Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

‘লীলাদি’ থেকে ‘লীলাদিদু’- এক আশ্চর্যময়ীর দলিল

মন্দার মুখোপাধ্যায়

ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২৬

Leela Majumdar
Bookmark (0)
Please login to bookmark Close
(Leela Majumdar)

আমার মনে এখনও এক ধন্দ যে, ঠিক কাকে নিয়ে লিখছি এ লেখা! মানুষটি, না লেখিকা লীলা মজুমদার। কারণ, একদিকে যেমন তাঁর রাশি রাশি লেখা, অন্যদিকে তেমনই ঝুড়ি ভর্তি গপ্পো। আর এই সব গপ্পোগুলো শুনেছি বা শুনে চলেছি একেবারেই কাছের মানুষদের থেকে। ‘লীলাদি’ থেকে ‘লীলাদিদু’— এমন সব সম্বোধনে ক্রমেই পারাপার করেছি প্রজন্মের সীমারেখা। এরই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলেছে ছাপা বইয়ে তাঁর লেখাগুলি এবং অন্তর্জাল জুড়ে নানা তথ্য, তাঁর আপনজনদের ইন্টারভিউ সমেত।

মানুষটি আমার বাবা-মায়ের জন্মের আগে এসে, দিন দশেক কম একশো বছর এই পৃথিবীতে শ্বাস নিয়ে চলে গেলেন তাঁর বহু অনুজদের অনেক পরে। ফলে জীবদ্দশাতেই তিনি এক স্মরণীয় ইতিহাস। আর, সে ইতিহাস এমনভাবে মিশে আছে আমার শ্বাসবায়ুর সঙ্গে যে, মনে হয় তা যেন আমার নাগালের মধ্যেই; যেন এক না-দূর অতীত। ফিরে তাকাতে হবে না; সবটাই চোখের উপর।


আরও পড়ুন: সাহেব ‘পণ্ডিত’– ডঃ ব্রায়ান এ.হ্যাচার


গল্পে তিনি প্রথম এসেছিলেন মায়ের আলাপচারিতায়। শান্তিনিকেতনে কিছুকাল থাকার সময় মা তাঁকে চকিতে দেখেছিলেন। তাঁদের ‘বিবিদি’ অর্থাৎ ইন্দিরা দেবীর তত্ত্বাবধানে আলাপিনী মহিলা সমিতিতে গানের ক্লাস করতে গিয়ে। সে সময়কার আটপৌরে শান্তিনিকেতনে লীলা মজুমদারের সেই হেঁটে আসা, ‘কী গো হেডমাস্টার, ক্লাসে বসে গেছো?’… ‘বিবিদি’র সঙ্গে এমন বাক্যালাপ এবং দু’জনের মধ্যে সেই হাসি বিনিময় মুগ্ধ করে রেখেছিল আমার মা’কে। বারবার বলতেন, পাড় দেওয়া সাদা তাঁতের শাড়ি পরে, গরমের বিকেলে দৃঢ় পায়ে তাঁর সেই হেঁটে চলে যাওয়ার দৃশ্য।

ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী হওয়ার সুবাদে মা জানতেন, কী বর্ণময় ছিল তাঁর লেখাপড়ার সাফল্য। প্রথম হওয়া, মেডেল পাওয়া এবং অল্প সময় হলেও আশুতোষ কলেজে তাঁর অধ্যাপনা, ও সেই সঙ্গে ‘রায়’ পরিবারের উত্তরাধিকার। রবীন্দ্রনাথের আমন্ত্রণে শান্তিনিকেতনে পড়াতে এলেও বেশিদিন থাকেননি। ফলে এটা সম্ভবত সেই ১৯৫৫-৫৮ সালের মধ্যে কোনও সময়, যখন লীলা মজুমদার শান্তিনিকেতনে এসে নিজের বাড়িতেই থাকতেন। কারণ ওই সময়ই আমার বাবা-মা শান্তিনিকেতনে ছিলেন, বোলপুরের শ্রীনন্দা স্কুলে, কাজের সূত্রে।

Leela Majumdar
আমাদের দুই বোনের অনেক দুপুর কেটেছে লীলা মজুমদারের বইগুলি মায়ের পড়ে শোনানোয়।

