(Maitreyi Devi)
রবীন্দ্রস্নেহধন্য মানুষের সান্নিধ্য পেলে ব্যক্তিগতভাবে মনে হয় কবির পরশ লাভ হল। কবিকে স্বশরীরে দেখার সৌভাগ্য যাঁদের হয়নি, তাঁদের কাছে রবীন্দ্রনাথের কাছের মানুষদের নিকটে যাওয়াটাই ভাগ্যের ব্যাপার।
শৈশবে পড়াশোনা শুরু হয়েছিল দোলনা স্কুলে। অনেকেই জানেন, দোলনা স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন রবীন্দ্রস্নেহধন্যা মৈত্রেয়ী দেবীর কন্যা মধুশ্রী দাশগুপ্ত। এক সময় দোলনা স্কুল ছিল দেশপ্রিয় পার্কের পাশে। পরে ওদের আরও একটি শাখা খোলা হয় মনোহরপুকুর রোডে, আমাদের বাড়ির একতলায়।
সেই সময় আমি খুবই ছোট। মৈত্রেয়ী দেবীকে দেখেছিলাম দোলনার নতুন শাখার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করতে। মায়ের মুখে শুনেছিলাম, ‘মংপুতে রবীন্দ্রনাথ’ বইটির কথা। শৈশব থেকে রবীন্দ্রানুরাগী হওয়ার ফলে কবির স্নেহধন্যা মৈত্রেয়ী দেবীকে সামনে থেকে দেখে বেশ রোমাঞ্চ অনুভব করেছিলাম!
অবশ্য ‘মংপুতে রবীন্দ্রনাথ’ বইটির থেকে বাঙালির ‘ন হন্যতে’ বইটির প্রতি বেশি আগ্রহ! রবীন্দ্রনাথের থেকেও মৈত্রেয়ী দেবীর জীবনের ব্যক্তিগত কথা জানা বোধহয় পাঠকদের বেশি জরুরি মনে হয়েছে। যাক, আমার অনেক লেখা থেকে পাঠকেরা ইতিমধ্যে জেনেছেন, আমার মা মধুশ্রী মৈত্র দীর্ঘ প্রায় তিরিশ বছর কলকাতা দূরদর্শনে কর্মরত ছিলেন। সেই সূত্রে অনেক গুণী এবং বিখ্যাত ব্যক্তিদের সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন।

সালটা এখন আর ঠিক মনে নেই। কিন্তু এটা মনে আছে যে, কলকাতা দূরদর্শনে ২২ শ্রাবণের অনুষ্ঠান রেকর্ড করতে গল্ফগ্রিনের স্টুডিওতে এসেছিলেন মৈত্রেয়ী দেবী, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, অধ্যাপক হরপ্রসাদ মিত্র প্রমুখ। অনুষ্ঠানের পর বেশ কিছু ছবি তুলেছিলাম। সেই সময় আমার হাতে ক্যামেরা দেখে মৈত্রেয়ী দেবী আমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কার কাছে ছবি তোলা শিখেছি, কতদিন ধরে ছবি তুলছি ইত্যাদি।
অনুষ্ঠান রেকর্ড করা শেষ হলে গাড়িতে ওঠার সময় আবার আমাকে কাছে ডেকে বললেন, ওঁর পাম এভিনিউর বাড়িতে যেতে। এমন একজন মানুষের আমন্ত্রণে কী সাড়া না দিয়ে পারা যায়!
