(Rahul Purakayastha)
মানুষ ফিরে গেলে কেমন স্তব্ধ হয়ে যাই আমি! তাকে নিয়ে কোনও শব্দ আসে না। আসে না স্মৃতিচারণ! একের পর এক আমন্ত্রণ আসে, বিশেষ সংখ্যা ছেপে চলে আসে, তাতে নামও রয়ে যায় সূচিপত্রে, অথচ মানুষটির অনুপস্থিতির মতোই শূন্য স্থান জুড়ে থাকে আমার লেখা।
এই দাদাসর্বস্ব বাংলাসাহিত্যে একমাত্র মামা হয়ে জ্বলেছিলেন রাহুল পুরকায়স্থ। তাঁকে মামা ডাকতাম আমার বন্ধু অরিত্রর সূত্রে। আর তিনিই সেই বিরল মামা, যাঁর সঙ্গে আমার মায়ের পরিচয় হয়নি কোনওদিনও! রাহুল মামার সঙ্গে অদ্ভুত এক আলাপ আমার! পারিবারিক অনুষ্ঠান, সাহিত্যসভা আর বেলঘরিয়ায় একইমাসে দেখা ও পরিচয়। হাইজেনবার্গের থিওরি মনে পড়ে যায়!
আরও পড়ুন: মেলার সাক্ষী চাতাল…
আমরা তখন পত্রিকার গর্বে মধ্যগগনে! লেখার পর লেখা বেরিয়ে চলেছে এদিক সেদিক! আমাদের দলগত যাপনে হিংসা ছুঁড়ে মারছে সতীর্থরা! আর একইসঙ্গে প্রবীণদের খানিক অস্বীকার করতে শিখছি ধীরে ধীরে। তবু মনের কোণে কিছু মানুষের প্রতি দুর্বলতা রয়ে যায়। কেউ কেউ কবি থেকে আত্মীয় হয়ে ওঠেন ধীরে। এমনই এক আশ্রয় ছিল তাঁর বেলঘরিয়ার ফ্ল্যাটটি। যেকোনও বাহানায় একটা ফোন করে হাজির হওয়া যেত সেখানে। (Rahul Purakayastha)
বইমেলায় নিয়ম করে আমাদের টেবিলে আসতেন তিনি। দু’চারটে মজার কথা বলতেন, কিছু ইয়ার্কি, তারপর দখল হয়ে যেতেন অন্যান্য স্নেহভাজনদের হাতে। আমরা বেলঘরিয়ার আধিপত্যটুকু নিয়েই খুশি হয়ে থাকতাম! কলকাতায় কে দখল করল তাঁকে, সে মাথাব্যথা কোনওদিনই ছিঁড়ে খায়নি আমাদের। (Rahul Purakayastha)

সম্ভবত ২০১৫ সাল, এক আত্মীয়ের শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে গেছি বাবার সঙ্গে, সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছেন শঙ্খবাবু, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তরা… রাহুল পুরকায়স্থ তখনও মামা হয়ে ওঠেননি আমার। হাতে খাবারের থালা নিয়ে দাঁড়িয়ে দেখছেন, সেই অনুষ্ঠানে সিন ক্রিয়েট করছেন এক ভদ্রলোক, কেন তাঁর বাবার শ্রাদ্ধ করছেন তাঁর সহোদরা! বোনের কামানো মাথায় হাত দিচ্ছেন আর অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করছেন নিজের পিতাকে! রাহুলমামা অপলক চেয়ে আছেন সেদিকে, তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে আমি, চোখে চোখ পড়তেই জড়ানো গলায় বললেন, ‘একটা লাড্ডু দিয়ে লাথি মেরে বার করে দে!’ আমি বুঝতে না পারায় আরও একবার রিপিট করলেন সেই কথা! তারপর গম্ভীর মুখে খাওয়ায় মন দিলেন তিনি! (Rahul Purakayastha)
