(Rabindranath Tagore)
মাঘোৎসব বললেই ঝলমল আলোয় আলোকিত চারিধার, এমন এক অনুষ্ঠানের দিনের কথা ভেসে ওঠে। এই দিনটি যেন মনের সকল মলিনতা, কলুষতাকে ঘুচিয়ে জেগে ওঠে। (Rabindranath Tagore)
পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব রাজা রামমোহন রায় বিভিন্ন মতবাদ ও বিভিন্ন ধর্মীয় শাখার ধর্মগ্রন্থ পড়ে, এক সমন্বয়ের স্বপ্ন দেখেছিলেন। আর তাই হিন্দু সমাজে তৈরি হয়ে ওঠে এক নতুন ধর্মের অবলম্বন চর্চা, যা সকল ধর্মের (হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান, যোরাষ্ট্রিয়ান প্রভৃতি) এক ঠাঁই, এক আশ্রয়। সকল পথই গ্রহণযোগ্য ‘নিরাকার-একেশ্বরবাদ’ এই ধর্মাচারণে। এমন এক ধর্ম প্রতিষ্ঠা পেল ‘ব্রাহ্মধর্ম’ নামে। (Rabindranath Tagore)
ব্রাহ্ম মতাদর্শের ব্যক্তিদের নিয়ে শুরু হল নিয়মিত সভা। রামমোহন রায় ও তাঁর একনিষ্ঠ ভক্ত দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে, এই সকল সভা খ্যাত হয়ে উঠল ব্রাহ্মসমাজ নামে। সভার মূল উদ্দেশ্য প্রার্থনা ও সঙ্গীতের মাধ্যমে ঈশ্বরের উপাসনা। এইভাবে নিয়মিত ধর্মসভা চলতে থাকল সাপ্তাহিককালীন প্রথায়। (Rabindranath Tagore)

এই ধর্মসভা প্রতিষ্ঠার প্রায় দুই বছর পর ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে ২৩ জানুয়ারি (১১ মাঘ) রাজা রামমোহন রায়ের উৎসাহে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে একটি অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ব্রাহ্মসমাজের এই বিশেষ অনুষ্ঠান ‘মাঘোৎসব’-এর যাত্রা শুরু হয়। প্রতিবছর ১১ মাঘ দিনটি গোটা পৃথিবীর সকল ব্রাহ্মসমাজ মন্দিরে উপাসনার মাধ্যমে উদযাপিত হয় মাঘোৎসব হিসেবে। ব্রাহ্মধর্মালম্বীদের জীবনে এ এক বিশেষ দিন। আনন্দের সঙ্গে পালন করেন তাঁরা এই দিনটিকে। (Rabindranath Tagore)
সকাল থেকেই সাজ সাজ রব পড়ে যায়। উপাসনা গৃহ সেজে ওঠে রঙিন ফুলের সম্ভারে। ধূপ, বাতি প্রজ্জ্বলন করে আচার্য উপবেশন করেন পবিত্র বেদিতে। শুরু হয় ব্রহ্ম নামের কীর্তন। এরপর সেই কীর্তনের দল বেরোয় নগরভ্রমণে। এমন করে ঘণ্টাখানেক ব্রহ্মনামে মাতোয়ারা হয়ে কীর্তনের দল ফেরেন উপাসনা মন্দিরে। (Rabindranath Tagore)

