(Rustic cooking 23)
এবারে গাছে গাছে আমের মুকুল এসেছে প্রচুর। চৈত্রের অকাল শ্রাবণ গাছেদের শরীরে মেঘের চাদরখানি জড়িয়ে দিতে চাইছে। শেষ বসন্তের মাটি এমন করে জলের প্রত্যাশা করে না, তবুও বৃষ্টি আর মেঘেদের ছায়ায় তারাও ভিজছে। কেবলই ভিজছে। ভেজামাটিতে লুটিয়ে পড়েছে কচি কচি পাতায় ঝিঙেরলতা, লাউফুল। ফুল ঝরানো কাগজ ফুলেদের শরীর এখন মাটি মাখছে। মাটিতে মিলেমিশে যাওয়ার আগে পৃথিবীকে জড়িয়ে ধরতে চাওয়া কেবল।
আরও পড়ুন: বনজ কুসুম: পর্ব – [১] [২] [৩] [৪] [৫] [৬] [৭] [৮] [৯] [১০] [১১] [১২] [১৩] [১৪] [১৫] [১৬] [১৭] [১৮] [১৯] [২০] [২১] [২২]
মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে যাঁরা আলু তুলছেন, এখনও তাদের দু’হাতে পৃথিবীর গন্ধ লেগে আছে। বাঁদরমুখি আলুর কী আশ্চর্য রঙ! লালচে আভায় সে অপূর্ব। এসব দেশি আলু আজকাল চোখে পড়ে কম। বীজ রেখে রেখে চাষের দিন বুঝি ফুরলো। ভাঁড়ার ঘর ফুরিয়ে গেলে গার্হস্থ্যের সমীকরণ বদলে যায়! মানুষের ঘরে ঘরে, অন্তত রাঢ়বঙ্গে এখন আলুর জাজিম পাতা আছে। সেসব নিয়েই বৈঠকখানার শোভা। হিমঘরের স্পর্শ সকলের জন্য নয়।

এই গার্হস্থ্য আর পুঁজির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে রান্নাঘর। সে তাই মাঠ কুড়ানো গুড়োগাড়া আলু দিয়ে ডাল রান্না করে। ভাজা করে, সেদ্ধ করে, চচ্চড়ি করে। লালতে শাকের ঝোলের পাশে আলুসেদ্ধ না হলে চৈত্রদিনের দুপুরখানিই বৃথা। সজনে খাড়া দিয়ে পাতলা ঝোল হবে, ছোলা কলাই বাটা হবে, তবে না! একে আপনি থোড় বড়ি খাড়া বলে চিহ্নিত করতে পারেন। কিন্তু কমফোর্ট ফুডের মানচিত্রে এরা জায়গা করে নিয়েছে কবেই। এই নিয়েই গ্রামদেশের গেরস্থালির দপ্তরিখানা ভরে উঠছে প্রতিদিন। বসন্তে বসন্তে যেমন করে গাছেরা ভরে ওঠে!

আসলে রাঢ়দেশের কথা বলতে গিয়ে, কোন কথায় কোথায় এসে পড়লাম। বলছিলাম চৈত্রদিনের কথা। সেসব দিন ভরে আছে পাকা বেলের গন্ধে, লেবু ফুলের গন্ধে। বেলের শরবতের সঙ্গে মিলে মিশে আছে চৈত্রের ভোর। বাতাবিলেবুর ফুলের গন্ধের মতো আর কী আছে! পুকুরপাড়ে, কুয়োতলায় সে গন্ধ ছড়িয়ে যায় কম, ভারী করে তোলে হাওয়াকেই। চৈত্রের বিষাদকে মনের কোন অতল থেকে সে নিয়ে আসে অকারণেই। এই অকারণ বিষাদের সুরে চৈত্রের দ্বিপ্রহর বাঁধা পড়েছে।

জনশূন্য দুপুরে তুতফলের ডালে ছিটকোকিল এসে বসে। বেনেবউ পাখি একটানা ডেকে ডেকে সারা। ওর ডাক এই মাঠ পেরিয়ে আমড়ার বোলে কাঁপন ধরিয়ে, ছড়িয়ে পড়তে চাইছে। গরু চরানি বুড়িমা কোঁচড় ভরে গিমেশাক তুলছে উবু হয়ে। মাটিতে বিছিয়ে আছে শাকের আলপনা। তবে শুধু গিমে না, পোস্ত শাক, গাথ ফুরোনি, নুনেশাক কত চান! নিজের মতো তুলে নিলেই হল।
এই পাঁচমিশালি শাকের মধ্যে মিশে কৌমের এক যাপনচিত্র। এটা ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে বলা মুশকিল। কিন্তু গাঁ-গঞ্জের মানুষের কাছে এই মেলানো মেশানো মাঠকুড়ানি শাক ভারী পছন্দের। আর নয়তো পেঁয়াজ দিয়ে গিমেশাক ভাজা। ছাঁচি পেঁয়াজের মিষ্টতায় তেতো শাকের শরীর মিলেমিশে গেলে সে ভারী সুখের। আর আছে কলাই ডাল। ভালোলাগাগুলো গ্রাম শহরে ভাগ হতে হতে বিন্দুর মতো স্থির হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ।

বিলীয়মান এই খাদ্যাভাসকে আলাদা করে বাঙালি রান্নার পরিসরে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়তো করছেন কেউ কেউ। সেসব চেষ্টার বাইরে নিজের মতো করে দাঁড়িয়ে আছে এসব গ্রাম কাঁদড় আর বনাঞ্চল। চৈত্রের বুকফাটা দিনে তারা ছায়া খোঁজে নিশ্চয়ই। ছায়া না পেলে বাড়ি গিয়ে বলে— ভাত দে মা। লালতে শাকের ঝোল আর আলুসানার থালা, কী আশ্চর্য এক ছায়ালোক। অকাল শ্রাবণের ছায়া সরে গেলে এসবই তো ভরসা।

