(P C Sarkar)
জাদুকর মানেই তখন ছিল কালো কোট, প্যান্ট, টাই পরিহিত পোশাক। তিনিই এই উপমহাদেশের প্রথম জাদুকর, যিনি ভারতের ঐতিহ্যবাহী রাজকীয় বেশে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জাদু প্রদর্শন করেন। দেশ বিদেশের অতিথিদের সামনেই যোধপুরের মহারাজা হানবন্ত সিং, প্রতুল চন্দ্র সরকারকে ‘জাদুসম্রাট’ উপাধি দিয়েছিলেন। সঙ্গে মহারাজকীয় পোশাক ছিল উপহার হিসেবে। তখন থেকেই জাদুসম্রাট পি সি সরকারের চিরকালীন পোশাক এই নাগড়া জুতা, পাঞ্জাবি-শেরওয়ানি আর পাগড়ি। কালো কোট, প্যান্ট, টাইয়ের বদলে ভারতীয় পোশাকও যে জাদুকরদের পরিচিতি হতে পারে, তার দৃষ্টান্ত প্রথম তৈরি করেন প্রতুল চন্দ্র নিজেই। (P C Sarkar)

বংশ পরম্পরায় জাদুবিদ্যার সঙ্গে জড়িত থাকলেও, মঞ্চে জাদু প্রদর্শনের ব্যাপারে প্রথম এগিয়ে আসেন প্রতুল চন্দ্র সরকারই। তিনি সরকার পরিবারের সপ্তম পুরুষ। পূর্ববঙ্গের টাঙ্গাইলের আশকপুর গ্রামে ১৯১৩ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি জন্ম। মা কুসুমকামিনী দেবী, বাবা ভগবানচন্দ্র সরকার। বাবা জাদুবিদ্যায় পারদর্শী হলেও মঞ্চে জাদু প্রদর্শন করেননি, সামাজিক কারণে। (P C Sarkar)
আরও পড়ুন: ‘আমি কৃত্রিম বুদ্ধি নিয়ে জন্মেছি’
ছোটবেলা থেকে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে নিজের শিক্ষাকেই সম্বল করেছিলেন প্রতুল চন্দ্র। দেশভাগের সময়ে কলকাতায় পাকাপাকি ভাবে চলে এসে বসবাস শুরু করেন। তবে, তার অনেক আগে থেকে কলকাতা ছিল কিশোর প্রতুলের পড়াশোনার জায়গা। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত নিয়ে পড়াশোনাও শুরু করেন। কিন্তু তাঁর সর্বক্ষণের ধ্যানধারণা ছিল ম্যাজিক দেখানো। (P C Sarkar)

মানুষের শ্রেষ্ঠ ইন্দ্রিয় চোখের সামনেই তাঁর মায়াবি জাল বিস্তার করে। এভাবেই নিজের প্রদর্শনী এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁর দলের নাম ‘ভারতীয় ইন্দ্রজাল’। এই প্রদর্শনী দল নিয়ে তিনি দাপিয়ে বেড়িয়েছেন দেশে-বিদেশে। অতীতে এক সময়ে কলকাতার নিউ এম্পায়ার থিয়েটার ছিল ব্রিটিশদের মনোরঞ্জনের ঠিকানা। সেখানে দিনের পর দিন হাউসফুল ইন্দ্রজাল প্রদর্শন করেছেন, আর অগণিত মানুষের ভালবাসা পেয়েছেন। দেশের মধ্যেই বিভিন্ন প্রদেশে ইন্দ্রজাল প্রদর্শন করেছেন সফলভাবে। (P C Sarkar)
তাঁর জাপান যাত্রা দিয়েই ইন্দ্রজাল প্রদর্শনে সাফল্যের শুরু। ১৯৫০ সালের আগস্টে লন্ডনে, ও তারপর শিকাগো শহরে মঞ্চজাদু প্রদর্শন করেন। পরে, ওই একই বছরের ৬ জুলাই প্যারিস শহরে চোখ বেঁধে সাইকেল চালিয়ে সাড়া ফেলে দেন বিশ্বে। (P C Sarkar)

