Protiva Bose Birthday Tribute Video
“সুদীর্ঘ আয়ুর রাস্তা ধরে হেঁটে হেঁটে প্রায় গন্তব্যের দরজায় এসে পিছন ফিরে তাকিয়ে মনে হচ্ছে জীবনটা একটা স্মৃতির স্তূপ মাত্র। মধ্য জীবনটা সংসারের চাপে যখন গমগম করে তখন শৈশব-কৈশোরের কথা ভুলে যাই, ভুলে থাকি। সন্তান-সন্ততির শৈশব কৈশোরে, যৌবনে উত্তীর্ণ করতেই ব্যস্ত থাকি। তারপর ধীরে ধীরে কোলাহল থেমে আসে আর মনের পর্দায় সেই ভুলে যাওয়া, ভুলে থাকা ছবিগুলো একের পর এক জলছবির মতোই ফুটে উঠে যবনিকা উত্তোলন করে।”
এভাবেই তিনি শুরু করেছেন তাঁর স্মৃতি কথা। জীবনের জলছবি। জীবন তাঁকে নানা পথ দেখিয়েছে, কখনো তা মধুর, মসৃণ, কখনো কাঁটায় মোড়া। কিন্তু সুদৃঢ় মননশীল মন তাঁকে রক্ষা করেছে, আগলে রেখেছে। সুকন্ঠী গায়িকা থেকে তিনি অনায়াসে হয়ে উঠেছিলেন সংবেদনশীল লেখিকা। কখনও তিনি রানু সোম কখনও আবার প্রতিভা বসু।
প্রতিভা বসুর ডাকনাম ছিল রানু। ১৯১৫ সালের ১৩ই মার্চ ঢাকা জেলার বিক্রমপুর পরগনার হাঁসাড়া গ্রামে তাঁর জন্ম। বাবা আশুতোষ সোমের বদলির চাকরি ছিল, পেশায় কৃষি-আধিকারিক। সে সময়ের নিরিখে যথেষ্ট স্বাধীনচেতা মনোভাব নিয়েই বড় করা হয়েছিল প্রতিভা বসুকে। ঢাকার কনভেন্ট স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। গান-বাজনার শখ ছিল ছোট থেকেই। শৈশবে ঢাকা শহরে সংগীতশিল্পী হিসেবে পরিচিত নাম ছিল কিন্নরকণ্ঠী ‘রানু সোম’।
চারু দত্ত, মেহেদী হাসান ভোলানাথ মহারাজের মত গুণী শিল্পীদের কাছে গান শিখেছেন। সংগীতের সূত্রেই দিলীপ কুমার রায়, কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মত প্রণম্য ব্যক্তিদের সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন। ১১ বছর বয়সে প্রথম গান রেকর্ড করেছিলেন। এক সময় গ্রামাফোন কোম্পানির সঙ্গে এক বছরে ছটি রেকর্ড অর্থাৎ ১২টি গানের চুক্তিতে আবদ্ধ ছিলেন তিনি।
ভিডিও: বাংলা কথাসাহিত্যের হীরে-‘মানিক’ – জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য
দেশের অস্থির সময়ে স্বাধীনতা আন্দোলন, বিপ্লবীদের আত্ম-বলিদান, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, সাম্প্রদায়িক হিংসা সব কিছুরই সাক্ষী থেকেছেন প্রতিভা বসু। এইসব অভিজ্ঞতাই ফুটে উঠেছে তাঁর রচনায়, গল্পে, উপন্যাসে। সাহিত্যের অঙ্গনে প্রতিভা বসুর আবির্ভাবও হয়েছিল অন্যরকমভাবে।
ঢাকাতেই আলাপ হয়েছিল সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে। ১৯৩৪ সালের ১৯শে জুলাই বিয়ে হয় তাঁদের। বিয়ের পর কয়েক মাসের মধ্যেই গানের চর্চা বন্ধ হয়ে যায় প্রতিভা বসুর। এই প্রসঙ্গে বুদ্ধদেব বসু লিখেছেন “বিয়ের পর কয়েক বছরের মধ্যেই রানুর গানের চর্চা শুকিয়ে গেল, সে তোড়-জোড় বেঁধে শুরু করেছিল কয়েকবার, কিন্তু চালাতে পারেনি।” গানের প্রশিক্ষকের বেতন জোগাতে গিয়ে বাজারের খরচে টান পড়তো।