এরপর শুরু হয় আচার্যের উপাসনা। প্রথমেই হয় সঙ্গীত। একটি বা দুটি গানের পর পর্যায়ক্রমে চলে আচার্যের বাণী। কখনও তা ঈশ্বরের বাণীর প্রতিভূ, কখনও বা উপনিষদ থেকে পাঠ, আবার কখনও তা হয় ঈশ্বরের মহিমা ব্যাখ্যান। এইসবের মাঝে মাঝে চলে একের পর এক ব্রহ্মসঙ্গীত, কখনও রামমোহন রায়ের, কখনওবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের, কখনওবা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সৌদামিনী দেবী, বেচারাম চট্টোপাধ্যায়, ত্রৈলোক্যনাথ সান্যাল, মনোমোহন চক্রবর্তী, হেমলতা দেবী, গণেন্দ্রনাথ ঠাকুর, উপেন্দ্রকিশোর রায়, সুকুমার রায়, শিবনাথ শাস্ত্রী, কাশীচন্দ্র ঘোষাল, অতুলপ্রসাদ সেন, রজনীকান্ত সেন প্রমুখের রচিত। (Rabindranath Tagore)
সকাল থেকেই সাজ সাজ রব পড়ে যায়। উপাসনা গৃহ সেজে ওঠে রঙিন ফুলের সম্ভারে। ধূপ, বাতি প্রজ্জ্বলন করে আচার্য উপবেশন করেন পবিত্র বেদিতে।
কিছু গানের নমুনা
ভাব সেই একে – রাজা রামমোহন রায়
কেন ভোলো – মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর
জাগো সকল অমৃতের – দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর
কে রচে এমন সুন্দর – সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর
জগতপিতা, তুমি বিশ্ববিধাতা – বিষ্ণুরাম চট্টোপাধ্যায়
দেখিলে তোমার সেই – গণেন্দ্রনাথ ঠাকুর

নিশীথ নিদ্রার মাঝে – বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর
মোহ আবরণ কর উন্মোচন – ত্রৈলোক্যনাথ সান্যাল
যাবে কি এ দিন আমার – বেচারাম চট্টোপাধ্যায়
জয় দীন দয়াময় – উপেন্দ্রকিশোর রায়
প্রেমের মন্দিরে তাঁর – সুকুমার রায়
প্রভু মঙ্গল শান্তি সুধাময় – শিবনাথ শাস্ত্রী
প্রথমেই হয় সঙ্গীত। একটি বা দুটি গানের পর পর্যায়ক্রমে চলে আচার্যের বাণী। কখনও তা ঈশ্বরের বাণীর প্রতিভূ, কখনও বা উপনিষদ থেকে পাঠ, আবার কখনও তা হয় ঈশ্বরের মহিমা ব্যাখ্যান।
কে সে পরম সুন্দর – হেমলতা দেবী
অনন্ত অপার তোমায় – মনোমোহন চক্রবর্তী
তুমি হে ভরসা মম – জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রভু পূজিব তোমারে – সৌদামিনী দেবী
নাথ, তুমি ব্রহ্ম – হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুর

দেখিয়ে হৃদয়মন্দিরে – যদু ভট্ট
প্রাণসখা হে আমার – পুণ্ডরীকাক্ষ মুখোপাধ্যায়
তৃষিত হৃদয়ে নাথ – কাশীচন্দ্র ঘোষাল
পাদপ্রান্তে রাখ সেবকে – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (Rabindranath Tagore)
এইসবের মাঝে মাঝে চলে একের পর এক ব্রহ্মসঙ্গীত, কখনও রামমোহন রায়ের, কখনওবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের
পুরবাসী রে তোরা যাবি – অন্নদাপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
ইত্যাদি।
এরপর উপাসনা শেষে সবাই মিলে একসঙ্গে এক পঙক্তিতে প্রসাদ ভক্ষণ হয়। মাঘোৎসব উদযাপনের পরিসমাপ্তি ঘটে উপেন্দ্রকিশোর রায় রচিত ‘জাগো পুরোবাসী’ গানটি গেয়ে। (Rabindranath Tagore)
তথ্যসূত্র: সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ (বিধান সরণী) থেকে প্রকাশিত ব্রহ্মসঙ্গীত স্বরলিপি ( ১ – ১০ ) খণ্ড
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
জয়িতা বন্দ্যোপাধ্যায় পেশায় অঙ্কের শিক্ষিকা। ঠাকুরবাড়ি এবং রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রধান গবেষণার বিষয়। লেখালেখি করেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। এ যাবৎ প্রকাশিত গ্রন্থ, রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্রে সঙ্গীত প্রসঙ্গ, ঠাকুরবাড়ির ঝুলি ও অন্যান্য গল্প, গান থেকে গানে, রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্যে রূপান্তর। এছাড়াও, রবীন্দ্রসঙ্গীত, ব্রহ্মসঙ্গীত, নজরুলগীতি, অতুলপ্রসাদীসহ সবধরনের গানই চর্চা করতে ভালোবাসেন।