১৯৫১ সালে দিনের পর দিন মায়ানমারের রেঙ্গুনে ও সিঙ্গাপুরে হাউস ফুল শো করেছেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলি হয়ে উঠেছিল তাঁর ম্যাজিকের পিয়াসী। ১৯৫২ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে থাইল্যান্ড ও ব্যাংককে ইন্দ্রজাল প্রদর্শন করে দেশে ফেরেন। ১৯৫৫ সালের প্রথম দিকে বেলজিয়াম, ডিসেম্বর মাসে ফের প্যারিসে সফলভাবে দেখানো হয় শো। (P C Sarkar)
লোক ঠকানো বা কুসংস্কারের সঙ্গে ম্যাজিকের যে সম্পর্ক নেই, তা প্রমাণ করেন বারবার। ১৯৫৬ সালের ৯ এপ্রিল লন্ডনের বিবিসি-র অনুষ্ঠানে সরাসরি ম্যাজিক দেখিয়ে তাক লাগিয়ে দেন বিশ্ববাসীকে।
১৯৫৬ সালের ৯ এপ্রিল লন্ডনের বিবিসি-র অনুষ্ঠানে সরাসরি ম্যাজিক দেখিয়ে তাক লাগিয়ে দেন বিশ্ববাসীকে। লোক ঠকানো বা কুসংস্কারের সঙ্গে ম্যাজিকের যে সম্পর্ক নেই, তা প্রমাণ করেন বারবার। ১৯৬০-এর জুলাই মাসে আমেরিকার বোস্টন শহরে ‘বিশ্ব ম্যাজিক কংগ্রেস’ সম্মেলনে পৃথিবীর স্বনামধন্য সব জাদুকরদের সামনে নিজের চোখ ধাঁধানো ইন্দ্রজাল প্রদর্শনী মঞ্চস্থ করেন। (P C Sarkar)

সোভিয়েত রাশিয়া ও ভারতবর্ষের মধ্যে সংস্কৃতি বিনিময়ের অন্যতম অঙ্গ মস্কোতে ১৯৬২ সালের আগস্ট মাসে ইন্দ্রজাল প্রদর্শন করেছেন প্রতুল চন্দ্র। জাপান ছিল তাঁর কাছে বিশেষ পছন্দের দেশ। সময় সুযোগ পেলেই সেখানে ছুটে যেতেন ম্যাজিক দেখানোর জন্য। ইরানের তেহেরান, ইজিপ্টের কায়রো, নাইরোবি, তাঞ্জানিয়া, জাঞ্জিবারেও জাদু প্রদর্শন করেছেন। (P C Sarkar)
ইন্দ্রজাল প্রদর্শনের জন্য কুড়ি টন সরঞ্জাম ও কুড়ি জন সহকারী কমবেশি তাঁর সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরেছে। জাদুমঞ্চে এক সময়ে মহিলাদের অভাবের জন্য বিদেশ থেকে মহিলা শিল্পী এনে জাদু প্রদর্শনী করেন। পরে নিজের নিকটজনদেরকে মঞ্চে হাজির করে প্রথা ভাঙেন তিনি। (P C Sarkar)

