Tags Posts tagged with "Kolkata Book Fair"

Kolkata Book Fair

কলকাতা বইমেলা মধ্যগগনে । সেই মেলা দেখে এসে এক তরুণী স্টেটাস আপডেট লিখেছেন—‘প্রতিবছর বইমেলা আসে আর আমাকে বুঝিয়ে দেয় আমি কতটা গরিব…’ অর্থাৎ পছন্দের বই দেখে গন্ধ শুঁকে নেড়েচেড়ে আবার যথাস্থানে বইটি রেখে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিরে এসেছেন ।

এই স্টেটাস আপডেট থেকেই স্পষ্ট, পিডিএফ এবং বুক পাইরেসির বাজারে এখনও বাঙালি বইপ্রেমী । হার্ডকপির হার্ড বাইন্ডিং কিংবা পেপারব্যাকেই আস্থা রেখে চলেছে বাঙালি । বইয়ের সঙ্গে এখনও তার সম্পর্ক অটুট । আর সে কারণেই বোধগয় প্রতিদিন কলেজপাড়া আজও সরগরম হয় । দোকানে দোকানে লম্বা লাইন ।

কলেজপাড়া মানে মধ্য কলকাতার কলেজ স্ট্রিট । বইয়ের আঁতুড়ঘর । প্রকাশকদের সারি সারি অফিস আর বিপণি । শতবর্ষ অতিক্রান্ত হলেও এখনও রঙ বদলায়নি কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়া । খোলনলচে আধুনিক হলেও এখনও পুরনো সাদার ওপর কালোর হরফ সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলেছে এশিয়ার এই বৃহৎ বইবাজার । পুরনো কলকাতার জীবন্ত জীবাশ্ম হয়ে বেঁচে আছে কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়া ।

একটা তথ্য অনেকেরই জানা নেই । কলকাতায় সে সময় সক্রিয় লটারি কমিটি ।কলকাতাকে নগর করতে লটারির মাধ্যমে টাকা তুলে রাস্তাঘাট তৈরি করছে লটারি কমিটি । ১৮২২-২৩ সাল নাগাদ লটারি কমিটির টাকায় তৈরি হয় কলেজ স্ট্রিট । এরপর থেকে আর নাম বদলায়নি এই রাস্তার । এখনও কলেজ স্ট্রিট কলেজ স্ট্রিটই । তবে কলেজ স্ট্রিটে কিন্তু আদতে বইপাড়া ছিল না । আর কলকাতার প্রথম বইয়ের দোকানও কলেজ স্ট্রিটে নয় । এমনকি এ বাংলায় বই বিক্রি কিন্তু প্রথমে কলকাতায় শুরু হয়নি ।

শ্রীরামপুরের মিশনারি প্রেসে চাকরি করতে আসেন বহড়া গ্রামের বাসিন্দা গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য । ১৮১৬ সালে চাকরি ছেড়ে তিনি কলকাতার ফেরিস কোম্পানি প্রেস থেকে ছাপেন ‘অন্নদামঙ্গল’। বই বেরোতেই হুহু করে তা বিক্রি হয় । সাফল্য পান গঙ্গাকিশোর । কিন্তু প্রশ্ন হল, কারা কিনলেন ? কোথা থেকে জানতে পারলেন গঙ্গাকিশোরের উদ্যোগ? শোনা যায়, গঙ্গাকিশোর বইয়ের দোকান খুলেছিলেন । কিন্তু কোথায় সে দোকান ? সে সম্পর্কে এখনও পর্যন্ত কোনও তথ্য পায়নি । তবে ‘পুশ সেলিং’ পদ্ধতিতে পরিচিত শিক্ষিত মানুষদের কাছে বই বিক্রিও করে থাকতে পারেন তিনি ।