আমাদের দুই বোনের অনেক দুপুর কেটেছে লীলা মজুমদারের বইগুলি মায়ের পড়ে শোনানোয়। পরেও ভীষণ খুশি হয়েছিলেন তাঁর রান্নার বইটি হাতে আসায়। ততদিনে আমি ডুবে গেছি বিমল কর, সমরেশ বসু, সুনীল-শক্তিতে। দাদাদের কাছ থেকে ভাই ফোঁটায় উপহার পাওয়া ‘আর কোনওখানে’, ‘পাকদন্ডী’— এসবও হয়ে গেছে কিশোর সাহিত্য। আমার শৈশবে মা যাঁকে ‘লীলাদি’ বলে উল্লেখ করতেন, ততদিনে তিনিও বদলে গিয়ে মায়ের আলাপে হয়ে গেছেন লীলা মজুমদার। অনেক বছর পর তাঁর শান্তিনিকেতনের বাড়িটি দেখতে গিয়েছিলাম। তাঁর জীবদ্দশাতেই সেটি কিনে নেন যোগেন চৌধুরী। অচেনা কারোর হাতে চলে না গিয়ে, বাড়িটিও আবার দেখভাল পায় আর-এক স্বনামধন্য চিত্রীর। (Leela Majumdar)

তবে লীলা মজুমদার সম্পর্কে সব থেকে স্বাদু গল্পগুলি শুনেছি আমার বন্ধু সৌম্য চক্রবর্তীর কাছে। একদা তার এক জম্পেশ মামার বাড়ি ছিল ওল্ড বালিগঞ্জ প্লেসে। কোনও এক আত্মীয়তা সূত্রে, লীলা মজুমদার ছিলেন তার ‘লীলা দিদু’ বা ‘কুটুম দিদু’। ফলে ওইসব অঞ্চলে থাকা ‘মজুমদার’ গুষ্টির নানান মজাদার গপ্পে সে মাতিয়ে রাখত আমাদের। এখনও উসকে দিলে আয়েস করে বসে যখন সেই ঝাঁপিটি সে খোলে, বুঝতে পারি যে লীলা মজুমদার এদেরই লিখে বা এঁকে গেছেন তাঁর বইগুলিতে। (Leela Majumdar)

ভারি মজার এক অভ্যাস তাঁর আছে। পছন্দের অন্যান্য লেখকদের সঙ্গে লীলা মজুমদারের নানা লেখার পাঠ, নিজের গলায় সে রেকর্ড করে নিয়মিত; থেকে-থেকেই সেইসব অডিও ‘শেয়ার’ করে বন্ধুদের সঙ্গে।

‘ভ্যাংচা’ মামা থেকে শুরু করে, টুকটুকে ফর্সা সেই চার বোন, যাঁদের নাম ছিল ‘কালি’, ‘ঝুল’ বা যাঁদের সেই সকাল থেকে রাত অবধি উদ্ভট সব চালচলন— এঁদের কথাই অন্য নামে ঘোরাফেরা করছে তাঁর বইগুলিতে। সৌম্য যদি লেখার অভ্যাসে থাকত, তবে ওর সেই লেখাই হতে পারত— সটীক লীলা মজুমদার। (Leela Majumdar)

তবে ভারি মজার এক অভ্যাস তার আছে। পছন্দের অন্যান্য লেখকদের সঙ্গে লীলা মজুমদারের নানা লেখার পাঠ, নিজের গলায় সে রেকর্ড করে নিয়মিত; থেকে-থেকেই সেইসব অডিও ‘শেয়ার’ করে বন্ধুদের সঙ্গে। পডকাস্ট বা ইউটিউব চ্যানেল ইত্যাদিতে ঝোঁক না থাকলেও সে নিজস্ব গোষ্ঠীতে অনায়াসে চালিয়ে যাচ্ছে অবিজ্ঞাপিত এই ‘লীলা মজুমদার ফ্যান ক্লাব’। (Leela Majumdar)

Leela Majumdar
পরিবারে সকলের কাছেই মান্যতা পেয়েছিল তাঁর মেধা, মনন এবং লেখালেখির শ্রম। প্রায় চার প্রজন্ম জুড়ে তিনিই ছিলেন তাঁর চালিকাশক্তি।

