(Purnendu Pattrea)
পারিবারিক সূত্রেই নিজের মধ্যে গ্রহণ করেছিলেন গ্রাম বাংলার আলপনা, পুজো-পার্বণ, মাটির পুতুল, পিঠে-পায়েসের উৎসব, আয়োজন। খুব আদরের ছিলেন বলে সকলেই তাঁকে ‘দুলাল’ নামে ডাকতেন। পোশাকি নাম ছিল পূর্ণেন্দু শেখর পত্রী। ১৯৩১ সালে আজকের দিনে হাওড়ার শ্যামপুরের নাকোল গ্রামে জন্ম পূর্ণেন্দু পত্রীর। পিতা পুলিনবিহারী পত্রী, মা নির্মলাদেবী। ছোটবেলায় নিজেই আপনমনে মাটি দিয়ে তৈরি করতেন খেলার পুতুল।
পাড়ায় যাত্রা হলে পরদিন সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জরি-চুমকি কুড়িয়ে এনে তা দিয়ে সাজিয়ে তুলতেন সেই পুতুলগুলি। এই নির্মাণেই ছিল তাঁর অনাবিল আনন্দ! মায়ের কাছ থেকে পেয়েছিলেন সেই শিল্পত্তার উত্তরাধিকার। গয়না বড়ি, আসন সেলাই, নকশি কাঁথা, উলবোনা, ছড়া-গল্প বলা এসবে তাঁর মায়ের ছিল অনন্য প্রতিভা। জীবনের প্রথম বইয়ের প্রচ্ছদটি করতে গিয়ে পূর্ণেন্দু আশ্রয় নিয়েছিলেন মায়ের করা একটি নকশি কাঁথার।
ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর, তিনি চলে আসেন কলকাতায়। কাকা নিকুঞ্জ পত্রী, নিজের কাছে রেখে তাঁকে ভর্তি করে দেন ইন্ডিয়ান আর্ট স্কুলে, কমার্শিয়াল আর্ট শেখার জন্য। নিকুঞ্জবাবু তখন ‘দীপালি’ নামের একটি সিনেমা পত্রিকায় কর্মরত। নন্দরাম স্ট্রিটে কাকার বাসায় থেকে, চলেছিল পূর্ণেন্দুর শিল্পসাধনা। ক্রমে কাকার সঙ্গেই লেগে পড়েন সেই পত্রিকার অলংকরণের কাজে। এখান থেকেই শিল্পী জীবনের শুরু। পরে শুরু করেন লেখার কাজ। কাকা তখন নিজেই শুরু করেছিলেন ‘চিত্রিতা’ নামে একটি মাসিক সিনেমা পত্রিকা।
ওদিকে, হাওড়াতে থাকার সময়ে বাগনানের বিশিষ্ট কমিউনিস্ট নেতা অমল গাঙ্গুলির সংস্পর্শে এসে কমিউনিস্ট পার্টির বিভিন্ন কাজকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি। পঞ্চাশের দশকের শুরুতে কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় সদস্য হন এবং একই সঙ্গে চালিয়ে যান রাজনীতি এবং সাহিত্যচর্চার কাজ।
ভিডিও: বাংলা কথাসাহিত্যের হীরে-‘মানিক’ – জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য
কাকার পত্রিকাতেই ক্রমে প্রকাশিত হতে থাকে তাঁর লেখা। ইতিমধ্যে ‘উল্টোরথ’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিযোগিতার বিজ্ঞাপন দেখে লিখে ফেলেন ‘দাঁড়ের ময়না’ শিরোনামে পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস। এখানে জয়ী হয়ে দ্বিতীয় পুরস্কার হিসেবে পেয়েছিলেন, রুপোর পদক। উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ১৯৫৮-এ। শিল্পীর অন্তরে জন্ম হল কথাসাহিত্যিকের। ১৯৫১-এ নিজের লেখা এবং প্রচ্ছদ শোভিত হয়ে প্রকাশিত হয় ‘একমুঠো রোদ’ শীর্ষক কাব্যগ্রন্থ।
তাঁর অন্যান্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘শব্দের বিছানা’, ‘তুমি এলে সূর্যোদয় হয়’, ‘গভীর রাতের ট্রাঙ্ককল’, ‘আমাদের তুমুল হৈ-হল্লা’ প্রভৃতি। আধুনিক ভাবনার এই কবি লেখেন, ‘মানুষ মেঘের কাছে আগে কত কবিতা চেয়েছে/ এখন পেট্রোল চায়, প্রমোশন, পাসপোর্ট চায়।’আর উপন্যাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘ভোমরাগুড়ি’, ‘মালতীমঙ্গল’ প্রভৃতি। ক্রমে প্রচ্ছদশিল্পী, প্রাবন্ধিক, কবি, ঔপন্যাসিক- ইত্যাদি বিভিন্ন পরিচয়ে গড়ে ওঠে তাঁর নিজস্ব পরিচিতি।