শান্তিনিকেতনের ‘উদয়ন’-এর ভেতরের নির্মাণশৈলীর সঙ্গে মিল পাওয়া যেত তাঁর বাড়ির। আমি অবাক হয়ে ঘরের চারিদিকে রাখা সব ছবি দেখছি! সেইসব ছবির মধ্যে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে মৈত্রেয়ীদির ছবি তো ছিলই।
দুদিন পরেই গেলাম ওঁর বাড়ি। যাঁদের ওঁর বাড়িতে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে, তাঁরা হয়তো ওঁর ঘরের আসবাব এবং সাজানো দেখে আমার মতোই মুগ্ধ হয়েছেন। শান্তিনিকেতনের ‘উদয়ন’-এর ভেতরের নির্মাণশৈলীর সঙ্গে মিল পাওয়া যেত তাঁর বাড়ির। আমি অবাক হয়ে ঘরের চারিদিকে রাখা সব ছবি দেখছি! সেইসব ছবির মধ্যে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে মৈত্রেয়ীদির ছবি তো ছিলই। আসন ছেড়ে উঠে গিয়ে একেকটি ছবি দেখছিলাম আর উনি কোনও কোনও বিশেষ ছবির সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করছিলেন। জীবনে এই ধরনের অভিজ্ঞতা বা মুহূর্ত খুব কমই আসে। (Maitreyi Devi)
উনি জানালেন মধ্যমগ্রামে ‘খেলাঘর’ নামে ওঁর একটি অনাথ আশ্রম আছে। তার জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে পণ্ডিত রবিশঙ্কর সেতার বাজাবেন। ওঁর ইচ্ছে, আমি যেন অনুষ্ঠানের দিন ছবি তুলি। একে রবিশঙ্করের অনুষ্ঠান, তার ওপর আবার মৈত্রেয়ী দেবীর মতো ব্যক্তিত্ব অনুরোধ করছেন সেই অনুষ্ঠানের ছবি তোলার জন্য। (Maitreyi Devi)

অনুষ্ঠানের দিন ক্যামেরা নিয়ে যথা সময় ইন্ডোর স্টেডিয়ামে গিয়ে পৌঁছোলাম। রীতিমতো চাঁদের হাট! কে নেই সেখানে। রাজ্যের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, পণ্ডিত কুমার বোস, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, তনুশ্রী শঙ্কর, গ্রামাফোন কোম্পানির বিমান ঘোষ প্রমুখ। (Maitreyi Devi)
অনেক ধরনের ছবি তুলেছিলাম, গ্রিনরুমে ঢুকে পণ্ডিতজিরও নানা ধরনের ছবি তুলি। সেটা ডিজিটাল ক্যামেরার যুগ ছিল না। অ্যানালগ ক্যামেরাতেই সব ছবি তোলা হয়। মৈত্রেয়ীদি নিজে আমাকে ফটোগ্রাফার্স কার্ড দিয়েছিলেন। আজও সেই বিশেষ কার্ডটি আমার কাছে যত্নে রাখা আছে। (Maitreyi Devi)
টাকা নেব না শুনে, উনি ওঁর লেখা কয়েকটি রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক বইতে আমার নাম লিখে, তার নিচে সই করে আমায় উপহার দিলেন। সেগুলো অর্থের চেয়েও মূল্যবান। আমার জীবনের সম্পদ।
এর কয়েকদিন পরে ছবিগুলো প্রিন্ট করে ওঁর বাড়িতে গেলাম। ছবি দেখে ভীষণ খুশি হলেন। আমার ছবি তোলার খরচ জানতে চাইলেন। কিছুতেই রাজি হলাম না এত মহৎ উদ্দেশ্যে আয়োজিত সুন্দর একটি অনুষ্ঠানে ছবি তোলার সঙ্গে অর্থের বিষয়টাকে যুক্ত করতে। টাকা নেব না শুনে, উনি ওঁর লেখা কয়েকটি রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক বইতে আমার নাম লিখে, তার নিচে সই করে আমায় উপহার দিলেন। সেগুলো অর্থের চেয়েও মূল্যবান। আমার জীবনের সম্পদ। বইগুলো হাতে নিয়ে মনে হয়েছিল, এ তো মেঘ না চাইতেই জল! (Maitreyi Devi)
