টানা রিকশার দাস্তান

টানা রিকশার দাস্তান

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
হাতে টানা রিকশা illustration by upal sengupta
অলঙ্করণ: উপল সেনগুপ্ত
অলঙ্করণ: উপল সেনগুপ্ত
অলঙ্করণ: উপল সেনগুপ্ত
অলঙ্করণ: উপল সেনগুপ্ত
অলঙ্করণ: উপল সেনগুপ্ত
অলঙ্করণ: উপল সেনগুপ্ত

তখন ছিল রামায়ণের যুগ। সালটা আনুমানিক ২৫০ খ্রিষ্টপূর্ব। জনককন্যা জানকী চলেছেন পবিত্র নদীস্নানে। তাঁকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে চারজন শক্তপোক্ত মানুষ, যাদের পোশাকি নাম পালকিবাহক বা বেহারাসীতারই পথ অনুসরণ করে সেই রামযুগ থেকে কলিযুগের, বলা যায় উনবিংশ শতকের শেষার্ধে এমনকি বিংশ শতকের গোড়াতেও সারা বিশ্বেই পালকির প্রচলন ছিল। পালকির এহেন রোমান্টিক যাত্রাপথে হঠাৎ বাধা পড়ল। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো শিল্পবিপ্লব বা ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভলিউশন ঘটে গেল পাশ্চাত্যে। তার প্রভাব পড়ল প্রাচ্যেও বিশেষ করে এশিয়া, আরও বিশেষভাবে ভারতীয় উপমহাদেশে ও আফ্রিকায় সালটা ১৭৬০।

এই সময়টাই শিল্পবিপ্লবের সূচনাকাল ইউরোপে, বিশেষ করে ইংল্যান্ডে। ভারতে ও এশিয়ায় তাদের উপনিবেশ যত বেড়েছে, শিল্পবিপ্লবের পথ ততই প্রশস্ত হয়েছে। ১৭৫০ থেকে ১৮৫০ – এই সময়ের মধ্যে সেখানে কৃষি ও বাণিজ্যিক  ব্যবস্থা থেকে আধুনিক শিল্পায়নের গতি শুরু হয়ে গেছে। আর এই জন্য প্রয়োজনীয় পুঁজি আসছে ঔপনিবেশিক ব্যবসা থেকে এই কারণেই সময় ও মানুষের শ্রমকে ভাগ করার জন্য ইতিহাসের পালা বদলের সাক্ষী হয়ে ক্রমশ পালকি উঠে যাচ্ছে সারা পৃথিবীর সড়কপথ থেকে, তার পরিবর্তে বিকল্প হিশাবে আসছে মনুষ্য চালিত ও বাহিত আর এক নতুন ত্রি-চক্র যানকারণ একটাই। পালকির চেয়ে এটা দ্রুত দৌড়য় আর ঘোড়ার গাড়ি বা ঘোড়ার থেকে মানবশ্রম ছিল অনেক সস্তা। এই নতুন হাতে টানা যানেরই নাম রিক্‌শা।

শব্দগত বুৎপত্তি

রিক্‌শা একপ্রকার মানবচালিত মনুষ্যবাহী ত্রিচক্রযান, যা এশিয়ার, বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোতে প্রচলিত একটি ঐতিহ্যবাহী বাহন। যদিও দেশভেদে এর গঠন ও আকারে বিভিন্ন পার্থক্য দেখা যায়। জাপানি রিকশাগুলো অবশ্য তিনচাকার ছিল না, সেগুলো দু’চাকায় ভর করে চলত। আর একজন মানুষ ঠেলাগাড়ির মতো করে টেনে নিয়ে যেত। এ ধরনের রিক্‌শাকে ‘হাতে টানা রিক্‌শা’ও বলা হয়সাধারণত ‘রিক্‌শা’ বলতে এই জাতীয় হাতে টানা রিক্‌শাকেই বোঝানো হয়ে থাকে। বাংলা ‘রিক্‌শা’ শব্দটি এসেছে জাপানি ‘জিন্‌ -রিকি-শা’ (人力車,  জিন্ = মানুষ,  রিকি = শক্তি,  শা = বাহন) শব্দটি থেকে, যার আভিধানিক অর্থ হলো ‘মনুষ্যবাহিত বাহন’মানবশক্তির শকট বা man-power carriage এর njjin-riki-sha ধ্বনি বিপর্যয়ে হয়ে উঠল আমাদের রিক্‌শা।