কলকাতায় প্রখম বইয়ের দোকান লালদীঘির পারে । অর্থাৎ  লালদীঘির পাড়ে ‘সেন্ট অ্যান্ড্রুজ’-এর দোকান । প্রথম ছাপাখানার মালিক অ্যান্ড্রুজই কি এই দোকানের মালিক ? এ নিয়ে অবশ্য নির্দিষ্ট কোনও তথ্য নেই । ১৮১৭  সালে শোভাবাজারের কাছে গরানহাটায় গোরাচাঁদ বসাকের বাড়িতে স্থাপিত হয় হিন্দু কলেজ ( হিন্দু কলেজ বা আজকের প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের সূত্রেই নাম হয় কলেজপাড়া‚ পরে কলেজ স্ট্রিট ) । হিন্দু কলেজ স্থাপনের জন্যই হোক বা অন্য কোনও কারণই হোক, ১৮১৮ সালে বিশ্বনাথ দেব এখানে (পড়ুন কালখানা অঞ্চলে) একটি ছাপাখানা শুরু করলেন ।

আর এই ছাপাখানা বদলে দিল কলকাতার সংস্কৃতি । কীভাবে? সুকুমার সেন লিখছেন, ‘শোভাবাজার কালাখানা অঞ্চলে একটা বড় বনস্পতি ছিল । সেই বটগাছের শানবাঁধানো তলায় তখনকার পুরবাসীদের অনেক কাজ চলত । বসে বিশ্রাম নেওয়া হত । আড্ডা দেওয়া হত । গানবাজনা হত । বইয়ের পসরাও বসত…’ অর্থাৎ বইয়ের মেলা বা বইয়ের হাটের যে ভাবনা, তা কিন্তু বটতলাতেই শুরু হয়েছিল ।

এ প্রসঙ্গে একটা কথা বলা যাক । অনেকেরই একটা ভুল ধারণা আছে । অনেকেই মনে করেন, বটতলার বই মানেই হলুদ সেলোফিনে মোড়া যৌনরসের সস্তা বই । তা কিন্তু মোটেই নয় । শ্রীপান্থ লিখছেন, ‘সত্যি বলতে কী, বিষয় বৈচিত্র্যে বটতলার কোনও তুলনা নেই । ধর্ম, পুরাণ, মহাকাব্য, কাব্য সংগীত, নাটক, কাহিনি, যাত্রার বই (পরে থিয়েটারেরও), পঞ্জিকা, সাময়িকপত্র, শিশুপাঠ্য, চিকিৎসাবিদ্যা, জ্যোতিষ, অভিধান, ভাষাশিক্ষা, কারিগরিবিদ্যা— এমন কোনও বিষয় নেই, যা ছিল বটতলার কাছে অজানা । সংস্কৃত, ফরাসি, উর্দু, ইংরেজি— নানা উৎস থেকে কাহিনি সংগ্রহ করেছেন বটতলার লেখক ও প্রকাশকরা…বটতলা সেদিক থেকে সাধারণ বাঙালির কাছে যেন এক খোলামেলা বিশ্ববিদ্যালয়, আজকের ভাষায় যাকে বলে ওপেন ইউনিভার্সিটি।’

রবি ঠাকুরও জানিয়েছেন সে কথা। তাঁর কাব্যে তিনি জানিয়েছেন, তিনি বটতলা থেকে
প্রকাশিত রামায়ণ পড়েছেন—

” কৃত্তিবাসী রামায়ণ সে বটতলাতে ছাপা,
দিদিমায়ের বালিশ-তলায় চাপা।
আলগা মলিন পাতাগুলি, দাগি তাহার মলাট
দিদিমায়ের মতোই যেন বলি-পড়া ললাট।
মায়ের ঘরের চৌকাঠেতে বারান্দার এক কোণে
দিন-ফুরানো ক্ষীণ আলোতে পড়েছি একমনে।”