সম্প্রতি ওল্ড বালিগঞ্জ প্লেসের একটি বই কম্পোজের ঠেকে বসে জানলাম, ওই বাড়ি থেকে একটু এগিয়ে গেলেই ছিল লীলা মজুমদারের বাড়ি; মানে সেকেন্ড লেন ছেড়ে এগিয়ে যেতে হবে ফার্স্ট লেনের দিকে। যেখান থেকে শুরু হচ্ছে বালিগঞ্জ পার্ক। (Leela Majumdar)

মনে মনে ঠিক করে নিলাম, সময় সুযোগ মতো এই পুরনো বাসিন্দা ঋষিকেশ চক্রবর্তী মশাইয়ের কাছ থেকেই জেনে নিতে হবে, এ-পাড়ায় তাঁর দীর্ঘ বসবাসের অন্তরঙ্গ স্মৃতি। যদিও জীবনের বেশিটাই তিনি কাটিয়েছেন কলকাতার চৌরঙ্গী অঞ্চলে। তাঁর চিকিৎসক স্বামীর কোয়ার্টারে; কিন্তু তাঁর গপ্পের অদ্ভুতুড়েরা নিশ্চিতভাবেই হয় এ-পাড়ার, নয়তো তাঁর জন্মস্থান গরপারের। (Leela Majumdar)

দ্বিতীয়বার বিচ্ছিন্ন হলেন রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে। রায় পারিবারের মান্য সুহৃদ রবি ঠাকুরের আমন্ত্রণে দার্জিলিং ইস্কুলের চাকরি ছেড়ে বিশ্বভারতীতে যোগ দিয়েও, মন বসল না; ফলে ইস্তফা। খুব সহজ ছিল না এ-কাজ, মানে রবীন্দ্রনাথকে ছেড়ে আসা।

তাঁর স্বাধিকারবোধ যত না প্রকাশ পেয়েছে তাঁর লেখায়, তার থেকে অনেক সরাসরিভাবে প্রকাশ পেয়েছে তাঁর স্বাধীন সিদ্ধান্তে। প্রথম জীবনে বাবার অমতে বিয়ে করে যখন তিনি রায় থেকে মজুমদার হলেন, সেই ভাঙন আর জোড়া লাগল না কিছুতেই। বাবার প্রতি শ্রদ্ধা, ভালবাসা সবই রইল; কিন্তু তার উপর চেপে বসল এক জমাট হিমবাহের চাঙড়; যাপনে স্থান দিলেন নিজের প্রেমকে। (Leela Majumdar)

আর, দ্বিতীয়বার বিচ্ছিন্ন হলেন রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে। রায় পারিবারের মান্য সুহৃদ রবি ঠাকুরের আমন্ত্রণে দার্জিলিং ইস্কুলের চাকরি ছেড়ে বিশ্বভারতীতে যোগ দিয়েও, মন বসল না; ফলে ইস্তফা। খুব সহজ ছিল না এ-কাজ, মানে রবীন্দ্রনাথকে ছেড়ে আসা। অনেক পরে লিখেওছিলেন শান্তিনিকেতন ও রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে। যা ছাপা হয়েছে আরও পরে। বিশ্বভারতীর চাকরি ছেড়ে দিলেও তিনি ভালবাসতেন শান্তিনিকেতনে তাঁর নিজের বাড়িটি এবং রবীন্দ্রনাথের গান। (Leela Majumdar)

Leela Majumdar
প্রথম জীবনে বাবার অমতে বিয়ে করে যখন তিনি রায় থেকে মজুমদার হলেন, সেই ভাঙন আর জোড়া লাগল না কিছুতেই।

বিশ্বভারতী ছেড়ে যোগ দিলেন আশুতোষ কলেজে, মেয়েদের বিভাগের অধ্যাপিকা হয়ে। এই চাকরিও ছেড়ে দিয়ে সম্পূর্ণ মন দিলেন পূর্ণ সময়ের লেখালেখিতে। গল্প উপন্যাসের সঙ্গে অনুবাদও একাধিক; কিন্তু খ্যাতি এল শিশু সাহিত্যের হাত ধরেই। সকালবেলা লেখা আর বিকেলবেলা ঘরোয়া আড্ডা; বিষয়ের বাছবিচার নেই। (Leela Majumdar)