এরপর ক্রমশ ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে তাঁর সঙ্গে, তাঁর লেখার সঙ্গে, দিনের পর দিন দেওয়ালে হেলান দিয়ে, পড়ার ঘরের মেঝেতে বসে কবিতা শুনেছি তাঁর কাছে। কখনও সঙ্গে তন্ময়, কখনও অরিত্র, কখনও একাই হাজির হয়েছি অন্য কিছু পৌঁছে দেওয়ার ছুঁতোয়। তবে সেসব লেখার মধ্যে খুব কমই নিজের লেখা শুনিয়েছেন তিনি। অধিকাংশই শুনিয়েছেন নিজের পড়ে ভাললাগা লেখা! কখনও মানিক চক্রবর্তী কখনও বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়! মুখস্থ বলে গেছেন একের পর এক লেখা! অবাক হয়েছি দেখে, যেখানে খ্যাতির সঙ্গে মানুষের পড়ার অভ্যাস ব্যাস্তানুপাতিক জেনে এসেছি এতদিন, এই মানুষটি তো তাহলে সেই ব্যাতিক্রমের পর্যায়ে পড়ছেন! তারপর পরিবেশ হালকা হয়ে এলে, প্রশ্ন করেছি বাজারচলতি তাঁর বিশেষ সব কীর্তির গল্প বিষয়ে! শুনেছিলাম জয়দেব বসুর বই সু-র্যাকে রাখা দেখে এক কবির বিছানায় ঘুরে ঘুরে হিসি করে দিয়েছিলেন তিনি। এই ঘটনা জিজ্ঞাসা করতেই খুব লজ্জার সঙ্গে জানান একদম মিথ্যা অপবাদ এটি! উনি দাঁড়িয়ে করেছিলেন, ঘুরে ঘুরে নয়! (Rahul Purakayastha)
যাঁরা অভিমান নয়, বরং হাসতে হাসতে তরুণদের জানিয়ে দিতে পারে, রণজিৎ দাশ তাঁর ‘আমার সামাজিক ভূমিকা’ পড়ে বলেছিলেন বুঝতে পারেননি কিছুই! বলেই একগাল হেসে ভাসিয়ে দেন বইমেলার টেবিল!
বৈশিষ্টের মধ্যে আরও একটি বিষয়, কারোর লেখা ভাল লাগলে, সচরাচর তাঁকে সরাসরি জানাতেন না মামা! জানাতেন তাঁর পরিচিত কাউকে। তাই স্মরণ সভায় যাঁরা এপাশ-ওপাশ সমস্ত মঞ্চ কভার করলেন, আর বললেন রাহুলদা তাঁদের হাজারবার প্রশংসা করেছেন, তাঁদের প্রতি খানিক সন্দেহ রাখলাম! হয়তো কখনও আগ বাড়িয়ে নিজের বই দিতে যাইনি বলেই, এই মানুষটির সামান্যতম প্রশংসা পেতে প্রায় সাত আট বছর লেগে গেল আমারও! (Rahul Purakayastha)
২০১১ থেকে কলকাতা বইমেলায় অংশ নিচ্ছি আমরা! প্রথম দু’বছর অন্য একটি পত্রিকার সঙ্গে, ও ২০১৩ থেকে মাস্তুলের হয়েই শুরু হয় জার্নি। পনেরোটা বছর! নেহাত কম নয়! মেলার জায়গা বদল দেখলাম, সময় বদল দেখলাম, অভ্যাস বদলও দেখলাম। দেখলাম মেলায় রঙিন ছাতা খুলে ভেজা গায়ে পাঠককে বই কিনতে, দমকলের গাড়ির পিছনে লুকিয়ে সিগারেট-মদ খেতে দেখলাম চেনা মুখগুলোকে! আরও কত কী! মারপিট, বইচুরি করতে গিয়ে ধরা পড়া, প্রচণ্ড মার অথবা বইটি তাকে দিয়েই বিক্রি করানো! (Rahul Purakayastha)