শুকিয়ে আসা নদী, চুনোমাছের টক আর শুকনো মাছের ঝাল। এই রুখুশুখু রাঢ়দেশেও এ গাঁয়ে সে গাঁয়ে ঘুরে ঘুরে ফেরিওয়ালা শুকনো মাছ বিক্কিরি করে। রাঢ়দেশীয় এই খাদ্যাভাসের কথা বহুচর্চিত ঘটিবাড়ির রান্নাঘরের চেয়ে সতত স্বতন্ত্র। আসলে এসব স্বাতন্ত্র্য এখনও গ্রামদেশে খুঁজে পাবেন। জাতধর্ম আর লোকাচার দিয়ে ঘেরা মানবজমিনের মতো এই পাড়াগুলো। পাড়াভেদে, জাতভেদে, ধর্মভেদে সেখানে ফেরিওয়ালার স্বর বদলে বদলে যায়। তবু এই রোদ্দুরের দিনে, ছায়া কি এতই অপর্যাপ্ত নয়! লালতে শাকের ঝোলে আর আলুসানায় তাই লিলুয়া বাতাস বয়, এইসব মাঠ আর প্রান্তর পেরিয়ে। চৈত্রদিন, এসো। খানিক জিরিয়ে নেওয়া যাক!
মেটে আলু দিয়ে মুরগির ঝোল
উপকরণ: মেটে আলু, মুরগি, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, জিরে, গরম মশলা, সর্ষের তেল, নুন, হলুদ, শুকনো লঙ্কা এবং তেজপাতা।

পদ্ধতি: মেটে আলু ভালো করে কেটে গরম জলে ধুয়ে ভাপিয়ে রাখুন। এবার তেল গরম করে ভাপানো আলু ভেজে তুলে নিন। আবার কড়াই বসান। তেল দিন। তেল গরম হলে জিরে তেজপাতা শুকনো ফোঁড়ন দিন। এরপরে পেঁয়াজ কুচানো দিন, ভাজা হলে আদা-রসুন বাটা দিন। অল্প নুন দিন। জলে গুলে হলুদ দিন। আবার কষান।

মশলার কাঁচা গন্ধ চলে গেলে জিরে শুকনো লঙ্কা বাটা (না চাইলে কাঁচালঙ্কা) দিন। মশলা তেল ছেড়ে এলে মুরগি দিন। মুরগি কষানো হলে মেটে আলু দিন। সব বেশ মিলেমিশে গেলে গরম জল দিয়ে সেদ্ধ বসান। ঢাকা দিন। মাংস আর আলু বেশ সেদ্ধ হয়ে এলে গরম মশলা বাটা দিন। আরেকটু ফুটিয়ে মাখা-মাখা ঝোল থাকতে নামিয়ে পরিবেশন করুন মেটে আলু দিয়ে মুরিগির ঝোল।
কাজির ভাত
উপকরণ: চাল, জল, মাটির হাঁড়ি, নুন।

পদ্ধতি: কাজির ভাত একটি পুরনো রান্না। এক সময়ে অনেকেরই পছন্দের রান্না ছিল। এখন এইসব রান্না খাওয়ার চল অনেকটাই কমে গেছে। একটি পাত্রে ভাত বসান। ভাতের জল প্রায় ফুটে উঠবে এমন অবস্থায় এক হাতা ওই উষ্ণ গরম জল আর এক হাতা ভাত ভাল একটি মাটির পাত্রে রেখে মাটির সরা চাপা দিন। এই প্রক্রিয়াটি পর পর পাঁচ-ছয়দিন করে যান। ক্রমে এই পাত্রটি থেকে একটি ফার্মেন্টেড গন্ধ বেরোবে। সাতদিনের দিন ওই চাল ধুয়ে ফ্যানা ভাত রান্না করুন। এই ফ্যানাভাতের স্বাদ টক টক, ফার্মেন্টেড ফ্লেভারযুক্ত। কোনও ঝাল স্বাদের ভর্তার সঙ্গে কাজির ভাত পরিবেশন করুন।
ছবি সৌজন্য: লেখক, AI
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
অমৃতা ভট্টাচার্য (জ.১৯৮৪-) শান্তিনিকেতনের জল হাওয়ায় বড়ো হয়েছেন। পাঠভবনে তাঁর পড়াশোনা। পরে বিশ্বভারতীর বাংলা বিভাগ থেকে বাংলা উপন্যাসে বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে গবেষণা করেছেন। পড়িয়েছেন জগদ্বন্ধু ইনস্টিটিউশনে এবং পরে চারুচন্দ্র কলেজে। বর্তমানে স্বেচ্ছাবসর নিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলের দেশজ রান্না নিয়ে কাজ করছেন। স্বপ্ন দেখেন পুঁজির প্রতাপের বাইরে অন্যরকম জীবনের, খানিকটা যাপনও করেন তা। যে হাতে শব্দ বোনেন সেই হাতেই বোনেন ধান, ফলান সব্জি। দেশ-বিদেশের নানা-মানুষের অন্যরকম জীবন দেখতে ভালোবাসেন। তাঁর লেখা স্মৃতিগ্রন্থ ‘বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ ’ এবং 'রেখেছি পত্রপুটে' পাঠকের সুসমাদর পেয়েছে।
