ক্যান্সারকে হারিয়ে গরিব বাচ্চাদের খাওয়া জোটানোই “আঁচল দিদির” প্রতিজ্ঞা

1751

আঁচল শর্মা সুপারহিরোদের মত পোশাক পরেন না ঠিকই‚ কিন্তু দিল্লির রঙ্গপুরী বস্তির কয়েক হাজার বাচ্চার জন্য আঁচল ‘দিদি’ এক জন সুপারহিরো| কেমোথেরাপি নিয়ে সোজা আঁচল হাজির হন বস্তিতে, সঙ্গে থাকে বাচ্চাদের জন্য গরম খাবার|বাচ্চারাও তাদের ‘দিদি’-র জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে| আঁচল জানিয়েছেন ওঁকে দেখে বাচ্চাদের চোখে মুখে যে আনন্দ ফুটে ওঠে সেটার থেকে বড় পাওনা আর কিছু হয় না|

ছোট থেকেই আঁচলকে অনেকে কিছু সহ্য করতে হয়েছে| দিনের পর দিন উপোস করে কেটেছে| বাড়ির লোকের হাতে নিয়মিত নির্যাতিত হতে হয়েছে| চোখের সামনে বোনের মৃত্যু দেখেছেন আঁচল| সব শেষে ২০১৭ সালে স্টেজ থ্রি ব্রেস্ট ক্যান্সার ধরা পড়ে ওঁর|

কিন্ত দিল্লির এই সাহসিনী কোনও পরিস্থিতেই হার মানবেন না বলে ঠিক করেছেন| নিজের জমানো টাকা খরচ করে উনি নিয়মিত ১০০-২০০ বাচ্চাদের খাওয়ান‚ ওঁর জীবন অনেকের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়াতে পারে|

আঁচলের জন্ম এক দরিদ্র পরিবারে‚ ওঁর বাবা একজন অটো চালক ছিলেন| কিন্তু খুব বেশি দিন সেই কাজ করতে পারেননি। অটোর মালিক ওঁকে তাড়িয়ে দেন| বেকারত্ব থেকে মদে আশক্ত হয়ে পড়েন| মাঝে মধ্যেই মদ্যপ অবস্থায় স্ত্রী ও মেয়েদের গায়ে হাত তুলতেন| তিন ছেলে মেয়ের মুখে অন্ন জোগাতে আঁচলের মা একটা কারখানায় মজুরের কাজ নেন| কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যে সেই কারখানা বন্ধ হয়ে যায়| আঁচল জানিয়েছেন সেই সময় ওঁদের দীর্ঘ সময় কেটেছে উপোস করে| এমনও দিন গেছে যখন সারা দিনে মাত্র একটা রুটি খেতে পেয়েছেন | আঁচল সেই সময় অষ্টম শ্রেণিতে পড়তেন| বাধ্য হয়ে স্কুলে ছাড়তে হয় ওঁকে| উনি একটা ট্রেডিং ফার্মে রিসেপশনিস্টর চাকরি পান| মাসে চার হাজার টাকা পারিশ্রমিক| পড়াশোনা শেষ না করলেও আঁচল খুব তাড়াতাড়ি অফিসের কাজে সিদ্ধহস্ত হয়ে যান| ঝরঝরে ইংরেজিতে আঁচল জানিয়েছেন ‘ আমি সেই সময় কিছু জানতাম না| কিন্তু নিজের চেষ্টায় সব শিখেছি|’

এর ফলে আঁচল কেরিয়ারে দ্রুত সফলতা পান| একটা রিয়েল এস্টেট সংস্থায় চাকরি পেয়ে যান উনি| পাশাপাশি ওঁর পারিশ্রমিক ও বাড়তে থাকে| কিন্তু এক বন্ধু ওঁকে ঠকিয়ে আড়াই লক্ষ টাকা নিয়ে নেয়| ভেঙে না পড়ে আরও মন দিয়ে কাজ করতে লাগলেন আঁচল| খুব শিগগির ওঁর পদোন্নতি হয় এবং উনি ওঁর পরিবারের জন্য একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিতে পারেন|

অন্য দিকে আঁচলের ছোট বোন পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে তাঁর প্রেমিককে বিয়ে করেন| বোনের সিদ্ধান্তে এক মাত্র মত ছিল আঁচলের| বিয়ের পাঁচ মাস বাদে বোনকে খুন করেন তাঁর স্বামী| বোনের অকস্মাৎ মৃত্যু মেনে নিতে পারেননি আঁচল| বোনের খুনিকে উচিত শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন| এর ফলে আঁচলকেও প্রাণের হুমকি দেওয়া হয়| অনেক লড়াই করে অবশেষে বোনের খুনিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের শাস্তি দেয় আদালত|