পরিচিত বইচোর বন্ধু টেবিলে এসে দাঁড়ালে যে দুশ্চিন্তা কাজ করে, সেও তো দেখলাম বহু বছর ধরে! তার প্রেমিকার করুণ মুখ এখন অন্যের সংসারে হাসি হয়ে উজ্জ্বল হয়ে আছে! সেও তো বেলঘরিয়াই দিল আমাকে! ক্রমশ নিজের জায়গা ভেবে বসলাম বইমেলাকে, আর এই উৎসবকে আরও আরও রঙিন করে তুলল রাহুল পুরকায়স্থর মতো রঙিন মানুষগুলি… (Rahul Purakayastha)
যাঁরা অভিমান নয়, বরং হাসতে হাসতে তরুণদের জানিয়ে দিতে পারে, রণজিৎ দাশ তাঁর ‘আমার সামাজিক ভূমিকা’ পড়ে বলেছিলেন বুঝতে পারেননি কিছুই! বলেই একগাল হেসে ভাসিয়ে দেন বইমেলার টেবিল! সাদা নীল রঙের এই বিশাল প্যান্ডেল কেঁপে ওঠে তাঁর কঠিন হাসিতে। যে মানুষটির জিজ্ঞাসার দিক নিয়ে কাল্টিভেট করাই যেত, তাঁর উশৃঙ্খলতাকেই সারাজীবন হাইলাইট করে গেলেন কাছের কিছু বন্ধুরা! এ ক্ষোভ তাঁর তরুণ বন্ধু হিসাবে বুকে পুষে রাখব বহুকাল! (Rahul Purakayastha)
গাড়িতে বসেই দু’কামড় স্যান্ডউইচ খেয়েছেন, সঙ্গে কথা দিয়ে গেছেন, একটা বই মাস্তুলকে দেবেন। পাণ্ডুলিপি সাজাচ্ছেন তিনি। নীল রঙের ব্যালেনো দেখলে এখনও তাই উঁকি দিই ভিতরে, যদি সেই হাত আরও একবার উঠে এসে বলে, ফ্ল্যাটে আয়, কথা আছে…
চলে আসি ২০২৪-এ। নীলগঞ্জ রোডে তখন একটি ছোট্ট ঘরে, ঘরোয়া ক্যাফে খুলেছি পাঁচ বন্ধুতে মিলে। সে ক্যাফে মামার বাড়ি থেকে সামান্যই দূরে, তাই অসুস্থ শরীরেও বারংবার এসে দায়িত্ব পালন করে গেছেন সেখানে। সে দায়িত্ব এতটাই গুরুতর মনে করেছেন, যে হাসপাতাল থেকে ছুটি পেয়ে বাড়ি ঢোকার আগেও ঘুরে গেছেন আমাদের ক্যাফেতে। গাড়িতে বসেই দু’কামড় স্যান্ডউইচ খেয়েছেন, সঙ্গে কথা দিয়ে গেছেন, একটা বই মাস্তুলকে দেবেন। পাণ্ডুলিপি সাজাচ্ছেন তিনি। নীল রঙের ব্যালেনো দেখলে এখনও তাই উঁকি দিই ভিতরে, যদি সেই হাত আরও একবার উঠে এসে বলে, ফ্ল্যাটে আয়, কথা আছে… (Rahul Purakayastha)

২০১৮ থেকে বার তিনেক যমের দরজায় মূত্রত্যাগ করে ফিরে এসেছেন তিনি! ঘুরে ঘুরে না দাঁড়িয়ে করেছেন সে বিষয়ে অবশ্য আলোচনা হয়নি আমাদের! এমন এক লড়াকু মানুষের মৃত্যু হতে পারে, সে কথা বোধহয় ভুলতে বসেছিলাম। আর তাই ভাল-মন্দ অনেক স্মৃতিই তেমন যত্নে রাখিনি আর। থাকার মধ্যে রয়ে গেছে তাঁর দেওয়া একটি কথা, ‘আমার শেষ কবিতার বই তোরাই করবি’। এমন একটা কথা সত্যি করে দিয়ে চলে গেলেন তিনি। ভরা বর্ষায়, দমদমের হাঁটুজল সাবওয়ে পেরিয়ে যখন যাচ্ছি নাগেরবাজার, তখনও ভেবে যাচ্ছি ফিরেই তো আসতে পারত এবারও! কতবারই তো পেরেছে! অমন এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের দিনেও প্রায় মেলার মতো লোক হয়েছিল সেখানে। হাসপাতালে, কর্মক্ষেত্রে, রতনবাবুর ঘাটে। (Rahul Purakayastha)
