(Short Story)
বেশ কিছুদিন আগে শঙ্খর প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে খাবি খেতে খেতে মরতে বসেছিল হিয়া। শঙ্খ তাকে ধারে-কাছেও ঘেঁষতে দেয়নি। সকাল বিকেল ফোনটাকে জাপটে ধরে যন্ত্রণার এক শেষ অবস্থা আর কী! কেবলই ফোন করে, কেবলই ফোন করে। দেখা করার সময়ই হয় না শঙ্খর। ইচ্ছাও ছিল না বোধহয়। অতএব কিছু কাল পরে হিয়ারও আর কোনও সদিচ্ছা রইল না। (Short Story)
হোয়াটসঅ্যাপে তথ্য, ভাষণ চালাচালি অবধি দিব্যি চলছিল। কিন্তু মানুষ তো! শারীরিক সান্নিধ্য ছাড়া সত্যিকারের ভালবাসা ব্যক্ত করতে অক্ষম সে। শরীর ব্যতিরেকে প্রেম, বিশ্বাসে বা তর্কে মেলানো যায়, বস্তুত কার্যকরী করা বড় দায়। কাজের চাপ ছিল ভাগ্যিস! শঙ্খকে টুক করে ভুলে যাওয়া সহজ হল। বিশুকে হিয়া বিশেষ বারণ করেনি পাছে সেও ওই যন্ত্রটুকুর মধ্যে আটকে পড়ে। কে জানে! শুধু ক্ষীণ স্বরে একবার বলেছিল, ‘সহ্য করতে পারবে কী না দেখো।’ (Short Story)
অনেকবার বিশুকে বলা হয়েছিল, ও বাড়িতে থাকতে পারবে না। কিন্তু সে ভাবল, প্রেম দেখানোর শ্রেষ্ঠ উপায় একেবারে বান্ধবীর ঘাড়ে গিয়ে চড়াও হওয়া। তাছাড়া বিশু হল গিয়ে ব্যাটাছেলে। নানা মহিলার কথা শুনে বশংবদ হয়ে থাকা কি তাকে মানায়? হিয়ার বাড়িতে বাড়তি ঘর, দুটো। একতলা হলেও, একটা গাড়িহীন গ্যারাজের মাথায় দেড়তলায় যে একখানা ঘর, তারই তালা খুলে দিয়ে হিয়া বলল, ‘এখন এখানে থাকো আপাতত। তারপর অভ্যাস হয়ে গেলে পদোন্নতির কথা ভাবা যাবে।’ (Short Story)

বিশু খুশিই হল। একসঙ্গে থাকাও বটে, আলাদাও বটে। চমৎকার ব্যবস্থা। বাড়ি ভাড়ার পয়সা বাঁচিয়ে ওরা বেড়ানোর পরিধি বাড়াতে পারবে। সিনেমা, নাটক, রেস্তোঁরায় যাওয়া, ট্যাক্সি চড়ার মতো খরচ করা যাবে। হিয়ার বাবা মা মারা গেছেন ওর চৌদ্দ বছর বয়সে। দাদুর কাছে সে থেকেছে পরের আরও চোদ্দটা বছর। পনেরো বছর হয়ে গেল, রুনুমাসি আজও সকালবেলায় আসে বিকেলবেলায় যায়। দাদু চলে যাওয়ার পর থেকে রাতে হিয়ার একা থাকা রুনুমাসির মোটেও পছন্দ হচ্ছিল না। হিয়ার নতুন বন্ধু হয়েছে শুনে, অবশেষে সে একটু হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। (Short Story)
কী যে এত সাবধানবাণী দেয় লোকে! কেনই বা! বিশুর এ-সব কথা একেবারেই পছন্দ হয় না। বাড়ি হিয়ার, থাকবে বিশু। কার কথায় কীই বা আসে যায়।
বিশু থাকবে এ তো চমৎকার কথা। তবু চা দিতে এসে সে বলল, ‘একটু বুঝে চলো বাপু। এ পাড়ায় অবশ্য বলার মতো তেমন কেউ নেই। তাও ওই আর কী! সাবধানের মার নেই।’ কী যে এত সাবধানবাণী দেয় লোকে! কেনই বা! বিশুর এ-সব কথা একেবারেই পছন্দ হয় না। বাড়ি হিয়ার, থাকবে বিশু। কার কথায় কীই বা আসে যায়। অবান্তর কথা নিয়ে ভাবার কোনও দরকার নেই তো। (Short Story)