রিক্‌শার উদ্ভাবন

 
ঠিক কে প্রথম রিক্‌শা বানালেন, আজও জানা যায়নি। মার্কিনিরা দাবি করে যে অ্যালবার্ট টোলম্যান নামে এক মার্কিন কামার মিশনারিদের জন্য ১৮৪৮ সালে প্রথম রিক্‌শা তৈরি করেন। অন্যরা বলে জোনাথন স্কোবি নামে একজন মার্কিন মিশনারি ১৮৬৯ খ্রিষ্টাব্দে রিক্‌শার উদ্ভাবন করেন। জাপানে। স্কোবি থাকতেন জাপানের ইয়োকোহামায়। স্কোবির স্ত্রী ছিলেন চলৎশক্তিহীন ইয়াকোহামার রাস্তায় স্ত্রীর চলাচলের সুবিধার্থেই নাকি স্কোবি রিক্‌শা বানান। অনেকে আবার বলেন, ১৮৬৯ সালে ইজ়ুমি ইয়োসুকি সুজ়ুকি টোকুজিরো ও টাকাইয়ামার সঙ্গে জোট বেঁধে এই রিক্‌শা তৈরি করেন। আবার এও শোনা যায় যে ১৮৮৮ সালে একজন মার্কিন ব্যাপটিস্ট মন্ত্রী রিক্‌শা তৈরি করেন। নিউ জার্সির বার্লিংটন কান্ট্রি হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি দাবি করে, ১৮৩৭ সালে রিক্‌শা উদ্ভাবন করেন জেমস ব্রিচ ,এবং তাঁর নামঙ্কিত রিক্‌শাটি মিউজিয়মে রাখা আছে এখনও।  

ভারতে রিকশা

বিশ শতকের একদম প্রথমে সুদূর পূর্বের আদলে অবিভক্ত ভারতেও রিক্‌শা এসে পড়ে। এই রিক্‌শা ছিল হাতে টানা। রেভারেন্ড জে ফরডিসের হাত ধরে ১৮৮০ সাল নাগাদ সিমলার রাস্তায় প্রথম রিক্‌শা দেখা যায়। লেডি ডাফরিন তাঁর স্মৃতিকথা ‘Our Vice regal life in India’ গ্রন্থে সিমলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সামজিক অবস্থান, মহিলাদের ভূমিকা ও রাস্তাঘাটের কথা বলতে গিয়ে রিক্‌শার কথাও উল্লেখ করেছেন। অবশ্য তখন একে জেনি রিক্‌শ বলা হত।

কলকাতায় ১৯০০ সালে প্রথম রিক্‌শা আসে এবং তা আসে চিনেদেরই হাত ধরে। তখন কেবল মাত্র মালপত্র বহনের কাজেই এর ব্যবহার ছিল। ১৯১৩-১৪ সালে ভাড়া নিয়ে যাত্রী তোলার কাজে রিক্‌শাকে কাজে লাগানো হল। ১৯১৪ সাল অবধি এদেশে চিনারাই একমাত্র রিক্‌শা টানত। ১৯২০-তে এই ব্যবসা ভারতীয়দের হাতে চলে আসে। ১৯৩৪ সালের একটি বাংলা বিজ্ঞাপন পাওয়া যায় এই মর্মে–

কলিকাতা কর্পোরেশন
লাইসেন্স বিভাগ
গাড়ী ও ঘোড়ার ট্যাক্স
দ্বিতীয় বৎসরার্দ্ধ-১৯৩৪-৩৫

‘ঘোড়ার গাড়ী, রিকশ, রেসের ও অন্যান্য ঘোড়ার, টাট্টু ঘোড়ার ও অশ্বেতরের মালিক ও রক্ষণকারীদের জানানো যাইতেছে যে ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দের কলিকাতা মিউনিসিপ্যালিটি আইনের ১৬৭(১) ও (২) ধারা অনুসারে তাঁহাদের অধিকারে ও রক্ষণে যত গাড়ী ও পশু আছে ট্যাক্সসহ তাহার তালিকা ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দের ১ লা নভেম্বরের পূর্বে মিউনিসিপ্যা্লিটি অফিসে তাঁহাদিগকে দিতে হইবে। তালিকার জন্য ছাপা ফর্ম সেন্ট্রাল মিউনিসিপ্যাল অফিসে, লাইসেন্স অফিসারের নিকট প্রাপ্য।এই তালিকা না দিলে তাহাদের বিরুদ্ধে নালিশ ও তাঁহাদের কুড়ি টাকা জরিমানা হইতে পারিবে। যাঁহারা সুবিধা ভোগ করিবেন তাঁহারা ইন্সপেক্টর তাঁদের নিকট গেলে তাঁহাদের নিকট হইতে প্রাপ্য ট্যাক্স তাঁহারা তাঁহাকে দিতে পারেন। তিনি তৎক্ষণাৎ টাকা লইয়া রসিদ দিবার ক্ষমতাপ্রাপ্ত। অব্যবহৃত গাড়ীর ট্যাক্স মকুবের আবেদন ১৯৩৪-এ ডিসেম্বরের পর গ্রাহ্য হইবে না।’