সাংসারিক জীবন তাঁর সুরের প্রতি অনুরাগকে ব্যাহত করে। সঙ্গীতশিল্পের পথ বন্ধ হলেও, খুলে যায় এক অন্য সৃজনশীলতার পথ। ছোটবেলায় লেখালেখির অভ্যাস ছিল। ধারাবাহিকভাবে লেখালেখির জগতে আসেন তিনি। মেয়েবেলায় নবশক্তি নামের সাপ্তাহিক পত্রিকায় প্রথমবার ছোটগল্প লিখেছিলেন। তারপর ১৯৪০ সালে তাঁর প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছিল, মনোলিনা। প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল ভারতবর্ষ পত্রিকায়।
তাঁর জীবনের পথ বরাবর চড়াই-উৎরাইতে ভরা ছিল। ঘটনাবহুল জীবনই গড়ে দিয়েছিল অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি। প্রতিভা বসুর গল্প, উপন্যাসেও নারীচরিত্ররা জীবনের অজানা পথের সন্ধান করেছেন। নারীর জীবনযন্ত্রণা আলোচনায় তাঁর অসামান্য দক্ষতা প্রকাশ পেয়েছে। পুরুষতন্ত্রের কঠিন নিয়মকে প্রশ্ন করেছে তাঁর লেখনী। তবে পুরুষের প্রতি সহানুভূতিশীল থেকেও নারী জীবনকে তাঁর অসাধারণ কলমে ফুটিয়ে তুলেছেন।
ভিডিও: লীলা-আলেখ্য – জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য
প্রায় ৪৫টি উপন্যাস লিখেছেন। এছাড়াও অসংখ্য ছোটগল্প, ভ্রমনকাহিনি, স্মৃতিকথা, গদ্যগ্রন্থ লিখেছেন। সাহিত্যকীর্তির জন্য অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। লীলা পুরস্কার ,আনন্দ পুরস্কার এবং জগত্তারিণী স্বর্ণপদকেরর মত পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁর গল্প, উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি হয়েছে আলো আমার আলো, অতল জলের আহবান-এর মত সিনেমা।
প্রতিভা বসুর জীবনের আরেকটি অনালোচিত দিক তাঁর স্বদেশ প্রেম। সংগীত আর সাহিত্য ছাড়াও দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন অল্প বয়সে। বিপ্লবী লীলা নাগ ছিলেন তাঁর আদর্শ। চট্টগ্রামের অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের অন্যতম নায়ক অনন্ত সিংহের ফাঁসি রদ করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন গান গেয়ে। পরবর্তীকালে প্রতিভা বসুর সৃষ্টি করা নারী চরিত্রেও লীলাদির প্রভাব দেখা গেছে।
জীবন তাঁকে আলো মাখা দিন দেখালেও, মৃত্যুভার সহ্য করতে হয়েছে। স্বামীর মৃত্যু তাঁকে শোকগ্রস্ত করে তুলেছিল। পুত্রশোকের যন্ত্রণাও সহ্য করেছেন। তবুও প্রতিভা বসু জীবনবিমুখ হননি। মনোবল হারাননি। জীবনের যাবতীয় দুঃখ-কষ্টের ভার সহ্য করেও অবিচল থেকেছেন। শেষ দিকে শান্তিনিকেতনের বাড়িতে নিজের নির্দিষ্ট ঘেরাটোপে থাকতেই ভালবাসতেন। জীবনের প্রতি তাঁর সুদৃঢ় অথচ আশ্চর্য দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে অনন্য করেছে। আজ তাঁর জন্মদিনে আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য।
বাংলালাইভ একটি সুপরিচিত ও জনপ্রিয় ওয়েবপত্রিকা। তবে পত্রিকা প্রকাশনা ছাড়াও আরও নানাবিধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে থাকে বাংলালাইভ। বহু অনুষ্ঠানে ওয়েব পার্টনার হিসেবে কাজ করে। সেই ভিডিও পাঠক-দর্শকরা দেখতে পান বাংলালাইভের পোর্টালে,ফেসবুক পাতায় বা বাংলালাইভ ইউটিউব চ্যানেলে।
