মেঘালয়ের খনিজ সম্পদ এবং ব্রিটিশ বাণিজ্যের ফাঁদ: জোয়াই পর্ব ১১

মেঘালয়ের খনিজ সম্পদ এবং ব্রিটিশ বাণিজ্যের ফাঁদ: জোয়াই পর্ব ১১

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
limestone mining in meghalaya
চুনাপাথরের উন্মুক্ত খনি
চুনাপাথরের উন্মুক্ত খনি
চুনাপাথরের উন্মুক্ত খনি
চুনাপাথরের উন্মুক্ত খনি

ভূতাত্ত্বিকদের অনুমান মেঘালয়ের মাটির গভীরে রয়েছে ১৩৩ মিলিয়ন টন কয়লা। আরও ৫৭৭ মিলিয়ন টন কয়লা লুকিয়ে থাকার সম্ভাবনা আছে যা মাটির উপরে তুলে আনার প্রযুক্তি এখনও সহজলভ্য নয়। তবে রাজ্য সরকারের বয়ান অনুযায়ী মেঘালয়ে ৫৭৬ মিলিয়ন টন কয়লার ভাণ্ডার সঞ্চিত রয়েছে। অন্যান্য খনিজ সম্পদের মধ্যে রয়েছে প্রায় সাড়ে নয় হাজার মিলিয়ন টন লাইমস্টোন। এছাড়া গ্রানাইট, কাওলিনাইট, গ্লাস স্যান্ড, বক্সাইট ইত্যাদি লুকিয়ে আছে মেঘালয়ের মাটির গভীরে।



গৃহনির্মাণ শিল্পের জন্য গ্রানাইট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মেঘালয়ে তার কতটুকু চাহিদা? পাহাড় কেটে গ্রানাইট বের করে ট্রাকে ভরে চলে যায় দূর-দূরান্তের নগর-বন্দরে। সেখানেই মাপ মতো কাটাকুটি করে পালিশ করার পরে ঝকঝকে চকচকে প্রস্তরখণ্ড ব্যবহৃত হয় অট্টালিকা-ইমারতে। কাওলিনাইট থেকে পাওয়া যায় কাওলিন। পোর্সিলিন তৈরির জন্য কাওলিন অপরিহার্য। টুথপেস্ট থেকে শুরু করে প্রসাধনীর জৌলুস বাড়ানোর জন্য কাওলিন ছাড়া অন্য কোনো উপাদানের কথা এখনও পর্যন্ত ভাবা হয়নি। এমনকী সাবেক আমলের বৈদ্যুতিক বাল্ব বানাতেও কাওলিনের প্রয়োজন। কাগজের চাকচিক্য বাড়ানোর জন্য ইদানীং কাওলিনের সবচেয়ে বেশি কদর। ঝকঝকে কাগজে ছাপানো বই পড়তে পাঠকের আগ্রহ বেশি। প্রকাশক বাণিজ্যিক কারণেই ভাল মানের কাগজে বই ছাপার চেষ্টা করেন। ঝলমলে কাগজের ব্যবহার যত বাড়বে ততটাই পাল্লা দিয়ে বাড়বে কাওলিনের চাহিদা। কাজেই সরাসরি কাওলিনাইট অর্থাৎ কাওলিনের আকরিক অন্যত্র চলে যায়। একই ভাবে মাটি খুঁড়ে বের করে আনার পর গ্লাস স্যান্ড চলে যায় কাচ তৈরির কারখানায়। মেঘালয়ের মাটির গভীরে পড়ে আছে বক্সাইট। অ্যালুমিনিয়াম ছাড়া এখনকার পৃথিবী প্রায় অচল। তুল্যমূল্য বিচারে সম্ভবত স্টেনলেস স্টিল সহ সবরকমের ইস্পাতের থেকেও অ্যালুমিনিয়ামের ব্যবহার এখন অনেক বেশি। মাটির গভীরে পড়ে থাকা বক্সাইট আকরিক হল অ্যালুমিনিয়ামের মূল উৎস।

পরিকাঠামোর দুর্বলতা, জমির আইনি জটিলতা ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে শিল্প স্থাপনের জন্য মেঘালয়ে বিনিয়োগ করতে সচরাচর কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানই আগ্রহ দেখায় না। সবরকমের উত্তোলিত খনিজ আকরিক পরিশোধনের কোনো বন্দোবস্ত এখনও মেঘালয়ে গড়ে ওঠেনি বলেই সময়বিশেষে অন্যান্য শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী মেঘালয়ের মহার্ঘ খনিজ সম্পদ মাটি খুঁড়ে বের করে এনে সরাসরি উৎপাদন কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেওয়া অনেক সহজ এবং সুবিধাজনক।