প্রতি বছর লাইসেন্স নবীকরণ করতে হবে, এই নিয়মও চালু হল।

সরকারি হিসাবে ২০০৮ সালে কলকাতায় ৫৯৪৫টি হাতে-টানা রিক্‌শা ছিল কলকাতায় প্রায় ২৫০ জন সর্দার। এক একজন সর্দারের অধীনে কুড়ি জন করে রিক্‌শাচালক থাকেন। রিক্‌শাচালকদের বাধ্যতামূলক ভাবে সপ্তাহে ২৮০ টাকা বা দৈনিক ৪০ টাকা সর্দারের হাতে জমা দিতে হয়। সর্দাররা প্রতি সপ্তাহে মালিককে প্রাপ্য টাকা বুঝিয়ে দেন। এক একজন মালিকের গড়ে ১০ থেকে ১৫টি রিক্‌শা চলে। রিক্‌শা চালকদের অধিকাংশেরই বাড়ি বিহার, ঝাড়খন্ডে। অন্যান্য প্রদেশ ও বাঙালি শতকরা ২০ ভাগ। প্রতিমাসে রিক্‌শার সব যন্ত্রপাতির পরীক্ষা করা হয়। বছরের প্রথমে জানুয়ারি মাসে লাইসেন্স নবীকরণ করা হয়। এর জন্য লাগে ৪০ টাকা।

তবে এখন, সরকারি হিসেবে কলকাতায় হাতে টানা রিক্‌শা প্রায় নেই বললেই চলে। তার কারণ, ২০০৫ সালের আগস্টে পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার হাতে-টানা রিক্‌শা সরকারি ভাবে আইন করে বন্ধ করে দেয়। এর ফলে রিক্‌শা চালকরা প্রতিবাদ মিছিল ও ধর্মঘট ডাকেন। এরপর ২০০৬ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শ্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ঘোষণা করেন, হাতে-টানা রিক্‌শা অবৈধ ও চালানো নিষিদ্ধ করা হলেও এই রিক্‌শা চালকদের কথা মাথায় রেখে তাদের জন্য নতুন সাইকেল রিক্‌শার ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু এসবের পরেও কলকাতার বেশ কিছু অঞ্চল যেমন, বালিগঞ্জ, ধর্মতলা, সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ, মহাত্মা গান্ধী রোড, কলেজ স্ট্রিট, বৌবাজার, বাগমারি, অ্যামহার্স্ট স্ট্রিটে এখনও হাতে টানা রিক্‌শাই চলছে। তবে যতোই টানা-রিকশা নিষিদ্ধ করা হোক না কেন, এ কথা অস্বীকার করে লাভ নেই যে স্বল্প দূরত্বে এবং প্রধান সড়ক পথ এড়িয়ে, বিশেষ করে বড়বাজার, বৌবাজার অঞ্চলে, যেখানে অন্য যানবাহন ঢোকার প্রভূত সমস্যা, সেখানে এই হাতে টানা রিক্‌শাই প্রধান অবলম্বন। এমনকি কোথাও কোথাও, বিশেষ করে মফস্বলে রিক্‌শা ’24 hour ambulance service’  হিসেবেও ব্যবহৃত হয়!

হাতে-টানা রিক্‌শা কেবল কলকাতার কয়েকটি জায়গায় সীমাবদ্ধ হলেও সাইকেল রিক্‌শা অবশ্য ভারতের বহু জায়গাতেই এখনো বর্তমানতার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ভারতের রাজধানী দিল্লিএছাড়া পঞ্জাব, হরিদ্বার ,উত্তরাখন্ড, লখনউ, মথুরা, বৃন্দাবন, বিহারের বিভিন্ন প্রান্তে এমনকি ওড়িশাতেও সাইকেল রিক্‌শার যথেষ্ট প্রচলন। অন্য দিকে, মুম্বইয়ের মাথেরান পাহাড়ি অঞ্চলটি ইকো-সেন্সেটিভ জ়োন হওয়ায় এখানে গাড়ির প্রবেশ নিষিদ্ধ, ফলে এখানে এই হাতে-টানা রিক্‌শাই একমাত্র যাতায়াতের বাহন।

তবে কালের গতিতে দ্রুত জীবনের ও সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এসে গেছে টোটো এবং অটো রিক্‌শা। অর্থাৎ কিনা, আদি নকশা বদলালেও রিকশা রয়ে যাচ্ছে নানা নতুন নকশায়। কাজেই যে ছেলেটা প্রাণপণে রিক্‌শা চালাচ্ছে, মুক্তির ঘুড়ি তাকে যতই স্বপ্ন দেখাক না কেন, তাকে নিয়ে যত গানই লেখা হোক না কেন, এখনই রিক্‌শা পাকাপাকি ভাবে মিউজিয়মে স্থান নেবে না। রিক্‌শা থেকে যাবে ,নতুন রূপে, নতুন ভাবে পরিবেশবান্ধব হয়ে।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

Leave a Reply

sharbat lalmohon babu

ও শরবতে ভিষ নাই!

তবে হ্যাঁ, শরবতকে জাতে তুলে দিয়েছিলেন মগনলাল মেঘরাজ আর জটায়ু। অমন ঘনঘটাময় শরবতের সিন না থাকলে ফেলুদা খানিক ম্যাড়মেড়ে হয়ে যেত। শরবতও যে একটা দুর্দান্ত চরিত্র হয়ে উঠেছে এই সিনটিতে, তা বোধগম্য হয় একটু বড় বয়সে। শরবতের প্রতি লালমোহন বাবুর অবিশ্বাস, তাঁর ভয়, তাঁর আতঙ্ক আমাদেরও শঙ্কিত করে তোলে নির্দিষ্ট গ্লাসের শরবতের প্রতি।…