তাঁর এক্সরে আই, করাত দিয়ে মানুষ কাটা, ওয়াটার অফ ইন্ডিয়া, ইলাস্টিক লেডি ইলুউশন, কামানের মধ্যে মানুষ অদৃশ্য এসব খেলা অগণিত দর্শককে চমকে দিয়েছে। প্রথম সারির পত্রপত্রিকায় বিজ্ঞাপন, পোস্টার, পুস্তিকা, প্রচারপত্র ছাপিয়ে মঞ্চ শিল্পের নজির সৃষ্টি করেন তিনি।(P C Sarkar)
বাংলা, ইংরাজি, হিন্দি তিন ভাষাতেই লেখালেখি করেছেন। ম্যাজিক কৌশল, দেশ ভ্রমণ, ছোট গল্প এসব সৃষ্টিতেও সমান পারদর্শী ছিলেন প্রতুল চন্দ্র সরকার।
শুধু মঞ্চে জাদু প্রদর্শন নয়, রীতিমতো তা নিয়ে গবেষণা ও চর্চা চালিয়ে গিয়েছেন। লেখালেখির জগতে তাঁর দক্ষতা ছিল ভূয়সী প্রশংসনীয়। ছোটদের জন্য নিয়মিত লিখতেন। এছাড়াও ম্যাজিক কৌশল, দেশ ভ্রমণ, ছোট গল্প এসব সৃষ্টিতেও সমান পারদর্শী ছিলেন প্রতুল চন্দ্র সরকার। বাংলা, ইংরাজি, হিন্দি তিন ভাষাতেই লেখালেখি করেছেন। (P C Sarkar)

বাঙালির প্রিয় পি সি সরকারের উত্তরণের পথ খুব সহজ সরল ছিল না। খ্যাতির পাশাপাশি তাঁর শত্রুও ছিল। ফ্রান্সে, একবার জার্মানির জাদুকর হেলমুট স্ক্রুবারের জঘন্য আক্রমণের সামনে পড়েন প্রতুল চন্দ্র। কিন্তু নিজের বুদ্ধিমত্তায় সেবার বিপদমুক্ত হন। হংকং এ জাদুকর লাইয়েল, তাঁর শো প্রদর্শনীর সামনে মুখ থুবড়ে পড়ার পর, শত্রুতা করতে শুরু করেন। তবে এইসব কিছুই হেলায় দুরমুশ করেছেন তিনি। তাঁর দূরদর্শিতা, বুদ্ধিমত্তায় ধরাশায়ী হয়েছে কুচক্রীরা। (P C Sarkar)

প্রতুল চন্দ্র সরকার ছিলেন অল ইণ্ডিয়া ম্যাজিক সার্কেলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। সাংগঠনিক দিক থেকেও তাঁর সাফল্য ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর সকল জাদু প্রদর্শনেই ভারতীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ফুটে উঠত। ১৯৪৩ সালে ‘বাংলা সরকার’ থেকে ‘গভর্নর মেডেলিয়ান’ সম্মানে তিনি সম্মানিত হন। সর্বশ্রেষ্ঠ জাদু প্রদর্শনের জন্য নিউ ইয়র্ক থেকে দুবার ম্যাজিক জগতের নোবেল সম্মান ‘দি ফিনিক্স অ্যাওয়ার্ড’ পান। পৃথিবীতে সর্বপ্রথম ‘গোল্ডবার’ পুরষ্কার, জার্মানি থেকে ‘সুবর্ণ লরেল মালা’ তেও সম্মানিত হয়েছিলেন তিনিই। (P C Sarkar)

১৯৬৪ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে সম্মানিত করে। সাধারণ জনগণ থেকে দেশের রাষ্ট্রপ্রধান সকলের কাছেই আজও তিনি প্রণম্য। দেহত্যাগের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্তই নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন জাদুবিদ্যার জন্য। ১৯৭১ সালের ৬ ই জানুয়ারি জাপানের হোক্কাইডো দ্বীপের সিবেতসু শহরে তিনি দেহত্যাগ করেন। শতবর্ষ পেরিয়ে এসেও কোনও অতি বাস্তবতার বিষয় আমাদের সামনে এলেই ‘জাদুসম্রাট পি সি সরকার’, নামটাই মন জানান দেয়। তাই, স্বীকার করতেই হয় জাদুসম্রাট চিরকালীন। (P C Sarkar)
এখানে ব্যবহৃত সমস্ত ছবি লেখকের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
সংগ্ৰাহক ও সুন্দরবন বিষয়ক গবেষক,
ফোকলোর বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