এবার আসা যাক বইয়ের ব্যবসার কথায় । বটতলা সর্বজনীন করে দিয়েছিল বাংলা বইকে । আর শোভাবাজারের বটতলা ছড়িয়ে পড়েছিল কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় । সুকুমার সেন লিখছেন, ‘ব্যাঙের ছাতার মতো অসংখ্য ছোট সস্তার প্রেস গড়ে ওঠে——যার চৌহদ্দি ছিল দক্ষিণে বিডন স্ট্রিট ও নিমতলা ঘাট স্ট্রিট, পশ্চিমে স্ট্র্যান্ড রোড, উত্তরে শ্যামবাজার স্ট্রিট এবং পূর্বে কর্নওয়ালিশ স্ট্রিট…’ শুধু তাই নয়, বটতলার বইয়ের ব্যাপ্তি ছিল আজকের বাংলাদেশের ঢাকাতেও । ঢাকার চকবাজারে গড়ে উঠেছিল কেতাবপট্টি । আর বটতলার ভৌগোলিক ব্যাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে বই বিক্রি এবং বই ছাপার
হার বেড়ে গিয়েছিল কয়েক গুণ ।

সব থেকে বড় কথা, ১৮১৭ থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত বই বিক্রির হার এবং বই ছাপার হার দেখলে স্পষ্ট, শুধুমাত্র বটতলার বই পড়তেন উচ্চবিত্ত বাঙালি, এমনটা কিন্তু মোটেই নয় । সাধারণ মানুষ যদি না বই কিনতেন তাহলে বই বিক্রির হার এই কয়েক বছরে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ত না । আর বইয়ের বাজার এবং বই ব্যবসাকে পথ দেখায় এই বটতলা ।

এবার ফেরা যাক কলেজ স্ট্রিটের কথায় । কলেজ স্ট্রিট এলাকায় পাকা বাড়িতে চলে আসে হিন্দু কলেজ, সংস্কৃত কলেজ । এই দুই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংখ্যাও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে । সে সময় ছাত্রদের পাঠ্য বই প্রয়োজন। তাই কলেজ স্ট্রিটে প্রথম ছাত্রদের জন্য পাঠ্য বইয়ের দোকান ‘ক্যালকাটা স্কুলবুক সোসাইটি’। কোথায় এবং কত সাল পর্যন্ত এই দোকান চলেছিল, সে সম্পর্কে অবশ্য প্রামাণ্য কোনও দলিল মেলেনি ।

‘ক্যালকাটা স্কুলবুক সোসাইটি’ চালু হলেও কলেজ স্ট্রিটের পাঠ্যবই ব্যবসা কিন্তু প্রাণ পায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মশাইয়ের হাত ধরেই । সংস্কৃত কলেজের শিক্ষক হওয়ার পর পাঠ্যবইয়ের ছাপাখানা এবং দোকানের ভাবনাটা মাথায় আসে বিদ্যাসাগরের । ১৮৪৭ সালে সহকর্মী মদনমোহন তর্কালঙ্কারের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি শুরু করেন সংস্কৃত প্রেস । সংস্কৃত কলেজের বিপণি গড়ে ওঠে সংস্কৃত কলেজের কাছেই । জানা গিয়েছে, সেই বইয়ের দোকানের নাম ছিল ‘সংস্কৃত প্রেস ডিপোজিটরি’। বিদ্যাসাগরের বই বিপণি কতদিন পর্যন্ত চলেছিল, সে সম্পর্কে নির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি । তবে কলেজ স্ট্রিটের বই ব্যবসা যে তাঁর উৎসাহে শুরু হয়েছিল এ কথা উল্লেখযোগ্য ।

বিদ্যাসাগর মহাশয় ছিলেন বই ব্যবসার পথিকৃৎ । এবং কলেজ স্ট্রিট যে ভবিষ্যতে বইব্যবসার অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠবে তা বুঝতে পেরেছিলেন তিনি । ধীরে ধীরে কলেজ স্ট্রিটেই গড়ে ওঠে প্রেসিডেন্সি কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ । এই কলেজ স্ট্রিটেই তৈরি হয় ছাত্রদের আবাসন । আর ছাত্র যেখানে, সেখানে যে বইয়ের ব্যবসার রমরমা হবে, এ তো স্বাভাবিক । কলেজ স্ট্রিটে ছাত্রদের মধ্যে বইয়ের চাহিদা এমন পর্যায়ে পৌঁছল যে গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় নামে এক ব্যক্তি হিন্দু হস্টেলের সিঁড়িতে বসে বই বিক্রি শুরু করলেন ।