ব্রিটিশ ব্যবসা বোঝে। মাটি খুঁড়লেই লাইমস্টোন পাওয়া যায় এমন একটা সহজলভ্য বিষয় ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগেই তাঁদের নজরে আসে। স্থানীয় মানুষের বিনিময় প্রথার চুনের ব্যবসাও তাঁদের নজর এড়ায়নি। ফলে সময় নষ্ট না করে এখানকার যেসব এলাকায় লাইমস্টোন পাওয়া যেতে পারে সেই জায়গাগুলোকে চিহ্নিত করে ফেলা হল। এখানে তো কোনো ব্যক্তিবিশেষের জমির মালিকানা নেই। জমির মালিক স্থানীয় জনজাতি। সহজ কথায় স্থানীয় সমাজ। শুরু হয়ে গেল জনজাতি প্রধানদের সঙ্গে কথাবার্তা।

লাইমস্টোন নিয়ে অবিশ্যি এত সমস্যা নেই। লাইমস্টোন বা চুনাপাথর থেকে সহজেই চুন পাওয়া যায়। বহুদিন ধরেই প্রচলিত পদ্ধতিতে চুনাপাথর থেকে ব্যবহারের যোগ্য চুন তৈরি করে নেওয়ার প্রক্রিয়া চালু রয়েছে।

পান খাওয়ার কাজে চুন অপরিহার্য। পানের নেশায় কবে থেকে মানুষ মজেছে তা বলা মুশকিল। অসমবাসী তাম্বুল চিবোতে অভ্যস্ত। মেঘালয়ের মানুষের কাছে তা কোয়াই। আর বাঙালি খায় পান। আদতে একই ব্যাপার। আর পান সাজতে চুন চাই-ই চাই।

এছাড়া চুনের সঙ্গে সুরকি মিশিয়ে বাড়িঘর রাস্তাঘাট নির্মাণের কাজ তো পুরনো আমল থেকেই বহুল প্রচলিত প্রযুক্তি। নানানরকমের ত্বকের অসুখেও ওষুধ হিসেবে চুন ব্যবহারের প্রচলন ছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর নথিতেও এইসব তথ্য পাওয়া যায়। এমনকী স্থানীয় জনজাতির লোককথাতেও চুনের গল্প ছড়িয়ে আছে। মেঘালয়ের স্থানীয় মানুষ প্রচলিত পদ্ধতিতে মাটি খুঁড়ে খনি বানিয়ে লাইমস্টোন ভূপৃষ্ঠের ওপরে আনার কাজে বহুকাল ধরেই অভ্যস্ত। লাইমস্টোন গুঁড়িয়ে জলে ভিজিয়ে তার মধ্যে থেকে বিশুদ্ধ চুন ছেঁকে আনার প্রযুক্তিও তাঁদের করায়ত্ত। আগেকার সময়ে নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে বাড়তি চুন বিক্রি করে দেওয়া হত ব্রহ্মপুত্র ও বরাক-সুরমা অববাহিকায় অবস্থিত বিভিন্ন বাজারে। এই ব্যবসায় লাভক্ষতির হিসেব সম্ভবত করা হত না। কারণ চুনের বদলে নুন বা অন্য কোনো পণ্য নিয়ে ঘরে ফিরতে পারলেই পাহাড় জঙ্গলের জনজাতির মানুষ খুশি। এই তল্লাটে ব্রিটিশ আসার অনেক আগে থেকেই এইভাবে চলত জীবনযাপন প্রক্রিয়া।



