর বোন বা আত্মীয়ের ওপরে ধর্ষণ বা অন্য অত্যাচারের অসহ্য চিৎকার শোনানো। এসবের পরে বন্দী মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়লে সাইকিয়াট্রিস্ট এবং সাইকোলজিস্টরা আবার অত্যাচারের উপযোগী করে তুলতো। নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে-এ প্রকাশিত “ডক্টরস অ্যান্ড টরচার” প্রবন্ধে বলা হচ্ছে – “প্যানিক এটাক হওয়া এক বন্দীকে দেখতে যখন নার্স ডাকা হয়, তিনি দেখেন ইরাকি বন্দীদের পিরামিডের মত এক এর ওপর এক জড়ো করে রাখা হয়েছে এবং তাদের মাথায় বালির বস্তা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।”

এখানে আমরা স্মরণ করব ১৯৪৫-এ্র প্রায় ২০ বছরের মধ্যে ভিয়েতনামের মাই লাই-এর গণহত্যার কথা। ১৯৬৮-র মার্চ মার্কিন সেনা মাই লাই গ্রামে ঢুকে একদিনে ৫০০ জনেরও বেশি ভিয়েনামীকে হত্যা করে। মেডিক্যাল পেশার নৈতিকতা নিয়ে নুরেমবার্গ পরবর্তী জেনেভা কনভেনশনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে মাই লাই ঘটে, আবু ঘ্রাইব বা গুয়ান্তানামো বে-র হিংস্রতম অত্যাচার চলে।

এরপরেও আমরা আমেরিকাকে কিন্তু ফ্যাসিস্ট বলিনি। ইরাকি প্রতিরোধকারীদের জেলের মধ্যে অত্যাচার করে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করার পরে বারাক ওবামা বলেছিলেন – “উই হ্যাভ কিলড আ ফিউ ফোকস (আমরা কিছু অবাঞ্ছিত মানুষকে হত্যা করেছি)”। আমরা কিন্তু এরকম বলদর্পী, আগ্রাসী, শীতল হিংস্রতায় মোড়া কথাকেও হিটলারের কথা বলে দেগে দিইনি। আমেরিকা পুরোমাত্রায় গণতান্ত্রিক থেকেছে! যেমনটা দিল্লিতে শান্তিপূর্ণ মিছিলে বড়ো লাঠি দিয়ে মেয়েদের গোপনাঙ্গে এবং পেছনে মেরে রক্তারক্তি করে দেবার পরে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হলেও আমরা বিশ্বাস করছি গণতন্ত্রের মাঝে বাস করছি।

এরকম অ্যানাক্রনিজম তথা বিপরীতমুখিতার মাঝে বাস করে আমাদের মেডিক্যাল পেশা সম্পর্কে নৈতিকতার বোধ। ডাক্তাররা ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে উপঢৌকন নেয় কিনা কিংবা ডাক্তারের “নেগলিজেন্স” বা অবহেলা / অসাবধানতার-র কারণে রোগীর মৃত্যু হল কিনা এগুলো যেমন রয়েছে নৈতিকতার একটা দিক হিসেবে, অন্যদিকে তেমনি রয়েছে রাষ্ট্রের তরফে চালানো অত্যাচারের সাথী হিসেবে ডাক্তারের অবস্থান কি হবে। ২০২০-র পৃথিবীতে সে ইতিহাস খুব উজ্জ্বল নয়। এমনকি একটি রাষ্ট্রের সহনাগরিকের ওপরে ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া অত্যাচার চললেও ডাক্তাররা কোন অবস্থান নেবেন সে কথাও বোধহয় আজ গভীরে ভেবে দেখার সময় এসেছে।

রাষ্ট্র এবং মানুষ – এ দুয়ের মাঝে আমাদের স্থিতি, আমাদের দোলাচলতা, আমাদের অবস্থান বদল। মেডিক্যাল নৈতিকতার কেবলমাত্র একটি কোন পাঠ নেই, বহু স্তরে স্তরায়িত।

সুত্র:

জার্নাল অব আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন
আমেরিকান জার্নাল অব পাব্লিক হেলথ
নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে-এ প্রকাশিত “ডক্টরস অ্যান্ড টরচার” প্রবন্ধ

Tags

Please share your feedback

Your email address will not be published.

SUBSCRIBE TO NEWSLETTER

Resize-+=

Please share your thoughts on this article

Please share your thoughts on this article

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.

  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.

  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.

  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).

  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

SUBSCRIBE TO NEWSLETTER

Please login and subscribe to Bangalive.com

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com