এর কয়েক বছর পর রবীন্দ্রজন্মোৎসব উপলক্ষে কলকাতা দূরদর্শন ঠিক করল, ‘মংপুতে রবীন্দ্রনাথ’ শিরোনামে একটা অনুষ্ঠান করবে। ততদিনে মৈত্রেয়ীদির সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। অনুষ্ঠানের সংকলন ও বিন্যাস করছিলেন শঙ্খদা মানে শঙ্খ ঘোষ। মাঝে মাঝে ওঁর বাড়ি গিয়ে কবির নানা গল্প ওঁর মুখে শুনে মাকে লিখে দিতাম। সেইসব গল্প শুনে যেন হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে বাড়ি ফিরতাম! অনুষ্ঠান আয়োজনে সেইসব স্মৃতিচারণ বোধহয় ওদের কোনও কাজে লেগেছিল। (Maitreyi Devi)

এরই মধ্যে একদিন বিনা মেঘে বজ্রপাত! শরতে বিদায় নিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়! দু’চোখ ভরা জল নিয়ে মৈত্রেয়ীদি ছুটে এলেন হেমন্তদাদুর বাড়ি। তাঁর মাথায় হাত রেখে বসে রইলেন বহুক্ষণ। কিছু সময় পরে ওঁর হাত ধরে গাড়িতে তুলে দিয়েছিলাম। (Maitreyi Devi)
মনে আছে, গাড়িতে ওঠার সময় বলেছিলেন, রাস্তাঘাটে চলার সময় কোথাও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান কানে এলে যতক্ষণ না গানটা শেষ হয়, ততক্ষণ ওখানেই হয় দাঁড়িয়ে নয়তো গাড়িতে বসে পুরো গানটা শুনে অন্য কাজে যান। (Maitreyi Devi)
অনেকেই হয়তো জানেন না, রবীন্দ্রনাথের চারটি কবিতা মৈত্রেয়ীদি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে দিয়ে সুরারোপ করিয়ে রেখেছিলেন।
অনেকেই হয়তো জানেন না, রবীন্দ্রনাথের চারটি কবিতা মৈত্রেয়ীদি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে দিয়ে সুরারোপ করিয়ে রেখেছিলেন। কবির তিরোধানের ষাট বছর পূর্ণ হলে যখন বিশ্বভারতীর হাত থেকে স্বত্ব চলে যায়, তখন ‘প্রথম প্রদীপ’ শিরোনামে একটি ক্যাসেট-এর মধ্যে ওই চারটে গান প্রকাশিত হয়েছিল। (Maitreyi Devi)
ওঁর বাড়িতে কবির সঙ্গে একটি ছবি দেখে আমার খুব পছন্দ হয়। মৈত্রেয়ীদিকে সেই কথা বলাতে উনি তৎক্ষণাৎ ছবিটি আমাকে উপহার দিয়ে দেন। এর দু’বছর পরে মৈত্রেয়ীদিও চলে গেলেন রবীন্দ্রলোকে। ওঁর স্মরণ অনুষ্ঠান পত্রে ‘বলাকা’র একটি কবিতা ছাপা হয়েছিল, ‘এই বাসছাড়া পাখি ধায় আলো-অন্ধকারে/ কোন পার হতে কোন পারে।/ধ্বনিয়া উঠিছে শূন্য নিখিলের পাখার এ গানে-/হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোথা, অন্য কোনখানে!’ ওঁর ফেলে যাওয়া বাড়ির প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠানের জন্য নির্মিত মণ্ডপের একেবারে পেছনে বসে অন্য কোনওখানে যেন মৈত্রেয়ীদির সন্ধান করছিলাম! এখন মনে হয় এইসব যেন গত জন্মের কথা! (Maitreyi Devi)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
অরিজিৎ মৈত্র পেশায় সাংবাদিক। তপন সিংহ ফাউন্ডেশনের সম্পাদক অরিজিৎ পুরনো কলকাতা নিয়ে চর্চা করতে ভালবাসেন। নিয়মিত লেখালিখি করেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। প্রকাশিত বই: অনুভবে তপন সিনহা, ছায়ালোকের নীরব পথিক বিমল রায়, চিরপথের সঙ্গী - সত্য সাই বাবা, বন্দনা, কাছে রবে ইত্যাদি।