বিশু কলকাতার ছেলে নয়, তাই ভাড়া বাড়িতে তার যাপন। মফঃস্বলে থাকা বৃদ্ধ মা-বাবাকে সে সাধারণত মাসান্তে একবার করে দেখে আসে। আর্থিক সাহায্য তাঁদের লাগে না। নিজেরটা চালিয়ে পুজো-পার্বণে ছেলে যা দেয়, তাতেই তাঁরা খুশি। বিশুর জীবনযাপন, ধ্যানধারণা খুব একটা বুঝতে পারেন না তাঁরা। মফঃস্বলে থাকা বিবাহিত মেয়েকে নিয়ে ওঁরা অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ। সে শ্বশুরবাড়িতে থাকে, সন্তানসম্ভবা। জামাই তার বাবার মুদির দোকানের সহকারী। রমরমা ব্যবসা – চট করে মার খাওয়া মুশকিল। আর্থিক সমস্যা বিন্দুমাত্র নেই। সবই চমৎকার। (Short Story)

কিন্তু ভাবুক ছেলে বিশু পড়াশোনায় ভাল বলে, সেই যে কলকাতায় কলেজে পড়তে গেল, তারপর ঠিক কী যে করে, বোঝা যায় না। বিশুর চাকরির ব্যাপার নেই। আপিস নেই। সে ভাবুক মানুষ। গান কবিতা গল্প লিখে নাম করতে শুরু করেছে সবে। সে লেখে, পড়ে, দেখে ও বোঝে। ছেলের ভাড়া বাড়িতে এসে মা-বাবা ঘুরে গেছেন। বিশুর মা এ শহরে এসে মানাতে পারবেন না, তাই তাঁরা আসতে চান না। ছেলের বউ হলে তখন ভাবা যাবে। বিশুর মেয়েবন্ধু আছে না নেই, এ বিষয়ে তাঁরা একেবারেই অন্ধকারে। (Short Story)
মাসের এক তারিখ সোমবার দিন। সপ্তাহের শুরু। তাই নতুন জীবনের আরম্ভ ভেবে এই মহল্লায় জুটে গেল বিশু। দুটো সুটকেস আর গোটা দুয়েক ব্যাগ নিয়ে সটান চলে এল সে সকাল সকাল। রুনুমাসি ঘরটা মুছে পরিষ্কার করে বিশুকে সাহায্য করতে চাইল। গোছাতে হবে তো! চারটি জামাপ্যান্ট বের করতে বিশুর সাহায্য লাগার কথাই নয়। তাছাড়া, এসেই একদিনে সব গুছিয়ে ফেলতে হবেই বা কেন। থাক না। ক্রমশ হবে। (Short Story)
ক্লান্তির জন্যই হয়তো আসার পর থেকে সারাক্ষণ শুধু পিপাসা পেতে থাকল তার। ঘরের সঙ্গে লাগোয়া ছোট্ট সুন্দর বারান্দায় বসে বিশু বোতল বোতল জল খেয়েই চলল। বিকেলে হিয়া তাড়াতাড়ি আপিস থেকে ফিরে এলে, অনেক কাপ চা ও টায়ের সঙ্গে দুজনের একটা নিখাদ আড্ডা হল। জল তেষ্টার কথা মনেও এল না আর। এই আড্ডাটা প্রথম দিনের পাওনা বিশু বুঝল। (Short Story)
উত্তেজনায় সমানে মনে হতে থাকল গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। গভীর রাতে বিশুর ঘুম এলেও অনেকবার জল খাওয়ার জন্য উঠল সে।
হিয়া যে ধরণের কাজ করে, তাতে দিনে কুড়ি ঘণ্টা তার কম পড়ে। তবে ছুটি মানে সেদিন সে একেবারেই কাজের প্রসঙ্গ তুলবে না। এমনভাবে কেমন করে যেন সে পারে। বিশু পারে না। অবশ্য তাতেই বা কী! প্রথম দিন হিয়া ঘুমিয়ে পড়ার পর উত্তেজনায় সমানে মনে হতে থাকল গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। গভীর রাতে বিশুর ঘুম এলেও অনেকবার জল খাওয়ার জন্য উঠল সে। (Short Story)
পরের দিন মঙ্গলবার। জঙ্গল নয়, ঘর পরিষ্কার করতে এসে রুনুমাসি অনেক গল্পগাছা করল। সন্ধ্যার আগেই সে চলে যায়। সকালের দিকে কখনও প্রয়োজন হলে অনেক আগেও সে আসে কিন্তু সূর্যাস্ত আইন মেনে চলে অর্থাৎ অন্ধকার হওয়ার পর আর সে কিছুতেই বাড়ির বাইরে থাকে না। ভালই তো, বিশুও ভোরের পাখি। সকলের আগে উঠতেই তার ভাল লাগে। হিয়া অত ভোরে ওঠে না। কাজের দিনে কোনওক্রমে ঘুম থেকে উঠে চা জলখাবার খেয়েই বেরিয়ে যায়। বিশু বড়জোর ওই জলখাবারের সময়েই ওর সঙ্গ পাবে, আর হয়তো বা রাতে খাওয়ার সময় যদি সে ঠিক সময়ে ফেরে! (Short Story)

