Rajshekhar Basu
এককথায় দস্যি ছেলে বললেও ভুল হয় না। যেকোনও খেলনা তার হাতে দিলে আর আস্ত থাকার জো নেই। সবকিছু ভেঙে সে দেখবে ভিতরে কী কলকবজা রয়েছে। তবে শুধু যে জিনিস ভাঙচুরই করে, তা নয়। সে কাগজের ব্যারোমিটার বানিয়ে বলে দিতে পারে বৃষ্টি হবে কি না। বাড়ির বড়দের অসুখ হলে কবিরাজি বই পড়ে ওষুধ বাতলে দিতে পারে। এমনকি বোমা তৈরি করে ফাটাতেও পারে! শুধু প্রতিভাধর নন, এই কিশোর আসলে ছিলেন ক্ষণজন্মা। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী, বাঙালির গর্ব রাজশেখর বসু।
১৮৮০ সালের ১৬ মার্চ, বর্ধমানের বামুনপাড়া গ্রামে মামার বাড়িতে জন্ম রাজশেখর বসুর। শৈশব কেটেছিল মুঙ্গেরের খরকপুর ও দ্বারভাঙ্গায়। বাবা ছিলেন সেখানকার রাজ-এস্টেটের ম্যানেজার। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় তুখোড়। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে রসায়নে এম.এ। আইন নিয়ে পড়াশোনা করলেও, মাত্র তিনদিন গিয়েছিলেন কোর্টের চত্বরে। পছন্দ হয়নি ওকালতি জীবন। এর পরেই শিক্ষকের দৌলতে যোগাযোগ আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের সঙ্গে। আচার্যের হাত ধরেই রাজশেখর বসু প্রবেশ করলেন ‘বেঙ্গল কেমিক্যাল’-এ। দীর্ঘ ৩০ বছর তিনি কাজ করেন এই সংস্থায়।
অল্প কয়েকদিনের কঠোর পরিশ্রম আর মেধার জোরে বেঙ্গল কেমিক্যালের ম্যানেজার পদ লাভ করেন রাজশেখর বসু। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় লিখেছিলেন, “রাজশেখরের মতো ছেলে থাকলে, এমন আরও দু-তিনটে বেঙ্গল কেমিক্যাল বানিয়ে ফেলা যায়!”। বেঙ্গল কেমিক্যালের কারখানার শ্রমিক থেকে উচ্চস্তরের কর্মচারী, সকলেই তাঁকে সমীহ করে চলতেন। আইন জানার কারণে উৎপাদনের পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনাতেও দক্ষ ছিলেন।
ভিডিও: বাংলা কথাসাহিত্যের হীরে-‘মানিক’ – জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য
সাহিত্য আলোচনার ভিড়ে বিজ্ঞানমনস্ক রাজশেখর বসুর কথা প্রায়ই উহ্য থেকে যায়। বেঙ্গল কেমিক্যালের বেশ কিছু দ্রব্যের উদ্ভাবক ছিলেন তিনিই। বিদেশি যন্ত্রপাতির বদলে দেশীয় পদ্ধতিতে খুব অল্প জিনিস দিয়ে নানা দ্রব্য উদ্ভাবন করেছিলেন। গ্রাহকদের মধ্যে সেগুলি জনপ্রিয়তাও লাভ করে।
ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন অত্যন্ত মিতভাষী এবং শৃঙ্খলাপ্রিয় মানুষ। কিন্তু এই গম্ভীর আবরণের নিচেও লুকিয়ে ছিল এক অসামান্য রসবোধ। বাঙালি শেষমেশ তার পরিচয় পেল ১৯২২ সালে।