গুরুদাসের সব বই অবশ্যই ছিল মেডিক্যালের বই । কথায় আছে বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী । গুরুদাসের সরস্বতী ব্যবসায় লক্ষ্মীলাভ হল । ১৮৮৩ সালে তিনি একটি বইয়ের দোকান খোলেন—‘বেঙ্গল মেডিক্যাল লাইব্রেরি’। নাম শুনেই বোঝা যায় সেই দোকানে বিক্রি হতো ডাক্তারির বই । বিদ্যাসাগর মশাইয়ের অনুপ্রেরণায় রামতনু লাহিড়ির ছেলে শরৎকুমার লাহিড়ি সে বছরই ‘এস কে লাহিড়ি অ্যান্ড কোম্পানি’ খোলেন এই কলেজ স্ট্রিটেই ।

খুব অল্প দিনেই কলেজ স্ট্রিট হয়ে ওঠে ব্যবসার জন্য বেশ লোভনীয় । এমনকি কলকাতার অনেক দূরে থেকেও কলেজ স্ট্রিটে বইয়ের দোকান দেওয়াটা শিক্ষিত তরুণদের অনেকেরই ‘aim in life’ হয়ে দাঁড়ায় । এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনার উল্লেখ করা যাক । কালিয়া গ্রামের বাসিন্দা গিরিশচন্দ্র দাশগুপ্ত খুলনা থেকে স্টিমারে কলকাতায় আসার সময় তাঁর বন্ধু মহেশচন্দ্র ভট্টাচার্যকে (পরবর্তীকালে বিখ্যাত চিকিৎসক) জানাচ্ছেন, কলেজস্ট্রিটে তাঁর একটি দোকান দেওয়ার ইচ্ছার কথা । গিরিশ্চন্দ্রকে উৎসাহ দিয়েছিলেন মহেশচন্দ্র । আর বন্ধুর উৎসাহে কলেজ স্ট্রিটে ১৮৮৬ সালে দোকান খুলে বসেন গিরিশ্চন্দ্র। দোকানের নাম দেন, ‘দাশগুপ্ত অ্যান্ড কোম্পানি’। সে সময় মাত্র চৌত্রিশটি বই নিয়ে দোকান দেন গিরিশচন্দ্র । আজ কয়েক হাজার বই নিয়ে বিকিকিনি করেন গিরিশচন্দ্রের উত্তরপুরুষরা । ১৬৩ বছরের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আজও আছে ‘দাশগুপ্ত অ্যান্ড কোম্পানি’। এই কলেজ স্ট্রিটেই ।

১৮৮০-এর দশকে যে কলেজ স্ট্রিটের চেহারার বর্ণণা দিলাম, সেই কলেজ স্ট্রিট কিন্তু আজকের কলেজ স্ট্রিট নয় । ধীরে ধীরে কলেজ স্ট্রিট বেড়ে উঠতে থাকে ১৮৯০-এর দশক থেকে । তথ্য বলছে, ১৮৯৯ সালে কলেজ স্ট্রিটে বইয়ের দোকানের সংখ্যা ৩৬। আর সম্পূর্ণ বই বাজার হিসেবে কলেজ স্ট্রিট যৌবনপ্রাপ্ত হয় ১৯৩০-৪০-এর দশকে । শোনা যায়, তখন বেশ সরগরম কলেজ পাড়া । পরবর্তী সময়ে বই ব্যবসায় এসেছেন লেখকরা । গজেন্দ্র কুমার মিত্র থেকে শুরু করে সমরেশ বসু, অনেকেই এসেছেন বইয়ের ব্যবসায় । আর যেহেতু কলেজ স্ট্রিট ছিল সাহিত্যকর্মীদের বই ব্যবসার আড়ত, সে কারণে কলেজ স্ট্রিটে প্রতি সন্ধ্যাতেই কবি-সাহিত্যিকদের আড্ডা বসত । এক একটি বইয়ের দোকানকে কেন্দ্র করে বসত আড্ডার আসর ।