এই ঘটনাটা আঁচলের পরিবারকে নড়িয়ে দেয়| আত্মীয়স্বজনদের পরামর্শে আঁচলের তাড়াতাড়ি বিয়ের ব্যাবস্থা করেন তাঁরা| এই বিয়েতে খুশি ছিলেন না আঁচল| আঁচলের স্বামী তাঁকে নিয়মিত মানসিক এবং শারীরিক নিপীড়ন করতেন| তিন মাসের মধ্যে স্বামীর ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসেন আঁচল এবং নিজের রিয়েল এস্টেটের ব্যবসা আরম্ভ করেন|

একা হাতে আঁচল ওঁর মা বাবার দেখাশোনও করতেন| এই সময় নিজের বাড়িও বানানো আরম্ভ করেন উনি| কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত পৌরসভার আদেশে সেই বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়| নিজের দিকে নজর দেওয়ার সময় ছিল না আঁচলের| অনেক দিন ধরেই বুকের একপাশে একটা মাংসপিন্ড গজাচ্ছিল| কিন্তু পাত্তা না দিয়ে আঁচল নিজের কাজ ও বাবা মাকে নিয়ে ব্যস্ত রইলেন|

অবশেষে ২০১৭ সালে স্টেজ ৩ ব্রেস্ট ক্যান্সার ধরা পড়ে| আঁচলের কথায় ‘সিনেমাতেও মাঝে মধ্যে হিরোদের হার হয়| কিন্তু আমার বেলায় সেটা হতে দিইনি| ভেঙে না পড়ে আমি ক্যান্সারের মোকাবিলার জন্য নিজেকে তৈরি করলাম| ‘

চিকিৎসা চলাকালীন এক দিন হাসপাতল থেকে ফেরার সময় ট্রাফিক সিগন্যালে কয়েকজন বস্তির ছেলে মেয়ে আঁচলের কাছে ভিক্ষা চায়| উনি টাকা দেওয়ার বদলে সেই বাচ্চাদের কাছের একটা ধাবাতে নিয়ে যান খাওয়াতে| কিন্তু সেই ধাবা মালিক গরীব বাচ্চাদের খাওয়াতে মানা করে দেন| অন্য একটা খাবার জায়গায় বাকি অতিথিরা ওঁদের দেখে খাওয়ার মাঝেই উঠে চলে যান| অন্যদের এই রকম ব্যাবহার দেখে স্তম্ভিত হয়ে যান আঁচল| সেই দিনই উনি ঠিক করেন ওই বাচ্চাদের প্রতি দিন খাওয়াবেন উনি|

প্রথমটায় নিজেই রান্না করে রঙ্গপুরীর বাচ্চাদের খাওয়াতেন উনি| কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই ওঁর জমানো টাকায় টান পড়লো| কয়েকমাস বাদে উনি নিজের এনজিও খোলার সিদ্ধান্ত নিলেন| সংস্থার নাম রাখলেন ‘মিলস অব হ্যাপিনেস’ | অনেকেই দান করলেন| কিন্তু এতেও সমস্যা দেখা দিল| আঁচলের কথায় ‘ অনেকে তাঁদের জন্মদিন বা বিবাহ বার্ষিকীতে টাকা দিয়ে সাহায্য করে| সেই দিনগুলোতে আমি ২০০০ বাচ্চাকে খাওয়াতে পারি| কিন্তু অন্য দিন টাকা না থাকায় ২০০-র বেশি বাচ্চাদের খাওয়াতে পারি না|’

আঁচলের স্বপ্ন ৫০০০ বাচ্চার মুখে নিয়মিত অন্ন তুলে দেওয়ার| ইদানিং তাই উনি সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ক্রাউড ফান্ডিং করে নিজের স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন | যে হাসপাতালে ওঁর চিকিৎসা চলছে সেইখানকার বেশ কয়েক জন ডাক্তার ইতিমধ্যেই এগিয়ে এসেছেন আঁচলকে সাহায্য করতে| তাঁরা নিয়মিত আঁচলের সঙ্গে বস্তিতেও যাওয়া আসা করেন|

আঁচলের এখনও চার বছর সময় লাগবে সম্পূর্ণ নিরাময় হতে| তবে উনি জানিয়েছেন যত ক্ষণ প্রাণ আছে তত ক্ষণ উনি বস্তির বাচ্চাদের খাওয়াদাওয়ার ব্যাবস্থা করবেন|

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.