বসু পরিবারের পৈতৃক বাসভবন ১৪ নম্বর পার্শিবাগানে এক মজাদার আড্ডা বসত। ‘উৎকেন্দ্র সভা’ নামে এই আড্ডায় মাঝে মাঝে যোগ দিতেন তিনি। একদিন সেখানেই পড়ে শোনালেন তাঁর ‘শ্রীশ্রীসিদ্ধেশ্বরী লিমিটেড’ গল্পটি। আড্ডাধারীরা মুগ্ধ হলেন সেই গল্পে। আড্ডাতে আসতেন ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকার সম্পাদক জলধর সেনও। রাজশেখর বসুর অনিচ্ছাসত্ত্বেও জলধর সেনের জোরাজুরিতেই গল্পটি ছাপা হয় ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকায়। তবে ‘পরশুরাম’ ছদ্মনামে। রাতারাতি সেই গল্পের জোরেই বিখ্যাত হয়ে উঠলেন তিনি।
এরপর একে একে গল্প সংখ্যা ছাড়িয়েছিল একশোর কোঠা। সব মিলিয়ে গল্পগ্রন্থের সংখ্যা নয়টি। প্রথম বই ‘গড্ডলিকা’ বেরোতেই বাংলা সাহিত্যে শোরগোল পড়ে গেল। লম্বোদর বাবু বা গদাধরের মতো চরিত্ররা জায়গা করে নিল বাঙালির বৈঠকখানায়। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বইয়ের সুখ্যাতি করলেন পত্রিকার পাতায়। পুরাণের পরশুরাম যেমন কুঠার দিয়ে পৃথিবীর অন্যায় বিনাশ করেছিলেন, রাজশেখর বসু যেন তেমনভাবেই বেছে নিলেন হাস্যরসের তীক্ষ্ণ ‘কুঠার’। তবে কাউকে আঘাত করার জন্য নয়, সমাজের ভণ্ডামি আর অন্ধবিশ্বাসকে উপড়ে ফেলার জন্য।
ভিডিও: মুক্তারামের রামকথা – জন্মদিনে শিবরাম
একদিকে যেমন তিনি লিখেছেন ‘হনুমানের স্বপ্ন’ বা ‘কজ্জলী’-র মতো হাস্যরসাত্মক গল্প, তেমনই গভীর একাগ্রতায় তর্জমা করেছেন মহাভারত আর রামায়ণের মতো মহাকাব্য। সাধারণ মানুষের কাছে ভারতের সুপ্রাচীন দুই মহাকাব্যকে পৌঁছে দিয়েছেন সরল ও নির্মেদ ভাষায়। বাঙালির পড়ার টেবিলে আজও যে বই অপরিহার্য, সেই ‘চলন্তিকা’ অভিধান তাঁরই অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল।
রবীন্দ্র পুরস্কার থেকে পদ্মভূষণ— সবই এসেছে এই গুণী ব্যক্তিটির ঝুলিতে। কিন্তু চিরকালই ছিলেন মিতভাষী ও নিরহঙ্কারী। মিতভাষীর পাশাপাশি মিতব্যয়ীও। বেঙ্গল কেমিক্যালের এক সহকর্মী যশেন্দ্রকিশোর গুপ্তের স্মৃতি থেকে জানা যায়, একটা পেনসিল এক ইঞ্চি আকার হলেও ব্যবহার করতে পারতেন। এমন কিছু কারণে কেউ কেউ তাঁকে কৃপণ ভাবতেন। কিন্তু তাদের সেই ভুল ভাঙে, যখন অবলীলায় সরকারি পুরস্কারের ৫০০০ টাকাও দান করে দেন রাজশেখর বসু।
ভগ্নস্বাস্থ্যের কারণে বেঙ্গল কেমিক্যাল ছাড়লেও জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ছিলেন সেখানকার পরামর্শদাতা। বিজ্ঞানের যুক্তি আর সাহিত্যের নির্মল আনন্দ— দুই বিপরীত মেরুকে এক সুতোয় বেঁধেছিলেন তিনি। ১৯৬০ সালে যখন এই মহান ঋষিকল্প মানুষটি ইহজগত থেকে বিদায় নিলেন, তখন বাঙালির জন্য রেখে গেলেন অসামান্য সব সৃষ্টি। আজও যা অমলিন, বাঙালির হৃদয়জুড়ে আজও যা চিরন্তন।
বাংলালাইভ একটি সুপরিচিত ও জনপ্রিয় ওয়েবপত্রিকা। তবে পত্রিকা প্রকাশনা ছাড়াও আরও নানাবিধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে থাকে বাংলালাইভ। বহু অনুষ্ঠানে ওয়েব পার্টনার হিসেবে কাজ করে। সেই ভিডিও পাঠক-দর্শকরা দেখতে পান বাংলালাইভের পোর্টালে,ফেসবুক পাতায় বা বাংলালাইভ ইউটিউব চ্যানেলে।