এখন আর সেরকম গমগমে আড্ডা নেই । তবে কলেজ স্ট্রিট এখনও গমগম করে । এখনও ফুটপাথ দিয়ে পথ চলা দায় । দশ হাজারেরও বেশি দোকান এই কলেজ স্ট্রিটে । এই বুঝি কেউ টেনে বসবেন, ‘কোন বই লাগবে দেখি !’ পিডিএফের জামানায় আজও কলেজ স্ট্রিট একইরকম । একই রকম প্রিয় বইপাগল বাঙালির কাছে ।

বান্ধবীর বাড়ির ছাদ

আমার এক বান্ধবীর বাড়িতে, তার ছাদটুকু ভারী চমৎকার। উত্তর কলকাতার সেই পা ছড়ানো দুপুর, সিমেন্ট ঢালাই করা পুরু দেওয়াল। মেঝেতে তাপ ওঠে। চিলেকোঠার পাঁচিলগুলোর থেকে নকশাকাটা জমিতে রোদ। আকাশে ঘুড়ির দেখা মেলে। পা মেলে দিয়ে বসতে ইচ্ছে হয়। বইমেলার সাথেও আমার সম্পর্কটা ঠিক সেই রকম। ঠিক একইরকম ভালোবাসার, ভালো লাগার …

১০০বছর আগেও ছিলো ‘বুক-ফেয়ার’

যদিও ‘বুক-ফেয়ার’ বা ‘বইমেলা’ শব্দটি তখনও চালু ছিলো না। ১৯১৮ সালের এপ্রিল মাসে, বঙ্গীয় জাতীয় শিক্ষা পরিষদের উদ্যোগে এক-সপ্তাহব্যাপী একটি শিক্ষা-সপ্তাহ পালন করা হয়। তারই অংশ হিসেবে একটি শিল্প-প্রদর্শনী ও একটি বই-প্রদর্শনীর ব্যবস্থা হয়। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে – খুব সম্ভবত সেটিই কলকাতা শহরে অনুষ্ঠিত প্রথম ‘বুক-একজিবিশন’। ‘কলিকাতা আন্তর্জাতিক পুস্তকমেলা’র সূচনা হতে তখনও বাকি অনেক দিন। ১৯১৮র পরে কেটে যাবে ৫৮টা বছর, ১৯৭৬এ শুরু হবে পাবলিশার্স এন্ড বুক-সেলার্স গিল্ডের ব্যবস্থাপনায় ‘কলকাতা বুক-ফেয়ার’।

বইমেলা-ধুলো, গার্গী-শ্রেয়সী – চেনা মুখগুলো, পরিচিত হাসি …

সে ছিলো ময়দানে বইমেলার যুগ। তখন আমাদের যা বয়স, গার্গী বা শ্রেয়সীর থেকেও অরণ্যদেব-কি-ম্যানড্রেকেই আমাদের উৎসাহ ছিলো বেশি।নির্মল বুক এজেন্সি থেকে কিনতুম ‘দুই বাংলার ১০০ গোয়েন্দা গল্প’, আবদার করতুম হাসির সিরিজটার জন্যেও। দক্ষভারতী থেকে রঙচঙে একটি টুপি উপহার পেতুম। বইমেলাতে যাবার জন্য বরাদ্দ থাকতো কেবল একটি দিন। অথচ বইমেলা ফুরোতেই দেখতুম, কোন জাদুবলে যেন বুক এজেন্সির হাসির সিরিজটিও বিছানার পাশটিতে এসে হাজির। মা যেতেন ফ্যামিলী বুকশপের ভরা দোকানটায়। কিনতেন সঞ্জীব কাপুরের খানা-খাজানার বই। আমার জন্য বেছে আনতেন এনীড ব্লাইটন – সিক্রেট সেভেন। হাত ধরে ধরেই বাবা চেনাতেন সন্দেশ আর নিউস্ক্রীপ্ট। চিনতে শিখতুম নলিনী দাশের গন্ডালু অথবা সত্যজিতের বাতিকবাবুকে। অনিল ভৌমিকের সৃষ্ট চরিত্র ফ্রান্সিসের তখন একটার পরে একটা নতুন বই বেরুচ্চে। সোনার ঘণ্টা – হীরের পাহাড়ের গল্পেতেই বুঁদ হয়ে থাকতুম। তবু, আজ এতদিন পরেও, চন্দ্রবিন্দুর গানটাই যেন বারেবারেই – সেই ময়দানের দিনগুলোকে মনে পড়ায়।