তাঁর বাড়িতে বন্ধু হিসেবে যাতায়াতে যাঁর নাম সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়, তিনি প্রেমেন্দ্র মিত্র। এমন এক উত্তাল মেধাসম্পন্ন মানুষের সঙ্গে মতামত বিনিময়ের পরেও তিনি অনায়াসে মিশতেন তাঁর পাড়াপ্রতিবেশী এবং আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে। খুব জোরাজুরিতে পড়ে শোনাতেন নিজের লেখা। রাস্তায় তাঁকে দেখে অপরিচিত মানুষ প্রণাম জানালে, স্বচ্ছন্দে কথা বলতেন তাঁদের সঙ্গে, সই করে দিতেন এগিয়ে দেওয়া খাতায়। পরিবারে সকলের কাছেই মান্যতা পেয়েছিল তাঁর মেধা, মনন এবং লেখালেখির শ্রম। প্রায় চার প্রজন্ম জুড়ে তিনিই ছিলেন তাঁর চালিকাশক্তি। (Leela Majumdar)

এই যাপনে অভ্যস্ত হয়েও মধ্য বয়সে পৌঁছে চাকরি নিয়েছিলেন অল ইন্ডিয়া রেডিওর ‘মহিলা মহল’-এ। সে তো এক আশ্চর্যময়ীর দলিল।

‘সন্দেশ’ পত্রিকার হাল ধরে রেখেছিলেন বহু বছর। আবার নিজের লেখালেখির মতোই একই মগ্নতায় এমব্রয়ডারি করতেন নিজের সেলাই করা ব্লাউজে। ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনি এমনকী তাঁদের ছেলেমেয়েদেরও দায়িত্ব নিয়েছিলেন, অনায়াসে সময় দিয়ে। গৃহপরিচারিকা ও অন্যান্যদের সঙ্গেও তাঁর ব্যবহার ছিল মানবিক এবং যুক্তিগ্রাহ্য। ফলে তাঁকে ঘিরে এক নিশ্চিন্ততার বলয় গড়ে উঠেছিল পরিবার ও বন্ধু মহলে। (Leela Majumdar)

এই যাপনে অভ্যস্ত হয়েও মধ্য বয়সে পৌঁছে চাকরি নিয়েছিলেন অল ইন্ডিয়া রেডিওর ‘মহিলা মহল’-এ। সে তো এক আশ্চর্যময়ীর দলিল। এক লম্বা সময়ের পরিক্রমায় মেয়েদের জীবনে যেন এক নতুন দিগন্ত ঘোষণা করেছিলেন তিনি, তাঁর ‘মহিলা মহল’-এর অনুষ্ঠানগুলির মধ্যে দিয়ে। শুধু কি সে সময়ে, এ যুগেও যা প্রায় অসম্ভব। (Leela Majumdar)

Leela Majumdar
ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনি এমনকী তাঁদের ছেলেমেয়েদেরও দায়িত্ব নিয়েছিলেন, অনায়াসে সময় দিয়ে।

খ্যাতির শিখরে থেকেও এবং নানা পুরস্কারে সম্মানিত হয়েও নিজেকে উপস্থাপন করেননি কোনওভাবেই। অথচ নিজেই হয়ে উঠেছেন স্বয়ং এক প্রতিষ্ঠান। খ্যাত বা অখ্যাত প্রতিটি মানুষেরই একটি নিজস্ব গতিরেখা থাকে। কখনও তা আপনা-আপনিই গড়ে ওঠে; কোনও সময় আবার তা গড়ে তোলা হয় পরিবেশ এবং পরিস্থিতির প্রভাবে। এভাবেই হয়তো আমরা প্রত্যেকেই এক থেকে বহু এবং সমবেত হতে থাকি; হতে থাকি দলবদ্ধ; এবং সেই সঙ্গে কিছুটা বিভাজিতও বটে। ফলে লীলা মজুমদারের সময়কালে যেসব সামাজিক সমস্যা বড় হয়ে উঠছিল, তাতে অনিবার্য ছিল দল বা গোষ্ঠীবদ্ধতা; সহজ ছিল রাজনীতিকরণের দিকে এগিয়ে যাওয়া। (Leela Majumdar)

