হেরে গিয়েছে গানের স্কুল, দো’তলা বাস, অনুরোধের আসর

Racingagainsttime

বাধ্যতাপ্রসূত সঙ্গমের মতো একটি সময়ের শরীরে আর একটি সময় ঢুকে পড়ে। বর্তমানের শরীরে গড়ে ওঠে অতীতের বিচ্ছিন্ন মুক্তাঞ্চল। দু’টি ভিন্ন সময়ের মধ্যে শুরু হয় তীব্র সংঘাত। রক্তাক্ত এবং পিচ্ছিল সেই লড়াই। সমকাল তার যাবতীয় মানসিক এবং প্রযুক্তিগত অস্ত্র নিয়ে টিকে থাকা অতীতকে আক্রমণ করে, পিষে দেয়।

এ এক অসম লড়াই। দমবন্ধ হয়ে মরে যাওয়া অথবা নিজের সময়-নৌকোটিকে ছেড়ে সমকালের হেলিকপ্টারে উঠে পড়া ছাড়া অন্য রাস্তা নেই কোনও।

কয়েকদিন আগে খবরের কাগজের এক কোণে একটি ছোট্ট প্রতিবেদন জায়গা করে নিয়েছিল। সোদপুরের নাটাগড়ে ৫৬ বছর বয়সী এক পোস্ট মাস্টার আত্মহত্যা করেছেন। সুইসাইড নোটে তিনি লিখেছেন, অফিসের কাজ ঠিকভাবে করতে না পারার গ্লানি থেকে মুক্তি পেতেই আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত। ওই পোস্টমাস্টারের মেয়েরর বয়ান থেকে জানা যাচ্ছে, সম্প্রতি অফিসে নতুন সফটওয়্যারের ব্যবহার শুরু হয়েছিল। বহু বার চেষ্টা করেও সেটির সঙ্গে সড়গড় হতে পারেননি ভদ্রলোক। বড় পোস্ট অফিসে বদলির জন্য খুব চেষ্টা করেছিলেন। ভেবেছিলেন বড় অফিসে যে সব কমবয়সী দক্ষ কর্মী কাজ করেন, তাদের থেকে শিখে নেবেন নতুন প্রযুক্তি। বদলি মেলেনি। ক্রমশ বেড়েছে গ্লানিবোধ আর তীব্র হতাশা। তার পর, আত্মহত্যা।

সের্ভান্তেস সেই কত্ত বছর আগে ডন কিহোতের কথা লিখেছিলেন। লা মাঞ্চার ডন কিহোতে নিজেকে ফেলে আসা সময়ের অংশীদার ভাবত। যে সময় মরে গেছে, যে সময় আর কখনও ফিরবে না, সেই সময়ে বাঁচত সে। সেই সময়টাকেই বিশ্বাস করত নিজের সর্বস্ব দিয়ে। অনুচর সাঙ্কো পাঞ্জাকে সঙ্গে নিয়ে পোষ্য রেজিনান্তের পিঠে চড়ে ডন কিহোতে বেরিয়ে পড়েছিল বেআক্কেলে এবং ঈষৎ অসংবেদী সমকালকে পোষ মানাতে। পারেনি। তার হেনস্থা আর বোকামি দেখে হাসি পায় আমাদের। মনে হয় ইতিহাসের ভাঁড়।

দত্যিদানো ভেবে ঝাঁপানোর পর উইন্ডমিলের থাপ্পর খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়তে হয়েছিল ডন কিহোতেকে। এমনটাই হয়। এমনটাই হবে। বর্তমানের কাছে হেরে যাবে অতীত। হারিয়ে দেওয়া হবে। নাকে খত দিতে হবে তাকে। অতীতের হেরে যাওয়াই দস্তুর। ময়দানে ঝড় তুলে প্রবল গতিতে ড্রিবল করতে করতে এগিয়ে যায় নবীন ফুটবলার। গ্যালারিতে বসে থাকা প্রবীন প্রাক্তনের চোখে খেলে যায় অবিশ্বাসের বিদ্যুৎ। প্রতিপক্ষের জাল ছিঁড়ে দেওয়ার পর সদ্য তারুণ্য পেরনো খেলোয়ার তাঁকে বলে যায়, আপনাদের সময় শেষ। এখন গতির যুগ, আমাদের সময় শুরু হয়ে গিয়েছে। বৃদ্ধ বিপ্লবীর সামনে দাঁড়িয়ে রাস্তায় থুতু ফেলে তরুণ অ্যাক্টিভিস্ট। হিসহিস করে ওঠে, আপনারা হেরে গেছেন। আপনারা ফালতু, ইতিহাসের প্রহসন মাত্র। হিমালয় পেরিয়ে উড়ে আসে অমোঘ উচ্চারণ, পৃথিবী শেষ পর্যন্ত আটটা-নটার সূর্যদের।

ডন কিহোতে হেরে গিয়েছিল। সোদপুরের ওই পোস্টমাস্টারও হেরে গিয়েছেন। হেরে গিয়েছে আকাশবাণী, গানের স্কুল, মফস্বলের নিজস্ব সকাল। হেরে যাচ্ছে লাল ফিতে মেয়েদের দল। হেরে গিয়েছে দো’তলা বাস, টেলিগ্রাম, অনুরোধের আসর। অথবা হারেনি, মিশে গিয়েছে নতুন সময়ে। আমরা বুঝতে পারছি না।

যেমন সব্বার ছোটবেলা প্রতিনিয়ত হারতে থাকে। তার পর এক সময় ফুরিয়ে যায়। অথবা মিশে যায় সন্তানের শৈশবে।

One Response

  1. অসাধারণ!!! এই লোকটার লেখার আঙুলে জাদু আছে। প্রতিটি প্রতিবেদন যেন অনুভবের উল দিয়ে বুনে চলা সময়ের স্যুয়েটার। মুগ্ধ হয়ে পড়তে থাকি রোজ। কুর্নিশ লেখক। ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা নেবেন। আপনার আগামী অসংখ্য অক্ষরের অপেক্ষায়। ইতি- আপনার গুণমুগ্ধ পাঠক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

কফি হাউসের আড্ডায় গানের চর্চা discussing music over coffee at coffee house

যদি বলো গান

ডোভার লেন মিউজিক কনফারেন্স-এ সারা রাত ক্লাসিক্যাল বাজনা বা গান শোনা ছিল শিক্ষিত ও রুচিমানের অভিজ্ঞান। বাড়িতে আনকোরা কেউ এলে দু-চার জন ওস্তাদজির নাম করে ফেলতে পারলে, অন্য পক্ষের চোখে অপার সম্ভ্রম। শিক্ষিত হওয়ার একটা লক্ষণ ছিল ক্লাসিক্যাল সংগীতের সঙ্গে একটা বন্ধুতা পাতানো।