সাহসী চুম্বন, আজও কাউকে দেবার সৌভাগ্য হয়নি … হয়তো বা, তার অপেক্ষা আরও কয়েকটা দিনের।

প্রথম দেখা শর্মিলা ঠাকুর / রুশদিকে ফেরালো কলকাতা

২০১২তে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উদ্যোগে শুরু হয় ‘কলম’, কলকাতার প্রথম আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসব। বইমেলার মঞ্চে তার অন্যতম টাইটেল স্পনসর হিসেবে যোগ দেয় গুগলের মতো নামজাদা সংস্থা। ততদিনে বইমেলা সরে গিয়েছে মিলন মেলাতে। ২০১২তেই প্রয়াত হন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। ২০১৩তে প্রথম দেখি সাহিত্য উৎসব।

এখন কলকাতায় অন্তত তিনটি বড় সাহিত্য উৎসব চলে। জানুয়ারির গোড়াতেই পার্ক গোষ্ঠীর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় এপিজে কলকাতা লিটারারি ফেস্টিভ্যাল। ‘কলম’ এখন গুগল আর বইমেলা দুটির সাথেই সংশ্রব চুকিয়ে, টাটা স্টীল এবং ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলের যৌথ ব্যবস্থাপনাতে ২৬শে জানুয়ারির সপ্তাহে শহর জুড়ে বিভিন্ন জায়গাতেই উদযাপিত হয়। সবশেষে, বইমেলাতেই দ্বিতীয় সপ্তাহে উদযাপিত হয় কলকাতা লিটারেচার ফেস্টিভ্যাল। উৎসবের মহোৎসব বলাই যায়।

এতকিছুর পরেও মনের মণিকোঠাতে থেকে গিয়েছে সেই ২০১৩ সাল। সাহিত্য উৎসবের একটি দিনে ভাষণ দিয়েছিলেন অমর্ত্য সেন। আরেকটি দিনের অনুষ্ঠানে, আলোচনার বিষয় ছিল : ‘সত্যজিতের নায়িকারা’, উপস্থাপনায় ঋতুপর্ণ ঘোষ, অংশগ্রহণে – অপর্ণা সেন, মাধবী মুখোপাধ্যায় এবং শর্মিলা ঠাকুর। সেই প্রথম কাছ থেকে দেখেছিলাম, অপুর অপর্ণাকে। অটোগ্রাফও পেয়েছিলাম। সেই উৎসবেই ‘শীন্ডলার্স লিস্ট’-খ্যাত বুকারজয়ী সাহিত্যিক থমাস কেনেলীর সঙ্গেও আলাপের সৌভাগ্য হয়েছিলো। আর লজ্জার সাথে শুনেছিলাম, ‘মিডনাইটস চিলড্রেন’ শীর্ষক একটি আলোচনায় স্বয়ং সলমন রুশদির আসবার কথা থাকলেও, শেষ মুহূর্তে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সরকার তাঁকে আটকে দিয়েছেন। আলো-অন্ধকারের সেই প্রথম সাহিত্য উৎসবটুকুকেই মনে থেকে গিয়েছে। মনে থাকবেই চিরটাকাল।

