একমাত্র তিনিই পারেন টানা রিকশার চাকা সারাতে!

337

মৌলালির রামলীলা পার্কের ঠিক উল্টোদিকে একটা সরু গলি আছে। সেটা ধরে সোজা এগিয়ে গেলে একটা বুড়ো গাছের সঙ্গে দেখা হবে। গাছটার গায়ে একটা ভাঙাচোরা বাড়ি। বাড়ির মালিক নন্দকুমার শর্মা কলকাতার একমাত্র ঘোড়ার গাড়ির চাকা সারাই মিস্ত্রি। তিন পুরুষের ব্যবসা এখন ধুঁকছে। পুরসভার নথি বলছে, এই শহরে অন্য কারও এই ঘোড়ার গাড়ির চাকা সারানোর ট্রেড লাইসেন্স নেই।

নন্দকুমারের আদি বাড়ি বিহারের বৈশালীতে। ১৯৩৫সালে ঠার্কুদা রঘুনন্দন চাকরিবাকরির খোঁজে কলকাতায় আসেন। সেই সময় শহরে ঘোড়ার গাড়ির সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। প্রথমে কিছুদিন বড়বাজারে মালবাহকের কাজ করার পর রঘুনন্দন ঘোড়ার গাড়ি আর টানা রিকশর চাকা সারানোর ব্যবসা শুরু করেন। বছর তিনেকের মধ্যে পসার ফুলেফেঁপে উঠল। হাতভর্তি কাঁচা টাকা। মৌলালিতে একতলা বাড়ি বানালেন। কয়েক বছর পর বিয়ে হল। মেটিয়াবুরুজ, রাজাবাজার, দমদম, বেলগাছিয়া, বালিগঞ্জ- শহর ঝেঁটিয়ে খদ্দের আসত। ছেলে পবনকুমারের বয়স যখন পনেরো, তখন থেকে সে-ও ভিড়ে যায় ব্যবসায়। ঘোড়ার গাড়ির রমরমা কমলেও পবনের টাকাপয়সার সমস্যা হয়নি। বাবার দেখাদেখি নন্দও মাধ্যমিক পাশ করে পারিবারিক ব্যবসায় লেগে যান। পসার মন্দ ছিল না, ভাতকাপড়টা জুটত।

বর্ষার দুপুরে ব্যবসা, শহর, পরিবার আর বদলে যাওয়ার সময়ের কথা বলতে বলতে নন্দের গলা ভারী এবং ঈষৎ ঘোলাটে হয়ে আসে। রোজগার এখন কার্যত বন্ধ। কাজ নেই, শরীরময় জং। কমতে কমতে শহরে এখন মাত্র ২৯টা ঘোড়ার গাড়ি চলে। সেগুলোও খদ্দেরেরর অভাবে ধুঁকছে। একটা ঘোড়ার গাড়ির চাকা সারাতে খরচ হয় আট হাজার টাকা। টানা রিকশার চাকা সারাতে লাগে চার হাজার। ঘাম মুছতে মুছতে নন্দ বলছিলেন, “এক বার চাকা সারালে তো আর কয়েক বছরে খারাপ হয় না। ফলে আমারও কামাই বন্ধ। মাসে গড়ে হাজার চারেক টাকা রোজগার হয়। তিনটে বাচ্চা, তারা পড়াশোনা করে। বউ অসুস্থ। এ ভাবে চলে, বলুন তো! ব্যবসা ছেড়ে দেব। মুটের কাজ করব। ধুর!”

মোষের দুধ দিয়ে তৈরি চা খাওয়ার ফাঁকে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এল। নন্দ চেয়ারটা ভিতরে সরিয়ে আনলেন। লাভ নেই। চাল ফুটো। জল পড়ছে একটানা। অতিথিকে ভিজতে দেখে একটু লজ্জাই পেলেন যেন! হেসে ফেললেন ঘোড়ার গাড়ির মিস্তিরি- “গরিবের বাড়ি। একটু মানিয়ে নিন।” চুপ করে খানিকক্ষণ বৃষ্টি আর গলে যাওয়া আবর্জনার দিকে তাকিয়ে থেকে আচমকা বললেন, “অভাবে কী সব বলে ফেলি! নাহ্, ব্যবসা ছাড়ব না। শহরের হেরিটেজ আমার হাতে! বাপ-ঠার্কুদার পেশা, হাজার হোক। খেয়ে না খেয়ে চলে যাবে। কী বলেন? যাবে না?”

ঘাড় নাড়লাম। নন্দ বললেন, “আরেকটা চা বলি?”

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.