বিয়ের উপহার হিসাবে পাণ্ডুলিপিটা দেবেন ঠিক করেছিলেন। কিন্তু সে সৌভাগ্য হল না আমার। পরে একদিন গিয়ে নিয়ে এলাম। সে বই হল বটে, তবে বেশিদিন পেল না কবিকে। একটা মাত্র মেলা! তাতেও যথেষ্ট সময় দিলেন আমাদের টেবিলে। এলেন, বসলেন, হাতে নিয়ে নিজের লেখাই পড়লেন আর আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোদের কেমন লাগল বল? (Rahul Purakayastha)
৫৫ নম্বর টেবিলে শুয়ে আছে প্রচ্ছদে তাঁর প্রতিকৃতি। যে ছবি দেখে কবি বলেছিলেন, জীবনবিজ্ঞানের বই ভাববে না তো লোকে? যে বই তাঁর কথায় হলুদ পাতায় ছাপা হয়েছিল! যে বই কেউ না কিনলেও এতটাই গুরুত্বপূর্ণ রয়ে যাবেন রাহুল পুরকায়স্থ!
‘লেখাগুলি আমাকেই বলে’, জীবনের শেষ বই বোধহয় সত্যিই তাঁকে কিছু বলেছিল। বলেছিল সংসারে ফিরে আসতে। সমস্ত ক্ষতদাগ, খারাপ বন্ধুত্ব ভুলে, সমস্ত আফসোস ভুলে নিজের কাছে ফিরে আসতে বলেছিল বোধহয়। (Rahul Purakayastha)
বইমেলায় এবার সেই সাদা নীল রঙের প্যান্ডেলের বাইরে তাঁর জ্বলজ্যান্ত মুখ। গোটা প্যাভেলিয়নটি তাঁর নামে নামাঙ্কিত! সেই ছাতার তলায় বসে তাঁর ভাই, বন্ধু, শত্রু, ভাগ্নেরা সবাই একসঙ্গে। মাটির লাল কার্পেটে তাঁর পায়ের শব্দ এখনও গুনগুন করছে। ৫৫ নম্বর টেবিলে শুয়ে আছে প্রচ্ছদে তাঁর প্রতিকৃতি। যে ছবি দেখে কবি বলেছিলেন, জীবনবিজ্ঞানের বই ভাববে না তো লোকে? যে বই তাঁর কথায় হলুদ পাতায় ছাপা হয়েছিল! যে বই কেউ না কিনলেও এতটাই গুরুত্বপূর্ণ রয়ে যাবেন রাহুল পুরকায়স্থ! শ্যামবাজার থেকে সোনাগাছি, খালাসিটোলা থেকে ব্রডওয়ে, মিলনমেলা থেকে করুণাময়ী, একটা লাঠি শুধু হেঁটে যাবে কবির লেখার হাতটা জাপটে ধরে! আর ডান পায়ের থেকে বাঁ পায়ের ছাপ কিছুটা বেশি পড়বে রাস্তায়, রাহুলমামাকে এসব কিছুই কোনওদিন ভাবায়নি তেমন একটা! (Rahul Purakayastha)
চিত্রঋণ- অরিত্র দত্ত
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
আকাশ লিখতে ভালোবাসে, ভালোবাসে গাছপালা আর বাইক রাইড! একসময় খেলাধুলার সঙ্গে কাটিয়েছে এক দশকেরও বেশি সময়। গত বেশ কয়েক বছর ধরে বাংলা পোর্টালে কর্মরত। যদিও মন থেকে ব্যবসার প্রতি এক অদ্ভুত টান আছে তার!