বাড়ি ফিরে খেয়ে হিয়া সটান বিছানায়। এই ওর প্রাত্যহিক ক্রিয়াকলাপের সূচি। আর এতেই বিশু মুগ্ধ। এমন কাজের বোঝা নেওয়ার কথা সে ভাবতেই পারে না। কোনওদিন পারবে না। ভোরবেলা উঠে একটু না হাঁটলে তার চলে না। তারপর আয়েস করে চা। তারপর? যেদিন ইচ্ছা করে লেখে, না হলে পড়ে। কখনও বাড়িতে পড়তে ভাল না লাগলে সে লাইব্রেরি চলে যায়। বেশ কয়েকটা পাঠাগারের সে সদস্য। তারপর হেলেদুলে বাড়ি ফিরে আবার লেখা বা পড়া বা বন্ধুমহলে গিয়ে আড্ডা দেওয়া। সান্ধ্য আড্ডা সপ্তাহে তিন-চার দিন তার চাই। দিব্য কাটে জীবন। (Short Story)
এমন এক আড্ডাতেই হিয়ার সঙ্গে তার দৈবাৎ আলাপ। এমন দৃঢ় স্বভাবের মহিলার সঙ্গে কথা বলে বিশু আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিল। এরপর গল্পের নিয়মমাফিক আস্তে আস্তে দেখা গেল সব ছুটির দিনই তারা কোথাও না কোথাও দেখা করছে। অবশেষে বিশু এ বাড়িতে এসে ওঠার কথাটাও পেড়ে ফেলল। এখন হিয়া আর তার একই ঠিকানা। (Short Story)
শুক্তো, ডাল, পটলভাজা, আনা মাত্র বিশু বলল, ‘মাসি অত কিছু খাবো না। শুধু মাংস ভাতটুকু হলেই আমার চমৎকার চলবে।’
লিখতে লিখতে দুপুরের খাবার সময় হয়ে গেল। বিশু জানে আজ পাঁঠার মাংসের ঝোল রান্না হয়েছে। ঘরে বসে মাংসের চমৎকার গন্ধ সে পেয়েছে। তাতে তার খিদে আপনা থেকেই চাগিয়ে উঠেছে। তাই চান টান সময় মতো সেরে, সোজা খাবার টেবিলে বসে রুনুমাসিকে খেতে দিতে বলল। রুনুমাসি হাসিমুখে চটপট ভাতের থালা দিয়ে টেবিল সাজিয়ে ফেলল। শুক্তো, ডাল, পটলভাজা, আনা মাত্র বিশু বলল, ‘মাসি অত কিছু খাবো না। শুধু মাংস ভাতটুকু হলেই আমার চমৎকার চলবে।’ (Short Story)

নিমেষের মধ্যে রুনুমাসির হাসিমুখ কালি হয়ে গেল।
‘আজ তো মাংস রান্না করিনি বাবা। হিয়া ছুটির দিন ছাড়া মাংস খেতে চায় না। তাই কাজের দিনে করি না। আজ তো পুরো নিরামিষ করেছি। তুমি বুঝি নিরামিষ খাও না? হিয়াও তো আমায় কিছু বলে যায়নি।’
বিশু ভয়ানক লজ্জিত হয়ে পড়ল, ‘আরে না না মাসি। ধ্যুৎ ও তো ইয়ার্কি। আমায় আর কে গো বসিয়ে এত পদ রান্না করে খাওয়াত? একা থাকতাম ডাল আর একটা সেদ্ধ করে তো ভাত দিয়ে মুখে তুললেই চলে যেত। নিরামিষ ছয়-সাত পদ খাওয়া তো ভুলেই গেছি।’ (Short Story)
রুনুমাসি খুশি হয়ে নিরামিষ পটলের দোলমা আর মোচা ঘণ্ট নিয়ে এল। এলাহি ভোজ। কিন্তু বিশু যে স্পষ্ট মাংসের ঝোলের গন্ধ পাচ্ছিল, সে কোথা থেকে? তার অতি প্রিয় মোচার ঘণ্ট খেয়েও যেন পেট ঠিক ভরল না। মাংসের ঝোলের স্বাদ কি আর মোচায় পাওয়া যায়? সারাদিন মনটা তার মাংসের জন্য কেমন যেন আকুলি-বিকুলি করতে থাকল। সান্ধ্য আড্ডায় সবাই মাটন চপ খাওয়ার কথা বলতে বিশু কিঞ্চিৎ স্বস্তি পেল। ঘোল তো আদতে দুধই। (Short Story)