স্বাধীনতা-উত্তর ভারতবর্ষের এই সময়টা চিহ্নিত হয়ে আছে পরিবার-সহায় নানা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগে। আদর্শবাদের যেসব তরঙ্গে উত্তাল হয়ে উঠছে আমাদের ঘরবসত এবং ভেতর উঠোন, তারই একপাশে দাঁড়িয়ে লীলা নিশ্চিত বুঝেছিলেন যে, এর কোনও স্রোতই ঠিক তাঁর জন্য নয়। কারণ তাঁর বোধ, মনন এবং দক্ষতার উপার্জনে, তিনি দাঁড়িয়ে আছেন এক একক দৃষ্টান্তে। কিন্তু কী সেই রেখা, যা বড় করে এঁকে দিতেই পাশের রেখাটিকে খাটো দেখাল! হয়তো এখানেই থমকে আছে এমন এক মূল্যায়ন যা সমাধানে আনবে আমার সংকট; মানুষ না লেখক— কোন লীলা মজুমদার! (Leela Majumdar)

তাঁর মেধার প্রকাশে দেখি অধ্যাপনার কাজে নানা প্রতিষ্ঠান থেকে বারে বারে আমন্ত্রণ; অন্যদিকে ‘মহিলা মহল’-এর দায়িত্ব পেয়েই খুঁজে খুঁজে তুলে আনা সেইসব মেয়েদের স্বর, যাদের অবস্থান বৃহত্তর সমাজের কাছে অজানা।

Ambition— বোধহয় নিজের কাছেই এক ধরনের দায়বদ্ধতা; আমরা নিজেকেই কথা দিয়ে রাখি। আর এই কথা দেওয়ার পিছনে যেমন কাজ করে আমাদের সমসাময়িক সময় এবং পরিস্থিতি, তেমনই কাজ করে অতীতের ঘটনা। ফলে মনের যে গঠনটি গড়ে উঠতে থাকে, সেখান থেকেই আসে নিজের কাছে কথা দিয়ে সেই কথা রাখার প্রাণপণ চেষ্টা। অনেক সময় তা যেমন প্রকাশ পায়, আবার তা ডুবেও থাকে অন্তর গভীরে। (Leela Majumdar)

লীলা মজুমদারের জীবনে কী এই কথা দেওয়া— সে কথা ভাবতে বসলে দেখি অদ্ভুত এক প্রক্রিয়া চলেছে সেখানে। তাঁর লেখার মধ্যে দেখি অদ্ভুতুড়েদের কাণ্ডকারখানা, ভূতেদের ছড়াছড়ি, এবং বাংলা ভাষার শব্দ প্রয়োগে দাঁড়ি-কমা সহ এক পুনর্নির্মাণ। (Leela Majumdar)

Leela Majumdar
লীলা মজুমদারের জীবনে কী এই কথা দেওয়া— সে কথা ভাবতে বসলে দেখি অদ্ভুত এক প্রক্রিয়া চলেছে সেখানে।

তাঁর মেধার প্রকাশে দেখি অধ্যাপনার কাজে নানা প্রতিষ্ঠান থেকে বারে বারে আমন্ত্রণ; অন্যদিকে ‘মহিলা মহল’-এর দায়িত্ব পেয়েই খুঁজে খুঁজে তুলে আনা সেইসব মেয়েদের স্বর, যাদের অবস্থান বৃহত্তর সমাজের কাছে অজানা। এখানেই তাঁর স্বকীয়তা, ধনী-দরিদ্র-শিক্ষিত-অশিক্ষিত সর্বস্তরের মেয়েদের তুলে ধরতে চেয়েছেন এই ভেবে যে, প্রত্যেকেই কোনও না কোনওভাবে এগিয়ে আসতে চাইছে। আর, সেই এগিয়ে আসাটা একরকম প্রতিদিনের ‘জোয়াল’ টেনে টেনে। একদিকে যেমন উদ্বাস্তু পরিবারের মেয়েরা, অন্যদিকে তেমন গাড়ি-বাড়ি সম্পদের মধ্যেও হাঁপিয়ে ওঠা সম্পন্ন গৃহিণীরা। এঁদের সংগঠন, এঁদের লেখা নাটক, কথিকাও আমরা শুনেছি ‘মহিলা মহল’ থেকেই; তেমনই পেয়েছি বেলা দে-র মতো স্মরণীয় মুখ।