লাইমস্টোন বা চুনাপাথর গুঁড়িয়ে সরাসরি চুন পাওয়া গেলেও তা মোটেও লাভজনক নয়। সিমেন্ট এবং ইস্পাত উৎপাদনের জন্য লাইমস্টোন অনেক বেশি প্রয়োজনীয় উপাদান এবং লাভজনক। ব্রিটিশ ব্যবসা বোঝে। মাটি খুঁড়লেই লাইমস্টোন পাওয়া যায় এমন একটা সহজলভ্য বিষয় ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগেই তাঁদের নজরে আসে। স্থানীয় মানুষের বিনিময় প্রথার চুনের ব্যবসাও তাঁদের নজর এড়ায়নি। ফলে সময় নষ্ট না করে এখানকার যেসব এলাকায় লাইমস্টোন পাওয়া যেতে পারে সেই জায়গাগুলোকে চিহ্নিত করে ফেলা হল। এখানে তো কোনো ব্যক্তিবিশেষের জমির মালিকানা নেই। জমির মালিক স্থানীয় জনজাতি। সহজ কথায় স্থানীয় সমাজ। শুরু হয়ে গেল জনজাতি প্রধানদের সঙ্গে কথাবার্তা। যেখানে যেমন সেখানে তেমন আলাপ আলোচনা করে প্রয়োজনে হয়তো ভয় দেখিয়ে আগে থেকে চিহ্নিত এলাকা করায়ত্ত করা হল। এখানে জমি কেনাবেচা নিষিদ্ধ। আগেও ছিল এখনও সেই নিয়ম বহাল রয়েছে। কাজেই লিজ নেওয়া হল। দশ -বিশ বছর নয়, একলপ্তে একশো বছরের লিজ। তবে দুর্গম পথ এবং অপ্রতুল পরিবহণ ব্যবস্থার জন্য ব্রিটিশের এই বিনিয়োগ খুব একটা কাজে আসেনি।

স্বতন্ত্র রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর মেঘালয়ের পাহাড় জঙ্গলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিল্পোদ্যোগীদের যাতায়াত শুরু হল। লাইমস্টোন ভিত্তিক পোর্টল্যান্ড সিমেন্টের তখনও রমরমা। কিন্তু আইন বড় বালাই। মেঘালয় ভারতীয় সংবিধানের ষষ্ঠ তফশিলের অন্তর্ভুক্ত বলে ব্রিটিশ আমলের মতোই এখানে সরাসরি জমি কিনে বিনিয়োগ করা সম্ভব নয়। তবে সব আইনের মধ্যেই কিছু না কিছু ফাঁকফোকর থাকে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কোনো রকমে গ্রামের সিয়েম বা গ্রামপ্রধানকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে জনজাতির জমি করায়ত্ত করে গড়ে উঠতে লাগল একের পর এক সিমেন্ট কারখানা। বিংশ শতাব্দী শেষ হওয়ার আগেই ন’টি সিমেন্ট কারখানা উৎপাদন শুরু করে দিল। দুই দশকের মধ্যে সংখ্যাটা তিরিশের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। ব্রিটিশের মতো একশো বছরের লিজ চুক্তিতে জমি ব্যবহারের অনুমোদন নিয়ে প্রতিটি কারখানাই একশো দেড়শো থেকে চারশো পাঁচশো একর জমিতে শুরু করে খননের কাজ। যেখানে যতটুকু জমি একলপ্তে পাওয়া গেছে সেটুকু নিয়েই তৈরি হয়েছে সিমেন্ট কারখানা। স্বাভাবিকভাবেই আশপাশের এলাকায় বসবাসের বন্দোবস্ত না করে উপায় কী! দোকান- বাজারও গজিয়ে উঠতে দেরি হয়নি। তবে হারিয়ে গেছে জঙ্গল। পাহাড় হয়েছে সমভূমি। আর স্থানীয় জনজাতির মানুষ যাঁদের হাতে সামান্য টাকাপয়সা ধরিয়ে দিয়ে তাঁদের চাষের জমি বসতভিটা দখল নেওয়া হয়েছিল তাঁরা যে কোথায় চলে গেলেন কে জানে?



প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে পোর্টল্যান্ড সিমেন্টের ব্যবহার কমে গেছে। ইস্পাত কারখানার বর্জ্য বা স্ল্যাগ ব্যবহার করে এখন যে সিমেন্ট তৈরি হচ্ছে তা গুণমানের নিরিখে উৎকৃষ্ট। ফলে মেঘালয়ের বেশ কয়েকটি সিমেন্ট কারখানা পাততাড়ি গুটিয়ে ফেলার চেষ্টা করছে। কিন্তু তারা চলে গেলেও কি আর ফিরে আসবে পাহাড় জঙ্গল এবং সেই হারিয়ে যাওয়া যূথবদ্ধ স্থানীয় জনজাতির মানুষ!

ছবি সৌজন্যে: Pexels

Tags

Please share your feedback

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Soumitra Chatterjee Session-Episode-2 স্মরণ- ২২শে শ্রাবণ Tribe Artspace presents Collage Exhibition by Sanjay Roy Chowdhury ITI LAABANYA Tibetan Folktales Jonaki Jogen পরমা বন্দ্যোপাধ্যায়