আকাশছোঁয়া বহুতল – কলকাতার স্কাইলাইন

কলকাতাকে ভালোবাসতে ইচ্ছে হয়। কলকাতার বইমেলাকে ভালোবাসতে ইচ্ছে হয়। ২০১৫তে রোজ বইমেলা যেতুম। ফেরবার সময়ে, মিলনমেলার ৩নং গেটের বাইরেটা থেকেই সরকারি বাস ছাড়তো পার্ক সার্কাসের। বিনামূল্যের সেই বাস-সফরটা ছিলো খুবই সুবিধাজনক। একটু আগে থাকতে বেরিয়েই, উঠে পড়ে একটা জানলার ধার দখল করে নিতুম। পাশে দেখতুম সুউচ্চ আইটিসির হোটেল-ইমারত। তখনও তৈরি হচ্ছে। এখনও কাজ শেষ হয়নি পুরোটা। উঁচু উঁচু স্টীলের ভারাতে সার্চলাইট। মাথার উপরে সার্চলাইটের আলোতে চিরছে বইমেলার চত্বর। হয়তো বা খুঁজছে আমার-আপনার মতো কারোর প্রেয়সীকেই। গান বাজত বইমেলায়। কখনো বা ফোক, বা কখনো রক। বইমেলার মুক্তমঞ্চেই শুনেছিলুম দোহারের গান – কালিকাপ্রসাদের মন মাতানো পারফর্ম্যান্স। আমার বইমেলাতেই, আমার সবটুকু ভালোবাসা। বছরে মাত্র একটিবার আমার সেই প্রেয়সীটির, কলকাতাতে আসার সময় হয়।

মিত্র ঘোষ, এম সি সরকার, সুবর্ণরেখা ও লিটল ম্যাগ …

মদের রসিক চাইবে নতুন বোতলে পুরানো মদ। বইপ্রেমীরা খুঁজবে নতুন মলাটে পুরানো বই। চক্রবর্তী-চ্যাটার্জীর স্টলে গিয়ে খুঁজতে চাইবে শঙ্করের ‘কত অজানারে’কে। ঘেঁটে দেখবে সুবর্ণরেখা-র পুরানো সমস্ত মণি-মানিক। মিত্র-ঘোষের দোকানটিতে গিয়েই খোঁজ নেবে ‘কেরী সাহেবের মুন্সী’র ব্যপারে, এম সি সরকারে গিয়ে খুঁজতে চাইবে উৎপল দত্তের ‘অঙ্গার’ অথবা ‘টিনের তলোয়ার’-এর একক সংস্করণ। আর তার সঙ্গে সঙ্গেই বেঁচে থাকবে আমাদের লিটল ম্যাগ। সারি সারি টেবিলেতে অপেক্ষমান ভবিষ্যতের নামজাদা হয়ে-উঠনেওয়ালারা। অথবা রিটায়ার্ড স্বামী-স্ত্রীর প্রকাশন। পাশাপাশি, অথবা একই টেবিলে ভাগাভাগি – দুটি পাশেই। কি প্রচন্ড আবেগ যে এই লিটল ম্যাগ প্যাভিলিয়নটিতে জমা হয়ে থাকে এই ১২টা দিন, ভিতর থেকে না জানলে তা উপলব্ধি করা যায় না। বিডন স্ট্রীট শুভম নাট্যগোষ্ঠীর নাট্যপত্রটিকে বইপ্রেমীদের হাতে পৌঁছিয়ে দেবার জন্য খুদে সদস্যদের কি প্রচন্ড হুড়োহুড়ি পড়ে যায় – সে এক আশ্চর্য আনন্দের সময়। বইমেলাই জানে আমার প্রথম সব কিছু …

মিলন হবে কতদিনে …

আবার সেই বান্ধবীর বাড়ির ছাদ। বইমেলা শুরু হতে আর এক হপ্তাও বাকি নেই বোধহয়। শুধোলুম তাকে, ‘বইমেলা যাবি, আমার সঙ্গে একটা দিন ?’ কোনও উত্তর পেলুম না। আমার প্রেয়সী আমার কাছেই থাকুক। এবারের গন্তব্য সেন্ট্রাল পার্ক, ১ থেকে ১১ই ফেব্রুয়ারী, ২০১৯ – বইমেলা এসে গেছে, আমার আর কোথাও যাবার নেই, কিচ্ছু করার নেই …

ওভার এন্ড আউট, দেখা হবে বইমেলায়, পারলে রোজ, না পারলেও তাই … আর, প্রেয়সী তোমার জন্য, ‘বইমেলা ’১৯’।

error: Content is protected !!