লীলা মজুমদারকে না চিনেও বেলা দে-কে অনায়াসে চিনে ফেলেছেন তাঁরা। ফলে তাঁর অবদান এখানেই অসীম হয়ে উঠেছে এবং তা অনায়াসে, একেবারে ঘর গৃহস্থী উঠোন বৈঠকখানার গল্প সাজিয়ে। কঠিন রুঢ় বাস্তবকেও তুলে ধরেছেন এক অসামান্য মুন্সিয়ানায়। জনপ্রিয়তা আপনিই এসেছে। অথচ না তিনি সোচ্চার হয়েছেন ‘নারীবাদ’ বা ‘আধুনিক’ এমন সব ভাবাদর্শকে তুলে ধরতে, না কোনও জোরালো অবস্থানে বুঝিয়েছেন যে তিনি কতখানি ‘স্বদেশি’। কোনও রকম গা-জোয়ারির ছায়া মাড়াননি।

খুব যে বেড়াতে গেছেন তাও নয়; বিদেশ ভ্রমণ তো নয়ই। হাতে বোনা কাঁথার মতো নিজের নকশায় বুনে গেছেন যাপনের ফোঁড়গুলি, যেখানে মেধার সঙ্গে লাগে পরিশ্রম এবং সংবেদনশীল মন।

তাঁর যাপন ও মনন দেখে বোঝা যাচ্ছে, স্থানীয়, দেশজ, ইয়োরোপীয়— সবেতেই তাঁর অনায়াস যাতায়াত। কারণ তাঁর সংগঠিত অবস্থানে আছে, প্রতিষ্ঠানস্বরূপ ‘রায়’ পরিবার, দু-দুটি নামজাদা কনভেন্ট স্কুল, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্বভারতী এবং স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। ফলে বঞ্চনা বা বাধা বা দেশ বিভাগের সংকট তাঁর জীবনে নেই। তবু তিনি চাইলেন এসব থেকে সরে গিয়ে নিজের মতো করে একটি সংসার সাজাতে। খুব যে বেড়াতে গেছেন তাও নয়; বিদেশ ভ্রমণ তো নয়ই। হাতে বোনা কাঁথার মতো নিজের নকশায় বুনে গেছেন যাপনের ফোঁড়গুলি, যেখানে মেধার সঙ্গে লাগে পরিশ্রম এবং সংবেদনশীল মন। (Leela Majumdar)


আরও পড়ুন: লীলা মজুমদারের গল্প: পেয়ারা গাছের নীচে


তাঁর মা সম্পর্কে যেটুকু যা জানা যায়, তা এক অদ্ভুত গল্প। দিদিমা’র মৃত্যুর পর নিজের দুটি নাবালিকা মেয়েকে রেখে সন্ন্যাস নিয়ে চিরদিনের মতো ঘর ছাড়েন দাদামশাই। বড় মেয়েকে বোর্ডিং-এ পাঠিয়ে দেওয়া হলেও, ছোট মেয়েটিকে দত্তক নেন উপেন্দ্রকিশোর, এবং পরে তাঁর বিয়ে দেন নিজের মেজ ছেলের সঙ্গে। তাঁদেরই সন্তান এই লীলা। তাঁর মা-মাসির মধ্যে এই অকাল বিচ্ছেদ, নিজের বাড়ি ছেড়ে মায়ের এই অন্য বাড়িতে এসে থাকা এবং ‘বাপের বাড়ি’-র জোর না থাকা— এসব মিলিয়ে কি কোনও বিষণ্ণতা ছিল তাঁর মায়ের মনে! এজন্যই কি পরিবার বন্ধনকে এত জরুরি মনে করতেন তিনি! (Leela Majumdar)