ইতিমধ্যে মুক্তি পেয়েছে বরেণ্য পরিচালক সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘পথের পাঁচালী’ সিনেমাটি। এই ছবি দেখে তিনি অত্যন্ত আপ্লুত হন। ‘পথের পাঁচালী’ ছবিটি সফল হলে টাউন হলে সত্যজিৎ রায়ের সম্বর্ধনা সভার মূল উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি। সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। ক্রমে নিজেই উৎসাহী হয়ে ওঠেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। চিত্রনাট্য লেখেন প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ ছোটগল্প অবলম্বনে। (Purnendu Pattrea)
নিজের স্বল্প সঞ্চয় আর একরাশ স্বপ্ন সম্বল করে নির্মাণ করেন ‘স্বপ্ন নিয়ে’। ছবিটি যদিও সেভাবে দাগ কাটেনি, কিন্তু সমালোচকরা স্বীকার করে নিয়েছিলেন এটি নির্মাণের মুনশিয়ানার কথা। কাজটি করতে গিয়ে তিনি বুঝেছিলেন, চলচ্চিত্র নির্দেশনা বা শিল্প-নির্দেশনা সম্ভব হলেও সংগীতে যথেষ্ট দখল না থাকলে, কাজটি সম্পূর্ণভাবে করা সম্ভব নয়।
ভিডিও: মুক্তারামের রামকথা – জন্মদিনে শিবরাম
অতঃপর তিনি সুবিনয় রায়ের কাছে সংগীত শিক্ষা শুরু করেন। পরে রবীন্দ্রনাথের গল্প নিয়ে ‘স্ত্রীর পত্র’ এবং ‘মালঞ্চ’-সহ পাঁচটি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন। এছাড়াও নির্মাণ করেছেন আরও সাতটি চলচ্চিত্র। ‘স্ত্রীর পত্র’ শ্রেষ্ঠ চিত্রনির্মাতা ও পরিচালকের পুরস্কার লাভ করে তাসখন্দ চলচ্চিত্র উৎসবে। ১৯৭৪-এ একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেছিল সমরেশ বসুর কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত তাঁর ‘ছেঁড়া তমসুক’ ছবিটি। চলচ্চিত্রকার হিসেবে স্থাপন করেন নিজের স্থায়ী আসন। (Purnendu Pattrea)
কলকাতা নিয়ে গবেষণাধর্মী অনেকগুলি উল্লেখযোগ্য বই লিখেছেন তিনি। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে এক বড় গবেষণার কাজ শুরু করেছিলেন জীবনের শেষ পর্বে। সেটি প্রকাশিত হয় ১৯৯৬ সালে। লিখেছেন ছোটদের জন্যেও। রয়েছে নিজের স্মৃতিকথা ‘আমার ছেলেবেলা’। এমত নানা ক্ষেত্রে তিনি রেখে গেছেন তাঁর অবিস্মরণীয় প্রতিভার স্বাক্ষর।
তাঁর আজীবন কর্মকৃতিত্বের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে ‘বিদ্যাসাগর পুরস্কার’ দিয়ে সম্মানিত করেন। পরে তিনি বহুবার ফিরে গেছেন নিজের গ্রামের বাড়িতে, প্রাণের টানে। সেখানেই রণজিৎ রাউতকে উৎসাহিত করেছিলেন শিল্পচর্চায়। পূর্ণেন্দু পত্রীর প্রয়াণের পর তাঁরই এই শিষ্য হাওড়ার ধান্দালিতে ৫ বিঘা জমির ওপরে গড়ে তুলেছেন গুরুর নামাঙ্কিত ‘পূর্ণেন্দু স্মৃতি শিল্পগ্রাম’। (Purnendu Pattrea)
এখন এই ধান্দালি গ্রামে শিল্পীর জন্মদিন উপলক্ষে জমে ওঠে মেলা। বহুদূর থেকে বহু মানুষ আসেন এই শিল্পগ্রামে, শিল্পীকে শ্রদ্ধা জানাতে। এখানে সন্ধে হয় শাঁখের শব্দে, প্রদীপের আলোয়। প্রকৃতির অনন্ত শ্রদ্ধা জেগে থাকে উড়ন্ত পাখির ডানায়, জলে মাছের খেলায় আর ঘাস ছুঁয়ে থাকা ভোরের শিশিরের ছোঁয়ায়। (Purnendu Pattrea)
‘যে আমাকে অমরতা দেবে
সে তোমার ছাপাখানা নয়,
সে আমার সত্তার সংগ্রাম
নিজের বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়।’ — পূর্ণেন্দু পত্রী
বাংলালাইভ একটি সুপরিচিত ও জনপ্রিয় ওয়েবপত্রিকা। তবে পত্রিকা প্রকাশনা ছাড়াও আরও নানাবিধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে থাকে বাংলালাইভ। বহু অনুষ্ঠানে ওয়েব পার্টনার হিসেবে কাজ করে। সেই ভিডিও পাঠক-দর্শকরা দেখতে পান বাংলালাইভের পোর্টালে,ফেসবুক পাতায় বা বাংলালাইভ ইউটিউব চ্যানেলে।