হিয়ার বাড়িতে এসে বিশুর মনে এক অভূতপূর্ব আনন্দ হয়েছে। সত্যি বলতে কী, লোকে যা ভাবে, তেমন তো ও ওর বান্ধবীর সঙ্গে থাকছে না। অর্থাৎ এক বিছানায় নয়, একঘরেই নয়। তবু। সপ্তাহ জুড়ে হিয়ার সঙ্গে ওর কতটুকুই বা দেখা হবে? আজ তো সবে বুধবার। এক ভাড়াটের মতোই সে থাকবে কিন্তু হিয়ার সংসারে আছে এটা ভেবেই বিশু খুশি। (Short Story)
বিস্কুটের কৌটোটা খেলামাত্র আঁশটে গন্ধ লাগল নাকে। বিস্কুটে এমন আঁশটে গন্ধ কেন রে বাবা! ইস্! ওয়াক। বিশু তাড়াতাড়ি কৌটোটা তাকে রেখে দিল।
বুধবার থেকেই বিশু তার নিজস্ব নিয়মমাফিক ভোরবেলা হাঁটতে যেতে শুরু করল। হেঁটে এসে একটা বড় পেয়ালা চা হাতে বারান্দায় বসতেই মনে একটা অদ্ভুত ফুরফুরে ভাব জাগল। কাগজকলম বার করে একটা ছোট গল্পের চমৎকার খসড়া লিখতেও শুরু করে দিল। বিস্কুট ছাড়া সকালের চা চলে না। বিস্কুটের কৌটোটা খেলামাত্র আঁশটে গন্ধ লাগল নাকে। বিস্কুটে এমন আঁশটে গন্ধ কেন রে বাবা! ইস্! ওয়াক। বিশু তাড়াতাড়ি কৌটোটা তাকে রেখে দিল। (Short Story)

রুনুমাসি নিশ্চয়ই মাছের হাতে বিস্কুট ঢেলেছিল বা কৌটো থেকে বিস্কুট বের করেছিল। মনটা কেমন বিচ্ছিরি হয়ে গেল। যাক, চা তো ঠিক আছে। দ্বিতীয় কাপ চা মুখে দিয়েই বিশুর চায়ে আঁশটে গন্ধ মনে হল। হয়তো হাতেই গন্ধ। কিন্তু তাও তো নয়। তবু বিশু বাথরুমে গিয়ে ভাল করে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে এল। চা আর খেতে পারল না। থাক। রুনুমাসি আসুক ঠিক করে চা বানিয়ে দিতে বলবে। (Short Story)
বলার আগেই রুনুমাসি চায়ের সঙ্গে প্লেটে করে বিস্কুট দিয়ে গেল। এতে কোনও আঁশটে গন্ধ নেই। বিশু জিজ্ঞাসা করে জানতে পারল ওই একই কৌটো থেকে বিস্কুট এসেছে। আঁশটে গন্ধ শুনে রুনুমাসি যারপরনাই অবাক হল। হিয়াও তো ওই বিস্কুটই খেল। ও তো কোনও খারাপ গন্ধ পেল না। ঠিক সেই সময়ে হয়তো ওখানে কোনও গন্ধ ভেসে আসছিল! হতেই পারে। লিখতে বসে শুধু উশখুশ করতে থাকল বিশু। কী যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছে ওর। লেখা বন্ধ করে একটা বই নিয়ে বসে কিছুতেই তাতে মনোনিবেশ করতে পারল না। খিদে পাচ্ছে ভেবে জল খাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে দেখল, জলের বোতলেও কেমন আঁশটে গন্ধ। নাকে ওই আঁশটে গন্ধটা সারাদিন লেগেই থাকল যেন। খোঁজ করে দেখবে বিশু আশপাশের বাড়ির রান্নাঘর কোথায়। এমন গন্ধ যখন, তখন মনে হয় রান্নাঘর একেবারেই পাশে হবে। সেখানেই হয়তো মাছ রান্না হচ্ছিল। রাতে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ল সে। (Short Story)
(ক্রমশ)
মুদ্রণ ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
জয়িতা বাগচী বর্তমানে স্বাধীন গবেষক। সাম্প্রতিকতম বই – আমাদের বেড়াল ও অন্যান্যদের কথা।