বাবার সঙ্গে বিরোধ হলেও মা-কে নিয়ে কোনও উপদ্রব ছিল না তাঁর মনে। তাঁর মা সুরমার সেই হারিয়ে যাওয়া বাপের বাড়ি এবং নিজের দিদির সঙ্গে বিচ্ছেদ যেন আবার পরিপূর্ণ হয়ে এসেছিল, যখন লীলা আর তাঁর দিদি জড়িয়ে জাপটে বড় হয়ে উঠেছেন ‘আপন ঘরে’। সেই মাসির কথা এবং নিজের দিদির কথাও তো লিখে গেছেন তিনি অপূর্ব সব মরমী অনুষঙ্গে। (Leela Majumdar)।

এবার বোধহয় সময় হয়েছে লীলা মজুমদার সরণি তৈরিতে উদ্যোগী হওয়ার। এই স্মরণ চিহ্নে গর্বিত হব নিজেরাই। এমন এক অসামান্য জীবনকে মান্যতা তো দিতেই হয়।

এ লেখার শেষে এসে ভাবছি ঠিক কী তাঁর অবদান! কীভাবে মনে রাখতে চাই তাঁকে! হয়তো এমনিই এক মানুষ হিসেবে, যাঁর লেখার কথা ভাবলেই ফিক করে হেসে ফেলি। তিনি আমাদের ভাসিয়ে নিয়েছিলেন অগাধ আনন্দের জগতে। জানতে পেরেছি, তাঁর মেয়ে ও নাতনি দুজনে মিলে সক্রিয়ভাবে অনুবাদ করে চলেছেন লীলা মজুমদারের বইগুলি। এই পরম্পরায় বেঁচে থাকবে মেধার যাপন ও মনন।

তাঁর বাড়ির দিকে এগোনোর আগেই ‘সুচিত্রা সেন মোড়’ বা স্কোয়ার। কিন্তু বাকি রাস্তাগুলো পুরনো সাহেবি নামেই— বন্ডেল রোড, ব্রড স্ট্রীট বা বালিগঞ্জ প্লেস। এবার বোধহয় সময় হয়েছে লীলা মজুমদার সরণি তৈরিতে উদ্যোগী হওয়ার। এই স্মরণ চিহ্নে গর্বিত হব নিজেরাই। এমন এক অসামান্য জীবনকে মান্যতা তো দিতেই হয়। তাই না! (Leela Majumdar)

মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Author Mondar Mukherjee

আড্ডা আর একা থাকা,দুটোই খুব ভাল লাগে।
লিখতে লিখতে শেখা আর ভাবতে ভাবতেই খেই হারানো।ভালোবাসি পদ্য গান আর পিছুটান। ও হ্যাঁ আর মনের মতো সাজ,অবশ্যই খোঁপায় একটা সতেজ ফুল।

Picture of মন্দার মুখোপাধ্যায়

মন্দার মুখোপাধ্যায়

আড্ডা আর একা থাকা,দুটোই খুব ভাল লাগে। লিখতে লিখতে শেখা আর ভাবতে ভাবতেই খেই হারানো।ভালোবাসি পদ্য গান আর পিছুটান। ও হ্যাঁ আর মনের মতো সাজ,অবশ্যই খোঁপায় একটা সতেজ ফুল।
Picture of মন্দার মুখোপাধ্যায়

মন্দার মুখোপাধ্যায়

আড্ডা আর একা থাকা,দুটোই খুব ভাল লাগে। লিখতে লিখতে শেখা আর ভাবতে ভাবতেই খেই হারানো।ভালোবাসি পদ্য গান আর পিছুটান। ও হ্যাঁ আর মনের মতো সাজ,অবশ্যই খোঁপায় একটা সতেজ ফুল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Subscribe To Newsletter

কথাসাহিত্য

জীবনানন্দ দাশ

সংস্কৃতি

আহার

শ্রুতি গঙ্গোপাধ্যায়
অমৃতা ভট্টাচার্য
ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

বিহার

কাকলি মজুমদার
মধুছন্দা মিত্র ঘোষ
নির্মাল্য চ্যাটার্জি

কলমকারী

আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়
আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়

ফোটো স্টোরি

নির্মাল্য চ্যাটার্জি
দেবার্চন চ্যাটার্জি

উপন্যাস

বিতস্তা ঘোষাল
বিতস্তা ঘোষাল
[adning id="384325"]
[adning id="384325"]

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.
  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.
  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.
  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).
  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

 

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com